০১ ডিসেম্বর ২০২০

জিনের সাথে কথা বলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

জিনের সাথে কথা বলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক - ছবি সংগৃহীত

১.
ভারতের রাজস্থান। সোনালি প্রান্তরের দেশ। রাজস্থানের ভাংড়া। রাজপুর থেকে ৮০ কিলোমিটারের পথ। এখানে সন্ধ্যা নামলে প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায় প্রবেশাধিকার। মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে- প্রিয় পাঠক? শুধু প্রশ্ন নয়, অনেকেই এমন তথ্যে ধাক্কাও খেয়েছেন।

ডাকাত বা সন্ত্রাসীদের ভয় নয়। বিষয়টা হচ্ছে জিনের উৎপাত। সন্ধ্যার অন্ধকার গ্রাস করার সাথে সাথে ওই শহরের অলি-গলি-পাড়া-মহল্লা দখলে চলে যায় জিনদের। এদের স্বাভাবিক চলাচলে ব্যাঘাত হলে রক্ষা নেই। নির্ঘাত মৃত্যু। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। সন্ধ্যার পর ওই শহরে আর কেউ প্রকাশ করতে পারে না। অনেকে দুঃসাহস দেখাতে গিয়ে আর জীবিত ফিরে আসেনি। স্থানীয়রা অবশ্য ভাংড়াকে ভূতের ঘাঁটি বলেন।

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কেউ যদি হরর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান তাহলে সোজা চলে যান রাজস্থানের ভাংড়ায়। এ বিষয়ে বন্ধুবান্ধব একে অপরকে চ্যালেঞ্জও দিতে পারেন। তবে দুর্বল হার্টের অধিকারীরা এসব বাজি থেকে দূরে থাকবেন প্লিজ।

২.
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ধর্মে বিশ্বাসী। তবে সংশয়বাদী। এর অর্থ এই নয় যে তিনি নাস্তিক। ব্যক্তিগত ও বাস্তব জীবনে ধর্মকে ধারণ করার সিদ্ধান্তে দোদুল্যমান। তার বিশ্বাসের ব্যারোমিটার আলিফের মতো স্থির নয়, পেন্ডুলামের মতো ঘূর্ণায়মান। তবে, বুদ্ধিবৃত্তিক পাণ্ডিত্যের দিক দিয়ে আমি তাকে তুলনা করি পাশ্চাত্যের রবার্ট ফিস্কের সাথে। আর দর্শনের দিক দিয়ে প্লেটোর মতো মনে হয়। (এই কমপ্লিমেন্ট আমার একান্ত, এর সাথে দ্বিমত থাকতেই পারে।)

একদিন জিজ্ঞেস করলাম, স্যার মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে কিছু কি ভাবেন?
- অতটা ভাবি না। কবরে কী হবে! দুনিয়ায় নিন্দিত কিছু করলে, এর একটা প্রতিক্রিয়া তো অবশ্যই হবে। তবে আমার মনে হয় সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সুপথে রাখতেই দোজখের বহুমাত্রিক শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন। আমার স্ত্রী ধর্মের প্রতি খুব অনুরক্ত ছিলেন। তাকে আমি খুব মিস করি।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক রাজস্থানের ভাংড়ায় যাননি কোনো দিন। ভাংড়ায় না গেলেও জিনদের (অনেকে যাদের ভূতপ্রেত বলে থাকেন) দীর্ঘ সঙ্গ পেয়েছেন ব্যারিস্টার রফিক। তার এক প্রিয়ভাজন শুভার্থী জাতীয় পার্টি জেপির নেতা মোশাররফ হোসেনের মাধ্যমে জিনদের সাথে পরিচয়। আইনের জটিল মারপ্যাঁচ আর দিনমান সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়াম। মানবিক নানা কাজের ব্যস্ততার বাইরে জিন বন্ধুদের সাথে কথা হয় তার। টেলিফোনে। কখনো বা মোবাইলে। ব্যারিস্টার রফিকের সাথে সখ্য হওয়া জিন সম্প্রদায়ের একজন মুরব্বি আছেন। তিনি চার শ' বছর বয়সী। তাকে দাদু বলে ডাকে সবাই। ব্যারিস্টার রফিকও। দাদু মক্কায় জিনের মসজিদে ইমামতি করেন।

প্রয়োজনে ব্যারিস্টার রফিক, মোশাররফ হোসেনকে ফোন দিয়ে কথা বলেন জিন দাদুর সাথে। দাদুর শিষ্য জিনদের তিনি ভাইয়া ও আপু বলে ডাকেন। দাদু অনেক সমস্যার সমাধান দিতে পারেন অনায়াসে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কেও তার ঢের ধারণা।

৩.

