২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
`

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ - ছবি : সংগৃহীত

ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাদদেশে গণজমায়েত হয়েছিল তখন। সেই গণজমায়েত থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবকে পাকিস্তান সরকার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল এবং শেষমেশ উর্দু ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ব্যাস এ পর্যন্তই। তার পর বাংলা ভাষা যেভাবে গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। কারণ ইংরেজরা বিতাড়িত হওয়ার পরও এ দেশের কিছু মানুষ নিজেদের ভেতর থেকে ইংরেজ মানসটাকে পরিত্যাগ করতে পারল না। এসব মানুষ কথাবার্তায় ইংরেজি ভাষা এবং ইংরেজদের ভাবাদর্শকে জাহির করতে পারাকে আভিজাত্য মনে করতে থাকল।

দেশ স্বাধীন হলো। তবুও মানুষ ঔপনিবেশিক মানসিকতাকে বাদ দিতে পারেনি। সমাজের উঁচুতলার অল্পসংখ্যক মানুষ বলতে থাকল; আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ রাখতে এবং উন্নত অর্থসমৃদ্ধ দেশের সাথে তাল মিলাতে ইংরেজি জানার বিকল্প নেই। তারা বাংলা ভাষাকে পাত্তা দিতে চাইল না। রাষ্ট্র তাদের জন্য ইংরেজি শেখার স্কুল প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিলো। তাদের ছেলেমেয়েরা সেসব স্কুলে পড়াশোনা করে বাংলা ভাষা ভুলে গেল। এই ভুলে যাওয়াকেও তারা গর্বভরে প্রকাশ করতে থাকল; যার প্রভাব বাঙালি সামাজ এড়িয়ে যেতে পারল না। শোনা যায়, দেশ স্বাধীনের পর ঢাকার গুলশান, বারিধারা আর বনানী নাকি এ দেশের জ্ঞানরাজ্যের তীর্থস্থান ছিল। এ দেশে বাংলা না জানলেও চলে; তবে হাল আমলের ইংরেজিওয়ালা বারোয়ারি সাহিত্য আর ইংরেজি ভাষা না জানলে জ্ঞানগর্বের বৈঠকি আলাপে কারো দৃষ্টিকাড়া সম্ভব ছিল না। শুধু তা-ই নয়; বলা হতো, খাঁটি বঙ্গদেশীয় কুকুরের সাথেও নাকি ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে হয়। এই গল্প থেকে অনুমান করা যায়, বাংলা ভাষাকে বাঙালি কোন আসনে রেখেছিল। ইংরেজিওয়ালা এসব বাঙালিই দেশের বেশির ভাগ অর্থসম্পদ গ্রাস করেছে। কিন্তু ইংরেজি ছাড়াও যে বহির্বিশে^র সাথে যোগাযোগ রক্ষার বিকল্প ছিল, সেটি খুঁজে বের করাকে কেউ আর প্রয়োজন মনে করতে পারেনি। ফলে দেশে ইংরেজি মাধ্যমের নতুন নতুন শিক্ষালয় বাড়তে থাকল। আর ইংরেজি ভাষা হয়ে উঠল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম।

রাষ্ট্রও ইংরেজি ভাষার কদরকে অস্বীকার করতে পারেনি। ফলে আইন-আদালত, কোর্ট-কাচারি থেকে দোকানপাটের সাইনবোর্ড পর্যন্ত ইংরেজি ভাষার বিস্তার দেখা গেল। প্রায় ৫০ বছর হতে চলল দেশের স্বধীনতা। এ সময়ের ভেতরও কিভাবে বাংলা ভাষার সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা যায় তার কার্যকরী সিদ্ধান্ত করা যায়নি। এখন উন্নত সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ হতে চলেছে চীন। বলা হচ্ছে চীনের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে না পারলে আমরা উন্নত দেশের যে স্বপ্ন দেখছি, তা হয়তো বাস্তবায়িত না-ও হতে পারে। সে জন্য চীনা ভাষা শেখা আমাদের জন্য জরুরি হতে পারে কি না কে জানে। তবে আশার কথা হলো, এখনো কাউকে এ কথা বলতে শোনা যায়নি যে, ইংরেজির মতো চাইনিজ ভাষাটাও আমাদের আয়ত্তে রাখা দরকার। শোনা যায়নি, তার মানে এই নয় যে, কেউ তা বলবে না। অচিরেই মানুষ হয়তো চীনা অর্থব্যবস্থার খবর রাখতে চাইনিজ মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির অভিলাষ ব্যক্ত করবে এবং রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে পরামর্শ দেয়ার প্রয়োজন মনে করবে।

এ দিকে রাষ্ট্রভাষার গুরুত্ব না বুঝতে পারার ভেতরেই ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাদিবসকে বদলে দিয়ে করা হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিবস পেয়ে বাংলা ভাষাভাষী কিছু মানুষ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল। মিষ্টি বিতরণ হলো। দুঃখের বিষয়, এ দিবসের অর্থ গিয়ে দাঁড়াল; বিশ্বে যার যার মাতৃভাষাকে সে সে চর্চা করবে; এবং তাতে কোনো রাষ্ট্রেরই অসম্মতি থাকবে না। এর ফলে বাংলা ভাষারও মর্যাদা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা থেকে নেমে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পৌঁছাল। কারণ মাতৃভাষা মানে মায়ের ভাষা। ভায়েরা যে ভাষায় সাবলীল ও সহজ করে সবসময় কথা বলে সে ভাষাটাই মাতৃভাষা। ছেলেমেয়েরা মায়ের কাছ থেকে প্রথম যে ভাষায় কথা বলতে শেখে, সে ভাষা ছেলেমেয়েদের মাতৃভাষা। অবাক করা ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের সব মায়ের ভাষা বাংলা কিন্তু একই রকম বাংলা নয়। যেমন- ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মায়েদের ভাষার সাথে রংপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় অঞ্চলের মায়েদের ভাষার মিল নেই। আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী অঞ্চলের মায়েদের ভাষার সাথে সুনামগঞ্জ সিলেট অঞ্চলের মায়েদের ভাষার মিল নেই। পুরান ঢাকার মায়েদের ভাষার সাথে ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলের মায়েদের ভাষার মিল নেই।

