০৯ মে ২০২১
`

নিঃসঙ্গ ঈগল

-

ফররুখ শব্দের অর্থ সৌভাগ্যবান। আমার সৌভাগ্য, কিশোর বয়সে কবি ফররুখের সাথে পরিচয়। ১৯৬৩ সালে শিশু সংগঠন শাহীন ফৌজ ঘিরে কবির সাথে আমার যোগাযোগ। আমি যখন এ সংগঠনের ঢাকা শহরের মাঠ পর্যায়ের কর্মী; কবি তখন এ সংগঠনের তাত্ত্বিক গুরু। আমি সে সময় তাকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম। ব্যক্তি ফররুখ সম্বন্ধে এ নিবন্ধে যা আলোচনা করব তা আমার দেখাশোনা এবং পড়াশুনার ফল।

প্রথমেই বলতে হয়, কবির দেহসৌষ্ঠব সম্বন্ধে যা আমাদের আকর্ষণ করত। দীর্ঘ দেহ, ধারালো নাক, মাথায় লম্বা চুল, প্রশস্ত বুক। এক কথায় তার ছিল এক অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি। মেরুদণ্ড ঋজু, গ্রীবা উন্নত ও নমনীয়। দেহ সৌষ্ঠব অনেকটা আলিফের মতো যেন খাপখোলা তলোয়ার। তিনি ছিলেন পরিচ্ছন্ন চরিত্রের অধিকারী। তার বড় বড় চোখ দেখলে মনে হতো যেন আগুন ঝরছে। চোখের দীপ্তিতে ছিল ঠিকরানো প্রতিভা, হাসিতে শিশুর সারল্য, অপরকে আপন করে নেয়ার এক আশ্চর্য প্রতিভা। প্রতাপ ছিল তার কণ্ঠস্বরে, বলিষ্ঠ গতিভঙ্গিতে, দৃষ্টির তীক্ষ্ণ শাসনে। শানিত কথাবার্তা ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য।

এই যে ফররুখ তার শিশুকাল ছিল হাস্যরসে ভরপুর। রসিকতায় তার জুড়ি মেলা ভার। কবির দাদী মহিলাদের সাথে আলাপকালে বলেন : বিধবারা বিয়ে হওয়ার পর ভালো থাকে, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করে। সেখানে উপস্থিত ফররুখ তার দাদীকে প্রশ্ন করে : দাদী আপনি দাদার ইন্তেকালের পর বিয়ে করলেন না কেন? তাহলে ভালো থাকতেন। আর একটি ঘটনায় কবির দুরন্তপনা লক্ষণীয়। কবি শিশুকালে মুরগির ডিমে তা দিয়েছিলেন বাচ্চা ফোটানোর জন্য।

তার ছিল স্পর্শকাতর মন। অপরের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার সাথে নিজকে একাত্ম করে নিতেন। দুস্থ, বঞ্চিতদের প্রতি তার ছিল গভীর মমতা। ১৯৪৪ সাল, মন্বন্তরের বছর। অগণিত লোক না খেয়ে মারা যাচ্ছে। কবি একদিন ট্রেনে কলকাতা থেকে যাদবপুর স্টেশনে নামলেন; সাথে ভাগ্নে সুলতান আহমদ- পরবর্তীকালে দৈনিক ইনকিলাবের বার্তা সম্পাদক। কবি স্টেশনে দেখলেন, এক ব্যক্তির মর মর অবস্থা। কবি ভাগ্নেকে বললেন দুধ কিনে আনতে। যতœ করে মুমূর্ষু ব্যক্তিটিকে দুধ খাওয়ালেন। পরে যাদবপুর লঙ্গরখানায় পৌঁছে দিলেন। অন্য এক দিনের ঘটনা। কবি তখন ঢাকা বেতারে কর্মরত। এক দুস্থ শিল্পী এসে কেঁদে বললেন, তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, এখনই রক্ত দিতে হবে, অথচ তার কাছে টাকা নেই। কবি ওই দিন পাওয়া বেতনের সব টাকা শিল্পীর হাতে তুলে দেন।

