২০ এপ্রিল ২০২১
`

কাশ্মির : সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতীক

কাশ্মির : সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতীক - ফাইল ছবি

কাশ্মির আন্তর্জাতিকভাবে একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই ভূখণ্ডটির চূড়ান্ত মর্যাদা এখনো জনগণ কর্তৃক অর্থাৎ জনগণের রায় বা মতামত অনুযায়ী, নির্ধারিত হয়নি। পাকিস্তান এবং ভারত উভয় দেশেরই পরমাণু অস্ত্র রয়েছে এবং এই বিতর্কিত অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে গত ৭৩ বছরে দু’দেশই তিনটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই কাশ্মির নিয়ে একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা খুবই প্রয়োজন।

এই বিরোধ বা দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের সমাধানের জন্য যেকোনো উদ্যোগ নিলে তাতে সাংঘর্ষিক বা বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোকে সরাসরি এবং সততার সাথে ও ন্যায়সঙ্গতভাবে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। তবে মনে হয়, ভারত সরকারের জন্য এ ধরনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়াটা কঠিন। ভারত কাশ্মির বিরোধের সমাধান নয়, বরং এটাকে বিলুপ্ত বা গায়েব করে দিতে চায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন কাশ্মির ইস্যুটি উত্থাপন করে তখন ভারত এটা ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিষয় অন্য কারো ইস্যু নয়- বলে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হলে হয়তো দৃঢ়তার সাথে বলা হবে ‘এটা দ্বিপক্ষীয় বিষয়’।

এটাও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভারত কাশ্মির পরিস্থিতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি ছবি বা বিবরণ উপস্থাপন করে থাকে। ভারত সরকার এবং তার বিভিন্ন মুখপাত্রের এজেন্ডা হলো কাশ্মির বিরোধ বা সঙ্ঘাতের ব্যাপারে জনগণকে বিভ্রান্ত করাটা অব্যাহত রাখা। নয়াদিল্লি কিছু ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী তৈরি করে ধূম্রজাল সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের সত্যিকারের সংগ্রামকে কলঙ্কিত করতে চায়। কিন্তু এসব ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের দুঃখ-দুর্দশা এবং বাস্তব অবস্থাকে গোপন করা বা ঢেকে রাখা যাবে না। ভারত কাশ্মিরি জনগণের সংগ্রামকে বিশেষভাবে মৌলবাদের সমতুল্য হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ভারত কাশ্মিরকে একটি মৌলবাদী ইস্যু বলে যে কল্পকাহিনী তৈরি করেছে তার সত্যিকারের চেহারা খুলে দিতে চাই।

‘মৌলবাদ’ টার্ম বা শব্দটিই কাশ্মিরি সমাজের জন্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কাশ্মিরি জনগণের দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য হচ্ছে- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সদিচ্ছা এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন। তাদের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য হচ্ছে- সংযম ও পরিমিতিবোধ এবং সহিংসতাবিরোধী অবস্থান। কাশ্মিরিদের সংস্কৃতিতে চরমপন্থা বা উগ্রবাদ অথবা মৌলবাদ নেই।

হিন্দু-মুসলিম এবং স্বল্পসংখ্যক খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের মধ্যে কাশ্মিরে শত শত বছর ধরে সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক বন্ধন সৃষ্টি ও বিকশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ধর্মীয় কোনো বঞ্চনা নেই, ধর্মীয় কোনো বৈষম্য নেই। কোনো অর্থনৈতিক অথবা তীব্র সাংস্কৃতিক বিভাজন নেই। সব ধর্মীয় বোধ বা প্রত্যয়ে এবং একে অপরের ছুটির দিনগুলোতে তারা পরস্পর আনন্দে মেতে ওঠে। পরস্পরের আনন্দেও তারা অংশীদার হয়। সামাজিক সমাবেশে তারা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একত্রে যোগদান করে এবং সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে তারা প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করে আসছে।

