২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
`

সেনাশাসিত মিয়ানমার

সেনাশাসিত মিয়ানমার - ছবি : সংগৃহীত

রাষ্ট্রের বহিঃশত্রুর প্রতিরোধ ও অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় চিরদিন সেনাবাহিনীর গুরুত্ব অপরিসীম। আগের দিনে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভৌগোলিক সীমারেখা বিস্তারে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এখনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অপরিসীম। তবে এ কথা সত্য যে, প্রাচীনকালের মতো সেনাশক্তির মাধ্যমে ইচ্ছা করলেই এখন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখা বাড়ানো যায় না। নানাবিধ রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এ বিষয়ে জবাবদিহির বেড়াজাল তৈরি করে রেখেছে। তার পরও অনেক শক্তিধর রাষ্ট্র সেনাবাহিনীর মাধ্যমে মানুষের মৌলিক অধিকার অবদমিত করে রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিস্তিন, গোলান মালভূমিসহ অনেক ভূখণ্ডের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

বর্তমানে পৃথিবীতে অনেক দেশে সেনাবাহিনী কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের শাসকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ রাষ্ট্রের মেধাবী ও সুঠাম দেহের অধিকারী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে সেনাবাহিনী গঠন করা হয়। যাদের নিকট রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আধুনিক সমরাস্ত্র মজুদ থাকে। আন্তর্জাতিক নিয়মবিধির আলোকে বহিঃশত্রুর আক্রমণের শঙ্কা প্রশমিত হওয়ায় বর্তমানে বেশির ভাগ অনুন্নত রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চিন্তায় মশগুল থাকে। মূলত দু’টি কারণে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ব্যাহত হলে মানুষের বাকস্বাধীনতা লোপ পায়। গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায় শক্তিশালী বিরোধী দল বিকশিত হয় না। ফলে সরকারি দল একনায়কতন্ত্র মানসিকতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করে। দ্বিতীয়ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাহত হওয়ার কারণে ও শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় সরকারি দলের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। যে কারণে দলের ভেতর উপদল গঠিত হয়। হত্যা, রাহাজানি ও সন্ত্রাস বাড়ে। সম্পদ লুণ্ঠনের এ প্রতিযোগিতায় সেনাবাহিনীও অনেক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করে থাকে। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বহু ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। মিয়ানমারে এর জ্বলন্ত প্রমাণ বিদ্যমান। আমরা দেখতে পাচ্ছি, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন সেনাশাসন চলেছে। মূলত মিয়ানমার কতগুলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি দেশ। যে কারণে মিয়ানমারে দীর্ঘদিন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত বিরাজিত ছিল। ফলে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বারবার বিঘ্নিত হয়েছে। মিয়ানমারে একাধিকবার রাজনৈতিক হত্যা ও ক্যু সংঘটিত হয়েছে।

৫০ বছর মিয়ানমারে সেনাশাসন ছিল। ১৯৬২ সালে দেশটিতে সেনাশাসন শুরু হয়। ২০১০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সামরিকজান্তা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দল এনএলডিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। চলমান সেই সেনাশাসন অন্তে ২০১১ সালে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল ছিল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি বা এনএলডি। যে দলের অন্যতম প্রধান ছিলেন অং সান সু চি। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ও অনেক রাজনীতিককে বন্দী করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় দেশের সর্বস্তরের মানুষ সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। সেনাবাহিনী কঠোর দমন ও নিপীড়নের মাধ্যমে সেনাশাসন চলমান রেখেছে। আমেরিকা, পশ্চিমা বিশ^ ও জাতিসঙ্ঘ অবৈধ সেনাশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। অথচ সেনাবাহিনী দৃঢ়তার সাথে শাসন চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত পাশর্^বর্তী রাষ্ট্র চীনের সহায়তায় সেনাবাহিনী শাসন চালিয়ে যাচ্ছে।