কবি ছিলেন পরের ব্যথায় সমব্যথী। তার ব্যক্তিত্বের অন্তরালে ছিল একটি সংবেদনশীল, কোমল ও স্নেহসিক্ত মন। দৈনিক ইত্তেফাক তখন বন্ধ। নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন (১৯৭১ সালে শহীদ) এবং বার্তা সম্পাদক আসাফউদ্দৌলা রেজা বেকার। আর্থিক কষ্টে দিনপাত করছেন। সে অবস্থায় কবি দু’জনকেই খামে একশত টাকা করে পাঠান। চিরকুটে লিখে পাঠান- থাকলে আরো বেশি দিতাম। কবির ইন্তেকালের পর শোকসভায় রেজা নিজেই এ ৪ঘটনার বর্ণনা দেন। এ হলো কবি ফররুখের চিরন্তন রূপ।

কবি প্রতিভা বিকাশে প্রত্যক্ষ প্রেরণা দিতেন। বিশেষ করে লেখকদের উৎসাহ জোগাতেন। বলতেন, ‘সাহস চাই। অকারণে ভীতু হলে চলবে না। ব্যাপক পড়াশুনা ও অনুশীলন করতে হবে। কোনো অহঙ্কার যেন স্পর্শ না করে।’ কবিদের যে লিখতে উৎসাহ দিতেন শুধু তাই নয়, তাদের বই ছাপাতে প্রেস মালিকদের অনুরোধ করতেন। ফলে প্রফেসর আশরাফ সিদ্দিকীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তালেব মাস্টার ও অন্যান্য কবিতা’ আলোর মুখ দেখতে পায়। ফররুখের উৎসাহে ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর একটি সনেট মাসিক মোহাম্মদীতে ছাপা হয়েছিল।

কনিষ্ঠ লেখকদের প্রতি তিনি ছিলেন সহমর্মী। তাদের লেখার যে অংশ ঝলমল করত তা নিয়েই আলোচনা করতেন। আশা প্রকাশ করতেন, তারা দুর্বলতা কাটিয়ে আরো ভালো লিখবে। এ প্রসঙ্গে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী হাসি সিদ্দিকীর (রেডিও পাকিস্তান ঢাকার স্কুলের ছেলেমেয়েদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী) ঘটনা উল্লেখ করা যায়। কবি ছিলেন তার জন্য স্নেহময় পথপ্রদর্শক। তিনি তাকে ছোট বলে তুচ্ছ করেননি। তার মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। কুড়ি বছরের জুনিয়র ছোট একটি মেয়ের আগ্রহকে কবি তুচ্ছ করে দেখেননি। তার মতামতকে মূল্য দিয়ে আলোচনা করেছেন। সংশোধন করেছেন। প্রতিষ্ঠিত একজন কবির উঁচু আসন থেকে নেমে এসে একটি ছোট্ট মেয়ের আগ্রহ, উৎসাহ, মতামতকে গুরুত্ব দেয়া, মর্যাদা দেয়া ফররুখের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। তার ছিল না কোনো অহমিকা।

১৯৫৩ সালের ঘটনা। গায়ক আবদুল লতিফ ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটি লিখেছিলেন এবং একজন স্বনামধন্য বিখ্যাত কবিকে তা পড়ে শোনান। উদ্দেশ্য, গানটি মানসম্মত হয়েছে কি না তা জানা। সে কবি এ গানটি সম্বন্ধে মন্তব্য করেন : ‘গান বলিস কিরে, এটা আসলে কিছুই হয়নি’। আবদুল লতিফ যারপরনাই ব্যথিত হন এবং তার স্ত্রীর পরামর্শে গানটি কবি ফররুখকে পড়ে শোনান। গান পড়া শেষ হলে অশ্রুসিক্ত ফররুখ আবদুল লতিফকে জড়িয়ে ধরেন। বললেন : ওরে আমি বলে দিলাম, এই গানের জন্যই তুই অমর হয়ে থাকবি।

