১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

মানবিকতার এক জাগতিক মডেল ডা: মোকারিম

ডা: মোকারিম - ছবি : সংগৃহীত

এই পৃথিবীতে যা আজ দৃশ্যমান কাল তাই অতীত। আর অতীত মানেই ভুলে যাওয়া। তবে অবিনশ্বর তা যা আমাদের কর্ম। বাংলার আকাশে একটি লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর জন্য মহান মুক্তি সংগ্রামের তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষত সিটি স্ক্যান ও এমআরআই প্রযুক্তি প্রয়োগে রোগ নির্ণয়ের অভূতপূর্ব কৃতিত্বে তিনি থাকবেন দেশবাসীর অন্তরের মণিকোঠায়। অবিরাম ধৈর্য, চেষ্টা, সাধনা, ত্যাগ, দিনরাত অনবদ্য শ্রম দিয়ে ইবনে সিনা ট্রাস্টের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি থাকবেন আমাদেরও স্মৃতির মিনার হয়ে। 

হ্যাঁ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) ডা: আবুল মোকারিম মোহসীন উদ্দীনের কথা বলছি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১২ মে ইন্তেকাল করেন তিনি। আমরা কায়মনোবাক্যে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। সমবেদনা জানাচ্ছি তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি এবং দোয়া করছি আল্লাহ তার কবরকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দিন। আমিন। 
ডা: মোকারিমের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৯ সালে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে একই ছাদের নিচে কাজ করতে গিয়ে বহু স্মৃতি এসে কলমে ভিড় করছে। কলেবর বেড়ে যাবে চিন্তায় রেখেই দু-একটি কথা কর্মক্ষেত্রে তার সহকর্মীসহ সবার উদ্দেশে তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করছি।

ভুলব না কোনো দিন
হারিয়ে যাওয়া অতীতের সব কিছুই কিন্তু হারিয়ে যায় না। জীবনের চলার পথে এমন কিছু মানুষ দেখেছি, যাদের কথা প্রায়ই মনে পড়ে যায়। এমনই এক হারানো মানুষ আমাদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন, তিনি হলেন করোনার প্রাণঘাতী ছোবলে সদ্যপ্রয়াত ডা: আবুল মোকারিম। এ কথা ঠিক, তিনি সময়ের অনেক আগেই চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। অবশ্য মহান আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী এটাই তার যাওয়ার উপযুক্ত সময় ছিল বলে তিনি চলে গেলেন। তবে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় তিনি আরো যা করতে পারতেন বা আরো যা দিতে পারতেন তা অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেলেন। সে কারণেই আমরা বলি, তিনি সময়ের অনেক আগেই হারিয়ে গেলেন। তবে আমাদের হৃদয়ে জাগরিত রবে তার প্রাণোচ্ছল ব্যক্তিত্ব, সহজ সরল জীবনের ইতিকথা এবং কাজপ্রিয় এই অমর চিকিৎসাবিদের জীবনগাথা।

কর্মের মহিমায় অবিনশ্বর 
সিটি স্ক্যান ও এমআরআই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে রোগ নির্ণয়ে তিনি দেশকে অনেক এগিয়ে দিয়েছিলেন। পেসেন্ট ফ্রেন্ডলি ডা: মোকারিম সিটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের রিপোর্টে কখনো কোনো সংশয় দেখা দিলে রোগীকে আবারো হাজির করে ফ্রি সিটি ও এমআরআই করিয়ে ফের রিপোর্ট করে রোগীর রোগ নির্ণয় সহজ করে দিতেন। এমনও দেখেছি, এক রিপোর্ট নিয়ে বারবার গবেষণা চালিয়ে যেতেন। এই সেক্টরে তার জনপ্রিয়তার এটাই শীর্ষ কারণ। এ জন্য দেখেছি, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ডাক্তাররা রেডিওলজির সবচেয়ে জটিল রিপোর্টগুলো করানোর জন্য ডা: মোকারিমকে পাঠাতেন। কর্মক্ষেত্রে নব নব অত্যাধুনিক বিষয় উদ্ভাবন করতেন। রিপোর্টের ক্ষেত্রে নিজস্ব একটি ফরমেট ব্যবহার করতেন, যা অন্যদের চেয়ে ছিল অনন্য। রাতদিন নিরলস পরিশ্রম করে তিনি ইবনে সিনাকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন কাক্সিক্ষত মর্যাদায়।