কাশ্মিরিদের বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস তাদেরকে ধর্মান্ধতা অথবা চরমপন্থী বা উগ্রপন্থী অন্ধ বিশ্বাস তথা গোঁড়া মতবাদ থেকে বিরত রাখে। উল্লেখ্য, এই গোঁড়া আদর্শ মতবাদগত উৎসকে বিকৃত করে তাদেরকে নীতিভ্রষ্ট করে দেয়। সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ হচ্ছে তাদের পাহারাদার।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কাশ্মিরি শিখরা অন্য ধর্মের প্রতি তাদের বিরোধিতা দেখায়নি। মুসলমানদের প্রতি তাদের বিশ্বাস এতই সুদৃঢ় ছিল যে, তারা মুসলমানদের দোষারোপ করার জন্য ভারতের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। উল্লেøখ্য, চিট্টিসিংপুরায় ৩৬ জন শিখকে হত্যা করার ব্যাপারে মুসলিমদের দায়ী করার জন্য সেনাবাহিনী শিখদের ঘুষ দিতে চেয়েছিল। ২০১০ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নয়াদিল্লিø সফরের সময় ভারতের সেনাবাহিনী নিজেরাই এই ঘুষ দিতে চেয়েছিল।

কাশ্মির মহাপুরুষ ও পুণ্যবান ব্যক্তিদের আলোকের বলয় পরিবেষ্টিত ভূমি তথা পুণ্যভূমি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই ভূখণ্ডটিতে রয়েছে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। এখানে কাশ্মিরের বৈচিত্র্যের সর্বশেষ কিছু আলোকোজ্জ্বল উদাহরণ উপস্থাপন করা হলো- ডেইলি কাশ্মির অবজারভার জানায়, ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীনগর শহরের মাইসুমা এলাকায় একজন হিন্দুর মৃত্যুর পর তার শবদাহ করার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু পরিবারটির সহায়তায় স্থানীয় মুসলিমরা এগিয়ে আসেন। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, সোমবার রাতে রাকেশ মারা যায়। তার মুসলিম প্রতিবেশীরা শবদাহ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা করে। স্থানীয়রা জানায়, তারা হিন্দুদের একজন পুরোহিতের ব্যবস্থা করে এবং মৃত ব্যক্তির লাশ নিজেরা কাঁধে বহন করে শবদাহের স্থানে নিয়ে যায়। ভারতের একটি প্রধান পত্রিকা, হিন্দুস্তান টাইমস ২০২০ সালের ১ মে জানায়, উত্তর কাশ্মিরের উরি এলাকায় মুসলিমরা একটি হিন্দু পরিবারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনে সহায়তা করেছে। করোনাভাইরাসের পরিপ্রেক্ষিতে লকডাউনের কারণে মৃত হিন্দু ব্যক্তির পরিবারের আত্মীয়-স্বজন কেউ সেখানে উপস্থিত হতে না পারায় এবং শবদাহের স্থানে মৃতদেহটি বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো যানবাহন পাওয়া না যাওয়ায় স্থানীয় মুসলিমরা এগিয়ে আসে এবং শবদাহ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে। উত্তর কাশ্মিরের উরি শহরে দেশব্যাপী লকডাউনের মধ্যে ৫৪ বছর বয়সী শেখর কুমার মৃত্যুবরণ করলে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের হিন্দু প্রতিবেশীর সর্বশেষ শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে। মৃত ব্যক্তির ছেলে গৌতম কুমার জানান, মুসলিম সম্প্রদায় তাদের কঠিন বিপদের সময় তাদের সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, ‘তাদের সমর্থন ও সহায়তা ছাড়া আমার পিতার শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না।’ ভারতের আরেকটি দৈনিক পত্রিকা দ্য হিন্দু ২০২০ সালের ৫ জুন জানায়, ‘স্থানীয় মুসলমানরা মিসেস রানী ভাটের শেষ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে। দাহ বা পোড়ানোর জন্য তারা জ্বালানি কাঠেরও ব্যবস্থা করে। মৃত দেহটি তারা কাঁধে বহন করে শবদাহের স্থানে নিয়ে যায়। আবদুল লতিফ নামক একজন মুসলিম গ্রামবাসী বলেন, ‘আমাদের পণ্ডিত প্রতিবেশীর সাথে আমরা সুখে-দুঃখে সবসময় ছিলাম, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য।’ অল পার্টি শিখ কো-অর্ডিনেশন কমিটির (এপিএসসিসি) যোগিন্দর সিং রায়না বলেন, ‘কাশ্মির কাশ্মিরিদের জন্য- এর অর্থ হলো ভ্রাতৃত্ববোধ... দুর্যোগ দুর্বিপাকের সময় শিখরা এখানে স্থায়ী হয়েছে। তারা কখনো ফিরে যাবে না এবং এখন কাশ্মিরি পণ্ডিতদেরও আসা উচিত এবং আমাদের সাথে বসবাস করা প্রয়োজন।’ আমি মনে করি, এই উভয় সঙ্কটের সর্বোত্তম সমাধান হলো পণ্ডিত ভাইদের কাশ্মির উপত্যকায় ফিরে আসা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে তাদের (পণ্ডিতদের) নিরাপত্তা ও নৈতিক সমর্থন দানের জন্যে তাদের অন্তরকে খুলে দিতে হবে। কাশ্মিরি পণ্ডিতদের অধিকার ও সংস্কৃতিকে অবশ্যই সম্মান ও মর্যাদা দিতে এবং রক্ষা করতে হবে।