দলাদলি ও সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে ছিলেন কবি। সময়টা ছিল সম্ভবত তেষট্টি কি চৌষট্টি সাল। কবি জসীমউদ্দীনকে নিয়ে কেউ একজন সংবাদপত্রে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। আর যায় কোথায়। কবি ফররুখ খবরের কাগজের কপি নিয়ে বাংলা একাডেমিতে হাজির হন। এমনিতেই তার চোখ ছিল লাল। ক্রোধে তা আরো অগ্নিশর্মা। ফররুখ বললেন, ‘জসীমউদ্দীনের প্রতি এরূপ আচরণের প্রতিবাদ করা দরকার। একজন কবি সম্বন্ধে বক্তব্যের জন্য অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে’। এরূপ ছিল কবি ফররুখের মন।

কবির আত্মমর্যাদাবোধ ছিল পাহাড়সম। ভীষণ একরোখা। আদর্শের ব্যাপারে একেবারেই আপসহীন। সেখানে তিনি ছিলেন কোষমুক্ত তরবারির মতো শানিত। বলা চলে, একেবারে হিমালয়ের মতো দুর্লঙ্ঘ দুরতিক্রম্য। দরাজ দিল কিন্তু প্রয়োজনে যেকোনো ব্যক্তির সামনে কথা বলতে কুণ্ঠিত হতেন না; সেই ব্যক্তি যতই উচ্চপদস্থ হোন না কেন। তার কাছে পাকিস্তানের কোনো জাঁদরেল শাসকই ঘেঁষতে পারেনি। তিনি আপন বিশ্বাসে পর্বত-শিখরের মতোই অটল ছিলেন। তিনি ভাঙতে রাজি ছিলেন, কিন্তু বাঁকা হতে রাজি ছিলেন না। ‘ভাঙবো, তবু মচকাবো না’। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। রেডিও পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল কবিকে কর্মচারীদের বেতনভাতা ইস্যুতে স্ট্রাইকে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিলে কবি বলেন : রিজিকের মালিক আল্লাহ, আপনি নন।

কবি বিত্ত-বৈভব, সম্পদ দিয়ে মানুষকে মূল্যায়ন করতেন না। তার কাছে পিয়ন ও সরকারের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী কর্মকর্তার মধ্যে এক কানা-কড়িও পার্থক্য ছিল না।

তিনি সরকারকে ছেড়ে কথা বলেননি। এ জন্য তাকে ১৯৫৭ সালে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়। তিনি ছিলেন জালিমের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী। ছিলেন বাঁকা তলোয়ারের মতো। কোনো দিন তাকে কেউ ‘কোষবদ্ধ’ হতে দেখেনি।

যাতে কেউ তাকে অযাচিতভাবে প্রভাবিত করতে না পারে, সেজন্য অনুগ্রহ গ্রহণ করতেন না। একই কারণে তিনি সরকারি খরচে হজ করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তিনি বলতেন : সরকারি ঘুষ আমি খাই না। ১৯৬১ সালে একটি কালচারাল ডেলিগেশন দিল্লি যায়। আমন্ত্রিত হয়েও তিনি দিল্লি যাননি। তিনি ছিলেন নির্লোভ।

অন্য একটি ঘটনায় কবির আত্মসম্মানের বিষয় স্পষ্ট হয়। সাহিত্য সাময়িকী ‘মাহে নও’-এ তার লেখার সম্মানী অন্য একজন জুনিয়র লেখক হতে কম হওয়ায় তিনি সম্মানী বাবদ যে চেক তাকে দেয়া হয় তা ধন্যবাদের সাথে ফেরত দেন। কবির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল টাকার পরিমাণ যাই হোক, জুনিয়র লেখক থেকে সম্মানী কম হওয়া চলবে না। তার দৃষ্টিতে লেখার মানও সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিচার্য বিষয় হওয়া উচিত।

