০৯ মে ২০২১
`

রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যা মামলা এবং ২০ বছরের কষ্ট

রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যা মামলা এবং ২০ বছরের কষ্ট - ফাইল ছবি

গুজরাটের একটি আদালত সম্প্রতি ওই ১২২ জন মুসলমানকে বেকসুর মুক্তি দিয়েছেন, আজ থেকে ২০ বছর আগে যাদের রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বেআইনি কার্যক্রম দমন আইনের (ইউএপিএ) অধীনে গ্রেফতারকৃত এই মানুষদের ১০ মাস জেলও খাটতে হয়েছে। এর পর হাইকোর্ট থেকে তারা জামিন পান বটে, কিন্তু ২০ বছরের এ দীর্ঘ সময় তাদের কঠিন মানসিক কষ্ট, যন্ত্রণা ও অস্থিরতায় কাটাতে হয়েছে। ৮৫ বছর বয়সী সাহারানপুরের অধিবাসী মাওলানা আতাউর রহমান ওয়াজদী আদালতের ফায়সালার পর কলাম লেখককে বলেন, ‘এই সময়টা রাষ্ট্রদ্রোহের কলঙ্ক নিয়ে পার করেছি। এখন আমি বেকসুর। এখন শান্তিতে মরতে পারব।’

মাওলানা আতাউর রহমান ওয়াজদীকে অভিযুক্তদের থেকে আলাদাভাবে নজরে পড়ার কারণ হলো, তিনি হুইল চেয়ারে বসে আদালতে হাজির হয়েছিলেন। মাওলানা ওয়াজদী জাতীয় আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত এক নিষ্ঠাবান ও আল্লাহভীরু মানুষ।

এই ভারতের এমন না জানি কত মানুষ রয়েছেন, যারা নিরপরাধ হলেও শাস্তি ভুগছেন। এই ১২২ জন ব্যক্তির সৌভাগ্য যে, তারা ২০ বছর পর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন এবং বেকসুর খালাস পেয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে গেছেন। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ নিরপরাধ হওয়া সত্ত্বেও আজো কারাগারে পড়ে আছেন। এর মধ্যে সদ্য বন্দী তারা, যাদের গত এক বছরের মধ্যে নাগরিক সংশোধনী আইন ও এনআরসির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেয়ার কারণে বন্দী করা হয়েছে। তাদের অনেককেই ‘বেআইনি কার্যক্রম দমন’ আইনে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং তাদের জামিন দেয়া হচ্ছে না। এ লোকগুলো আরো কত কাল জেলে থাকবেন এবং কবে তাদের রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে, তা কারো জানা নেই।

২৮ ডিসেম্বর, ২০০১-এর মধ্যরাতের ঘটনা। সুরাট পুলিশ সংবাদদাতার সংবাদ পেয়ে নবসারী বাজারের একটি হলরুমে অভিযান চালায়। সেখানে একটি অনুষ্ঠানের জন্য সমবেত হওয়া সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, তারা সেখান থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘সিমি’ সদস্য তৈরির ফর্মসহ উসামা বিন লাদেনের প্রশংসা ও গুণকীর্তনের পোস্টার ও উপকরণ উদ্ধার করেছে। পুলিশ এ দাবিও করেছে, যে সময় অভিযান চালানো হয়েছে, ওই সময় সেখানে উপস্থিত লোকেরা প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য নিজ নিজ মোবাইল সিম বের করে ফেলে। অথচ এটা সে সময়, যখন কারো কাছে মোবাইল ফোন দুর্লভ ছিল। যে সময় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়, ওই সময় সিমির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাত্র দুই মাস সময় অতিবাহিত হয়েছে। সেখানে উপস্থিত লোকদের বক্তব্য, তারা ‘শিক্ষা-বিষয়ক অধিকার ও সাংবিধানিক রূপরেখা’ বিষয়ের ওপর অল ইন্ডিয়া মাইনরিটিস এডুকেশন বোর্ডের দুই দিনব্যাপী সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য সমবেত হয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের সিমির সাথে এ জন্য জড়িয়ে দেয় যে, ওই সেমিনারের জন্য যে মাজেদ মানসুরীর নামে হল বুক করা হয়েছিল, তিনি হচ্ছেন সিমির সদস্য সাজেদ মানসুরীর ভাই। পুলিশের অভিযোগ ছিল, সিমির কার্যক্রম চালানোর জন্য মূলত এ সেমিনারকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট অমিত কুমার দুবে সব অভিযুক্তকে নির্দোষ ঘোষণার রায় দিয়ে বলেন, ‘বাদি শক্ত প্রমাণ পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ জন্য অভিযুক্তদের ইউএপিএর আওতায় দোষী সাব্যস্ত করা যাচ্ছে না। আদালত আরো বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে পেশকৃত সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং নির্ভরযোগ্যও নয়। ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন, পুলিশ অভিযুক্তদের সিমির সাথে সম্পৃক্ততা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। তারা এটাও প্রমাণ করতে পারেনি যে, এ লোকগুলো সিমির কার্যক্রম প্রচারের জন্য সেখানে সমবেত হয়েছিলেন। আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এ লোকগুলো সেখানে একটি শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের জন্য সমবেত হয়েছিলেন। তাদের কারো কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না এবং পুলিশের অভিযানের সময় কেউই সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেননি। পুলিশ তাদের কাছ থেকে সিমির সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো দস্তাবেজও উদ্ধার করতে পারেনি এবং সিমির সাথে তাদের কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ দিতে পারেনি।

