০৪ আগস্ট ২০২০

করোনা টেস্ট বিড়ম্বনার শেষ হবে কি?

করোনা টেস্ট বিড়ম্বনার শেষ হবে কি? - ছবি : সংগৃহীত
24tkt

প্রাণঘাতী করোনার ছোবলে প্রতিনিয়ত লাফিয়ে লাফিয়ে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অদৃশ্য এই শত্রুর মোকাবেলায় সবাই ‘ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি’ করছে। প্রায় ছয়টি মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও করোনার নিষ্ঠুরতা থামেনি। বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে ভাইরাসটি পাঁচ লাখের অধিক মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। করোনার ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি। সফল ভ্যাকসিন কবে আসবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও করোনাকালীন নানা সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে করোনা আক্রান্তদের বিড়ম্বনার বিষয়টি বেশ আলোচিত। 

কিছু দিন আগে চীনের একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে সফর করে গেছে। তারা উহানে করোনা নিয়ন্ত্রণের সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র বলে গেছেন : দ্রুত টেস্ট, দ্রুত শনাক্ত, দ্রুত আইসোলেশন এবং দ্রুত চিকিৎসা। তার মানে, দ্রুত টেস্ট করাতে পারলে করোনার নিষ্ঠুরতা থেকে জাতিকে রক্ষা করা কিছুটা হলেও সহজ হবে। করোনা প্রতিরোধে টেস্টের বিকল্প নেই। অথচ এ দেশে মানুষ টেস্ট করতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। এর ফলে টেস্টের প্রতি অনীহা বাড়ছে। তবে এতে বিপদ আরো প্রকট হচ্ছে। কারণ টেস্টের সুযোগবঞ্চিত রোগীরা নির্বিঘেœ ঘুয়ে বেড়ানোর ফলে আরো অনেক মানুষ সংক্রমিত হবে। প্রথম দিকে আইইডিসিআরে করোনা টেস্টের সুযোগ পাওয়া মানে কানাডায় ভিসা পাওয়ার মতো কঠিন ছিল। তখন করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইন্টারভিউ দিতে হতো। সন্তুষ্ট হলে ৪-৫ দিন পর সিরিয়াল মিলত এবং রিপোর্ট পেতে লাগত ১০-১৫ দিন। এমনও হয়েছেÑ সিরিয়াল বা রিপোর্ট পাওয়ার আগেই আক্রান্ত মানুষটি মারা গেছেন। কিন্তু মারা যাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ জেনে যেতে পারেননি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেস্ট বাড়ানোর তাগিদকে অবজ্ঞা করে ইতালি, স্পেন ও আমেরিকার মতো দেশ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। অন্য দিকে জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মুখেও টেস্ট অব্যাহত রেখেছে বলেই করোনা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট করোনা টেস্টের সংখ্যা সাত লাখ ৬৬ হাজার ৪০৭ এবং দেশে মোট ল্যাব পরীক্ষাগার চালু আছে ৬৮টি, যা করোনা মহামারীর মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় অত্যন্ত নগণ্য। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ টেস্টে বরাবরই পিছিয়ে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা তো বটেই, বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে টেস্টে পিছিয়ে আমরা। লাখের বেশি করোনায় আক্রান্ত এমন ১৮টি দেশের মধ্যে মেক্সিকোর পর সবচেয়ে কম পরীক্ষা করা হয়েছে বাংলাদেশে। জনসংখ্যার অনুপাতে টেস্টে ২১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪৭তম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ লাখে যেখানে টেস্ট হয় ৮৯ হাজার ৩৫১ জনের, সেখানে বাংলাদেশে মাত্র চার হাজার ২৯ জন। এটা সত্যিই উদ্বেগজনক।