কবির গরিমা বা অহঙ্কার ছিল না। অন্যকে বাহবা দিয়েছেন কিন্তু নিজে নেননি। এনাম-উপঢৌকন গ্রহণ করতেন না। তিনি ছিলেন ইস্পাতের মতো দৃঢ়, নির্ভীক, উন্নতশির; কখনো মাথা নত করেননি। অসাধারণ দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, স্পষ্টভাষী। তোয়াজ করার স্বভাব ছিল না। অমিয় তেজদীপ্ত শক্তিমান। এক কথায় তিনি অসাধারণ আত্মমর্যাদাশীল ছিলেন। একবার পাকিস্তান রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যসচিব কুদরতউল্লাহ শাহাব ফররুখকে তার সাথে দেখা করতে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ফররুখ সে আমন্ত্রণে সাড়া দেননি। অগত্যা তিনি কবির সাথে দেখা করতে নিজেই তার বাসায় যান। কবি ফররুখ নির্দ্বিধায় সচিব মহোদয়কে তার বৈঠকখানার হাতলভাঙ্গা চেয়ারে বসতে দেন। নিজেই গামছা দিয়ে চেয়ারের ধুলাবালু পরিষ্কার করেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, কুদরতউল্লাহ শাহাব ছিলেন উর্দু সাহিত্যিক।

কবি ফররুখ ছিলেন তার ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে যত্নশীল। কিন্তু তিনি একই সাথে ‘এক্সটেনডেড’ পরিবারের সদস্যদের ভালো-মন্দ খেয়াল রাখতেন। কবির দাদা মাগুরার গ্রামের বাড়িতে বিরাট এক সাহিত্যভাণ্ডার গড়ে তোলেন যাতে তার নাতি-নাতনীরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে। সংগ্রহে ছিল শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, মাইকেল প্রমুখের সাহিত্যকর্ম। প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এই পরিবারেরই সন্তান। জিল্লর রহমানের তখন বয়স খুবই কম। এসব সাহিত্য স্কুলের নিচের ক্লাসে থাকার সময়ে পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তার পড়াশুনার বিঘ্ন হতে পারে মনে করে কবি ফররুখ তার দাদাকে কলকাতা থেকে পত্র লিখেন, যেন জিল্লুর রহমানের ব্যাপারে তিনি যত্নবান হন। পরে অবশ্য জিল্লুর রহমান ‘অপোগণ্ড বালক’ হতে সাবালকত্ব অর্জনের পর এসব বই পড়ার ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়।

আভিজাত্যের মোহ ফররুখের ছিল না। ফররুখ আহমদের বংশের পদবি ছিল সৈয়দ। পরবর্তীকালে পদবিটি তিনি আর ব্যবহার করতেন না। সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকাই তিনি পছন্দ করতেন। তিনি বাসার কাজের লোকদের ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। কারো বার্তা নিয়ে বাসার কাজের লোক এলে তিনি তাদের আপ্যায়ন করতে ভুলতেন না। এমনটি ঘটেছে হাসি সিদ্দিকীর কাজের লোক শওকত আলীর সাথেও। বলতেন, ‘শুধু লেবাসে মুসলমান হওয়া যায় না। মনে-প্রাণে আচরণে ইসলাম থাকতে হয়।’

তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের কবি। নিজের জামা-কাপড় নিজেই ধুতেন। কবি শিক-কাবাব, টিকিয়া, চাল-কুমড়ার মোরব্বা, পনির, গোশতের কিমা, পরোটা, খেজুর পছন্দ করতেন। শাক-ডাল তৃপ্তির সাথে খেয়ে বলতেন : আলহামদুলিল্লাহ- সকল প্রশংসা আল্লাহর। বিড়াল, পাখি, ফুল, আতর ও শিশুদের সাথে কবি খেলা করতে পছন্দ করতেন। তিনি যেমন দরিদ্র জনসাধারণের জন্য সহমর্মিতা অনুভব করতেন, নিজেও তেমনি দারিদ্র্যের মধ্যে কঠোর জীবনযাপন করতেন। তার কবিসত্তা ও ব্যক্তিসত্তা পৃথক ছিল না। তার কবিতার এক বিরাট অংশে সমাজের অনাচার, অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বাণী ধ্বনিত হয়েছে।

