১৫ এপ্রিল ২০২১
`

জর্দানের ‘অভ্যুত্থানের’ পেছনের রহস্য

বাদশাহ আবদুল্লাহ (ডানে) সাথে হামজাহ -

গত ৫০ বছরের মধ্যে জর্দান এখন সবচেয়ে মারাত্মক রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। বাদশাহ আবদুল্লাহ তার দায়িত্বে সুরক্ষিত রয়েছেন, তবে দেশটি করোনাভাইরাস মহামারী সৃষ্ট পরিস্থিতিতে যথেষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাদশাহ আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগে এই সপ্তাহে এক ডজনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাক্তন ক্রাউন প্রিন্স হামজাহ বিন হুসেনকে তার বাড়ির মধ্যে আটক রাখা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এটি ক্ষমতাসীন পরিবারের অভূতপূর্ব এক গোলযোগ, যার পেছনে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে।

জর্ডানে বাদশাহ আবদুল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রের গুজব কয়েক মাস ধরে প্রচারিত হয়ে আসছিল। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে সৌদি সমর্থকরা এই চক্রান্তকারীদের সমর্থন করেছেন। এই সময়ে সরকারের সমালোচনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু উপজাতি অঞ্চলে বিশেষভাবে এটি বেশি হয়েছে। গত শনিবার, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা ক্ষুব্ধ সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করেছে এবং গ্রেফতার করার জন্য অনেককে অগ্রিম পদক্ষেপ হিসেবে দ্রুত দক্ষতার সাথে পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। অবশ্য সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সৌদি আরবে নিযুক্ত প্রাক্তন দূত শরীফ হাসান বিন জায়েদ এবং ২০০৯ সালে আফগানিস্তানের আল-কায়দার ডাবল এজেন্টের হাতে হত্যার শিকার হওয়া জর্দানের একজন সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাইও রয়েছেন। ঐ সময়ের আত্মঘাতী হামলায় সিআইএর পাঁচ কর্মকর্তাও মারা গিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে থাকা সাবেক মন্ত্রি পরিষদ সদস্য বাসাম আওদাল্লাহর পাশাপাশি আরো একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি রয়েছেন আটক ব্যক্তিদের মধ্যে। তিনিও সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। হামজার অফিসের পরিচালককেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রাক্তন ক্রাউন প্রিন্স হামজা বিন হুসেন সম্ভবত প্রাসাদে গৃহবন্দী রয়েছেন- যিনি ৪১ বছর বয়সী মরহুম বাদশাহ হুসেনের বড় ছেলে আর তার চতুর্থ স্ত্রী রানী নুর। সরকারী মিডিয়া জানিয়েছে যে তিনি আটক নন। তবে তিনি ইংরেজিতে একটি দীর্ঘ ভিডিও এবং আরবিতে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও প্রকাশ করেছেন, যাতে তিনি বলেছেন, তার ফোনের লাইনগুলো কেটে দেয়া হয়েছে, তিনি বাইরের বিশ্বের সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগ করতে অক্ষম। ভিডিওগুলোতে তিনি দুর্নীতি ও অক্ষমতার জন্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন, তবে নাম নিয়ে বাদশাহর কথা বলেননি। তিনি দেশ এক স্বৈরশাসকের দ্বারা পরিচালিত হবার কথাও উল্লেখ করেন। সরকার বলছে, তার স্ত্রী রাজকন্যা বাসমাহ দেশ ছাড়ার বিষয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রয়েছেন।

১৯৯৯ সালে বাদশাহ হুসেন হামজাহকে ক্রাউন প্রিন্স মনোনীত করেছিলেন, কিন্তু পাঁচ বছর পরে আবদুল্লাহ তাকে অপসারণ করেন এবং পরে তার স্থলাভিষিক্ত করেন নিজ পুত্র হুসেন বিন আবদুল্লাহকে, যার বয়স এখন ২৬ বছর। দেশটির ইতিহাসে রাজপরিবারে বিভক্তিটি ছিল নজিরবিহীন। উত্তরাধিকারের লাইনে পূর্ববর্তী পরিবর্তনগুলো সাধারণভাবে বোঝাপড়ার মাধ্যমে হয়েছিল। হামজাহ উপজাতি গোত্রগুলোর কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় এবং রাজার সমালোচনাকারী জনসমাবেশগুলিতে তার উপস্থিতি বিভিন্ন সময় দেখা যেত।

