২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
`

ময়নার মার সুখ-দুঃখের কথা

ময়নার মার সুখ-দুঃখের কথা - নয়া দিগন্ত

আমি ময়নার মা। অজপাড়াগাঁয়ে আমার জন্ম। জন্মের পরপর শুরু হয় একের পর এক অঘটন। বেঁচে থাকি ঝিয়ের কাজ করে। এক স্বামী পালায়। আরেক স্বামী করে আত্মহনন। মেয়ে ঘর ছাড়ে। ফাঁস দেয় ছেলের বউ। পর হয়ে পড়ে আপন পুত্র। কেউ পাশে নেই। সবাই ‘দূর দূর’ করে। সমাজ ও পরিবার থেকে একে একে আলগা হতে থাকে আমার বন্ধন। হতাশা, ব্যর্থতা, দুঃখ, গ্লানি শেয়ার করারও কেউ নেই। কমে যাচ্ছে বেঁচে থাকার অভিলাষ। সুন্দর পৃথিবীর অসুন্দর আবর্জনা শুধু আমি। পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগে বলতে চাই আমার সুখ-দুঃখের কথা।

যমজ শিশুকন্যা হয়ে জন্মের পরপরই খেতাব পেয়েছি ‘অপয়া’। কারণ যমজ কন্যা প্রসবের ‘অপরাধে’ ভাঙে মায়ের সংসার। তালাক দিয়ে মাকে বাড়ি থেকে বের করে বাবা আবার বিয়ে করেন। দুই কন্যাসন্তানসহ মাকে আশ্রয় দিতে বিব্রতবোধ করেন মামারা। এক নিঃসন্তান দম্পতি আমাকে দত্তক নেয়। ‘দত্তক’ শব্দটির বৈধতা আছে সনাতন ধর্মে, আছে অধিকারও। অধিকারহীন দত্তককে আমরা বলি ‘পালক’। পালক মা-বাবার সম্পদ-সম্পত্তিতে পালক সন্তানের হক নেই। আমাকে পালক নেয়ার পরপরই টের পাওয়া যায় পালক মায়ের সংসারে নতুন অতিথির আগমন বার্তা। কয়েক মাস পরই পালক মায়ের কোলে আসে ছোট বোন পারুল। বছর দেড়েক পর আসে ছোট ভাই মনির। অনেক সহায়-সম্পদ ছিল পালক বাবার। জমিজমা ভাগে-বর্গা দিয়ে যা আয় হয়, তাতেই সংসার চলত। উড়নচণ্ডী স্বভাবসহ পালক বাবার ছিল জুয়া খেলার নেশাও। এক দিকে বাড়ছে সংসারের ব্যয়, আরেক দিকে কমছে আয়। সব শেষ করে একদিন শেষ হয়ে যায় পালক বাবাও।

তিন ভাইবোন নিয়ে অন্ধকার দেখেন পালক মা। নিরুপায় হয়ে বাড়ি বাড়ি কাজ করতে শুরু করেন। গাঁয়ে ঝিয়ের কাজ করে চার মুখের আহার জোগানো কঠিন হয়ে পড়ে। চরম দুঃসময়ে পালক মা স্মরণ করেন মা ও বাবাকে।

বিধির লীলা বোঝা ভার। আমাকে দূর করার পর ঝড় থামতে শুরু করে মা-বাবার পরিবারে। বাবা ও মা দু’জনেরই দ্বিতীয় সংসার হয়। দ্বিতীয় সংসারে পুত্রসন্তান আসে দু’জনেরই। কয়েক বছর পর উভয়ের দ্বিতীয় সংসার ভেঙে আবার জোড়া লাগে। অর্থাৎ বাবার সাথে মায়ের তৃতীয় বিয়ে। তৃতীয় বিয়ের পর জন্ম হয় তিন সন্তানের। সাত ভাইবোনের সংসার থেকে শুধু ছিটকে পড়েছি আমি। তিন সন্তান নিয়ে পালক মা চলে যান শহরে। পারুল-মনিরকে বাসায় রেখে পালক মা আর আমি শুরু করি ঝিয়ের কাজ। ফজরের আজানের আগে নিজের বাসার পাক করি। রাতে এসে আবার রান্না করে খাই। বাসার কাজ করতে করতেই বয়স বাড়ে। বাড়ে জমানো টাকাও। সংসারে যোগ হয় রিকশাচালক ধর্মভাই। পালক মায়ের ধর্মপুত্র আমাদের ধর্মভাই। ছোট ভাইবোনের খাবারসহ মাঝে মধ্যে বাজার নিয়ে আসে বাসায়। ধর্মভাই ধর্মবোনকে বিয়ে করতে চায়। ধর্মপুত্রের সাথে ধর্মকন্যার বিয়েতে ধর্মে বাধা নেই। শুভক্ষণে হয়ে যায় বিয়ে। এক খোপের বাসা ছেড়ে দুই খোপের বাসায় উঠি আমরা। আমার বাসার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। বাসার কাজ বন্ধ করতে বলা হয় মাকেও। মায়ের প্রশ্ন,
: সবাই কাজ বন্ধ করে খাবো কী, বাসাভাড়া দেবে কে?
: আমি থাকতে আপনাদের কিসের চিন্তা।
: রিকশা চালিয়ে, বাসা ভাড়াসহ চার মুখের আহার জোগাড় করা সম্ভব নয়।
: রিকশা চালাব কেন, বেবিট্যাক্সি চালাব। আমার কাছে কিছু টাকা আছে আর কিছু টাকা হলেই একটা বেবিট্যাক্সি কেনা যাবে। পারুল-মনিরকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবো। আমরা নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। বেবিট্যাক্সি কেনার জন্য নতুন স্বামীর হাতে তুলে দিই দু’জনের জমানো সব টাকা। সমিতিতে নাম লেখানোসহ বেবিট্যাক্সি কেনার কথা বলে এক সকালে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। আর ফিরে আসে না। গাঁয়ের যে ঠিকানা দিয়েছে, সে ঠিকানাও ভুল। মা ও ঝিয়ে কান্নাকাটি করে নতুন বাসা ছেড়ে আবার চলে আসি বস্তির এক খোপের বাসায়।