সেনাশাসনের মাধ্যমে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে চরম কর্তৃত্ববাদ বা স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বৈরশাসিত সরকার জবাবদিহি ছাড়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ যথেচ্ছভাবে ব্যবহারের সুযোগ পায়। কারণ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ অনুপস্থিত থাকায় জবাবদিহির কোনো দায়ভার থাকে না। আগে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমার খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ, উর্বর ভূমি অধ্যুষিত একটি দেশ। তদুপরি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সামরিক আধিপত্য বিস্তারে যে সৈকতের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে সামরিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আমেরিকা, চীন ও ভারতের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এ প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সেনাশাসন গভীর তাৎপর্য বহন করে। পাশর্^বর্তী শক্তিশালী রাষ্ট্রের সমর্থন থাকায় মিয়ানমারের সেনাশাসনের অবসান অত্যন্ত দুরূহ। দীর্ঘ সেনাশাসনের পর অং সান সু চি নির্বাচনের মাধ্যমে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। তবে তিনিও সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত ছিলেন না। বর্তমানে পৃথিবীতে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মসচেতনতার উন্নয়ন ঘটেছে। যে কারণে বর্তমানে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখা বৃদ্ধির পরিবর্তে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে অন্য রাষ্ট্রের ওপর পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারে সদা সচেষ্ট থাকে। মধ্যপ্রাচ্যসহ তৃতীয় বিশে^র অনুন্নত দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশে^র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের সুস্পষ্ট নিদর্শন প্রতিভাত হয়।

আমাদের পার্শবর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার। ভূরাজনৈতিকভাবে যার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই রাষ্ট্র। উর্বর এই রাষ্ট্রের ভূমি। খনিজসম্পদে ভরপুর এই রাষ্ট্রের ওপর তাই শক্তিশালী রাষ্ট্র চীন, রাশিয়া ও জাপানের যথেষ্ট সহানুভূতি রয়েছে। ধর্মীয়ভাবে এ রাষ্ট্রের বেশির ভাগ নাগরিক বৌদ্ধধর্মে বিশ^াসী। ধর্মীয় বিশ^াস হিসেবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীতে বৌদ্ধরা সর্বাধিক। চীন, জাপানসহ দক্ষিণ এশিয়ায়ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব যথেষ্ট। মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে বেশির ভাগ সময় চীন, রাশিয়া ও জাপানের আনুকূল্য লাভ করে থাকে। যে কারণে আন্তর্জাতিক মতামত ও এমনকি জাতিসঙ্ঘের মতামতকে উপেক্ষা করে মিয়ানমারে সামরিক জান্তারা রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করে থাকেন। বর্তমানে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ইস্যু এর জ্বলন্ত প্রমাণ।


সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী ধর্মীয়ভাবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়ায় মিয়ানমারের প্রতি চীন ও জাপান, ভূরাজনৈতিক কারণে রাশিয়াসহ অনেক রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন থাকায় বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা আশু সমাধানের কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের সেনাশাসন গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। বর্তমানে পৃথিবীতে সমরসজ্জার উন্মাদনা ক্রমাগত বাড়ছে।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রত্যেকটি দেশ সাধ্যমতো সামরিক বাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করে চলেছে। প্রতিরক্ষা খাতে প্রভূত ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় মানবকল্যাণ বা জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে ক্রমাগত ব্যয় সংকোচন করা হচ্ছে। যে কারণে তৃতীয় বিশ^সহ সমগ্র পৃথিবীতে প্রান্তিক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী (পিপিপি) যেসব মানুষের দৈনিক আয় এক ডলার ৯০ সেন্টের কম, তাদের হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ^ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, সারা বিশে^ এখন দৈনিক এক ডলার ৯০ সেন্টের কম আয়কারী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৭৩ কোটি ৬০ লাখ। যারা হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচিত।


সামরিক খাত যত শক্তিশালী হবে, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা তত বাড়বে। অপর দিকে দারিদ্র্যের হার যত বাড়বে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তত বিঘ্নিত হবে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়বে। সামাজিক অস্থিরতা রোধে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে স্বৈরশাসনের দিকে অগ্রসর হবে। জনগণের ওপর আস্থাহীন হয়ে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। জনগণের সাথে সম্পর্কহীন এসব সরকারকে সময় ও সুযোগমতো সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করবে। সে কারণে বলা যায়, মিয়ানমারের সেনাশাসন ভবিষ্যতে তৃতীয় বিশে^র রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। 


লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ



আরো সংবাদ