২৮ অক্টোবর ২০২০

অপরাধ বা দুর্নীতি উন্নয়নে বাধা হবে না

-

‘বিশেষ করে একটা নতুন রাষ্ট্রে জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ঘুষ ও দুর্নীতি, যা আগাছার মতো সব ভালো গাছকে মেরে ফেলতে চায়। অন্য ভাষায় বলতে গেলে, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি মানুষের সদিচ্ছাকে নষ্ট করে এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর সমস্ত নীতিকে নস্যাৎ করে দেয়।’ একটা গবেষণা কর্মের উদ্ধৃতিটি এখানে পেশ করা হলো।

মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান দুর্নীতিকে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থনীতির জ্ঞানী ব্যক্তিরা দুর্নীতি, অন্যায় অবিচারকে দেখছেন আমলাতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে।

প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী মুহাম্মদ আবদুর রহিম রহ: ‘অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম’ গ্রন্থে ‘পূর্ব কথা’ শিরোনামে বলেছেন, ‘অপরাধ মানুষের অন্তর্নিহিত দুর্বৃত্তের এক কদর্য অভিব্যক্তি। মানুষ আল্লাহর সেরা সৃষ্টি হিসেবে অনেক মহৎ গুণাবলির অধিকারী। বিশেষত জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার-শক্তিতে ভূষিত হওয়ার ফলে গোটা সৃষ্টিলোকে তার মর্যাদা অনন্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ নিজের অন্তর্নিহিত দুষ্প্রবৃত্তির তাড়নায় নানা অন্যায় ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় এবং নিজকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে তার অনন্য মানবিক মর্যাদাই শুধু ভূলুণ্ঠিত হয় না, সমাজ ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও বহু ক্ষেত্রে বিপন্ন হয়ে পড়ে।

ইসলাম আল্লাহর দেয়া একমাত্র কল্যাণকর বিধান হিসেবে অপরাধমুক্ত, ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে রোগের চিকিৎসার চেয়ে তার প্রতিষেধকই হচ্ছে উত্তম ব্যবস্থা।

দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব। উন্নয়নের শুরুতে কোনো নতুন রাষ্ট্রে দুর্নীতি থাকলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে সুশাসনের অভাবজনিত সমস্যা আস্তে আস্তে রাষ্ট্র থেকে দূর হতে থাকে। দেশে দেশে উন্নয়নের ইতিহাস আমাদেরকে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তি বার্নার্ড ম্যান্ডভিল বলেছেন, একজন দক্ষ ও সৎ রাজনীতিকের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পড়লে ব্যক্তির অসততাকে তিনি কখনো কখনো সমষ্টির জন্য হিতকর করেও তুলতে পারেন।

১৯৯৫ সালে তার বিখ্যাত প্রবন্ধে সাওরো বাংলাদেশের উদাহরণ টানেন এবং উল্লেখ করেন যে, দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাপকহারে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি হারাচ্ছে। ২০০২ সালে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে দুর্নীতি না হলে প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হতে পারত। সুতরাং আমাদের কাছে একেবারে পরিষ্কার যে, দুর্নীতির জন্য বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি থেকে নিয়মিত বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ১৯৯১-২০০০ মেয়াদে ৫.৫৮ শতাংশ এবং ২০১২-২০১৯ মেয়াদে ৬.৯৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই প্রবৃদ্ধি যে খুব বেশি তা নয়; যেখানে ইথিওপিয়ার প্রবৃদ্ধি হার ২০১২-২০১৯ ছিল ৯.২৫ শতাংশ।

এনজিও কার্যক্রম ছাড়া শুধু সরকারি উদ্যোগে দেশের উন্নয়ন সম্ভব, তা বলা মুশকিল। দুর্নীতি এখন বাংলাদেশে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত, তাই দুর্নীতির কারণগুলো আমাদের সরকার, সরকারপ্রধান ও সিভিল সোসাইটির জানা ও বোঝা খুবই প্রয়োজন। দুর্নীতির কারণ জানা থাকলে তার প্রতিকার করা সহজ হয়। রোগের কারণ জানলে ডাক্তার সহজে রোগীকে সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করে সুস্থ করতে পারেন। অতি জরুরি কিছু কারণ আমরা আলোচনা করার চেষ্টা করব।

