০৯ মে ২০২১
`

করোনা নিয়ে পর্যবেক্ষণ

-

আমি নিজে বিজ্ঞানী নই। সামাজিক মানুষ এবং সমাজ নিয়ে ভাবি। কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটি উপেক্ষা না করে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সমাজের মানুষের ভাবনা-চিন্তাগুলো জানার চেষ্টা করি এবং নিজের উপলব্ধিটা জানাই । শুরু থেকেই করোনা নিয়ে লেখালেখি করেছি এবং বিশ্বাসের জায়গা থেকেই লেখার চেষ্টা করেছি। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে একেবারে ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম এবং ঘরকেই মসজিদ বানিয়ে নিয়েছিলাম। এখন প্রয়োজনে বাজারে যাচ্ছি এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামায়াতের সাথে আদায় করছি। ২০ রাকাত পুরো তারাবিহ পড়ার মতো সুস্থতা আল্লাহপাক এখনো বহাল রেখেছেন। তাই তাঁর দরবারে শুকরিয়া, আলহামদুলিল্লাহ। আমার বিশ্বাস, মসজিদে ২০ রাকাত তারাবিহ পড়ার মধ্যে করোনা থেকে সুরক্ষাও রয়েছে। আমেরিকাপ্রবাসী ছেলের সাথে কথা বলার সময় রসিকতা করে বললাম, ২০ রাকাত তারাবিহ পড়া মানে ৫-৬ কিলো হাঁটার মতো শারীরিক শ্রম (করোনা নিয়ে আমার ছেলের কিছু গবেষণা আছে এবং সে শারীরিক শ্রমের ওপর খুব গুরুত্ব দেয়, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বলা এবং আমার কথা শুনে সে হেসে দিলো)।

আসলে আল্লাহর বিধান তাঁর বান্দাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সমভাবে কল্যাণকর। মোমিন আখেরাতের সওয়াবের আশায় কাজ করে, আর মহান আল্লাহ আখেরাতে তো দেবেনই, দুনিয়াতেও দেন। আখেরাতের উদ্দেশ্যে করা হলেও নামাজ, রোজাসহ সব ইবাদতে দুনিয়াবি কল্যাণও রয়েছে।
করোনার টিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে অনেকেই (ইংল্যান্ড, ইসরাইলসহ ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশ) ভালো অবস্থানে চলে এলেও ভারতসহ অনেক দেশে করোনা সংক্রমণ বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। গত রোববার ভারতে ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত ৩,৪৬,৭৮৬ জন এবং মৃত্যু ২,৬২৪ জন। ভারতে মোট মৃতের সংখ্যা ১,৯০,২১০ (বিশে^ দ্বিতীয়) এবং মোট শনাক্ত ১,৬৭,৪৩,৯৫৫ (বিশে^ দ্বিতীয়)। বিশ্বে মোট আক্রান্ত ১৪,৬৫,২০,০২৭ জন এবং মৃত্যু ৩১,০৩,৩৩৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় বিশে^ করোনায় মারা গেছেন প্রায় ১৫ হাজার। বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত ২,৬৯৭ এবং মৃত্যু ৮৩ জন। মোট শনাক্ত ৭,৪২,৪০০ এবং মৃত্যু ১০,৯৫২ জন। বাংলাদেশে গড় শনাক্তের হার ১৩.৯৫।

গত ৫ এপ্রিল থেকে লকডাউনের পর ২৫ এপ্রিল দোকানপাট খুলেছে এবং ২৯ এপ্রিল থেকে গণপরিবহন খুলে দেয়া হবে বলা হয়েছিল। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে লকডাউন দীর্ঘদিন চলা সম্ভব নয়। কর্মহীন দরিদ্র মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে। মুষ্টিমেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া সবাই করোনায় বিপর্যস্ত। বেসরকারি খাত ২/১টা ছাড়া সবই ক্ষতিগ্রস্ত। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্য না করতে পেরে ঋণগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে। শহর এলাকায় অনলাইনে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার কিছু সুযোগ পেলেও গ্রামে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এটি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। গ্রামে করোনা লক্ষণীয় নয় এবং মানুষের মাঝে কোনো ভীতিও নেই, তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। গ্রামে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া যায় এবং নিয়মিত অ্যাসেম্বলি ও প্যারেড-পিটি বাধ্যতামূলক করা হলে সহজেই করোনা থেকে সুরক্ষা পেতে পারে।