জেকেসিএইচআরের প্রেসিডেন্ট ড. সৈয়দ নাজির গিলানি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সেন্টিমেন্ট প্রকাশ করে বলেন, ‘মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক ছিলেন কাশ্মিরি পণ্ডিতরা। মহান চরিত্রের নারী-পুরুষ তারা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এসব কাশ্মিরি পণ্ডিত। তারা আমাকে তাদের রান্নাঘর ছাড়া তাদের বাড়িতে সব জায়গায় যেতে দিতেন। আমাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল। ১৯৯০ সালে তাদের প্রস্থানে আমি মর্মাহত। জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ মাবাধিকার কমিশনের সাব-কমিশনে তাদের অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরেছি।’

কাশ্মিরের জনগণ এ ব্যাপারে পূর্ণ সতর্ক রয়েছে যে, একবার তৎপরতা চালিয়েই কাশ্মির সঙ্কটের সমাধান করা যাবে না। সব পর্যবেক্ষকের মত, তারা কিছু পদক্ষেপ প্রত্যক্ষ করবেন অথবা মাঝারি পর্যায়ের সমাধানের কিছু পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন দেখবেন। তবে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে এসব পথ বন্ধ করে দিলে কোনো সমাধান আসবে না। কাশ্মিরের মানুষ চায় না, কেউ দলীয়ভাবে কোনো পক্ষ নিক। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা সার্বজনীন নীতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে কাশ্মির সঙ্কটের সমাধানের প্রতি সমর্থন জানান। দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট মহল ভারত, পাকিস্তান এবং কাশ্মিরি নেতাদের সবাই একত্রে বসে একটি নীতি নির্ধারণ করার এখন উপযুক্ত সময়। কারণ শেষ পর্যন্ত সহিংসতা নয়, আলোচনার মাধ্যমেই কাশ্মির সঙ্কট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এটাই সঙ্কট সমাধানের একমাত্র পথ। আর একটি শান্তি প্রক্রিয়াকে অর্থপূর্ণ ও ফলপ্রসূ করতে হলে অবশ্যই আলোচনার টেবিল থেকে কাশ্মিরিদের বাইরে রাখলে চলবে না।

কাশ্মিরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের কাছে দু’টি বিকল্প আছে। প্রথমত, তারা কাশ্মিরি বিরোধকে এড়িয়ে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে অব্যাহত রাখতে পারেন এবং ভারত ও পাকিস্তানকে একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দিতে পারেন। এ ছাড়াও কাশ্মিরে স্বৈরতন্ত্র ও বর্বরতা চালানো হয়েছে; সেটিকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এ জন্যে ভারত-পাকিস্তান চুক্তি হতে পারে। ভারতে একটি ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী সরকারের সাথে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অগ্রহণযোগ্য বিবেচনায় চুক্তি করে কোনো লাভ হবে না। বিরোধের কারণে উপমহাদেশে একটি পরমাণু যুদ্ধ বেধে যাওয়াকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

দ্বিতীয় উপায় হলো- কাশ্মিরের ব্যাপারে একটি নতুন শান্তি উদ্যোগ চালু করার লক্ষ্যে অধিকতর সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় বাইডেন প্রশাসন অবতীর্ণ হতে পারে। এই উদ্যোগ নেয়া হলে তাতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান এবং কাশ্মিরকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অথবা জাতিসঙ্ঘের সামর্থ্যকেও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সঙ্কট সমাধানে প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানের জোগান দিতে পারে।

লেখক : ওয়াশিংটনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড কাশ্মির অ্যাওয়ারনেস ফোরামের সেক্রেটারি জেনারেল
‘দ্য নেশন’ পত্রিকা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার



আরো সংবাদ