আবার হয়ে পড়ি কাজের ঝি। ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’র মতো আমার শরীরই আমার বৈরী হয়ে ওঠে। বিয়ের ছোঁয়া পেয়ে শরীর-মন বদলে যেতে শুরু করে। বদলে যেতে শুরু করে পুরুষ মানুষগুলোর নজরও। নিজেকে আড়াল করে কাজও করি, স্বামীর খোঁজও করি। বিশ্রী ইঙ্গিত-আবদারসহ বিয়ের প্রস্তাবও দেয় কেউ কেউ। একা বাসায় অবস্থানসহ পথ চলাচল নিরাপত্তাহীন হয়ে ওঠে; বস্তির বাসাও। বস্তির এক খোপের বাসা ছাড়া চারজন মানুষের কোথায় আশ্রয়? চলে যায় আরো তিন বছর।

পালক মায়ের এক বোনের বাড়ি এই গাঁয়ে। একবার আমাকেসহ পালক মা এ গাঁয়ে আসেন। আমাকে দেখে পাশের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। কাজের ঝিয়ের জন্য গাঁয়ের নামকরা প্রধানবাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব! ভাবতে পারছি না। নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। প্রথম সমস্যা, ছেলের বউ থাকে না। ভালো ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর বউ বাপের বাড়ি গেলে আর ফিরে আসে না। দ্বিতীয় সমস্যা, বলতে গিয়ে কথা আটকে যায়। তৃতীয় সমস্যা, বুদ্ধিজড়তা। সর্বশেষ, বউপেটায়। গুনের মধ্যে আছে, কাজে নিরলস ও বউপাগল। সর্বদা চোখের সামনে বউ চাই, নিজের মর্জি মতো না চললেই শুরু হয় তাকে পিটুনি।

আমার জানের নিরাপত্তার চেয়ে শরীরের নিরাপত্তা বেশি দরকার। সে জন্য স্বামীর যোগ্যতার চেয়ে স্বামীর বাড়ির যোগ্যতা বেশি প্রয়োজন। রাজি হয়ে যাই বিয়েতে। কাজের জমানো টাকাসহ স্বামীর ঘর করতে শুরু করি। তিন মাসের বেশি যেখানে কোনো বউ টেকেনি, সেখানে আমি টিকে গেলাম। না টিকে যাবো কোথায়? কারণ আমি কুলহারা। হয় স্বামীর মর্জিমতো চলতে হবে, না হয় শকুনের ভিড়ে ঝিয়ের কাজ করে খেতে হবে। বেদেনীরা যেভাবে বিষধর সাপের ছোবল উপেক্ষা করে ফণার সামনে হাত নেড়ে খেলা করে সেভাবে আমিও স্বামীর সাথে সংসার সংসার খেলছিলাম। স্বামী দিনমজুরের কাজ করে আমিও কাজ করি। গাঁয়ে বাসার কাজ হয় পেটে-ভাতে। দু’বেলা খাওয়ার বিনিময়ে সারাদিন ধানভেনে দেয়া। জমিতে কাজ শুরু করি। মরিচ তোলা, উচ্ছে ক্ষেতে নাড়া বিছিয়ে দেয়াসহ মাটি কাটার মতো কঠিন কাজও বাদ পড়েনি। সংসারজীবনে ভালোবাসার সন্ধান না পেলেও স্বপ্ন ছিল। বাসায় কাজ করে যে টাকা জমেছিল, সে টাকাসহ দু’জনের রোজগারের টাকা লাভে খাটাই। লাভের টাকা দিয়ে ঘর তুলি। পেটে সন্তান আসে। এক দিকে পেটের সন্তান বাড়তে থাকে; অন্য দিকে বাড়তে থাকে স্বামীর উৎপাত। মান-অভিমান করে মাঝে মধ্যেই চলে যায় বাড়ি থেকে। ঘরে থাকে না। কোথায় থাকে কী খায়, খবর পাই না। শ্বশুর-শাশুড়ি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঘরে নিয়ে আসেন।