কবির পোশাক হিসেবে পছন্দ ছিল পায়জামা, পাঞ্জাবি, শেরওয়ানি, শীতে পুলওভার এবং আলোয়ান যা ছিল না খুব দামি। কবি কাপড় ইস্ত্রি করে পরতেন না।

কবি কঠোরভাবে আত্মপ্রচার-বিমুখ ছিলেন। ইসলামের আদর্শকে তিনি উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু প্রচারকের ভাষায় নয়, শিল্পীর ভাষায়। মিথ্যা সহ্য করতে পারতেন না। মিথ্যাবাদীদের সাহচর্য এড়িয়ে চলতেন। কারো আচরণে বিরক্ত হলে সামনা-সামনি বলতে দ্বিধা করতেন না। তার ভেতর-বাইরে ছিল এক। কারো কথায়-কাজে মিল না থাকলে বলতেন ‘খান্নাস, খবিস, ইবলিস’। তিনি সর্বপ্রকার মোনাফেকি ও কৃত্রিমতাকে ঘৃণা করতেন। তিনি কারো ওপর নিজের মতকে চাপাতেন না। স্তাবকদের ঘৃণা করতেন, এড়িয়ে চলতেন। কোনো সময়ই অন্ধভক্তির প্রশ্রয় দিতেন না। ব্যক্তিগত স্বার্থের বশবর্তী হয়ে নিজের মত গঠন বা পরিবর্তন করতেন না। বলতেন, ক্ষুদ্রমনা মানুষ কোনো বড় কাজ করতে পারে না। তার চরিত্রে সততা ছিল সুস্পষ্ট। মন ছিল ভণ্ডামিমুক্ত। সংযম ও পরিমিতিবোধ ছিল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কবি সময়ের গুরুত্ব দিতেন। কাউকে বিশেষ সময়ে উপস্থিত হওয়ার কথা বললে সময়মতো উপস্থিত হতেন এবং আগেই প্রস্তুতি নিতেন যাতে দেরি না হয়। এক কথায় তিনি ছিলেন ‘সোনার মানুষ’।
ফররুখ বন্ধু-বান্ধবের সাথে গল্পগুজব করতে পছন্দ করতেন। কবিকে সামনে রেখে রেডিও অফিসের আবন মিয়ার রেস্টুরেন্টে যে আসর বসত তা থেকে খালি মুখে ফেরার জো ছিল না। বন্ধুদের আপ্যায়ন করতেই কবির বেতনের বিরাট অংশ ব্যয় হয়ে যেত। মজলিসি পরিবেশ ঘন হয়ে উঠলে কবি চেয়ারে দুই পা উঠিয়ে বসতেন। তিনি ঘরানা-নির্বিশেষে সবাইকে আপ্যায়ন করতেন।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়, যা তার চরিত্রের একটি বিশেষ দিক উন্মোচিত করে। কবির তিন বন্ধু- চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান, সরদার জয়েনউদ্দীন ও কবি হাবীবুর রহমান ঢাকার ৩৬ নম্বর র‌্যাংকিন স্ট্রিটের আনোয়ার সাহেবের বাড়িতে আট ফিট-দশ ফিট রুমে থাকতেন। হাবীবুর রহমান কাজ করতেন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় রাতের শিফটে। চৌকি একটা। কাজেই সমস্যা হতো না। দিনে হাবীবুর রহমান চৌকিতে ঘুমাতেন; আর সেই চৌকিতে রাতে ঘুমাতেন কামরুল হাসান ও সরদার জয়েনউদ্দীন। এক রাতে কবি ফররুখ এসে উপস্থিত। দুই বন্ধু কামরুল হাসান ও জয়েনউদ্দীন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলেন। ফররুখকে কোথায় শুতে দেয়া যায়। কবি এর সমাধান করলেন। কবি তাদের নিয়ে শীতের রাতে বের হলেন। রাত ১২টা পর্যন্ত রাস্তায় হাঁটলেন। গল্পগুজব করলেন। শেষে চা খাওয়ার ইচ্ছা হলে ঢাকার পুরনো রেল ক্রসিংয়ে- ফুলবাড়িয়া স্টেশনের ঝুপড়ি রেস্টুরেন্টে তিন বন্ধু মিলে গল্পগুজব করলেন আর চা খেলেন। এক টাকায় ষোল কাপ। তখন কবির পকেটে রূপোর একটি টাকা ছিল। সারারাত তিন বন্ধু মিলে ফুলবাড়িয়া স্টেশনের ঝুপড়ি রেস্টুরেন্টে বসে চা খেয়ে রাত কাটালেন ফজরের আজান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এই হলো আড্ডাবাজ ফররুখের চরিত্র।