১. দেশে সরকারের অতিরিক্ত আইনকানুন, দুর্নীতি বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ হিসেবে আমাদের বোধগম্য হয়। প্রতি বছর বাজেটের পর দেখি, সরকারি বিভিন্ন দফতরে ঘুষের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কী কারণ? আমলারা বলেন, নিয়মকানুন অনেক কঠিন। স্যারকে অনেক বেশি অর্থ দিতে হবে। তাই ঘুষের পরিমাণও বাড়িয়ে না দিলে কাজ করা খুবই কষ্টকর। বিশ্বব্যাংক প্রতি বছর ব্যবসায় বাণিজ্য সহজীকরণ-বিষয়ক একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে, তাতে দেশে সরকারের আইনকানুনের প্রয়োগের কথা বেশি আসে। দেখা যাচ্ছে, যে দেশে দুর্নীতি বেশি সেসব দেশে সূচকের মান অনেক বেশি। যেমন- আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের সূচক যথাক্রমে ১৭৩, ১৬৮, ১৩১, ১০৮ ও ৬৩। অন্য দিকে যেসব দেশে দুর্নীতি কম, সেসব দেশে এই সূচকের মান ও অনেক কম। যেমনÑ নিউজিল্যান্ড ১, ডেনমার্ক ৪, নরওয়ে ৯ ও সুইডেনে ১০। মালয়েশিয়া বিগত চার দশক ধরে ব্যবসায় বাণিজ্যে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। তাদের দেশে এই সূচকের মান মাত্র ১২।

রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে এসব সূচক বিবেচনার ভার দেয়া মানে দুর্নীতি অধিক হারে করার সুযোগ করে দেয়া। এই ক্ষমতা শুধু থাকবে সংসদ সদস্যদের কাছে। সংসদে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। পরবর্তীতে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হবে। তার পর আইন প্রণয়নের আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে সংসদীয় কমিটি আলোচনা করবে। তার পরই সঠিক আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। তখন কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। দেশ উপকৃত হবে। দুর্নীতি অনেক অনেক হ্রাস পাবে। ২. দুর্নীতি বৃদ্ধির অপর বড় কারণ হচ্ছে সরকারের আকার। সরকারের আকার যত ছোট হবে, দুর্নীতিও তত কম হবে। তখন দুর্নীতি করার সুযোগ বেশ কমে আসবে। সরকারি ব্যয় বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে গেলে দুর্নীতি অনেকটাই কমে যাওয়ার কথা। তবে সরকারের আকার ছোট হলে দুর্নীতি কমবে ঠিকই, দেশে যদি প্রকৃত গণতন্ত্র বিরাজ করে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক ও আমলা রাষ্ট্রীয় সম্পদ এমন সব অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেন, যেখানে তাদের অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ সব চেয়ে বেশি থাকে। দুর্নীতিপরায়ণ আমলা ও তাদের অদক্ষ জনশক্তি প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অর্থ গচ্ছা দিয়ে যাচ্ছেন। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক ও অনুরূপ মতামত দিয়েছে। অনুৎপাদনশীল খাতগুলোতে রাষ্ট্রের সম্পদ চলে যাওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ৩. অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটা বিশাল অংশজুড়ে আছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ওপর গবেষণা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশে দুর্নীতি হ্রাস করা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে সব গবেষক এই মত দিয়েছেন। বাংলাদেশের ব্যাপারে এ বিষয়ে করণীয় সবার কাছে একেবারে সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার। ৪. অন্য দিকে বিশ্বের গবেষকগণ মতামত দিয়েছেন শ্রমবাজারে, সংসদে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে, বিভাগে নারীর অংশগ্রহণ দুর্নীতি হ্রাসে বেশ ভালো ভূমিকা রাখে। গণতন্ত্র মানব উন্নয়নে সহায়তা করে। সুশাসন ছাড়া কখনো মানব উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রে সর্বত্র সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসনের ফলে দেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেতে পারে। ৫. দেশে ও বিদেশে ব্যবসায় বাণিজ্যের সাথে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলের সুসম্পর্ক কিভাবে দুর্নীতির হাতকে প্রসারিত করে তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে।