প্রথম সন্তান আসে, কন্যাসন্তান। তাতে কী! সবাই বলে প্রথম কন্যাসন্তান সৌভাগ্যের প্রতীক। শখ করে নাম রাখা হয় ময়না। ভাগ্যের চিহ্নই বটে। কারণ খাটানো টাকার লভ্যাংশ এবং স্বামীর সামান্য রোজগার দিয়ে সংসার চালানোসহ বাড়ছিল মূলধনও। সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছি। দ্বিতীয় সন্তান পেটে আসে। আগের মতোই পেটে সন্তান বাড়তে থাকে, দূরত্ব বাড়তে থাকে স্বামীর সাথেও। সন্তানের জন্মের কয়েক দিন আগে নিখোঁজ হয়ে যায় স্বামী। দ্বিতীয় সন্তান কোলে আসে। পুত্রসন্তান। তিন কুলে আমার কেউ নেই। কুলের কাণ্ডারি পুত্রসন্তান। মুখ দেখেই জীবনের সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।

রাতে ঘুম আসে না। কান খাড়া করে রাখি। এই বুঝি স্বামী এসে, ‘দরজা খোল’ বলে ডাক দেয়। জানি, সামান্য কারণেই রাগ করে স্বামী। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। চলে যায় বাড়ি ছেড়ে। এখন ছেলেমেয়ে হয়েছে। ছেলের বয়স এক দিন, দুই দিন, এক মাস, দুই মাস, দেখতে দেখতে বছর পার হয়ে যায়। দুই সন্তান কোলে-কাঁধে নিয়ে মানুষের কাজও করি, স্বামীর খোঁজও করি। দূরে খোঁজ করার জন্য পাঠাই শ্বশুরকে। কবিরাজ বাড়িতে গিয়ে জিনের ‘ভারাম’ বসাই, জিনের মুখে জানতে চাই, স্বামী আছে কি নেই। জিনের কাছে জানতে পারি, স্বামী আছে সিলেটের কোনো এক গ্রাম এলাকায়। এবার ফিরে এলে, স্বামীর মর্জির বাইরে যাবো না। আমাদের যে টাকা আছে সে টাকায় জমি বন্ধক রাখব। আর পরের জমি নয়, নিজের জমিতে নিজেরা কাজ করে খাবো। এরকম স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে রাত পার হয়ে যায়। স্বামী আর ফিরে আসে না।

লাভে টাকা খাটানো ওঠানো বড়ই কঠিন। এ কাজে সাহায্য করতেন মাস্টার ভাসুর। তিনি এক দিকে স্কুলশিক্ষক অন্য দিকে গাঁয়ের বড় মোড়ল। বিশেষ করে যারা বিদেশ যায় তারাই আমার টাকার বড় কাস্টমার। বিদেশ গিয়ে টাকা পাওয়া শুরু হলেই টাকা পরিশোধ শুরু হয়। ব্যাংক থেকে টাকা ওঠানো যত কঠিন আমার কাছ থেকে টাকা নেয়া তত সহজ। লাভের পরিমাণ বেশি হলেও লেনদেন পদ্ধতি সহজ হওয়ায় গরিব-ধনী সবাই আসত আমার কাছে। লাভের লাভ থেকে বাড়তে থাকে মূলধন। গাঁয়ের মানুষ আমার নতুন নাম দেয়, ‘লেডিব্যাংকার’। কাজের ঝি ময়নার মা’র নাম ‘লেডিব্যাংকার’ শুনতে ভালোই লাগে। রাতে ঘুম ভাঙলে ভাবি, এখন যদি স্বামী আমার পাশে থাকত, কতইনা সুখের হতো। মেয়েটা তার বাবাকে দেখলেও ছেলে জন্মের পর বাবা দেখনি। ছেলেটা মাশ আল্লাহ, কী লম্বা লম্বা হাত-পা। বাপের মতোই বাড়ন্ত শরীর। মেয়ের দুই বছরের ছোট হলেও দেখতে দেখতে ছাড়িয়ে যাচ্ছে মেয়েকে। যে রাতে স্বামীর কথা মনে পড়ে, সে রাতে আর চোখের পাতা এক করতে পারি না। ছেলেমেয়ে বড় হতে থাকে। বাড়তে থাকে ঘরের প্রয়োজন। ছোট ঘরটি ভেঙে বড় করা হয়। একটা রুম বাড়িয়ে করা হয় দরজা-জানালা। দ্বিতীয়বার ঘর তোলার খবর পেয়ে বাবা-মা এসেছিলেন, আসল বাবা-মা। ফেলে দেয়া অপয়া মেয়ের সাহস ও ভাগ্য দেখে সবাই হতবাক। আমার শ্বশুরবাড়ির সবাইকে দাওয়াত করেছিলেন। সবাই গিয়েছিল যে গাঁয়ে পোঁতা রয়েছে আমার জন্মনাড়ি। নাড়িপোঁতা বাড়িতে ২৫ বছর পর পা রাখি। গাঁয়ের লোকজন দেখতে আসেন আমাকে। তারা নানাভাবে জানতে চান আমার স্বামীর কথাও। সে কথা এড়িয়ে গিয়ে শ্বশুরবাড়ির গল্প করি।

