২০ এপ্রিল ২০২১
`

লিবিয়ায় আশার আলো

লিবিয়ায় আশার আলো - ফাইল ছবি

মিসতারা’র ৬১ বছর বয়সী ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, আবদুল হামিদ দিবিবাহর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন ঐক্য সরকারের মনোনয়নদানের মাধ্যমে গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এই সরকারে আবদুল হামিদকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী এবং লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে মোহাম্মদ ইউনেস মেনফিকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এই কাউন্সিলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তুয়ারেগ সংখ্যালঘিষ্ঠদের মধ্য থেকে মুসা আলকোনি এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় জুওয়ারা শহর থেকে আবদাল্লাহ হুসেইন আল লাফিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিদ্বেষপূর্ণ ও দুর্বিনীত গৃহযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত একটি দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এটাকে বড় ধরনের এক অগ্রসর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ খুব একটা সহজ ছিল না। প্রথমত, উল্লিখিত চার ব্যক্তিকে ৭৫ সদস্যের লিবীয় প্রতিনিধিদের একটি ফোরাম সুইজারল্যান্ডে আলোচনার মাধ্যমে এই মনোনয়ন দিয়েছে। সেখানে সমঝোতার ফলাফলের চাইতেও জাতিসঙ্ঘ পরিচালিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এটাকে গুরুত্ব দান করা হয়। দ্বিতীয়ত, লিবিয়ায় অস্থিতিশীলতা অব্যাহত রয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি পরস্পরবিরোধী উপদলগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। চূড়ান্তভাবে বলতে গেলে, একটি সঙ্ঘাতময় দেশ যেখানে খলিফা হাফতারের নেতৃত্বে একটি পক্ষ এবং ফাইয়াজ আল-সাররাজের নেতৃত্বে ন্যাশনাল অ্যাকর্ডের একটি সরকার- ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এই দু’টি পক্ষ এখনো মুখোমুখি অবস্থানে, তখন মাত্র ২১ দিনে জাতীয় চুক্তির (ন্যাশনাল অ্যাকর্ড) মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা খুব কঠিন কাজ। অবশ্য উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে।

পরিস্থিতি উপলব্ধি করার জন্য ২০১১ সালের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। ওই সময় দেশটির দীর্ঘ দিনের শাসক গাদ্দাফিকে ন্যাটো সমর্থিত বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই বিশাল উপজাতীয় দেশটিতে শান্তি তিরোহিত হয়ে গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, লিবিয়ায় রয়েছে বিশাল তেলের মজুদ।

বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং ধর্মীয় ও সামরিক উপদলগুলো সেখানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে সঙ্ঘাতে লিপ্ত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ২০১৬ সালে স্বীকার করেছিলেন, গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়াকে প্রস্তুত করতে অবহেলা করাটা ছিল তার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বকালীন একটি ‘বড় ব্যর্থতা।’ তাই লিবিয়ানরা প্রতিদিন তার মূল্য দিচ্ছে।

জাতিসঙ্ঘ উদ্বাস্তু সংস্থার মতে, ১৩ লাখ মানুষের এখন মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। দুই লাখ লোক দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত এবং ৪৩ হাজার মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। এটা হলো কেবল সরকারি পরিসংখ্যান। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি। সব উদ্বাস্তু বা শরণার্থী ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যেতে চায়। এতে ইউরোপের ওপর চাপ পড়েছে এবং বহু মানুষ নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিশ্বের ক্ষমতাধর সরকারগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রতিযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতেই লিবিয়ায় আজ আর্তমানবতার কান্না শোনা যাচ্ছে।

লিবিয়ায় হাফতারকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান এবং ফ্রান্স। অপর দিকে আল-সাররাজের সমর্থনে রয়েছে জাতিসঙ্ঘ, ইতালি, তুরস্ক, কাতার এবং কয়েকটি পশ্চিমা দেশ। রাশিয়া ও তুরস্ক লিবিয়ায় ভাড়াটে সৈন্য এবং আরো অনেক দেশ অস্ত্র পাঠিয়েছে।

গত বছরের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে। এটা দেশের জন্যে ভালো এবং এর মাধ্যমে লিবিয়া তার বন্ধ হয়ে যাওয়া তেল উৎপাদনের সুযোগ পেয়েছে। সৌদি আরব আর রাশিয়ার নেতৃত্বে ওপেক লিবিয়ার তেল উৎপাদনের ব্যাপারে যে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল, তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। লিবিয়ায় সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির কারণে ওপেক লিবিয়াকে তেল উৎপাদন থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। প্রত্যেকে আশা করছেন, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে এবং অন্তর্বর্তী ঐক্য সরকার বছর শেষে লিবিয়াকে সফলভাবে একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুত করতে সক্ষম হবে। তবে এ পথে এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। প্রথমত, হাফতার ও আল-সাররাজকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে, যা বিশেষভাবে হাফতারের ব্যাপারে বাস্তবায়ন করাটা খুব কঠিন। কারণ ইতোমধ্যে সামরিকভাবে একজন শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, যেকোনো সময়ে আবার উপজাতীয় ও গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। হয়তো খুব কম মানুষ ২০১৬ সালে সিরতে দায়েশের (ইসলামিক স্টেট) আকস্মিক হামলার কথা ভুলে যেতে পারে। সে সময় সন্ত্রাসীরা ত্রিপোলি ও অন্যান্য স্থানে শতাধিকবার হামলা চালিয়েছিল। আর ২০১৮ এবং ২০১৯ সালেও একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছিল। দায়েশ হয়তো পরে পাশের মালি, নাইজার অথবা বুরাকিনাফসোতে পালিয়ে যায়। কিন্তু লিবিয়ায় যেকোনো দুর্বল অবস্থায় তারা আবার সুযোগ মতো হামলা চালাতে পারে। বিদেশী শক্তি হয়তো কিছু সময়ের জন্য ধৈর্যধারণ করেছে। কাতার এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে সেটা একটা ভালো ইঙ্গিত। প্রকৃত ব্যাপার হলো, সৌদি আরব এবং অন্য দেশগুলো তুরস্কের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও রাশিয়া এবং তুরস্কের জন্য লিবিয়া আঞ্চলিক প্রভাববলয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ শান্তির জন্য কয়েকটি কারণে ইউরোপের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছের প্রতিবেশী লিবিয়া। লিবিয়ার বহু অভিবাসী এখনো ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাচ্ছেন। লিবিয়ার তেল এবং গ্যাস রফতানি থেকে ইউরোপও লাভবান হচ্ছে। হাফতার বনাম সাররাজ বিরোধে ব্যাপক অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় বিশেষভাবে, জ্বালানি তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

লিবিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য স্থানে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস করার ব্যাপারে বিশ্বের রয়েছে স্বার্থ। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল প্রভাবশালীদের সশস্ত্র সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। লিবিয়া হাইড্রোকার্বনের রফতানিকারক দেশ হওয়ায় শরণার্থী প্রবাহসহ নানা কারণে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এ দেশে আমরা সবাই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল এবং ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সফল হোক- এটাই কামনা করি। আমাদেরকে এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, লিবিয়ার জনগণ নিজেরাই এখন অবহেলিত এবং তারা ব্যাপক দুর্দশাগ্রস্ত।

লেখক : বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে ৩০ বছরের অভিজ্ঞ। বিজনেস কনসালট্যান্সি মেয়ার রিসোর্সের চেয়ারপারসন ও সিইও।
আরব নিউজের সৌজন্যে
ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার



আরো সংবাদ