ফররুখ রসিকতা পছন্দ করতেন। ছিলেন উচ্ছলতায় পরিপূর্ণ। আফ্রো-এশিয়া লেখক সম্মেলনে যোগদান করার জন্য কিছু কবি-সাহিত্যিক তদবির করে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। শীতকাল হওয়ার কারণে সম্মেলনে যোগদান করার জন্য সবাই স্যুট-বুট, ওভারকোট তৈরি করেছিলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এ সম্মেলন না হওয়ায় তাদের তাসখন্দে যাওয়া হয় না। কেউ একজন বললেন, ওভারকোটের কী হবে? এ আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন কবি। ফররুখ হো হো করে হাসলেন। বললেন, সমস্যা কী, শীতের ভোররাতে ওভারকোট পরে ছাদে বসে মাথায় মোমবাতি জ্বালিয়ে গান গাইলেই হবে ‘আকাশ প্রদীপ হয়ে জ্বলবো’। তখন এ গানটির ছিল প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা। কবি ফররুখের তাৎক্ষণিক রসিকতায় সবাই হো হো করে হেসে ওঠেন।

কবির রসিকতার অন্য দিক হলো, তিনি বন্ধুদের নানা রকম নামকরণ করতেন। এ ব্যাপারে তার জুড়ি মেলা ভার। বন্ধুদের নামকরণের বিষয়ে তার উৎসাহের অন্ত ছিল না। ছিলেন এ বিষয়ে ‘মহা পণ্ডিত’। কবি বন্ধুবর লেখক কাজী আফসার উদ্দিনকে আদ্যক্ষর মিলিয়ে বলতেন ‘কাউয়া’। কবি সিকান্দার আবু জাফরকে বলতেন ‘আল সিকান্দর’। কবি গোলাম কুদ্দুসকে ডাকতেন ‘গদাই কদু’ নামে। বন্ধুবর কবি আহসান হাবীবকে বলতেন ‘ঊর্ধ্বলিঙ্গ শিব’। আহসান হাবীব এতে অস্বস্তি বোধ করলেও ক্রুদ্ধ হতেন না।

এ পর্যায়ে কবির সাহিত্য সম্পর্কে দু-একটি কথা উল্লেখ করা যথার্থ হবে। ফররুখ আহমদ কবিতা, ব্যক্তিত্ব, মানবিকতায় নিজেই ছিলেন নিজের তুলনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, যেকোনো সাহিত্যের থাকতে হবে জীবন-দর্শন, স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকত্ব এবং বক্তব্যে তীব্রতা। তার লেখায় নৈরাশ্য ছায়াপাত করেনি। তিনি ঐতিহ্যের ভিত্তিমূলে আদর্শের পতাকা উড়িয়েছেন। কবিতাকে অবলম্বন করেছিলেন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জীবন এবং সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে। তার কবিসত্তা বিপর্যস্ত হয়নি।