আমার স্বামীকে খুঁজতে খুঁজতে না পাওয়ার কষ্ট বুকে নিয়েই মারা যান শ্বশুর। তিনি মারা যাওয়ার মাস চারেক পর একদিন এসে হাজির হয় স্বামী। হাজির হওয়ার কথা ঠিক নয়- হাজির ‘করা হয়’। হাজির করে গাঁয়ের ফুলমাল ব্যবসায়ী ছেলেরা। গাঁয়ের ছেলেরা ঢাকার চকবাজার থেকে কাগজের ফুল বিক্রি করতে চলে যায় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, হাতিয়া প্রভৃতি দুর্গম এলাকায়। ফুলমাল নিয়ে একবার নোয়াখালী এলাকায় এক হোটেলে ওঠেন। ফুল বিক্রি শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে দেখতে পায় আমার স্বামীর মতো এক লোক। কাছে গিয়ে দেখে, ঠিকই আমার স্বামী। তবে ও আসতে চায়নি কিছুতেই। গাঁয়ের ছেলেরা জোর করে তাকে বাসে ওঠায়। বাড়িতে এনে ছাড়ে। ছেলেমেয়ে তাদের বাবাকে দেখে কাঁদে খুশির কান্না; স্বামী কাঁদতে শুরু করেন আমার শ্বশুরকে না দেখে।

পরে জেনেছি, স্বামী সেখানেও একটা বিয়ে করেছিল। সন্তানও হয়েছে একটা। বিয়ে ও সন্তানের কথা বলে খোঁটা দিতে গেলে মুখ বুজে মুচকে মুচকে হাসত। পুরুষ মানুষ বিয়ে করতেই পারে। এতে আমার কিচ্ছু যায়-আসে না। আমার এখন সোনার সংসার। সুখের দিন। মেয়েটা পঞ্চম শ্রেণীতে আর ছেলেটা বাপের কাঁধে চড়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরে। এখন বাবা-মা, ভাইবোন সবাই খোঁজখবর নেয় আমার। পালা করে বেড়াতে আসেন নিজের মা আর পালক মাও। যা-ই কাজকর্ম করি, নজর থাকে স্বামীর দিকে।

ছেলেটার খৎনার বয়স। সে অনুষ্ঠানটা বড় করেই করতে চাই। দুই গাঁয়ের মা, বাবা, ভাইবোনসহ শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় দেড়-দুই শ’ মেহমানের কম হবে না। প্রায় সমবয়সী বোন পারুল। সচ্ছল ঘরেই বিয়ে হয়েছে। পারুল তার ছেলের জন্য এখন থেকেই আমার মেয়ের খোঁজখবর নেয়া শুরু করে দিয়েছে। তাদের পরিবারকেও বাদ দেয়া যাবে না। ঘটা করা স্বামীর মত ছিল না। নানাভাবে রাজি করিয়েছি। খৎনার পর চিঁড়ামুড়ি, পিঠা-পুলি নিয়ে আসে আত্মীয়স্বজন। রাত-দিন ভর্তি থাকে ঘর। অনুষ্ঠানের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে লোকসমাগম। বাড়ছে স্বামীর বিরক্তি ও অসহিষ্ণুতা। চলছে তার সাথে বাগ্যুদ্ধ।

দুই মা, বোন-ভগ্নিপতি আগের দিন চলে এসেছেন। রাতে ঘরভর্তি লোক। শোয়ার বিছানা নেই। খড়কুটোর ওপর কাঁথা বিছিয়ে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে কেউ কেউ। আমার ঘুম নেই। বাগ্যুদ্ধে পরাজিত স্বামী সারাদিন ঘরে আসেনি। বের হয়ে খোঁজখবর নেবো, সে সুযোগও নেই। রাত যতই বাড়ছে ততই বাড়ছে টেনশন। রাগ হয় নিজের ওপর। সহজ-সরল স্বামীটাকে কড়া কথায় ভর্ৎসনা করা ঠিক হয়নি। ডিসেম্বর মাস। বাইরে কড়া শীত। ঘরে শুয়ে থাকলেও মন পড়ে রয়েছে বাইরে। আমাকে অন্যমনস্ক দেখে, ‘বেটা মানুষ; হয়তো কোথাও ঘুমিয়ে পড়েছে’ বলে সান্ত¡না দেয় মা ও বোন।