এটা সবিশেষ উল্লেখ্য, যে লোকগুলোকে পুলিশ মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছিল, তারা সবাই শিক্ষিত। তারা শিক্ষা বিষয়ে মতবিনিময়ের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে ভাইস চ্যান্সেলর, প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, সাংবাদিক ও আলেমও শামিল ছিলেন। পুলিশ যখন তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের ধারায় মামলা করে, তখন তাদের চাকরি চলে যায় এবং সমাজে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার যোগ্যতাও তারা হারিয়ে ফেলেন। যে ধারাগুলো রাষ্ট্রদ্রোহী ও সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে আরোপ করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে সে ধারাগুলোই আরোপ করা হয়েছিল। এই লোকগুলো বিগত ২০ বছর যে মানসিক কষ্ট ও যন্ত্রণায় অতিবাহিত করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রতি দুই মাস অন্তর তাদের আদালতে হাজিরা দিতে হতো। কষ্টের ওপর কষ্ট হলো, যে পুলিশগুলো তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছিল, এই মামলার তদন্তের ভার তাদেরই দেয়া হয়েছিল, যা ন্যায়বিচারের রীতিবিরুদ্ধ। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই যে, এসব লোক তাদের জীবনের যে মূল্যবান ২০টি বছর মারাত্মক মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করেছেন, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? বাহ্যত যখন তাদের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়, তখন তাদের মধ্যে কয়েকজন যুবক ছিলেন। আর তাদের সারাটা জীবন নিজেদের নিরপরাধ প্রমাণের সংগ্রামেই কেটে গেল। যারা তাদের সম্পূর্ণ নিরপরাধ হওয়া সত্ত্বেও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে তাদের জীবন ধ্বংস করেছে, তাদের কী শাস্তি হবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, তাদের জীবনের এই মূল্যবান সময় ধ্বংসের বিনিময় তারা কী পাবেন? ভারতের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতার কোনো নিয়ম আছে কি?

এভাবে নিরপরাধ ব্যক্তিদের কঠিন ধারায় ফেলে তাদের জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে দেয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও আদালতের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বেশ কয়েকজন এভাবে বেকসুর খালাস হয়েছেন। অবশ্য প্রথমবার একসাথে এত অধিক সংখ্যক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। অর্থাৎ একটি সেমিনারের সকল অংশগ্রহণকারীকেই সরাসরি একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। বাহ্যত তাদের জীবনের সেই সোনালি দিনগুলো তো আর কখনোই ফিরে আসবে না, যা তারা অবর্ণনীয় মানসিক কষ্টের সাথে অতিবাহিত করেছেন। আর সেই পুলিশগুলোরও কোনো শাস্তি হবে কি, যারা এসব মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে। রাষ্ট্রকে এই বিষয়টা নিয়ে ভাবা উচিত, এই পুলিশকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তারা আর কতদিন তার অপব্যবহার করতে থাকবে এবং কতদিন সমাজের নিগৃহীত শ্রেণী ও সংখ্যালঘুর বেঁচে থাকাকে হারাম করতে থাকবে। ‘ন্যায়বিচারের দেবী’ চোখে কালো পট্টি বেঁধে এসব জুলুম-অন্যায় আর কতদিন সহ্য করতে থাকবেন?

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে এক আবেদন পেশ করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার গাইডলাইন তৈরি করার দাবি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের উকিল অশ্বিনী উপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে দাখিলকৃত ওই আবেদনে প্রদেশ ও কেন্দ্রের অধীনস্থ অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং ল কমিশনকে প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, ভুল আর্জির কারণে মানুষের বিশাল বড় ক্ষতি হয়। এ ব্যাপারে কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তার কারণে সংবিধানের ২১ নম্বর ধারায় সংরক্ষিত নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্মানের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। প্রকাশ থাকে যে, এর আগে দিল্লি হাইকোর্ট ৩০ নভেম্বর, ২০১৭ সালে ভুল আর্জির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের আরাম ও পুনর্বাসনের বিষয়ে ল কমিশনকে ব্যাপকভাবে চিন্তাভাবনা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এখন দেখার পালা, সুপ্রিম কোর্টে দায়েরকৃত এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। অথচ এই আবেদন বেকসুর খালাসকৃত উল্লি­খিত ১২২ জন ব্যক্তি সম্পর্কিত নয়। তবে এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনামা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বা প্রমাণ হতে পারে এবং এর দ্বারা পুলিশের ইচ্ছেমতো চলার গতিপথ রুদ্ধ হতে পারে।

মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিকমুম্বাই উর্দু নিউজ হতে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com

লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট



আরো সংবাদ