একবারের ঘটনা। রফিক স্যারের শরীরে তখন ভয়ঙ্কর ক্যান্সার সবে বাসা বাধতে শুরু করেছে। স্যারের স্ত্রী ডা. ফরিদা হক। তার বান্ধবী ডা. মমতাজ করিম।
পরামর্শটা মমতাজ করিমের। জিন দাদুর সাথে রফিক স্যারের ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
নির্ধারিত সময়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, মিসেস ফরিদা হক, ডা. মমতাজ করিমসহ পাঁচ-ছ’জন মানুষ প্রবেশ করলেন একটি ঘরে। সব বাতি নিভিয়ে দেয়া হলো। ঘুটে ঘুটে অন্ধার। শোঁ শোঁ আওয়াজ করে দাদু এলেন। সব সমস্যা শুনলেন। মক্কা থেকে একটি আংটি এনে দেবেন বলে জানালেন। উপঢৌকন হিসেবে মিসেস ফরিদা হক নিজের গয়না খুলে দিলেন।

কিছুদিন পর জিন দাদু আংটি পাঠালেন। মক্কা থেকে। কালো রঙের। এটা সবসময় পরে থাকার পরামর্শ দিলেন দাদু। সেই থেকে রফিক স্যার আংটিটা যক্ষের ধনের মতো আঙুলে রাখেন। দাদু বলেছেন, মৃত্যুর সময় আংটিটা হাত থেকে খুলে ফেলতে হবে। নইলে জান বের হবে না। অনেক কষ্ট হবে। আংটিটা ব্যবহারের কারণে স্যারের শরীর থেকে ক্যান্সার উধাও।

৪.
আরেকবারের ঘটনা। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের শাশুড়ি অসুস্থ হলেন। তাকে নেয়া হলো লন্ডনের বিখ্যাত হসপিটাল ক্রোমওয়েলে। বিশ্বখ্যাত ওপেন হার্ট সার্জন ডা. দেবী শেঠি তাকে দেখলেন। শেঠি জানালেন, গলায় ক্যান্সার হয়েছে। কিন্তু দাদুর শিষ্য এক জিন ডাক্তার, স্যারের স্ত্রীকে জানালেন, হসপিটালের কেবিনে আমিও দেখেছি আপনার মাকে। আসলে ক্যান্সার হয়নি তার। পরে, দাদুর নির্দেশে জিন ডাক্তার চিকিৎসা করলেন রফিক-উল হক স্যারের শাশুড়িকে। পুরো সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি। ডাক্তার দেবী শেঠির চোখ কপালে!
এভাবে অনেকের উপকার করেছেন দাদু। মাধ্যম ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক।

এরশাদ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে দাদুর সামনে নিয়ে গিয়েছিলেন রফিক স্যার। দাদুর পরামর্শে ব্রেইন অপারেশন করেন। নইলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল ব্যারিস্টার মওদুদের। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের শাশুড়িও সুস্থ হয়ে উঠেছেন দাদুর শিষ্যদের প্রেসক্রিপশনে।

৫.
এক দিনের এক চা আড্ডা। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক শুনালেন, এখন থেকে ৭০ বছর আগের এক ঘটনা। স্যারের বাবা মোমিনুল হক। সেবার তিনি পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনার মিউনিসিপ্যালিটি মেয়র পদে দাঁড়ালেন। নির্বাচনী প্রচারণার একপর্যায়ে তার পক্ষের মুসলমান দু’জন লোক গুম হয়ে গেলেন। রফিক স্যারের নানীর এক বান্ধবীর কাছে প্রতি শুক্রবার জিন আসত। গুম হওয়া দু’জন লোকের সন্ধান পেতে শুক্রবারের আগেই জিনকে হাজির করার ব্যবস্থা করা হলো। জিনটি জানালেন, হাজারীবাগ এলাকায় এক বাড়িতে ওই দু’জনকে আটকে রাখা হয়েছে। এ তথ্য পাওয়ার পর ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় তাদের।

আলাপের এ পর্যায়ে রফিক-উল হককে বললাম, স্যার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী কোথায় আছে জিনের মাধ্যমে সেটা কি জানা যায় না?
স্যার হাসলেন। জিনদের ব্যর্থতারও আরেকটি ঘটনা বললেন তিনি।

রফিক স্যারের একটা পোষা কুকুর ছিল। নাম ল্যাসি। একদিন ল্যাসি হারিয়ে গেল। জিন দাদুর শিষ্যরা জানালেন, পাশের বাড়িতে বেড়াতে আসা মেহমানরা ল্যাসিকে চুরি করে নিয়ে গেছে। এবার জিনদের তথ্য সত্য হলো না। পরে, ল্যাসিকে পাওয়া গেল পুরান ঢাকায়। উদ্ধার করেছিল স্যারের বাসার কাজের মেয়ে।
জিন দাদু একবার ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে অভিযোগ করে বসলেন।