কুয়াশাসহ ভোর হয়। ঘন কুয়াশা কাটতেই উত্তরের ভিটির ঘরের পেছনে আমগাছে চোখ যায়। ভেসে ওঠে স্বামীর ঝুলন্ত দেহ। আর্তচিৎকারে লোকজন আসে। তড়িঘড়ি করে নামিয়ে আনা হয়। নামানোর আগেই লাশে পরিণত হয়েছে দেহ। আমার দিকে আঙুল তোলে কেউ কেউ। দুই ছেলেমেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। গ্রামপুলিশ থানায় যায়। পুলিশ অনুমতি দিলেই জানাজাসহ দাফন-কাফনের ব্যবস্থা হবে। দুপুরের দিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কয়েকজন পুলিশসহ হাজির। দাফন-কাফনের অনুমতি চাইলে পুলিশ বেঁকে বসে। ওয়ান-ইলেভেনের সময়। ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফন-কাফন নয়। অনুনয় বিনয় উপেক্ষা করে লাশ নিয়ে যায় সদরে। সপ্তাহখানেক পর রিপোর্ট আসে। রিপোর্ট ‘মাথায় আঘাতজনিত কারণে নরহত্যা।’ নড়ে-চড়ে বসে পুলিশ। সাধুমোহন্ত সেজে যারা তড়িঘড়ি দাফন-কাফন করতে চেয়েছিল, তাদের মধ্যেই রয়েছে স্বামীর খুনি। খুনি খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেয়া হয় সাব ইন্সপেক্টর সুকান্ত চক্রবর্তীকে। প্রকৃত বিষয় তাকে বোঝানো সম্ভব হলেও এসপি সাহেবকে কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না। এসপি সাহেবের সন্দেহ, বিশাল অঙ্কের টাকায় খুন ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। সরেজমিন নিজে আসেন তদন্ত করতে। এসপি সাহেবের তদন্তকালে উকিল ভাসুরও উপস্থিত ছিলেন। চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে জীবন থেকে শেষ হয় স্বামীর অধ্যায়।

এরপর শুরু হয় সন্তানের অধ্যায়। ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে মেয়েকে ভর্তি করাই হাইস্কুলে। পারুলের ছেলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসে। মেয়ের বয়স কম বলে অপেক্ষা করতে বলি। পারুলের ইচ্ছা ছিল বিয়ে দিয়ে ছেলেকে বিদেশ পাঠাবে। বিয়ে করে ছেলে বিদেশ চলে যাওয়ার চেয়ে বিদেশ থেকে এসে বিয়ে করা উত্তম। দু’জন মিলেই হবুজামাতাকে বিদেশ পাঠাই।

হাইস্কুলে যাওয়ার পর বাড়তে থাকে মেয়ের শরীর। দুই বছরের মধ্যেই নজর পড়ার মতো হয়ে ওঠে। জামাতা তো ঠিক করাই আছে। দেশে এলেই বিয়ে। তার পরও পেছন ছাড়ে না পারুল। পারুলের সন্দেহ, ভালো ছেলে পাওয়া গেলে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেবো। ছেলে যে টাকা খরচ করে বিদেশ গেছে, তা উত্তোলনসহ লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে। তাই আরো বছর দু-এক থাকতে চায়। বিদেশ থাকাকালেই শরা-কাবিন করে রাখতে চায়। টেলিফোনে শরা-কাবিনের পর মেয়ে শ্বশুরবাড়ি আসা-যাওয়া শুরু করে। জামাতা মোবাইল ফোন কিনে দেয় বউকে। পাঠায় উপহার, উপঢৌকন, কসমেটিকস, পারফিউম। দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও বরকনের মধ্যে ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হয়। হু হু করে বাড়তে থাকে মনের বয়স। এর প্রভাব পড়তে শুরু করে শরীরেও। বাড়ে বাইরের ছেলেদের উঁকিঝুঁকি আসা-যাওয়া। জামাতার ফোনের সাথে আসতে থাকে বাইরের ফোনও। মাস তিনেক পরই আসছে জামাতা। প্লেনের টিকিট কাটা হয়ে গেছে। বিয়ের বাজার করাও শুরু করে দিয়েছে। কপাল ভালো। গরিব পিতৃহীন মেয়ের অঙ্গে উঠবে সৌদি আরবের খাঁটি স্বর্ণের গয়না, পারফিউম কসমেটিকস- সবই সৌদির। ছোট বোন পারুল ও আমি, দু’জনই কষ্ট করে বড় হয়েছি। দু’জনই দুঃখিনী। দু’জনেরই প্রথম কাজ। পয়সার মায়া না করে বড় করেই অনুষ্ঠান করতে চাই। যে বাবা-মা এক দিন আমাকে ফেলে দিয়েছিল তাদের সবাইকে দাওয়াত দেবো। তারাও ঘটা করে আসবে নাতনির বিয়েতে। বিয়েতে কী দিতে হবে, জানতে চেয়েছিল বাপের বাড়ির লোকজন। আনন্দ আর আনন্দ। আনন্দে ঘুম আসে না। মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে তিন পরিবারের মহাসমাবেশ।