সৎ ও ঈমানদার খাঁটি মুসলিম ছিলেন তিনি
একজন আধুনিক শিক্ষিত মানুষ হয়েও তিনি যাপন করতেন সরল-সোজা সাদাসিধা জীবন। প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় পার করতেন তিনি, তার পরও নিয়মিত জামাতের সাথে নামাজ পড়তেন। নামাজের ওয়াক্ত হলে তাকে আর কোনো কাজে আটকানো যেত না। ব্যক্তিগত জীবনে আমার দেখা মানুষের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীল পরিমার্জিত একজন মানুষ। পোশাকে-আশাকে চলনে-বলনে অমায়িক। নিয়মিত পাঞ্জাবি-পাজামা পরতেন, এভাবে তার নায়কোচিত চেহারায় ঈমানদারের অতি ঔজ্জ্বল্য আভা প্রস্ফুটিত হয়েছিল। প্রতি বছর রমজানে তিনি ছুটে যেতেন মক্কাতুল মোকররমায়। উমরার মহিমায় ব্যয় করতেন পুরো রোজার মাস। রাসূল সা:-এর মসজিদধন্য মদিনায় গিয়ে হৃদয়ভরে দোয়া করে দেশে এসে আবারো কর্মচঞ্চল হতেন। তার এ সততার ছাপ কর্মক্ষেত্রের প্রতি পরতে ছড়িয়ে পড়তো।

ইবনে সিনার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একান্ত স্বজন ছিলেন তিনি 
ডা: মোকারিমের ব্যক্তিত্ব ছিল পাহাড়সম উচ্চতায়, কিন্তু তার মনটি ছিল শিশুসুলভ সরলতায় ভরা। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ছিলেন একজন মানবিক মানুষ। দান-খয়রাত করতেন অবলীলায়, অসংখ্য মসজিদ ও মাদরাসায় দান করতেন। গোপনে দান করা পছন্দ করতেন। সহকর্মীদের যেকোনো বিপদ-আপদে ছুটে যেতেন দরদভরা ভালোবাসা নিয়ে, দিতেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। স্বভাবসুলভ সদালাপী ও মিষ্টভাষী ছিলেন, অফিসের ওয়ার্ডবয় ও ক্লিনার থেকে শুরু করে সবপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে ছিল তার সুসম্পর্ক। দেখেছি হাজার কাজের চাপ ও ব্যস্ততার মধ্যেও কেমন করে হাসিমুখে নীরবে কাজ করতে হয়। কিভাবে অধস্তন সহকর্মীদের হৃদয় নিংড়িয়ে ভালোবাসা দিয়ে কাজ আদায় করতে হয়।

বড় ভালোবাসতেন ইবনে সিনাকে 
দেশকে স্বাধীন করতে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র এবং সেই যুদ্ধে বিজয়ী বীর ছিলেন তিনি। সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে চাকরি করেছেন এবং মেজর পদমর্যাদায় থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। ইবনে সিনায় আসার আগে আরো দু-একটি স্বানামধন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করেছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ইবনে সিনা মেডিক্যাল ইমেজিং সেন্টারের চিফ রেডিওলজিস্ট হিসেবে আমৃত্যু নিরলস কাজ করে গেছেন। চাকরিবিধিতে তার একটি নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারিত ছিল, কিন্তু রোগীর প্রয়োজনে ইবনে সিনার সুনামের জন্য তিনি রাতদিন পরিশ্রম করতেন। নিজ পেশায় জ্ঞানের গভীরতা ও কোয়ালিটির প্রশ্নে আপসহীন হওয়ায় তার এমআরআই ও সিটি রিপোর্টের সিডি ওপেন করে নামীদামি বিদেশী হাসপাতালের রেডিওলজিস্টরা অবলীলাক্রমে বলে উঠতেন ইটস ওকে!

এমন একজন প্রথিতযশা মানুষের মৃত্যুতে দেশ হারাল একজন মেধাবী ও দক্ষ চিকিৎসাবিজ্ঞানীকে। আর ইবনে সিনা হারাল ট্রাস্টের অগ্রযাত্রা ও অগ্রগতির অন্যতম একজন বিশ্বস্ত শুভাকাক্সক্ষী ও সহযোদ্ধাকে। ইবনে সিনা ট্রাস্ট তার মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক আর কখনো পাবে কি না আল্লাহই তা ভালো জানেন। 
এ ধরনের ভালো মানুষের শানে জনৈক কবির এ কবিতাটিই যথাযথ উপমা-

‘‘হয়তো তাহা’ই- নয়তো তাহা’ই 
এইতো জেনেছি খাঁটি
তারই স্বর্গের আছে প্রয়োজন 
যারে ভালোবাসে মাটি।”

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, ইবনে সিনা ট্রাস্ট, ঢাকা


আরো সংবাদ