প্রতি বছর টিআইবি এই বিষয় সুন্দর, বস্তুনিষ্ঠ, সঠিক তথ্য-উপাত্ত জাতির সামনে তুলে ধরছে। রাজনৈতিক সহযোগিতার কারণে সরকারি দলের ব্যবসায়ীরা সহজে সব সুবিধা পাচ্ছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পাচ্ছেন। সরকারি দলের ব্যবসায়ীরা সহজে, সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন। অন্য ব্যবসায়ীরা সহজে ঋণ পাচ্ছেন না। তাতে রাষ্ট্রে একটি অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্য দিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যখন ব্যবসা করে বিরাট অঙ্ক পান, তার একটা অংশ রাজনৈতিক নেতারা পাচ্ছেন। অর্থ একটি শ্রেণীর লোকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। দেশে ধনী-দারিদ্র্যের পার্থক্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্মসংস্থান ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। ৬. যেকোনো দেশের অর্থনীতি দুর্নীতিকে ব্যাখ্যা করে একটা আমলাতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থনৈতিক গবেষকরা কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্র ও জবাবদিহি, সংসদে কার্যকর বিরোধীদলের উপস্থিতি, সংবাদপত্রের সত্যিকার স্বাধীনতা, ব্যক্তির স্বাধীনতা, সব মতবাদ প্রচার করার সমান সুযোগ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন ইত্যাদি হচ্ছে সেসব হাতিয়ার বা ব্যবস্থা। শুধু তা করলে চলবে না; পুলিশ বিভাগ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, সব তদন্ত সংস্থাকে সত্যিকারার্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এসব সংস্থার নিয়োগপ্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও যোগ্যতা অনুযায়ী। কোনোরকম দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোনো নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা ঠিক হবে না। তা না হলে দেশ থেকে কোনোক্রমেই দুর্নীতি হ্রাস বা দূর করা যাবে না। ৭. দুর্নীতি নিয়ে আজকাল বেশ আলোচনা হচ্ছে। সরকার দুর্নীতি হ্রাসের জন্য নানা আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায় করার পরিপ্রেক্ষিতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওপরে উল্লিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের সাথে সাথে সরকারের বর্তমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অবশ্যই চালু রাখতে হবে। আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের বর্তমান উদ্যোগ অব্যাহত রাখা খুবই জরুরি। তা হলে অপরাধ বা দুর্নীতি উন্নয়নে কোনো বাধা হবে না।

লেখক : কলামিস্ট, শিল্প উদ্যোক্তা
[email protected]


আরো সংবাদ

ভিডিও গান দেখানোর প্রলোভনে শিশুকে গণধর্ষণ, গ্রেফতার ২ র‌্যাবের শীর্ষ কমান্ডারদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটরদের আহ্বান বিয়ের নাটক সাজিয়েও রেহায় হয়নি ধর্ষকের তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কার্টুন : শার্লি এবদোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ভালুকায় চুরি হওয়া ৭ ভরি স্বর্ণ ও আড়াই লাখ টাকাসহ আটক ৩ শায়েস্তাগঞ্জ থেকে নিখোঁজ দুই মাদরাসাছাত্র ঢাকায় উদ্ধার রামগঞ্জে অটোরিক্সার ধাক্কায় শিশু নিহত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অল্প সুদে ঋণ দেয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর করোনার দ্বিতীয় ধাপ ঠেকাতে অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করলো ইইউ সালামে জঙ্গিত্ব নেই আছে শান্তিকামনা বিএনপি শুভানুধ্যায়ীদের আজকের প্রত্যাশা

সকল