এক ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি, মেয়ে বিছানায় নেই। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি পাশের বাড়ির এক বেকার ছেলেও নেই বাড়িতে। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। পায়ের তলা থেকে সরে যেতে শুরু করে মাটি। জানাজানি হয় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি হয়ে সুদূর সৌদি আরবেও। নতুন জামাতার নাওয়া-খাওয়া হারাম হয়ে যায়। ঘুম নষ্ট হয়ে যাওয়া জামাতা বারবার ফোন করে স্ত্রীর কাছে। সম্পর্ক ছিন্ন করার সাথে সাথে মোবাইলের সিম ছিন্ন করার বিষয়টিও টের পায় স্বামী। দিন পনেরো পরে খোঁজ পায় পালিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়ের। শহরে গিয়ে খুঁজে বের করি মেয়েকে। অনেক বুঝিয়েও মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হই। সুখস্বপ্ন কাচের মতো ভেঙে খান খান হয়ে যায়।

সব শেষ, নতুন স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করি ছেলেকে নিয়ে। বাপের মতো হাত-পায়ে তড়বড় করে বেড়ে উঠলেও ছেলেটার বয়স কম। আমার টাকা নিয়ে বহু মানুষ বিদেশ গেছে। এবার নিজের ছেলেকে বিদেশ পাঠানো যায় কি না, চেষ্টা শুরু করি। কম বয়সের ছেলে বিদেশ গিয়ে থাকবে কী করে! ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে আমিই বা থাকব কী নিয়ে! বিদেশ গিয়ে ছেলে কষ্টের কাজ করলে আমিও কষ্ট পাবো। টাকা যত লাগে লাগুক, ছেলের যেন কষ্টের কাজ না হয়। লাভে খাটানো টাকা, জমানো টাকা তার পরেও ধারকর্জ করে সাত লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে সৌদি পাঠাই। প্রথম কয়েক মাস সমস্যা হলেও ভালো কাজ পায় ছেলে। দিন ঘুরতে থাকে। শুরু হয় সুখের সময়।

চরম সুখের সময় একদিন সন্তানসম্ভবা মেয়ে এসে হাজির হয়। শত হোক, পেটে ধারণ করেছি। ফেলে দিই কী করে! মেয়ের সন্তান হয় আমাদের বাড়িতেই। সন্তান দেখার জন্য মাঝে মধ্যে সন্তানের বাবাও আসতে শুরু করে। বারণ করতে পারি না। বেকার জামাতা ব্যবসা করতে চায়। গরু পালার ব্যবসা। কোরবানি সামনে। ৬-৭ মাস আগে কিনে কোরবানির সময় বিক্রি করলে অনেক লাভ। এক দেড় লাখ টাকা হলেই ব্যবসাটা শুরু করা যায়। শাশুড়ির কাছে চালান চায় জামাতা। গরু বিক্রির সাথে সাথে চালানের টাকাটা ফেরত দিয়ে দেবে। গরুসহ জামাতা মেয়ে থাকবে আমাদের বাড়িতেই। মনে মনে ভাবলাম, বেকার অবস্থায়ও আমার ওপরেই খায়। তার চেয়ে কাজ করলে মন্দ কী! ছেলেকে না জানিয়ে দু’টি গরু কিনে, গরুর জন্য একটা দোচালা ঘরও তুলে দিই। সপ্তায় সপ্তায় কিনে দিতে হয় খৈল-ভুসি। কোরবানির গরুতে লোকসান যায়। বড় লোকসানসহ কথা বন্ধ হয়ে পড়ে মেয়ে ও মেয়ে জামাতার সাথে। রাগ করে ঘরছাড়া হলেও বাড়িছাড়া বন্ধ হয়নি।

বছর চারেক পর ছুটি নিয়ে ছেলে দেশে আসে। মনের মতো একটা ঘর দিতে চায়। ঘর দিয়ে আবার বিদেশ চলে যাবে। বর্তমানে যেখানে ঘর আছে, সেখানে মনের মতো ঘর উঠবে না। বাড়ির সবার কাছে ছেলের ইচ্ছার কথা জানানো হয়। সবাই খুশি এ কথা শুনে। মূল বাড়ি থেকে বেশ দূরে দক্ষিণমুখী মসজিদের পাশের সুন্দর জমিটি বাড়ি করার জন্য চিহ্নিত করে দেয়া হয়।