এটি এখনো অস্পষ্ট যে প্রকৃতপক্ষে বাদশাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রের সাথে হামজা বা অন্যরা জড়িত ছিলেন কিনা। অথবা আদৌ তেমন কোন ষড়যন্ত্র হয়েছিল কিনা। হামজাহ এ জাতীয় কোনও ষড়যন্ত্রের কথা অস্বীকার করেছেন। বিদেশী সংযোগের অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, ষড়যন্ত্রের পেছনে বিদেশি হাত জড়িত ছিল আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ইঙ্গিত সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) দিকে। কেউ কেউ নেতানিয়াহুও এর সাথে যুক্ত থাকতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এই দু'জনের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
বেশিরভাগ জর্ডানের নাগরিকের কাছে সৌদি আরবের নেতারা জনপ্রিয় নন। আর ইয়েমেন যুদ্ধে এমবিএসের ভূমিকা এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজমিন নেতানিয়াহুর সাথে তার বিশেষ সম্পর্কের কারণে তিনি জর্দানিদের কাছে অপছন্দের ব্যক্তি। এমবিএস জড়িত রয়েছে এমন একটি অভ্যুত্থানের প্লট সামরিক বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের ব্যাপক বিরোধিতার মুখোমুখি হবে- এমনটাই স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।

জর্দানের সাথে সৌদি রাজপরিবারের মনস্তাত্বিক দূরত্ব এসব দেশ গঠনের সময়কালীন। হাশেমি বংশের উত্তরাধিকারী জর্দানের বাদশাহর পূর্বপুরুষরা উসমানীয় খেলাফতের সময় মক্কা মদিনাসহ জাজিরাতুল আরব হিসেবে পরিচিত অঞ্চলের শাসক ছিলেন। বৃটিশদের সাথে যোগাযোগ রেখে খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পর সংগতভাবেই আশা করেছিলেন তারা জাজিরাতুল আরবের শাসক হবেন। বাদশাহ আবদুল আজিজ ব্রিটিশদের সাথে আরো বেশি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র তৈরি করে ইসলামের এই পবিত্র অঞ্চলকে সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। আর আবদুল্লাহ পূর্বসুরিদের একজনকে বর্তমান জর্দানের রাজত্ব আর অন্যজনকে ইরাকের রাজত্ব দেয়া হয়। ইরাকে অভ্যুত্থানের পর সেখানকার বাদশাহ ক্ষমতা হারান। অবশিষ্ট থাকেন জর্দানের বাদশাহ।

দেশ গঠনের এ বিষয় নিয়ে সৌদি শাসকদের সাথে মনস্তাত্বিকভাবে সংঘাত থাকলেও এই অঞ্চলের প্রবলভাবে ক্ষমতাধর হবার কারণে সৌদ পরিবারের সাথে হাশেমীয়রা সংঘাত পরিহার করে চলেছে। এবার ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য জেরুসালেমকে রাজধানী এবং পশ্চিম তীরের উপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব বিস্তারসহ যে নেপথ্য বোঝাপড়া সৌদি আরবের সাথে তেলআবিবের হয়েছে বলে বলা হয় তার সাথে প্রবলভাবে দ্বিমত রয়েছে জর্দানি শাসকদের। এখন জর্দানে অভ্যুত্থানের পেছনে বিন সালমানের যে সম্পর্ক থাকার কথা বলা হচ্ছে সেটি সম্ভবত এ কারণেই। তবে বিন সালমান কাতার অবরোধের সময় সেখানেও শাসন পরিবর্তনের নানা তৎপরতা চালিয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে গণমাধ্যমে।

রাষ্ট্র হিসাবে জর্দান মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে দুর্বল শক্তির দেশগুলোর একটি। জর্ডান নদীর পূর্ব তীরে পশ্চিম এশিয়ার লেভান্ট অঞ্চলে আরব দেশ হলো জর্ডান। জর্দানের সীমানা রয়েছে সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়া, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের (পশ্চিম তীর) সাথে। মৃত সাগরটি তার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত এবং দেশটির একবারে দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগরের উপর একটি ২৬ কিলোমিটার উপকূলরেখা রয়েছে। দেশটির অবস্থান এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের চৌমাথায়। এর রাজধানী আম্মান হলো জর্ডানের সর্বাধিক জনবহুল শহর এবং দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