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে; একই রাষ্ট্রের ভেতরে সব মানুষের মাতৃভাষা একরকম নয় এবং মাতৃভাষা আর রাষ্ট্রভাষাও এক নয়। তা হলে রাষ্ট্রভাষা দিবস বাদ দিয়ে মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য কী দাঁড়াল? এর উত্তর যা হবে তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে না। নতুন কিছু একটা করতে হয়, সে রকম কিছু একটা করা হয়ে থাকতে পারে। দেখা গেছে, নাগরিক হিসেবে ২৩ প্রকারের ক্ষুদ্রজাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে বাংলাদেশে। আর তাদের রয়েছে তেরো-চৌদ্দ প্রকারে মাতৃভাষা। আঞ্চলিক বাংলা ভাষাকে বাদ দিলেও এই তেরো-চৌদ্দ প্রকারের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারে না। তবুও বাংলাদেশ সংবিধানে বলা হলো বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা। এখন আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে বলা হচ্ছে, প্রমিত বাংলার ওপর জোর দিতে না পারলে বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধ সম্ভব হবে না। কিন্তু বাংলা আর প্রমিত বাংলা যে এক হলো না তা নিয়ে বিশ্লেষণও হলো না। বাংলা ও প্রমিত বাংলার মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে, সেটা আমলে না নিয়েই করা হলো মাতৃভাষা দিবস।

আর সংবিধানে রাখা হলো, রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। এখন যদি মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব অনুধাবনে নিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে সবাই ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তাহলে প্রমিত বাংলা চর্চার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ইতোমধ্যে পরিলক্ষিত হতে শুরু করেছে। যেমন, যার যার ইচ্ছামতো সে সে তাদের মাতৃভাষা নিয়ে খেলা শুরু করছে। এতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আসল রঙ হারাতে বসেছে। ধরা যাক, প্রমিত বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা। যদি সেটিই হয়ে থাকে, তবে মাতৃভাষা দিবস আর রাষ্ট্রভাষা দিবস কি আলাদা অর্থ বহন করে না? এরকম হওয়াটা ভাষার জন্য বিড়ম্বনা।

এবারই নতুন নয়। বাংলা ভাষা ভাগ্যবিড়ম্বনায় পড়েছে অনেক বার। বহুজাতিক রাজনীতির মোকাবেলা করে বাংলা এ পর্যন্তু এসেছে। প্রথমের দিকে বৈদিক মতাদর্শের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বাংলা। বেদের ভাষা ছাড়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা অন্য কিছু মানতে চাইত না; এমনকি বাংলা ভাষীদের জন্য মন্দিরে প্রবেশও ছিল নিষিদ্ধ। আবার অব্রাহ্মণদের সংস্কৃত ভাষা চর্চার অধিকারও হরণ করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বাংলা ভাষায় ধর্মের বিষয় বর্ণনা করা মানে ধর্ম অবমাননা করার শামিল বলে মনে করা হতো। মুসলমান সময়ে এসে বাংলা ভাষাকে সেই অবজ্ঞার অন্ধকার গহ্বর থেকে টেনে আলোতে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এ দেশের ব্রাহ্মণ্যবাদী বুদ্ধিজীবী কর্তৃক (বাংলা ভাষাকে মুসলমানি বাংলা আখ্যা দিয়ে) ভাষাকে আবার সঙ্কটে ফেলে দেয়া হলো।

১৭৫৭ সালের পর বাংলা ভাষা আবার অবহেলার মুখোমুখি হতে শুরু করল। এ সময় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বাংলা ভাষা বাদ দিয়ে ইংরেজি ভাষা সাদরে গ্রহণ করলেন এবং বাংলা ভাষার বিস্তার তখন মন্থর হতে থাকল। বাঙালি মুসলমান ইংরেজিকে প্রথমে গ্রহণ করতে না চাইলেও পরে কিছু মুসলমান ইংরেজির সংস্পর্শে এসে নিজেদের অর্থনৈতিক ভাগ্য বদলাতে চাইলেন।

এ ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, বাঙালি ভাষার টানে বায়ান্নর আন্দোলন করেনি; করেছে রাজনীতির টানে। বাংলা ভাষার দাবিতে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম যিনি কথা উত্থাপন করেছিলেন তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। অথচ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল। গান্ধী, রবীন্দ্রনাথও বঙ্গভঙ্গে অসম্মত ছিল। ৪৭ সালের আগে দেখা গেল, ভারত ভেঙে মুসলমানদের জন্য পৃথক একটি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা হচ্ছে। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সেটা চায়নি। তার পরও ভারত বিভক্ত হয়েছে। কংগ্রেস চায়নি পাকিস্তান উন্নত শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হোক। সে জন্য ভাষার প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছিল কি না কে জানে। তা না হলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র গুরুত্বে নিতে পারল না কেন?

[email protected]



আরো সংবাদ