২৫ অক্টোবর ২০২০

সিজার ডেলিভারি : ক্ষতি কার?

সিজার ডেলিভারি : ক্ষতি কার? - ছবি সংগৃহীত

স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা খাতে আমাদের দেশে দুর্নীতির সীমাহীন নজির চলমান। ৯ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ৮ কোটি টাকাই লুটপাট হয়ে যাওয়ার খবর পত্রিকাতেই আসে। এখানে কী পরিমাণ দুর্নীতি আর জালিয়াতি হচ্ছে, সেটি সাহেদ-সাবরিনাদের সুবাদে করোনাকালীনও কিছুটা টের পাওয়া গেল। অন্যান্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি আর স্বাস্থ্য খাত বা চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে দুর্নীতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য আছে। অন্য খাতের দুর্নীতির ফলে একটা দেশের নাগরিক তার অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে কিছুটা বঞ্চিত থাকেন। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থায় দুর্নীতি হলে সেই দেশের নাগরিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়।

চিকিৎসা নিয়ে বা রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার নামে আমাদের দেশের মতো পৃথিবীর আর কয়টা দেশে রমরমা ব্যবসা চলে এবং রোগীর সাথে প্রতারণা করে চিকিৎসা-ব্যবসায়ীরা, ক্লিনিক-ব্যবসায়ীরা, ওষুধ-ব্যবসায়ীরা এভাবে ফুলেফেঁপে বড় হয়ে যান, সেই হিসাব কারো কাছেই ভালোমতো থাকার কথা নয়। কারণ, চরম দুর্নীতিবাজ কয়েকটা দেশ ছাড়া বাস্তবে এমন ঘটনাগুলো পৃথিবীতে কমই ঘটে।

আমাদের দেশে চিকিৎসার নামে অনেক রকমের অনিয়ম আছে। যেমন অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল টেস্ট করতে দেয়ার অভিযোগ পুরনো। রোগীকে নির্দিষ্ট কোম্পানির নির্দিষ্ট ওষুধ প্রেসক্রাইব করার অভিযোগ পুরনো। এরপর এই টেস্টগুলো ডাক্তাররা আসলে করতে দিচ্ছেন কি-না এবং নির্দিষ্ট ওষুধ নির্দেশিত ডাক্তার লিখছেন কি-না, সেগুলো মনিটরিংয়ের জন্য এখন ক্লিনিকের বাইরেও বেতনভুক্ত লোক থাকেন! রোগীকে অপ্রয়োজনে আইসিইউয়ের মধ্যে রেখে দিয়ে বিল বাড়ানোর জন্য কালক্ষেপণ করার অভিযোগও অনেক দিনের। আরো অসংখ্য অমানবিক অভিযোগও আছে। এবং এই কাজগুলোর সাথে চিকিৎসক, ক্লিনিক মালিক বা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সবারই আনুপাতিক হারে লাভের বিষয় জড়িত থাকে। অন্তত এসব ক্ষেত্রে সাধারণ রোগী বা রোগীপক্ষের কোনো হাত নেই, তারা পুরোপুরি জিম্মি।

কিন্তু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নেয়ার সময় আমরাই কিছুটা আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। সেটি হলো সন্তান প্রসবের সময় নরমাল ডেলিভারির দিকে না যেয়ে সিজারের দিকে নিয়ে যাওয়া। কিছু ডাক্তারও ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে রোগীকে সবসময় সিজারের দিকেই নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজেদেরও একটা সিদ্ধান্ত থাকে। তাই ঠিক এই পয়েন্টে আমি যাবতীয় দোষ চিকিৎসকের ওপর চাপিয়ে দিতে অনাগ্রহী বরং অন্তত অর্ধেক দোষ সংশ্লিষ্ট পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিতে আগ্রহী। নিজেকে দিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তরটা সবচেয়ে সহজ হয়। ভালো চিকিৎসকরা সবসময় নরমাল ডেলিভারির সুপরামর্শই দিয়ে থাকেন। সন্তান সম্ভবা একটা মেয়ে যখন একজন ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসাধীন থাকেন, তখন সেই ডাক্তার প্রথম থেকেই তাকে নরমাল ডেলিভারির ব্যাপারে উৎসাহ দেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে সেই মেয়েটিরও সিজার ডেলিভারি হয়। এর জন্য দায়ী কে?