- আপনি যখন পল্টনের বাসায় থাকেন না অথবা দেশের বাইরে যান, তখন তো আমার শিষ্যরা না খেয়ে থাকে।
এ অভিযোগের পর রফিক স্যার স্পেশাল খাবারের ব্যবস্থা করতে বললেন। স্যারের অফিসের লোকেরা দোতলায় রাজসিক খাবারের ব্যবস্থা করলেন। নির্দিষ্ট সময় পরে দেখা গেল বিন্দু পরিমাণ খাবারও নেই।
জিনের কণ্ঠটা কেমন? স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম।

- মিহি কণ্ঠ। চিকন সুর। মিনমিনিয়ে কথা বলে।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একজন বস্তুবাদী বা প্রগতিবাদী মানুষ। তার সাথে একটা জিনের দহরম-মহরম সম্পর্কের এ ঘটনা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকবে। কিন্তু যা সত্য, তা সত্যই। অস্বীকার করার জো নেই। স্বচ্ছ দীঘি বা কুমারী যৌবনাবতী নারীর মতো সত্য।

৫.
দুই নেত্রীকে একসাথে বসাবার অনেক চেষ্টাই তো করলেন। কিন্তু কই! সম্ভাবনায় গুঁড়েবালি।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক স্যার, এমন মন্তব্যে নিঃশব্দে হাসেন।
- এক কাজ করা যায় না?
- কী বলো তো ?
- আপনার ওই জিনের মাধ্যমে দুই নেত্রীকে এক টেবিলে আনা যায় না?
আবার সেই উত্তরহীন নিঃশব্দ হাসি।

একবার দেশের এক শীর্ষ নামডাকওয়ালা বাণিজ্যমানবের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আমি তখন ডান হাতের চার আঙুলে আংটি পরি। উনার ডান হাতের অনামিকায় দৃষ্টিজুড়ানো একটা আংটি দেখে প্রশ্ন করার লোভ হলো।

- কোথায় পেলেন, এই অসাধারণ আঙ্গুরি ?
- জিনের কাছ থেকে।

উত্তর শুনে ভড়কে গেলাম।
- সত্যি বলছেন তো?
- হ্যাঁ, তিন সত্যি। আমার এক জিন বন্ধু দিয়েছে।

- একটা নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে আমি অপেক্ষা করছিলাম এটার জন্য। আমার বিশ্বস্ত বেশ ক’জনকে নিয়ে। তারপর যথাসময়ে ঊর্ধমুখী শূন্য থেকে আমার টেবিলে নাজিল হয় এই আংটি। অবশ্য আমাকে “পে” করতেও হয়েছে। তবে জিন বন্ধুর পরামর্শে অন্য একজনকে।
আমি তো থ। প্রথমে এটাকে গালগল্প ভাবলাম। পরে, অনুসন্ধানে এর সত্যাসত্য বেরিয়ে এসেছিল। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সাথে জিন দাদুর এখনো কথা হয়। তবে হঠাৎ বৃষ্টির মতো, কখনো সখনো। মিসেস ফরিদা হকের মৃত্যুর পর সব কিছুই যেন ঝরা পাতা।

পুরানা পল্টনের সুদৃশ্য বাসার দহলিজে দু-একটি ফুলের গাছ। তাতে, মওসুম এলে রঙিন ফুলও ফোটে। কিন্তু রফিক-উল হকের কাছে এসব ফুল মানে রক্তক্ষরণ, ঝরে যাওয়া রঙহীন পাতা। বিবর্ণ ঘাতক স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রথম বাসরের স্মৃতিকাতর আহ্লাদি স্বপ্নে মাঝে মাঝেই ভেঙে যায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ঘুম।

৬.
কিন্তু আমাদের তো আকাশ সমান প্রত্যাশা। আমাদের রফিক-উল হক সজীব ও সবুজ থাকুন। শত বছর বেঁচে থাকুক এবং দিতে থাকুন- গণতন্ত্রের জন্য দুই নেত্রীর সংলাপের অসম্ভব কিন্তু অনিবার্য আহ্বান। জিন দাদু, প্লিজ আপনি আমাদের রফিক স্যারকে নিরন্তর জাগিয়ে রাখুন বিপ্লবী তিতুর মতো।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, আমাদের অভিভাবক। এক শ' বছর পর যখন ইতিহাস লেখা হবে, তখন ইতিহাসের কঠিন পারদে মূল্যায়িত হবে তার যথাযথ মূল্য। এই হিংসুটে সমাজে রফিক-উল হককে নিয়ে খুব একটা মাতামাতি হবেনা- এটা সবাই জানি। বরং রাজনীতির রঙ লাগিয়ে দিতে চাইবে অনেকেই। তবুও বলবো, দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে এই মানুষটি ডাহুকের মতো নিরন্তর ডেকে যাবেন। ঘুম ভাঙানি বাঁশি বাজিয়ে যাবেন।


আরো সংবাদ