২০ জানুয়ারি ২০২১
`

যেন নিয়ম হয়ে গেছে অর্থপাচার

-

কানাডার বেগমপাড়াসহ বিশ্বের দেশে দেশে অর্থপাচারকারীদের প্রতি আমাদের হাইকোর্টের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। ‘দেশ-জাতির শত্রু’ উল্লেখ করে ১৭ ডিসেম্বর এদের তালিকাসহ তথ্য চেয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। আর ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে বোঝানো হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে। বিচারপতি মো: নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এসেছে স্বপ্রণোদিত এই আদেশ। স্বপ্রণোদিত বা স্যুয়োমুটো বলা হলেও আদালত এ বিষয়ে প্রণোদিত হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের বক্তব্যের জের ধরে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ‘মিট দ্য রিপোর্টার্স’ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যতাড়িত হয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় টাকা পাচারের গুঞ্জনের কিছুটা সত্যতা তিনি পেয়েছেন। আর প্রাথমিক তথ্যে দেখেছেন, টাকা পাচারে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সরকারি চাকুরেই বেশি। এ তথ্য দিতে গিয়ে আরো জানিয়েছেন, তার ধারণা ছিল পাচারকারীদের মধ্যে রাজনীতিকের সংখ্যাই বেশি হবে। কিন্তু দেখলেন রাজনীতিবিদ মাত্র চারজন। ব্যবসায়ী আছেন কয়েকজন। তবে পাচারকারীদের নাম বা তালিকা দেননি তিনি।

তিনি ২৮টি কেস স্টাডির তথ্য দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের আদেশের আগে পরে আরো কিছু প্রাসঙ্গিক কথা রয়েছে। পাচারকারীদের নাম প্রকাশ করা না হলে এ ধরনের অপরাধ কমবে না, বরং বাড়বে বলেও মনে করেন উচ্চ আদালত। দেশে পড়াশোনা করে, দেশের মাটিতে থেকে, দেশের বাইরে টাকা পাচার করবে, এটা কি এক ধরনের বেঈমানী নয়?- এমন প্রশ্নও করা হয়েছে। আদালতের প্রশ্নের সাথে একমত বলে জানিয়েছেন দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। অনেকটা আক্ষেপের সাথে বলেছেন, ‘এটা কালচার হয়ে গেছে’।

তথ্য জোগানের পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য কিছু জিজ্ঞাসা তৈরি করেছে। এতদিন পর কেন-কোন পরিপ্রেক্ষিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছাড়লেন তিনি। এমনি? কথাচ্ছলে? বলার জন্যই বলা? মোটেই না। দেশের শত-হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের ঘটনা গত বছর কয়েক ধরেই আলোচিত। সরকারের দিক থেকে যে কোনো ছাড় বা নমনীয়তা রয়েছে এমনও নয়। কিন্তু পাচারকারী চক্র দমছে না। বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এগিয়েই যাচ্ছে। তার ওপর কানাডায় অর্থপাচার বা বিনিয়োগকারীদের সম্পর্কে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করে আসছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছে তাগাদাপত্রের মতো চিঠিও দিয়েছিল। কিন্তু তথ্য কেমন পেয়েছে সে খবর নেই তেমন। তবে গণমাধ্যমের তথ্য হচ্ছে, ৬০ জন দুর্নীতিবাজের বিদেশে পাচার করা টাকা দেশে ফেরত আনতে কাজ করছে দুদক। সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার মিলিয়ে এই ৬০ জনের পাচার করা টাকা ফেরত আনতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট-এমএলএআর পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৮টি দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই আবেদন করা হয়েছে। কানাডার ‘বেগমপাড়া’ বেশি আলোচনায় এলেও পাচার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ডও রয়েছে। বিদেশে থাকা কয়েকজন দুর্নীতিবাজকে দেশে ফেরাতে ইন্টারপোলের সাহায্য চেয়েও আবেদন করা হয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের হোতা প্রশান্ত কুমার হালদারের বিষয়েও তদন্ত চলছে। হালদারের পাচার করা অর্থের মধ্যে ৬৫০ কোটি টাকার তথ্য পেয়েছে দুদক।