বাংলাদেশে ৭০%-এর বেশি সিজার বেবি। উন্নত দেশগুলোতে এই হার ৫% এর কম। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে সন্তান জন্মগ্রহণের সময় এমন গণহারে সিজার করানোর নজির নেই। খুব প্রয়োজন হলে এবং আর কোনো বিকল্প উপায় না থাকলে শুধু তখনই সেইসব দেশের চিকিৎসকরা সিজার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু সব চিকিৎসকের মত হলো- নরমাল ডেলিভারি হলে মা যেমন সুস্থ হয়ে যেতে পারত, সিজার করলে সেটি আর কখনই সম্ভব হয় না। এরপর দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বাড়ে। কষ্ট তো বাড়েই। এত কিছুর পরেও আমাদের দেশে প্রায় সবগুলোই সিজার-বেবি হচ্ছে কেন? আমরা কথায় কথায় উন্নত দেশের রেফারেন্স দিই, তাহলে সিজারের ক্ষেত্রে আমরা আধুনিক না হয়ে পশ্চাৎপদ হওয়ার কারণ কী? যেটি স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে, যেটি উপকারী; আমরা সেটি বাদ দিয়ে তার বিপরীত এবং ক্ষতিকর কাজটি কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করে যাচ্ছি?

সিজার করাতে পারলে ডাক্তারদের কমিশন থাকে এটা জেনে এবং মেনে নিয়েই আমরা সিজার করাই। ক্লিনিক বা হসপিটাল মালিকদের মুনাফা থাকে, সেটা জেনে এবং মেনে নিয়েই আমরা সিজার করাই। কিন্তু আমাদের বোন বা স্ত্রী বা মেয়েদের শারীরিক ক্ষতি হবে এটা জেনেও এবং মেনেও আমরা কেন শখ করে সিজার করাই!
এটা তো কোনো ফ্যাশন নয়। তাহলে ক্ষতিটা কার?

স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মেয়েরা শারীরিকভাবে আনফিট এমন তো নয়। কারণ, যেই মেয়েটা ঢাকা বা চট্টগ্রাম বা কুষ্টিয়া শহরে থাকলে সিজার হতো, সেই মেয়েটাই প্লেনে উঠে, কয়েক ঘণ্টার জার্নি করে, আমেরিকা বা ইউরোপের একটা দেশে পৌঁছিয়ে গেলে সেখানে সে ঠিকই নরমাল ডেলিভারিতে যেতে সক্ষম হচ্ছে! তাহলে একই আকাশের নিচে, প্রায় একই রকম আবহাওয়ায়, আমগাছ, জামগাছ, ধানক্ষেত, নদী সবকিছু দেখতে একই রকম হওয়া দুইটা দেশে, শুধু স্থান পরিবর্তনের কারণে এতবড় ব্যতিক্রম কীভাবে ঘটছে? তাহলে সমস্যাটা কিন্তু কোনোভাবেই ওই মেয়েটির নয়, সমস্যাটি আমাদেরও, সমস্যাটি বাংলাদেশেরও।

এর সাথে জড়িত অন্য ব্যবসায়ীদের মতো ‘ক্লিনিক-ব্যবসা’ করতে নামা অর্থলোভী ব্যবসায়ীরা, এর সাথে জড়িত ওষুধ প্রোডাকশন করা ওষুধ কোম্পানিগুলো এবং সার্বিকভাবে তৈরি হওয়া একটা খারাপ সিস্টেম। দেশের পরিবেশটাই এমন, পুরো চক্রটাই এমন যে, ওই চক্রের মধ্যে সবাই কমবেশি জড়িত। তাদেরই একটি অংশ চিকিৎসকরাও। কিন্তু অন্তত সিজারের ব্যাপারে এসে আমাদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। যেই ডাক্তার অযথা সিজারে উৎসাহ দিচ্ছেন, তার কথা বাদ রাখুন, যেই ডাক্তার নরমাল ডেলিভারিতে উৎসাহ দিচ্ছেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে তাকেও যদি বলা হয়, ‘আমরা কোনো রিস্ক নিতে চাই না’; তখন ওই ডাক্তার নিজের থেকে আর কোনো সাহসে ঝুঁকি নিতে যাবেন? কারণ পরে সত্যিই যদি কোনো বিপদ হয়, তাহলে ওই রোগীর লোকজনই হামলা করবে ডাক্তারের ওপর, হামলা করবে ক্লিনিকের ওপর! এ দেশের এই বাস্তবতাও তো সবারই পরিচিত।

এ দেশের একজন অভিজ্ঞ সুচিকিৎসক তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়েদেরও চিন্তা হলো, নরমাল ডেলিভারিতে তারা যাবে না, সিজার করাবে। অভিভাবকদেরও একই চিন্তা! কোনো কোনো মেয়ে বা কোনো কোনো অভিভাবক প্রথমদিকে নরমাল ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নিলেও যখনই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়, তখন তারা আর আধাঘণ্টাও ধৈর্য ধরেন না। তারা তখন ডাক্তারদের বলতে শুরু করেন, ‘আমরা কোনো রিস্ক নেব না, সিজার করে ফেলেন!’
আমরা কয়েক ঘণ্টার বা একদিনের কষ্ট মেনে নিতে পারছি না কিন্তু কোন বিবেচনায় সারা জীবনের কষ্ট মেনে নিচ্ছি? এটা কি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হচ্ছে না?
লেখক : প্রধান নির্বাহী, কুষ্টিয়া প্রকাশন।

ইমেইল : [email protected]

 


আরো সংবাদ