সৌদির একই এলাকায় কাজ করত আমার এক সহোদর। গল্পের মতোই মামার সাথে পরিচয় হয় ভাগিনার। মামা অর্থাৎ আমার ভাইয়ের একটি মেয়ে আছে। মেয়ের জামাতা হিসেবে তখনই পছন্দ করে ফেলে ভাগিনাকে। এ খবর জানিয়ে দেয় বাড়িতেও। মেয়ে দেখতে যাওয়ার জন্য বিদেশ থেকে বারবার ফোন করেন। মেয়ের বাড়ি থেকে লোক পাঠায় আমাদের বাড়িতে। বিয়েতে যা চাই, তাই দিয়ে দিতে রাজি হয়। পরিশেষে বড় ট্রলার ভাড়া করে মেয়ে দেখতে যাই। তারা কল্পনাতীত আদর-কদরসহ আশাতীত রকমের খানাপিনার আয়োজন করেন। বড় চিংড়ি মাছসহ সামুদ্রিক রুপচাঁদাও বাদ পড়েনি। বিয়েতে ছেলেও সম্মত। ছুটিও ফুরিয়ে যাচ্ছে। সব ঠিক, কনের বয়স ঠিক নেই। স্কুল সার্টিফিকেট অনুসারে বয়স মাত্র তেরো বছর। তাই মেয়ের কাবিন করবে না কোনো কাজি। তাতে কী, কাবিন ছাড়াই শরা-কবুল পড়ানো হয়।

শুরু হয় বাড়ির কাজ। এক মাসের মধ্যে দক্ষিণমুখী, পাকা ভিটির, কাঠকেওয়াড়ি বারান্দাসহ সুন্দর একটি বাড়ি। নতুন ঘরে ওঠে নতুন বউ। পুতুলের মতো বউ সারা দিন ঘোমটার আড়ালেই থাকে। ঘোমটার ভাঁজ ভাঙার আগেই ছেলে বিদেশ চলে যায়। বউ ছোট হিসেবে সবসময় চোখে চোখেই রাখি। রাতে আমার সাথে শোয়াই। মেয়ের বাপ থাকেন বিদেশ; মা থাকেন ঢাকা। বালিকা বধূকে নজরের বাইরে রাখি না- নাইওর দিই না মায়ের কাছেও। আমার সাথে নামাজ পড়াই। দিনে কয়েকবার কথা হয় ছেলের সাথে। ছেলেও যখন-তখন ফোন করে। কথা হয়। কথার পর কখনো উৎফুল্ল কখনো বিষণ্নে হয়ে থাকে বউ।

২০২০ সালের জুলাইয়ের শেষ দিন। মহামারী করোনায় সারা দেশ স্তম্ভিত। রাত পোহালে ঈদ। কোরবানির জন্য টাকা পাঠিয়েছে ছেলে। দলবেঁধে ঈদের নামাজ আদায়ে বারণ থাকলেও কোরবানিতে বারণ নেই। জীবনে প্রথম কোরবানি। নিজের কোরবানির আনন্দই আলাদা। অন্য দিকে নতুন বউ। আনন্দ আর আনন্দ। বউয়ের সাথে আসরের নামাজ আদায় করে বের হই। শরিক মিলে লক্ষাধিক টাকায় গরু কিনেছে। বিয়ের সময় মেয়ের বাবা ঘরসাজানোর জন্য তিন লাখ টাকা দিয়েছেন। সে টাকা থেকে একটা ফ্রিজও কিনেছি। বেশির ভাগ গোশত রেখে দেবো ডিপে ছেলে এসে যেন কোরবানির গোশতের স্বাদ নিতে পারে। শরিকের লোকজনই গরু ‘বানানো’র কাজ করে। আমাদের পরিবারে পুরুষ লোক নেই। এ বিষয়ে আলাপ করতে গেছি ভাসুরের সাথে। ঘরে বউ একা। তাতে কী! ঘরের পশ্চিমে-দক্ষিণে চলাচলের রাস্তা, পূর্ব দিকে বাড়িঘর। জানালায় কাঠের কপাট থাকলেও গ্রিল লাগানো হয়নি। তাই সবসময় কপাট বন্ধ রাখা হয়।

