০৫ মার্চ ২০২১
`

নৈতিক শিক্ষার অভাব

নৈতিক শিক্ষার অভাব - ছবি : প্রতীকী

কথায় আছে, সন্তানের জন্ম দেয়া খুব সহজ কিন্তু তাদের মানুষ করা কঠিন। এই কঠিন কাজটি করতে পারিনি বলেই আমাদের পরিবার ও সমাজ দিন দিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। শিশু বয়সে সন্তানরা মা-বাবার কাছ থেকে যা শেখে তা তাদের মনে বিপুল প্রভাব বিস্তার করে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা বড়দের যেভাবে চলতে দেখে, সেটাই রপ্ত করে। তাই মা-বাবাকে সবার আগে পরিশুদ্ধ হতে হবে। কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখতে হবে। খারাপ অভ্যাস থাকলে তা ছেড়ে দিতে হবে। আজ সমাজের যে চিত্র সেজন্য তিন শ্রেণীর মানুষ দায়ী বেশি। তারা হলেন, বাবা-মা এবং শ্রেণী শিক্ষক। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মার কষ্ট পাওয়ার মূল কারণ শিশু বয়সে সন্তানদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের ভুলভ্রান্তি। একজন সুসন্তান জীবিত অবস্থায় তার মা-বাবাকে কষ্ট দেয় না, মৃত্যুর সময়ও না। নবী করীম সা: বলেছেন, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন থেকে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমলের দরজা কখনো বন্ধ হয় না, (১) সদকায়ে জারিয়ার সাওয়াব (২) মানবসেবা এবং (৩) নেকসন্তানের দোয়া (মুসলিম, মিশকাত পৃষ্ঠা ৩২)। নেকসন্তান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নেয়ামত। বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ ছাড়া সন্তানই হয় বাবা-মার একমাত্র আশ্রয়।

জন্মের পরক্ষণেই সন্তানের কানে একত্ববাদের বাণী শোনানো মাতা-পিতার অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে সর্বপ্রথম। হজরত আবু রাফে থেকে বর্ণিত, আমি নবী করীম সা:কে দেখেছি মা-ফাতিমা রা:-এর গর্ভে হজরত হাসান রা: জন্মগ্রহণ করলে তার কানে নামাজের আজানের মতো আজান দিয়েছেন, (তিরমিজি, প্রথম খ-, পৃষ্ঠা-১৮৩)। মহানবী আরো বলেন, যখন তোমাদের সন্তানেরা কথা বলতে শেখে তখন তাদের কালেমা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ শিক্ষা দাও (বায়হাকি)। মহানবী সা: এও বলেছেন, আল্লাহর গুণবাচক নামের সাথে মিলিয়ে সন্তানদের নাম রাখো। শিশুর জন্মের সপ্তম দিন আকিকা করা নবীর সুন্নত। রাসূল সা: বলেছেন, ছেলের জন্য দু’টি ছাগল এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল আকিকা করবে (বায়হাকি)। মাতা-পিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হক হলো পুত্রসন্তানের খতনার ব্যবস্থা করা। এটি সুন্নতে ইবরাহিমি। আনুষঙ্গিক এসব কাজ শেষ করার পর সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। এটাই জীবন পরিচালনার মূলগত ভিত্তি বা কাঠামো। ইসলামের ৫টি স্তম্ভ, ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত এসব কর্ম যাতে করে সন্তানদের মধ্যে শিশু বয়স থেকে প্রতিফলিত হয়, সেই প্রচেষ্টা বাবা-মাকে চালিয়ে যেতে হবে। এভাবে যদি একটি শিশু সন্তানকে (১-১৮ বছর) প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সেই সন্তান পিতা-মাতার কাছে আকাশছোঁয়া স্বপ্নের মতো মনে হবে। শিশু বয়সে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার পর পরবর্তী সময়ে সন্তানদের ইংরেজি বা বাংলায় যতই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হোক না কেন, সমাজের জন্য সে হিতকর বার্তাই বয়ে আনবে।