কিছু পর্যবেক্ষণ এখানে পেশ করছি। আমার এক মামাতো ভাইসহ তার অফিসে (হেড অফিস) এক সাথে ৯০ জন করোনায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে তিনজন বাদে সবাই নিজ বাসায় চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং এখন সবাই সুস্থ। বাসায় স্ত্রী ও দু’টি শিশু সবসময় মাস্ক পরে ছিল এবং তারা আক্রান্ত হয়নি। আমার বেয়াই-বেয়াইনের পরিবারে তাদের তিন নাতি-নাতনি (সবাই শিশু) ছাড়া সবাই আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমার প্রতিবেশী ভায়রা করোনা পজিটিভ হয়ে ৫-৬ দিন হাসপাতালে থাকার পর বাসায় চিকিৎসা শেষে এখন নেগেটিভ। তার স্ত্রী সুস্থ মানুষ, স্বামীর সেবাযতেœর লক্ষ্যে একই কেবিনে ছিলেন এবং বাসায় স্ত্রী ও মেয়ে সর্বক্ষণ মাস্ক পরে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় আল্লাহর মেহেরবানিতে সুস্থ আছেন। আমার কিছু প্রিয় মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিবারের সাথেই অবস্থান করছেন এবং যতদূর জানি, তারা ভালো আছেন।
রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে মানুষের সাথে কথা বলি। টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিতে লকডাউনে রিকশায় যাতায়াতের সময়ে কথা বলে তাদের কাছে জানতে চাইলাম, তোমাদের জানামতে করোনায় কোনো রিকশাচালক মারা গেছে বা আক্রান্ত হয়েছে? তাদের জবাব, একজনও না। লকডাউনের আগে বাসে চলতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, শুনি গণপরিবহন থেকে করোনা ছড়ায়, তোমাদের ড্রাইভার, হেলপার কেউ কি করোনায় মারা গেছে? জবাব দিলো, না। দুই-তিন দিন আগে বাসার সামনে ভ্যানের ওপর থেকে কলা কিনলাম। মাস্কটা থুতনির সাথে ঝুলছে। বললাম, মাস্কটা ঠিক করে নাও। তার জবাব, আমাদের করোনা হবে না।’ কতবড় আত্মবিশ্বাস! একটু বাড়িয়ে বলল, স্যার, আপনারও হবে না। শ্রমজীবী মানুষ আল্লাহর বন্ধু। আল্লাহ তাঁর বন্ধুর দোয়া কবুল করুন। বৃদ্ধ ভিক্ষুককে দেখলাম, মাস্ক ছাড়াই ভিক্ষা চেয়ে যাচ্ছেন। লকডাউনের আগের দিন বাজারে গিয়েছিলাম। পা রাখার জায়গা ছিল না। আমি কিছুক্ষণ ছিলাম এবং দ্রæত বাসায় ফিরে গোসল না করলেও ভালো করে সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিলাম। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ যারা বাজারে বেচাকেনা করছে, বাসে কাজ করছে, রিকশা চালাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যবিধি অত মানেও না- তাদের সুরক্ষা কে দিচ্ছেন? বাসায় অনেকে কাজ করে এবং তারা থাকে বস্তিতে। আমরা এক সময় তাদের বাসায় আসা বন্ধ করে দিয়েছিলাম (তাদের বেতন ঠিকমতো দিয়েছি); এখন তারা আসছে এবং কাজ করছে। সেখানেও কেউ করোনায় মারা যায়নি। এসব বিষয়ে গবেষকদের ভাবতে হবে।

আমার উপলব্ধি, আল্লাহতায়ালা সমগ্র বিশ্বে একযোগে করোনা দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে সতর্ক করার জন্য। এত ক্ষুদ্র একটি জীবাণু যা খালি চোখে দেখা যায় না তার আক্রমণে বিশ্বের পরাশক্তি সব ধরাশায়ী হয়ে পড়েছে। তাদের মজুদকৃত পারমাণবিক বোমা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতি কোনো কাজে এলো না। স্রষ্টার কাছে মানুষের অসহায়ত্ব নগ্নভাবে ধরা পড়ল। আজ পৃথিবীর সেরাশক্তি আমেরিকা সবচেয়ে বেশি পর্যুদস্ত। আল্লাহ পাক কুরআনে আদ, সামুদ ও ফেরাউনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তাদেরকে পরাশক্তি হিসেবেই চিত্রিত করেছেন। তবে আল্লাহর ক্ষমতার কাছে অতীতে কোনো শক্তি টিকতে পারেনি। বালা-মুসিবত যা আপতিত হয় তা ‘আমাদের হাতের কামাই’ বলে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। কুরআন মজিদে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় এবং তার কারণও বলা হয়েছে। সমাজে জুলুম ও অশ্লীলতার ব্যাপক প্রসার ঘটলে আল্লাহ গজব হিসেবে মহামারী বা প্রকৃতিক বিপর্যয় দিয়ে থাকেন। যেমন, লুত আ:-এর জাতির সমকামিতা, শোয়াইব আ:-এর জাতির মাপে-ওজনে কম দিয়ে ঠকানো আর ফেরাউনের জুলুম।