ঘণ্টাখানেক পর ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। দরজার দু’টি কপাট মিলিয়ে গিয়েছিলাম। বউ নামাজ শেষে মাঝে মধ্যে কুরআন পাঠ করতে বসে। বউ বন্ধ করে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। বউয়ের নাম ধরে ডাকাডাকি করি। সাড়াশব্দ না পেয়ে জানালায় ধাক্কা দিতেই কপাট খুলে যায়। কপাট খুলতে যা দেখলাম, তা মনে হলে শরীর শিউরে ওঠে। শূন্য খাটের ওপর টাচ্ মোবাইলটা পড়ে আছে। পাশেই ঝুলে রয়েছে বউ। আর্তচিৎকারে লোকজন আসে। নামাজ আদায়ের সময় যে সালোয়ার কামিজ পরনে ছিল, সে সালোয়ার কামিজসহ খয়েরি রঙের ওড়নাটি মুখমণ্ডলে বাঁধা রয়েছে। পাজোড়া ঠেকে রয়েছে ভূমিতে। অনেকের ধারণা, খাটে দাঁড়িয়ে ঘরের রোয়ায় বাঁধা ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ঝাঁপ দেয়ার পর মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করাকালে বাঁধন নিচে নেমে যাওয়ায় পা ঠেকে রয়েছে মাটিতে। কারো মতে, অপরাধের উদ্দেশ্যে দুরাচার জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে অপরাধ করেছে যা ঢাকতে এই দুষ্কর্ম্ম। মোবাইল পরীক্ষা করে দেখা যায়, কথা হয়েছিল স্বামীর সাথেই। স্বামী এমন কিছু হয়তো বলেছে যা কচি মন সামাল দিতে পারেনি। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে বাণ দিয়ে মানুষ মারার কথা অনেক শুনেছি। আপনজনের কোনো কোনো বাক্য তান্ত্রিক বাণের চেয়েও ভয়ঙ্কর, যা যোজন-বিজন দূর থেকেও আপনজনের ওপর আঘাত হানতে পারে। খবর পেয়ে ট্রলার বোঝাই করে চলে আসে মেয়ের বাড়ির লোকজন। খবর দেয়া হয় থানা পুলিশকেও। মেয়ের পক্ষের এক কথা, আগে লেনদেন ফায়সালা, পরে দাফন-কাফন। পুলিশেরও এক কথা, ‘এক দিকে করোনার লকডাউন, অন্য দিকে রাত পোহালে ঈদ। কারো ওপর সন্দেহ নেই, এই মর্মে দুই পক্ষ লিখিত দিলে আমাদেরও আপত্তি নেই; অন্যথায় লাশ যাবে পোস্টমর্টেমে।’ স্বামীর ঝুলন্ত লাশে যেখানে কারো সন্দেহ ছিল না সেখানে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসেছিল ‘আঘাতজনিত নরহত্যা’, সেখানে জীবনের শুরুতে আত্মহননের প্রকৃত কারণ কেউ খুঁজে পেল না। আত্মহননের রহস্য খোঁজার চেয়ে সবাই ফায়সালার পক্ষে। ঋণ করে মেয়ে পক্ষের চার লাখ টাকা পরিশোধ করে ঈদের দিন সকালে লাশ দাফন-কাফন হয়।

সব দোষ আমার। ছেলে টাকা-কড়ি পাঠানো দূরের কথা, বন্ধ করেছে কথা বলাও। শূন্যঘর আমাকে গ্রাস করতে চায়। মা, ভাইবোন সবাই দূরে সরে গেছে। ভীষণ একা আমি। কখন রাত আসে দিন যায়, দিন আসে রাত যায়, টের পাই না। টের পাই না ক্ষুধাতৃষ্ণার যন্ত্রণাও। একাকার হয়ে পড়েছে নিদ্রা-অনিদ্রাও। ঘরে দমবন্ধ হয়ে আসে। তালা লাগিয়ে ভাসুরের ঘরের বারান্দায় রাত কাটাই। দুঃস্বপ্ন দেখে হু হু করে কেঁদে উঠলে জেগে ওঠে ঘরের ঘুমন্ত মানুষ। ‘তোমার মতিগতি ঠিক নেই। কী থেকে কী হয়ে যায়। তোমাকে ঠাঁই দিতেও ভয় পাই’ বলে জবাব দেয়। সমাজ ও পরিবার থেকে একে একে আলগা হয়ে যাচ্ছে আমার সব বন্ধন। জীবনের হতাশা, ব্যর্থতা, দুঃখ, গ্লানি প্রভৃতি শেয়ার করার কেউ ছিল না, এখনো নেই। কমে গেছে বেঁচে থাকার অভিলাষ। মরণ হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু এবং যে কেউ আত্মহত্যা করবে, তাকে অনলে দগ্ধ করব’; অদৃশ্যের এই আপ্তবাক্যে ফাঁসের রশি কয়েকবার হাতে নিয়েও রেখে দিয়েছি।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
[email protected]



আরো সংবাদ


মৃত্যু কাম্য নয়, তবে কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেলে কিছু করার নেই : হাসিনা খুলনায় লেখক মুশতাকের মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় যুবক গ্রেফতার ৩০ মার্চ থেকে খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেভাবে ক্লাস হবে শামীমা বেগম কি আর কখনো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ফিরে পাবেন? মান্দায় ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত একসাথে দুই বোনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল প্রেমিক কারওয়ান বাজারে হাসিনা মার্কেটে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৮ ইউনিট সিরিয়ায় বিমান হামলা আমেরিকার সঙ্ঘবদ্ধ সন্ত্রাসবাদের নতুন ধাপ : ইরান রাজশাহীতে ১ চিকিৎসক ও ৫ পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ উড়ছে ম্যানসিটি জামায়াত আমীরের শোক

সকল