এই পর্যন্ত খবর অবশ্যই আশা জাগানিয়া। হতাশ হয়ে গেলে চলবে না। এরই মধ্যে ৩৫ জনের অর্থপাচারের রেকর্ডপত্র দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা হাতে পেয়েছেন- এমন খবর আশাবাদে বাড়তি মাত্রা দিয়েছে। দুদকের অন্তত ২২ জন দক্ষ কর্মকর্তা এ নিয়ে কাজ করছেন। ওই সব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চার্জশিট আকারে আদালতে দাখিল করা হয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে আদালতে বিচারকাজ চলছে। এ অবস্থায় তালিকা প্রকাশ করলে কি বেশি সমস্যা হবে? লুকোচুরি বরং প্রশ্ন বাড়াবে। বদনামের বেশিটাই যাবে সরকারের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া পাচারকারীদের মধ্যে সংখ্যায় সরকারি কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি, এমন তথ্য সৎ-দক্ষ কর্মকর্তাদের জন্য পীড়াদায়ক। জড়িতদের তালিকা প্রকাশ হলে তারা স্বস্তি পাবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনীতিকের সংখ্যা এ তালিকায় কম। দু-চারজন রাজনীতিকের জন্য বাদবাকি রাজনীতিকরা কেন দহনে পুড়বেন? লক্ষ করার মতো বিষয় হচ্ছে- সম্রাট, খালেদ, জিকে শামীম, সাহেদ, সেলিম প্রধান বা গোল্ডেন মনিরের মতো যাদের নামে বিদেশে টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে, এরা কী? তাদের একজনও কি সরকারি কর্মকর্তা? ওরা রাজনীতিক? না-কি ব্যবসায়ী? এসবের কিছুই না। এরা দুর্বৃত্ত, লুটেরা, জালিয়াত। কেন এদের কলঙ্ক সরকার, রাজনীতিক বা ব্যবসায়ীদের কাঁধে চাপবে? কেন এদের কারণে পাচারের বিশ্বতালিকায় উঠবে বাংলাদেশের নাম?

গত কয়েক বছরে দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। নানা কৌশলে টাকা পাচার করছে এই গোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি-জিএফআইর তথ্য মতে, গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার ২৭০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে স্থানীয় মুদ্রায় যা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। টাকা পাচারে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় রয়েছে এ দেশের নাম। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার এ সংক্রান্ত তালিকায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্যও উল্লেখ করার মতো। প্রতিষ্ঠানটির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, পাচার করা অর্থের বেশির ভাগ অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে পাচার করা হয়। এতে বলা হয়েছে, আমদানিযোগ্য পণ্য বা সেবার মূল্যবৃদ্ধি করে বিশেষত যেসব পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কম (মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, কম্পিউটার সামগ্রী ইত্যাদি বা যেসব পণ্য বা সেবার দাম নির্ধারণ কঠিন) সেসব পণ্য বা সেবা আমদানির মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। অপর দিকে, রফতানি করা পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে রেখেও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি আমদানি করা পণ্যের বিবরণ পরিবর্তন করে বা কোনো পণ্য আমদানি না করে শুধু ডকুমেন্টের বিপরীতে মূল্য পরিশোধ করেও অর্থ পাচার করা হয়। তা ছাড়া একই পণ্য বা সেবার একাধিক চালান ইস্যুকরণ কিংবা ঘোষণার তুলনায় পণ্য বা সেবা বেশি বা কম জাহাজীকরণের মাধ্যমেও অর্থপাচার হয়ে থাকে। বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থপাচার রোধে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট একটি গাইড লাইন্স জারি করেছে। সেটা কি মানা হচ্ছে? এ ছাড়া অর্থ পাচারে জড়িত সন্দেহে ২১ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট-বিএফআইইউ। সন্দেহজনক লেনদেন, হিসাবের তথ্যে গরমিল, প্রতারণা ও অর্থপাচারের সাথে প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগে এ ২১ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব, টাকা পাচার রোখার চেষ্টা করা হচ্ছে না, তা বলা সমীচীন নয়। তবে সেই চেষ্টায় ফল আসছে না।

কেন ফল আসছে না? এ চেষ্টার পথে কারা বাধা? এসব প্রশ্ন তলিয়ে দেখতে হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নানের কথা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তার মূল্যায়ন হচ্ছে- বিদেশে টাকা পাচারে সুবিধা পাওয়ায় কমছে না অর্থপাচার। তারা বিদেশে টাকা পাচার করে ভালো সুবিধা পাচ্ছে। টাকা পাচার কম হলে সেটা দেশে উন্নয়নের কাজে লাগত। টাকা পাচার হওয়ার ফলে আমাদের ঋণ নিতে হচ্ছে। টাকা পাচার বন্ধ করতে পারলে ঋণ নিতে হতো না বলেও মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

এ নিয়ে সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কার কথা বলেই যাচ্ছেন। পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিআইডি কাজ করছে। এ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করা জরুরি। বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। ফলে ওই ব্যক্তিদের তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নাও দিতে পারে। কিন্তু দেশে থেকে, দেশের খেয়ে যারা এই অপকর্ম করে যাচ্ছেন, তাদের ধরা নিশ্চয়ই কঠিন নয়। ইচ্ছা থাকলে উপায় অবশ্যই পাওয়া যাবে।



আরো সংবাদ