এবার একটু সমাজচিত্রের দিকে দৃষ্টি দিই। দেশ এখন উন্নয়নের পথে হাঁটছে। কিন্তু এর পাশাপাশি সমাজে অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা, লাগামহীন দুর্ঘটনা বাড়ছে। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই নজরে পড়ছে ধর্ষণ, পাশবিক নির্যাতনের নানা ঘটনার খবর। পৈশাচিক কায়দায় খুন, শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, লুটপাট, দুর্নীতি, মারামারি আর হানাহানির খবর তো নিত্যদিনের পত্রিকার পাতা ভরে থাকছে। আমাদের দেশে পারিবারিক কলহ, হিংসা, বিদ্বেষ এসবও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বেড়েছে। বিগত সময়গুলোতে পারিবারিক কলহের কারণে পরিবারের সবার একসাথে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। স্বামী-স্ত্রীর কলহে প্রাণ দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। ধর্ষণ করে শিশু ও নারীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, যা বর্বর যুগকেও হার মানিয়েছে। দেশে কিশোর গ্যাং এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। নীতি-নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ বিভাগের তথ্যানুযায়ী বছরে মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ সংঘটিত হচ্ছে পারিবারিক কলহের কারণে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবক্ষয় একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব অপরাধ বহু বছর ধরে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা রোধ করতে হলে পরিবার-সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে মূল ধারায় ফিরে আসতে হবে।

মানুষ কখনো অপরাধী হয়ে জন্ম নেয় না। বাবা-মা এবং স্কুলশিক্ষকের ভুল শিক্ষাদানের কারণে পরবর্তী সময়ে মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে। মূল ধারায় ফিরে না আসার কারণে সমাজে আরেকটি বড় ধরনের অনৈতিকতার রোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেটি হচ্ছে লিভ টুগেদার। এ ধরনের সংস্কৃতি মূলত পশ্চিমা দুনিয়ায় বেশি প্রচলিত। ইদানীং আমাদের দেশে ঢাকাসহ বড় বড় কয়েকটি জেলা শহরে এর প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। এতে করে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ব্যাচেলরদের বাড়ি ভাড়া না পাওয়া, আর্থিক সঙ্কট এবং চাহিদার কারণে এ ধরনের অসামাজিক কাজে উৎসাহী হচ্ছে যুবক-যুবতীরা। পশ্চিমা ও ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের অন্ধ আবেগ এবং অনুকরণের পাশাপাশি জৈবিক চাহিদার কারণে তারা লিভ টুগেদার করছেন। আবার ঘন ঘন সম্পর্কচ্ছেদ করছেন। এতে খুনের মতো অপরাধ বাড়ছে। আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন কেউ কেউ।

সম্প্রতি খবরে দেখলাম, ধর্ষিতাকে বিয়ে করে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন এক ধর্ষক। একজন আইনজীবী একে বলেছেন, আইনের শাসনের দুর্বলতার দৃষ্টান্ত। পরিবারবিষয়ক কাউন্সিলর অধ্যাপক ড. কামরুন মোস্তফা বলেন, পারিবারিক সমঝোতার কারণে ধর্ষিতা আর ধর্ষকের বিয়ে হলো। এরপর ধর্ষকের কারামুক্তি ঘটল, এটি হয়তো ঘটনার আপাতত সমাধান। কিন্তু টেকসই সমাধান নয়। ধর্ষক-ধর্ষিতার পরবর্তী দাম্পত্য জীবন কেমন যাচ্ছে, ধর্ষিতা ধর্ষকের পরিবার বিপদের মুখে পড়ছে কি না- সেই নিশ্চয়তা থাকছে না। তাই বিয়ের শর্তে ধর্ষকের জামিন লাভের পাশাপাশি পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেরও ব্যবস্থা থাকা দরকার। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের পর ধর্ষিতাকে বিয়ে এটি তার কারামুক্তির কৌশল কি না তা-ও ভেবে দেখতে হবে।

