২০ জানুয়ারি ২০২১
`

দিলকুশায় দবির সাহেবের শেষ দিনগুলো

-

এক শুভ সকালে দবির উদ্দিন তার কর্মস্থল ঢাকার দিলকুশার রাস্তায় এসে অনেকটা আতঙ্কিত হয়ে গেলেন। যা দেখে তিনি আতঙ্কিত হলেন, মানুষ তা দেখে আতঙ্কিত হয় না। সিমেন্ট বালুর তৈরি ঢাউস আকৃতির স্যুয়ারেজ পাইপ রাস্তায় সারি সারি সাজানো। বৃহস্পতিবার যখন অফিস ত্যাগ করেন তখন ছিল না। শুক্র-শনি দুই দিন বন্ধ। রোববার অফিসে এসে দেখেন এই দৃশ্য। এগুলো অনন্তকাল রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে শুয়ে থাকার জিনিস নয়। রাস্তা খুঁড়ে ভেতরে চালান করা হবে। খানাখন্দ পূরণ করে মসৃণ কার্পেটিং করা হবে। চমৎকার নতুন রাস্তায় আরো মসৃণ গতিতে তার গাড়ি চলবে। বিষয়টি ভেবে মি. দবিরের উৎফুল্ল হওয়ার কথা; কিন্তু তিনি আতঙ্কিত হলেন।

স্যুয়ারেজের এই বিশাল আকৃতির পাইপ তিনি যৌবনে হলিউডের মুভিতে দেখেছিলেন। সিনেমার নায়ক অপরাধী ধরতে মাটির নিচে স্যুয়ারেজের পাইপের মধ্য দিয়ে পিস্তল হাতে দৌড় দিচ্ছে। স্যুয়ারেজের পাইপও এত বড় হতে পারে ভেবে তিনি অবাক হয়েছিলেন। ঢাকার রাস্তায় স্যুয়ারেজ পাইপ তখন হাঁটু বরাবর। আমরা এগিয়েছি। সক্ষমতা বেড়েছে। আমাদের নায়কও দিব্যি মতিঝিলের স্যুয়ারেজের পাইপের মধ্য দিয়ে ক্রিমিনাল ধরতে দৌড় দিতে পারবে। ভাবতে ভালোই লাগার কথা।

কিন্তু তিনি আতঙ্কিত হলেন ভিন্ন কারণে। বাংলাদেশের এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়, শেষ হতে চায় না। নিশ্চয়ই শুরুতে অর্থ বরাদ্দ, কাজের বয়ান, শেষের সময়সীমা নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু শুরু হলে কোনো কিছুই আর নির্দিষ্ট থাকে না। বাজেট বাড়ে, সময় বাড়ে, বাড়ে সাধারণের অসহনীয় ভোগান্তি। কিন্তু কাজের গতি বাড়ে না। আর বিচিত্র কোনো কারণে কাজগুলো শুরু হয় মে-জুনে। জুন মাস বাংলায় আষাঢ়, বৃষ্টির মাস। অঝোর বৃষ্টি, সাথে কাদামাটিতে একাকার ঠিকাদারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।

মি. দবির উদ্দিন গাড়ি থেকে নেমে অফিস ব্যাগ হাতে দুই পাইপের মধ্যে শরীর বাঁকিয়ে নিজের অফিসের দরজায় পৌঁছলেন। ভাবলেন, এভাবে কত দিন কে জানে? কিন্তু দুর্ভাগ্য! এভাবে বেশি দিন গেল না। ঘন বর্ষার এক সকালে মি. দবির দেখলেন অফিসের সামনে দিয়ে পরিখা খনন করা হয়েছে। স্যুয়ারেজের পাইপগুলো নামানো হবে। পরিখা প্রস্থে খুব বেশি নয়। কিন্তু পারাপার দুর্গম। পারাপারের জন্য অফিস পিয়ন মোবারক কোত্থেকে একচিলতে তক্তা জোগাড় করে এপার ওপার সংযোগ তৈরি করেছে। মি. দবির ইতস্তত করছিলেন পার হওয়া নিয়ে। প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া গর্ত, উপরে প্রায় বাঁশের মতো চিকন কাঠের তক্তা। মোবারক সাহস দিয়ে বলল, স্যার কোনো সমস্যা নাই। বড় স্যারও এইমাত্র হন হন করে পার হলেন।’ মি. দবির আলতো করে পা রাখলেন। বৃষ্টির পানিতে মতিঝিলের ঈষৎ লাল মাটি কিছুটা পিচ্ছিল। তিনি কাঁপা কাঁপা এক পা সামনে বাড়ালেন। পাঁচ ফুটের গর্ত মনে হলো, অনন্ত যাত্রাপথ। তারপর আর মনে নেই। জ্ঞান ফিরল হাসপাতালের বেডে। বাম কলারবোন আর চশমার ডান ডাঁট ভেঙে গেছে। ডাক্তার বাঁ হাত প্লাস্টার করে দিলেন। ১৪ দিনের বেড রেস্ট। হতাশা আর কষ্টের মধ্যেও দবির সাহেব কিছুটা খুশি হলেন আপাতত অফিসে যেতে হবে না বলে। ক্ষীণ আশা, এর মধ্যে অফিসের সামনের গর্তে হয়তো স্যুয়ারেজের পাইপ মাটিচাপা দেয়া হবে। রাস্তা কার্পেটিং হবে।