জর্ডান অঞ্চলে প্যালিওলিথিক কাল থেকেই মানুষ বাস করে আসছে। ব্রোঞ্জ যুগের শেষে তিনটি স্থিতিশীল রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল এখানে। পরবর্তী শাসকদের মধ্যে নবাটাইয়ান কিংডম, পারস্য সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য, রাশিদুন, উমাইয়া এবং আব্বাসি খেলাফত এবং সর্বশেষ অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল দেশটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে অটোমানদের বিরুদ্ধে মহা আরব বিদ্রোহের পরে, অটোমান সাম্রাজ্যকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিলে বিভক্ত করে। এমিরেটস অফ ট্রান্সজর্ডানে ১৯২১ সালে হাশেমীয় আমিরাত প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৪৬ সালে জর্দান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রান্সজর্দান হাশেমি রাজতন্ত্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় দেশটি পশ্চিম তীর দখল করার পরে ১৯৪৯ সালে হাশেমি রাজতন্ত্র জর্ডান নামকরণ করা হয় এবং ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের কাছে পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ না হারানো পর্যন্ত এটি জর্দানের অংশ ছিল।

জর্ডান ১৯৮৮ সালে এই অঞ্চলটির দাবি পরিত্যাগ করে এবং ১৯৯৪ সালে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী দ্বিতীয় আরব রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভূত হয়। দেশটি আরব লীগ ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আনুষ্ঠানিকভাবে জর্দান একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হলেও বাদশাহর বিস্তৃত কার্যনির্বাহী এবং আইনী ক্ষমতা রয়েছে।
জর্ডান একটি আধা-শুষ্ক দেশ, যার আয়তন ৮৯,৩৪২ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা এক কোটির মতো। এটি এগারতম জনবহুল আরব দেশ যার জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ ভাগ সুন্নি মুসলিম। জর্দানকে এক সময় অশান্ত অঞ্চলের মধ্যে ‘স্থিতির মরূদ্যান' হিসেবে উল্লেখ করা হতো। ২০১০ সালে আরব বসন্তের পরে এই অঞ্চলটিতেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। তবে তা শাসন ব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন আনেনি।

১৯৪৮ সালের শুরু থেকে জর্ডান একাধিক প্রতিবেশী দেশের শরণার্থীদের গ্রহণ করেছে। ২০১৫ সালের আদম শুমারি অনুসারে জর্ডানে প্রায় ২১ লাখ ফিলিস্তিনি এবং ১৪ লাখ সিরিয়ান শরণার্থী রয়েছে। আইএসআইএলের শাসন থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার ইরাকি খ্রিস্টানকেও এই দেশটি আশ্রয় দেয়। জর্দানের শরণার্থীদের গ্রহণ আগে থেকে চলে এলেও, সিরিয়ানদের সাম্প্রতিক বৃহত্তর আগমন দেশটির জাতীয় সম্পদ এবং অবকাঠামোতে যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে।

জর্দানকে 'উচ্চ মধ্যম আয়ের' অর্থনীতি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। জর্দানের অর্থনীতি, এই অঞ্চলের ক্ষুদ্রতম অর্থনীতির একটি, তবে দক্ষ কর্মীশক্তির কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে এর একটি আকর্ষণ রয়েছে। দেশটি একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র, এর উন্নত স্বাস্থ্য খাতের কারণে চিকিৎসা পর্যটনকেও আকর্ষণ করে। এর পরও প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব, শরণার্থীদের চাপ এবং আঞ্চলিক অশান্তি দেশটিকে অর্থনৈতিক দুরাবস্থার মধ্যে ফেলে রেখেছে।

জর্দানের সাম্প্রতিক ক্র্যাকডাউন এর একটি প্রভাব সার্বিক পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। বিন সালমান ও নেতানিয়াহু এর সাথে যুক্ত থাকলে বাদশাহকে এ জন্য মূল্য দিতে হবে বেশি। নেতানিয়াহু আবারো সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। সৌদি আরবে বিন সালমানের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে সেটি মনে হচ্ছে না। ফলে জর্দানে সাবেক ক্রাউন প্রিন্সের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ঘটে থাকলে এর রেস থেকে যেতে পারে। গ্রেফতারকৃতদের এবং তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা যাচ্ছে না। সাবেক ক্রাউন প্রিন্স হামজাহ এর সাথে যুক্ত থাকলে তিনি হতে পারে বাইরের প্রভাব সৃষ্টিকারীদের একটি বিশেষ টুলস। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে দেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো বাস্তব পরিকল্পনা এর পেছনে ছিল কিনা। নাকি কেবল সরকার ও অর্থনীতির দুরবস্থা নিয়ে অভিযোগ ছিল সংক্ষুব্ধদের। তবে ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির সাথে এর একটি সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।



আরো সংবাদ