এখন চলছে চার দিকে রুচির দুর্ভিক্ষ। একটি স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির এই দুর্ভিক্ষ দেখে কষ্ট হয়। ছায়াছবির বাজারেও একই অবস্থা। উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো ছবি তৈরি হচ্ছে না। দুই-চারটি যাও হয় তা ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। এসব ছবি বহুলাংশে বিজাতীয় সাংস্কৃতিক বৈকল্যের কার্বন কপি ছাড়া আর কিছু নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্লোগানেই সীমাবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধনির্ভর ছবি আমরা দেখেছিলাম ১৯৭০ সালে জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া। এরপর দেখেছিলাম, ওরা ১১ জন, স্টপ জেনোসাইড, বার্থ অব নেশন, লিবারেশন ফাইটার্স, ইনোসেন্ট মিলিয়নস। এখন আর তেমন কিছু হচ্ছে না। সামাজিক ছায়াছবিরও দুর্ভিক্ষ চলছে। মানুষ এখন স্টার প্লাস, স্টার জলসা, স্টার মুভিজ দেখে সময় কাটাচ্ছেন। স্বদেশী রুচি এখন বিজাতীয় রুচিতে রূপ নিয়েছে। চলাফেরায় পোশাক আশাকে এখন আর দেশীয় ভাবধারা নেই। এসব নিয়ে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা মাঠ গরম করেন না। দেড় হাজার মাইল দূরে রাষ্ট্রটি নিয়েই তাদের যত চিন্তা। অথচ এই দেশটির কখনোই পাকিস্তানের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। বরং অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ওঠে কি না সেটাই ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় উন্নয়ন হলো মানুষের নৈতিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রবৃদ্ধি দিয়ে নৈতিক উন্নয়নের মানদণ্ড বিচার করা যায় না। এ জন্য নৈতিক উন্নয়নের সব শাখা-প্রশাখায় সমানতালে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এ দুটো সমানভাবে এগোলেই বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। আজ নৈতিক শিক্ষার সুযোগ নেই বলেই দেশে সাড়ে তিন কোটি মানুষ না খেয়ে থাকে। আমাদের দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বাসস্থান সেবা সার্বজনীন হয়নি বলেই সর্বক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য বিরাজমান। প্রতিটি মানুষের জীবনবীমা ব্যবস্থার সুযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে করে দেয়া হয়নি। খাদ্যের মান ঠিক নেই।

ভেজালসামগ্রী খেয়ে মানুষ দিন দিন পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অনৈতিকতার থাবা সর্বস্তরে প্রসারিত হচ্ছে আজ। একটি সড়ক বার বার খোঁড়াখুঁড়ির পেছনে কাজ করে অনৈতিকতা। বাংলাদেশে প্রতিদিন যেভাবে অনৈতিকতার কালো হাত প্রসারিত হচ্ছে তাতে স্বাভাবিক জীবনযাপন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বড় বড় ডিগ্রিধারী লোকরাই দেশ চালাচ্ছে- কিন্তু অনৈতিকতার মহামারী কমছে না কেন? কারণ একটি, যারা দেশ পরিচালনা করছেন তাদের অধিকাংশই নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন। তাদের মা-বাবা শিশু বয়সে তাদের নৈতিক শিক্ষা দেননি।

উন্নত বিশ্বের বহু দেশ অর্থনৈতিক উন্নতির চেয়ে নাগরিকদের মানবিক বা নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বিষয়ে জাতিসঙ্ঘ ধারাবাহিকভাবে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে। বিশ্বের প্রায় দেড় শতাধিক দেশের ওপর জরিপ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। উল্লেখ্য, গোটা বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম আকাল তীব্র আকার ধারণ করছে যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। যাদের হাতে বাংলাদেশ তারাই আজ পথভ্রষ্ট। তাহলে ভবিষ্যতে সরল সঠিক পথের সন্ধান কে দেবে?

মানুষ যখন খারাপ পথে ধাবিত হয়, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে তখনই বিশ্বজুড়ে মহামারী শুরু হয়। অবাধ্য মানুষদের আল্লাহ তায়ালা এভাবে পাকড়াও করে দুনিয়াতেই শাস্তি দেন। বাংলাদেশ ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র এবং ইসলাম আমাদের রাষ্ট্রধর্ম। তা সত্ত্বেও আমরা বাংলাদেশকে একটি কল্যাণময় ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছি। জাতির মনে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প নেই। নৈতিক অবক্ষয় ঠেকানো না গেলে যত উন্নয়নই করা হোক না কেন তা দিয়ে সুস্থধারার জাতি বিনির্মাণ কখনোই সম্ভব নয়। এ কারণে আজ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো সেই পথে হাঁটছে। আসুন আমরা সুখ ও শান্তি নিশ্চিত করার সেই শান্তির ধর্ম ইসলামের পথে ফিরে যাই।

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক



আরো সংবাদ