১৯ এপ্রিল ২০২১
`

ময়মনসিংহ জিলা স্কুল অ্যালামনাই সম্মেলন

ময়মনসিংহ জিলা স্কুল - ছবি : সংগৃহীত

ময়মনসিংহ জিলা স্কুল একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। প্রায় পৌনে দুই শ’ বছরে এই বিদ্যাপীঠ এখন এক বিশাল মহীরুহের মত। ১৮৪৬ সালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হিসেবে ‘হার্ডিঞ্জ স্কুল’ নামে শুরু হয় এই বিদ্যাপীঠ। পরে ১৮৫৩ সালে ময়মনসিংহের কাচারিঘাট এলাকায় বর্তমান ‘ল্যাবরেটরি স্কুল’-এর স্থানে পুরোদমে শুরু হয় জিলা স্কুল। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা ভগবান চন্দ্র বসু। বর্তমান স্থানে স্কুলের অবকাঠামো তৈরি হয় ১৯১২ সালে। ১৯৬৫ সালে এ স্কুলের একজন আমেরিকান বিজ্ঞান শিক্ষক বর্তমান কমপ্লেক্সের লে-আউট তৈরি করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আর্মি এখানে ক্যাম্প করেছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা এই স্কুল কমপ্লেক্স ব্যবহার করেন। এই স্কুলের ৪০ জন ছাত্র মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দিয়েছেন। ১৯৮১ সালের ৩ মার্চ অন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্কুলের জমি দখলের চেষ্টা করলে তা নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়। সেখানে আমরা দশম শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে নেতৃত্বে ছিলাম। সেদিন পুলিশের সাথে সংঘর্ষে প্রায় ৬০ জন মানুষ আহত হয়েছিলেন।

গত ১৯, ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারি হয়ে গেল ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের অ্যালামনাই সম্মেলন। এটা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী পুনর্মিলনী। গতানুগতিক ধারায় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ভুঁড়িভোজের আয়োজন না করে বরং ক্রিকেট টুর্নামেন্টের মাধ্যমে এই পুনর্মিলনী উদযাপন করা হয়। প্রাক্তন ছাত্রদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গঠিত একটি স্পোর্টস কমিটির মাধ্যমে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

১৯৭১ সালে এসএসসি পাস করা ব্যাচ থেকে শুরু করে ২০২০ সাল পর্যন্ত দু-একটি ছাড়া প্রায় সব ব্যাচের ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। মোট ৪৭টি ব্যাচের মধ্যে ৫৫টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন বয়সের কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ খেলোয়াড়রা অভূতপূর্ব এই টুর্নামেন্টে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে খেলেছেন। প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিযোগিতা হয়েছে ‘বড় ভাই’-‘ছোট ভাই’দের মধ্যে।

আয়োজক কমিটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পুরো টুর্নামেন্ট সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। জিলা স্কুলের হোস্টেল মাঠ এবং স্কুল মাঠ এই দু’টি ভেন্যুতে প্রায় ৫৫টি ম্যাচ সম্পন্ন হয়। হোস্টেল মাঠে দিবা-রাত্র খেলার ব্যবস্থা ছিল। আয়োজকরা দীর্ঘদিন যাবত নিখুঁত পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এই মিলনমেলা সফল করে তুলেছেন। একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যে ধরনের সাজসজ্জা ও প্রস্তুতি দরকার ঠিক সেই ধরনের আয়োজন তারা করেছিলেন। মাঠে বড় পর্দায় খেলা দেখানো এবং লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খেলা উপভোগ করার ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক আইনকানুনের আদলে স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্ন শৃঙ্খলা নিরূপণ এবং প্রয়োগ ছিল অনন্য উদাহরণ। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আম্পায়ার, ধারাভাষ্যকার, (বাংলা ও ইংরেজি) অন্যান্য অফিসিয়াল, ম্যাচ রেকর্ডার ইত্যাদি যেখানে যা দরকার সবই যথাযথভাবে নির্ধারিত ছিল। আয়োজক কমিটির প্রতিটি সদস্য আন্তরিকতার সাথে রাত-দিন পরিশ্রম করে টুর্নামেন্ট সুসম্পন্ন করেছেন। এজন্য ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের ‘প্রাক্তন ছাত্র স্পোর্টস ক্লাব’-এর সদস্যদের প্রতি রইল সশ্রদ্ধ সালাম।

খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়দের মাঝে যে টিম স্পিরিট, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক মমত্ববোধ এবং সিনিয়র-জুনিয়র সুলভ সম্মান ও স্নেহার্দ্র পরিবেশের অবতারণা হয়েছিল তা সত্যিই অনন্য ও অনুকরণীয়। সে যুগে অর্থাৎ আশির দশকে জিলা স্কুলের মতো একটি বিশাল অসামরিক বিদ্যাপীঠে তেমন একটি রেজিমেন্টেশন প্রক্রিয়া ছিল না। কিন্তু তখনকার সময়ে যেভাবে আদব-কায়দার মধ্যে বিদ্যালয় অঙ্গনে বেড়ে উঠেছিলাম সেই শিক্ষা এখনো আমাদের মাঝে বিরাজমান বলে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে প্রায় ৪৫ বছর পর আজ যখন জুনিয়র ব্যাচের ছেলেদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি তখনো সেই ছেলেবেলার আদব-কায়দার আমেজ অনুভব করেছি। এতদিন পর বেশির ভাগকেই চিনতে পারিনি, কিন্তু যখনই নতুন পরিচয়ে সিনিয়র-জুনিয়র পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে তখনই দেখেছি ছোট ভাইসম মানুষগুলো খেলার মধ্যেই বিনয়ে একেবারে মাটির সাথে নুইয়ে পড়েছে। আনন্দ ও ভালোবাসায় চোখে পানি চলে এসেছে। মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছি। সেই সময়কার আমাদের শিক্ষকদের এবং আমাদের বাবা-মায়ের শিক্ষাটাই বোধ হয় আমাদের এই ধরনের মহৎ করে তুলতে পেরেছিল।

ময়মনসিংহ নগরবাসীও এই অ্যালামনাই টুর্নামেন্ট প্রাণভরে উপভোগ করেছেন অত্যন্ত শৃঙ্খলা ও সৌজন্য রক্ষা করে। মাঠের চারপাশে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। গভীর রাত পর্যন্ত তারা এই খেলা হৃদয়ভরে মমতার সাথে উপভোগ করেছেন। এমনকি জিলা স্কুলের বর্তমান ছোট ছেলেরাও এতে মেতে উঠেছিল। এই আয়োজন সফল হতে সহায়তার জন্য ময়মনসিংহ নগরবাসীর প্রতি অশেষ শুকরিয়া।

অভূতপূর্ব এই অ্যালামনাই পুনর্মিলনী ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট সফল করার জন্য ময়মনসিংহ শহরের সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের কথা বলতেই হবে। তাদের সার্বিক সহযোগিতা এবং ইতিবাচক উৎসাহ আয়োজক কমিটিকে সক্ষমতা জুগিয়েছে। বিভিন্ন দলের নেতা পারস্পরিক রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে গিয়ে একসাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারা সহযোগিতা করেছেন কিন্তু কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাববলয় সৃষ্টিতে মনোযোগ দেননি। ময়মনসিংহের সেই সব নেতাকে শ্রদ্ধাভরে সালাম জানাচ্ছি।

বেশ কিছু শিক্ষা আমরা এখান থেকে পেতে পারি। প্রথমত আন্তরিকতা থাকলে যেকোনো আয়োজন সফল করা সম্ভব যা আমাদের আয়োজক কমিটি দেখিয়েছে। এ ধরনের আয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হলে সফল হতে পারে যা ময়মনসিংহের নেতারা দেখিয়েছেন। যেকোনো বড় আয়োজনে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে সংহতি, মমত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পায় যা দেশ ও জাতির উন্নয়নে অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি আশা করব, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের অ্যালামনাই সম্মেলনের এই মডেল দেশের অন্যান্য বড় ঐতিহ্যবাহী স্কুল অনুসরণ করতে পারে।

অ্যালামনাইয়ের প্রতিযোগিতা ছিল শুধুই নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য। দীর্ঘ দিন পর ছোট-বড় সবাই একত্রিত হয়েছিল ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থনের জন্য। এই প্রতিযোগিতা ট্রফি নেয়া বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য নয়। এই বয়সে আসলে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করতে হয় যার যার কর্মক্ষেত্রে দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রেখে, অন্য কোনোভাবে নয়।

ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের তৃতীয় অ্যালামনাই পুনর্মিলনী সার্বিকভাবে অত্যন্ত সফল হয়েছে। ধন্যবাদ আয়োজক কমিটি, ধন্যবাদ ময়মনসিংহ নগরবাসী।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
E-mail: maksud2648@yahoo.com



আরো সংবাদ