করোনা টেস্ট এক মহাভোগান্তির নাম। কারণ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পেতে হলে এখন করোনা সাটিফিকেট জরুরি। করোনা পজিটিভ না হলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যায় না এটা ছাড়া। এ টেস্ট রেজাল্ট না পাওয়ায় অনেকে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে মারা গেছে। সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় শঙ্কায় অনেকে যান ‘ঝকঝকে, চকচকে’ বেসরকারি হাসপাতালে। অথচ সেখানে যে আলোর নিচেই অন্ধকার তা অনেকেই জানেন না। কিন্তু যখন হাসপাতাল থেকে বের হন তখন বুঝতে পারেন কোন কুয়োর মধ্যে এসে পড়েছেন। ভুতুড়ে বিলের একটি কাগজ হাতে ধরিয়ে বলা হয়, আগে টাকা পরিশোধ করুন, পরে রোগী নিয়ে যান। এ অবস্থার নিরসন আশু কাম্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে করোনা পরীক্ষাকে গুরুত্ব দিলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। যেখানে পরীক্ষা করা হচ্ছে সেখানকার পরিবেশ নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও গাদাগাদি করে লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এত দিন সরকারিভাবে বিনামূল্যে টেস্ট করা হলেও এখন হাসপাতালে ২০০ টাকা, বাসায় টেস্টের নমুনা নেয়া হলে ৫০০ টাকা রোগীকে দিতে হবে। যেখানে টেস্টের সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন সেখানে তা না করে, উল্টো ফি আরোপ করার সিদ্ধান্তটি বৈষম্যমূলক, অমানবিক ও দুরভিসন্ধিপ্রসূত। টেস্টের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। যেসব হাসপাতাল করোনা টেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে সেসব হাসপাতালে ফোনে লাইন পাওয়া যায় না। রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে শাওন নামের একজন মাকে করোনা টেস্ট করাতে গিয়েছিল। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষায় টোকেন কেন দেয়া হচ্ছে না তা জানতে চাইলে এক আনসার সদস্যের সাথে তার বাগি¦তণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তার কলার ধরে টেনে আনসার ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন এক আনসার। আরেকজন তাকে বাঁধার জন্য রশি নিয়ে আসেন। পরে পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়। তবে তারাও ঘটনার জন্য শাওনকে অভিযুক্ত করেছেন। করোনা টেস্টের ভোগান্তি আর জালিয়াতি এখন ওপেন সিক্রেট। যারা আক্রান্ত হয়ে টেস্টের সম্মুখীন হয়েছেন তারা টের পেয়েছেন ‘বিড়ম্বনা’ কী জিনিস? নিজেই করোনা টেস্ট করানোর জন্য মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন হাসপাতালে চেষ্টা করার পর যখন পারিনি তখন আমার পরিচিত জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের একজন ডাক্তারকে বিষয়টি অবহিত করলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘আগামীকাল আসুন; দেখি ব্যবস্থা করে দিতে পারি কিনা।’ একটু স্বস্তি পেলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম আরেক তেলেসমাতি। করোনা টেস্ট সেখানেও করাতে পারিনি। 

পরে বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নমুনা দিতে গেলাম; সেখানেও কোভিড-১৯ কালেকশন ফি বাবদ ৩০০ টাকা এবং ডাক্তার ফি বাবদ ২০০ টাকা আর পিসিআর বাবদ ৩৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। যেখানে সরকারি হাসপাতালে ২০০ টাকায় টেস্ট করা হয় সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে ৪০০০ টাকা ফি নেয়াটা কি জুলুম নয়? তারা তো পারতেন একটু মানবিকতার পরিচয় দিতে।

করোনা টেস্টের নামে চলছে জালিয়াতি। মুগদা এলাকা থেকে করোনা টেস্টের জাল রিপোর্ট তৈরির এক চক্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা পাঁচ হাজার টাকা দিলেই চাহিদামতো নেগেটিভ বা পজিটিভ রিপোর্ট দিয়ে দিত। জেকেজি নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের অনুমতি নিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহ করত। কিন্তু তারা নমুনা ফেলে দিয়ে ইচ্ছেমতো রিপোর্ট বানাত। এ দু’টি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের ভুয়া টেস্ট ও রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগে হাসপাতালটি সিলগালা করা হয়েছে। করোনা টেস্ট নিয়ে এই জালিয়াতিই বলে দেয় সাধারণ মানুষ কত বেশি বিড়ম্বনার শিকার।


আরো সংবাদ

হিজবুল্লাহর জালে আটকা পড়েছে ইসরাইল! (৪০৮০০)হামলায় মার্কিন রণতরীর ডামি ধ্বংস না হওয়ার কারণ জানালো ইরান (১৭৬৭১)মরুভূমির ‘এয়ারলাইনের গোরস্তানে’ ফেলা হচ্ছে বহু বিমান (১৫১৫২)আবারো তাইওয়ান দখলের ঘোষণা দিল চীন (১২২৫৮)ভারতের যেকোনো অপকর্মের কঠিন জবাব দেয়ার হুমকি দিলো পাকিস্তান (৮৯৮৮)করোনায় আক্রান্ত এমপিকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়েছে (৭৩০৫)নেপালের সমর্থনে এবার লিপুলেখ পাসে সৈন্য বৃদ্ধি চীনের (৭২৫১)তল্লাশি চৌকিতে সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু দেশবাসীকে ক্ষুব্ধ করেছে: মির্জা ফখরুল (৭১৭৪)সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা : পুলিশের ২১ সদস্য প্রত্যাহার (৬৮১৬)তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে : আবহাওয়া অধিদপ্তর (৬৪২৬)