ফররুখ ছিলেন একজন শিল্পী-কবি। তিনি বলতেন, কবিতা লেখা কারুকার্যের ব্যাপার। এর জন্য লেখকের নিজস্ব পরিকল্পনা দরকার। সাহিত্যচর্চায় জ্ঞান ও বিদ্যা দুটোই লাগে।

একজন লেখক শিল্পী বেঁচে থাকেন তার শিল্পকর্মের ভেতর দিয়ে; কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্য দিয়ে নয়। একজন লেখকের বড় গুণ হলো, মানবতার প্রতি তার মমত্ববোধ- অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত ও ভাগ্যহতদের জন্য অশ্রু; সর্বোপরি বিশ্বমানবতা। ফররুখ ছিলেন উদার, অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী কবি।

সাহিত্য মূল্যায়ন সম্পর্কে তার মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : কবিতায় আমরা পশ্চিম বাংলার চেয়ে পিছিয়ে নেই। কিন্তু গদ্যে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। আমাদের গদ্যে সাবলীলভঙ্গি আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে [আবদুল আহাদ, প্রেমিক ফররুখ, শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ফররুখ আহমদ : ব্যক্তি ও কবি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, জুন ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৪৮]।

ফররুখের দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করার জন্য তার সাক্ষাৎকার হতে উদ্ধৃতি দেয়া প্রাসঙ্গিক হবে। কবি এক সাক্ষাৎকারে বলেন : ... ড্রয়িং রুমের একপাশে দামি শেলফে রেক্সিনে বাঁধানো অনেক অনেক বই সাজানো থাকে। কোনো দিন সেসব বইয়ের পাতা খোলা হয় না [আবদুল মান্নান সৈয়দ, ফররুখ আহমদ : জীবন ও সাহিত্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, জুন ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ৩১১]।

অন্যত্র এক সাক্ষাৎকারে বলেন : দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে আমাদের পাঠক-সম্প্রদায়কে পরিচিত করতে হলে মাতৃভাষার মাধ্যমেই সে চেষ্টা করতে হবে ...তরজমা করার মতো যোগ্য লোকেরও তখন অভাব হবে। আর যেসব বই লেখা বা তরজমা হবে, তারও প্রকাশক খুঁজে পাওয়া যাবে না [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩০৭]। কবি বলেন : টাকাই এখন মানুষের ঈমানের চাইতে বড় হয়ে উঠেছে [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৪-৩২৫]।
কবি ছিলেন ভোগবাদে নিরাসক্ত। তার ছিল না বিলাসী জীবনের প্রতি মোহ। তিনি অপচয়কে দারুণ ঘৃণা করতেন। স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে এক পত্রে তিনি লিখেন : আম্মা আয়েশার [উম্মুল মোমেনিন- বিশ্বাসীদের মাতা নবী মুহাম্মদ- তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক- এর স্ত্রী] মাত্র একটি জামা ছিল [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৪]।

কবির জীবনে কোনো অহমিকা ছিল না। ছিল না আত্মম্ভরিতা। কুরআনের অনুবাদ যখনই করেছেন ফররুখ, কোনো আলেমকে তা দেখিয়ে নিতেন [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৩৯]।

কবি ফররুখ আহমদ সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী পাঠককে শাহবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ফররুখ আহমদ : ব্যক্তি ও কবি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, জুন ১৯৮৮ পড়ার জন্য অনুরোধ করছি। সেই সাথে অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমান সম্পাদিত ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য (প্রথম খণ্ড, জুন ২০১৫ এবং দ্বিতীয় খণ্ড, বইমেলা ২০১৭), বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি., ঢাকা, পড়ার অনুরোধ করছি।

নিবন্ধকার ‘ঈগলস আই : লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্কস অব ফররুখ আহমদ’-এর লেখক।



আরো সংবাদ