আমরা এমন এক আল্লাহকে বিশ্বাস করি যিনি সৃষ্টি করে চুপ করে বসে থাকার মতো কোনো সত্তা নন বরং যিনি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, মহাপরাক্রমশালী এবং সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, তিনি যা ইচ্ছা করেন সেটিই হয়। করোনা নিয়ে যা ঘটছে তা তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়। সাধারণত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত বস্তিতে বসবাসকারী হতদরিদ্র মানুষগুলো মহামারীতে বেশি আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশ নিয়ে বলা হয়েছিল, এখানে আট কোটি লোক আক্রান্ত হবে এবং ২০ লাখ মারা যাবে। আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। এ জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হিসেবে সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে ফিরে এসে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়া দরকার। করোনা থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বেশি করে তাওবা-ইস্তেগফার ও জীবনকে পরিশুদ্ধ করে নেয়া।

এবারে বান্দা হিসেবে আমাদের কিছু করণীয় সম্পর্কে বলতে চাই। করোনা এসেছে একটি সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে। ফলে আমাদের সতর্ক থাকতেই হবে। বিশ্বব্যাপী গৃহীত পন্থা মাস্ক পরিধান, ঘন ঘন হাত ধোয়া ও দূরত্ব বজায় রেখে চলা আমাদের সবার প্রাথমিক দায়িত্ব। কোনো মাস্কই ভাইরাস প্রতিরোধী নয়। অনেক গবেষক বিশেষ করে আমার ছেলের মতে, মাস্ক নাককে গরম করে রাখে এবং ভাইরাসের বংশবিস্তারে বাধা দেয়। তার বিশ্বাস, বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুর বড় কারণ এসিতে বসবাস। ফলে বিত্তবানদের মৃত্যু বেশি। এসিতে থাকলে অবশ্যই মাস্ক পরে থাকতে হবে। তাকে দেখি, ল্যাবরেটরিতে একাকী মাস্ক পরে বসে থাকতে। তার মতে, বাইরে শুধু নয় ঘরেও একটি সময় মাস্ক পরে থাকা করোনা প্রতিরোধে সহায়ক। তার গবেষণাপত্র আমেরিকায় একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তার মতে, ভাইরাস এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়; বরং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সর্দিজ্বরের মতো এর কোনো চিকিৎসা নেই। এই ভাইরাসটি ভয়ঙ্কর। তাই সতর্ক থাকতেই হবে। সতর্ক হওয়া বলতে সে বারবার বলতে চায়- ‘এসি পরিহার করুন ও মাস্ক ব্যবহার করুন।’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যা যা দরকার- পুষ্টিকর খাদ্য, পরিমিত পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরে রৌদ্র লাগানো, দৈহিক শ্রম/ব্যায়ামসহ পরিচিত যেসব নিয়ম রয়েছে সেগুলো। তার ধারণা, বাংলাদেশে মহিলাদের আক্রান্ত ও মৃত্যুহার অনেক কম হওয়ার কারণ রানা-বান্নায় তাদের অংশগ্রহণ। আমেরিকায় মহিলাদের মৃত্যুহার যেখানে ৫২ সেখানে বাংলাদেশে ৩০ জন। তার মতে গরম খাওয়া ও গরম পানিতে গোসল উত্তম। অবশ্য করোনা নিয়ে অন্যদের মতো তার মতও চূড়ান্ত নয়। তা সারা বিশ্বেরর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে নিজের গবেষণালব্ধ জ্ঞান মাত্র। আমি নিজে অনুসরণের চেষ্টা করি। এই গ্রীষ্মকালেও গরম পানিতেই গোসল করি।

করোনা আল্লাহর সৃষ্ট এক ক্ষুদ্র জীবাণু। তাঁর শেখানো ভাষায় (সূরা ফালাক) আমরা বলি, ‘পরোয়ারদেগার! তোমার সৃষ্ট সব কিছুর অনিষ্ট থেকে আমরা তোমারই কাছে আশ্রয় চাই। আমাদের হেফাজত করো। পবিত্র রমজান মাস। সব গুনাহ থেকে আমরা তাওবা করছি। তুমি আমাদের তাওবা কবুল করো এবং ইসলামের ওপর অবিচল রেখো। আমীন।’

লেখক : উপাধ্যক্ষ অব:, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ



আরো সংবাদ