১৪ নয়, প্রায় ২৮ দিন পরে গলায় হাত ঝুলিয়ে তিনি অফিসে এলেন। বুড়ো হাড় জোড়া লাগতে সময় লাগবে। রাস্তার অবস্থা আগের মতোই। অফিসের সামনে দীর্ঘ পরিখা আর রাস্তায় সারি সারি স্যুয়ারেজ পাইপ।

বর্ষা গেল, শরৎও গেল। হেমন্তের এক বিষণ্ণ বিকেলে পরিখার স্যুয়ারেজ পাইপগুলো সমাহিত হলো। এরপর পরিখা মাটি দিয়ে ভরাট হলো। বৃষ্টিতে সে মাটি দেবে গেল। দিলকুশা এলাকার আরো অনেকের সাথে মি. দবির হাফ ছাড়লেন। যাক, আপাতত কিছু একটা তো হলো।

কয়েক দিন পর মি. দবির উদ্দিনের এলপিআরে যাওয়ার কথা। রাস্তা কার্পেটিং হবে, সুন্দর মসৃণ হবে। অথচ তখন এ রাস্তায় আর আসা হবে না। ভেবে তিনি হালকা ঈর্ষা অনুভব করলেন।

দিন যায়, মাস যায়, সবাই অপেক্ষায় আছে, কাটা রাস্তা আবার কার্পেটিং হবে। একদিন ইটের খোয়া দিয়ে খননকৃত পরিখার উপরিঅংশ ভরাট করা হলো। এবার নিশ্চয়ই কার্পেটিং হবে! এলপিআর শেষে প্রায় এক বছর পর মি. দবির উদ্দিন অফিসে এসেছেন। তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন রাস্তায় স্যুয়ারেজ পাইপ বসানোর বিষয়। অজান্তে তার ডান হাত ভাঙা কলারবোন স্পর্শ করল। অবাক চোখে তিনি দেখলেন, দগদগে ঘায়ের মতো লাল খোয়া বের হওয়া রাস্তা। এত দিনেও কার্পেটিং না হওয়ায় বিস্মিত হলেন তিনি। মতিঝিল-দিলকুশা এলাকা হলো ঢাকা শহরের রাজধানী। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়-বাণিজ্যের করপোরেট হাউজগুলোর কেন্দ্রভূমি এই এলাকা। তারই কিনা এই দশা! শুনেছেন এই রাস্তার মালিক সিটি করপোরেশন। প্রয়োজনে এই রাস্তা কেউ কাটতে চাইলে সেটি মেরামতের যাবতীয় খরচ পূর্বাহ্ণে সিটি করপোরেশনে জমা দিতে হয়। তার মানে এই রাস্তা মেরামতের খরচ করপোরেশনের কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে।

নইলে রাস্তা কাটার অনুমতি সিটি করপোরেশন দেয়ার কথা নয়। ঘটনা সত্যি না গুজব, কে জানে?

প্রায় ৩৬ বছরের চাকরি শেষে মি. দবির উদ্দিন পূর্ণ অবসরে যাচ্ছেন। এই এলাকার সাথে তার দীর্ঘ আড়াই যুগের সম্পর্ক। বুকের কোথায় যেন চিনচিন ব্যথা অনুভব করছেন তিনি। চেনা পথঘাট, দালান কোঠা, ভাসমান দোকান সব কেমন আপন মনে হয়। কত গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, শীত, বসন্তের দিনমান কেটেছে এই এলাকায়। আগামীকাল থেকে তিনি এখানে আগন্তুক। বদলির চাকরি; তবে মতিঝিল দিলকুশা করেই ৩০ বছর সময় কেটে গেল। গত শতকের শেষ দশক থেকে এ পর্যন্ত।

বিষণ্ণ দবির উদ্দিন উদ্দেশ্যহীনভাবে দিলকুশা-মতিঝিলের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে থাকলেন। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, শাপলা চত্বরে সোনালী ব্যাংক আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে স্যুয়ারেজ পাইপগুলোও এখনো সারিবদ্ধ শুয়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দরজার পাশ দিয়ে কমলাপুর স্টেশনগামী রাস্তাটা অপারেশনের রোগীর মতো ব্যান্ডেজ নিয়ে এখনো শয্যাশায়ী। দবির সাহেব জোড়ালাগা কলারবোনের ভেঙে যাওয়া হাড়ে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। ডাক্তার সাহেব বলেছেন, এ ব্যথা আরো কিছু দিন ভোগ করতে হবে।



আরো সংবাদ