০৮ আগস্ট ২০২০

করোনাকালীন বাজেট : একটি পর্যালোচনা

করোনাকালীন বাজেট : একটি পর্যালোচনা - ছবি : নয়া দিগন্ত
24tkt

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট (২০২০-২১) উপস্থাপিত হয়েছিল সংসদে গত ১১ জুন। এটি দেশের স্বাধীনতা-উত্তর ৪৯তম এবং এই সরকারের তৃতীয় ধারাবাহিক মেয়াদের দ্বিতীয় বাজেট। এটিকে করোনাকালীন বাজেটও বলা যেতে পারে। মহামারীর মধ্যে কেমন বাজেট ঘোষিত হয় সে বিষয়ে অনেকেরই আগ্রহ ছিল।

অনেকের মতো, প্লাস-মাইনাস রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে, মাত্র ছয় মাস আগে আত্মপ্রকাশ করা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাজেট ঘোষিত হওয়ার মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আয়োজন করেছিল বাজেটের ওপর একটি বিশ্লেষণধর্মী কনফারেন্স। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মো: মুস্তাফিজুর রহমান, সাবেক ভিসি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের প্রফেসর। প্রধান অতিথি, গবেষণায় ২০২০ সালের একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, ভিসি, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ। আলোচক, প্রফেসর ড. আবুল হাসান সাদেক, ভিসি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। গেস্ট অব অনার, প্রফেসর ড. মো: শাহ-ই-আলম, ভিসি, সিটি ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক ভিসি, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ অতিথি ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, সাবেক সিনিয়র সচিব এবং সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। বিশেষ অতিথি এ এম এম নাসির উদ্দিন, সাবেক সচিব। প্রধান আলোচক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক, কৃষি ব্যবসা ও বিপণন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। একক প্রবন্ধ উপস্থাপক এবং মডারেটর ছিলাম আমি।

করোনাকালীন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিক্ষা এই চারটি খাতের ওপর আলোচনা সীমিত রাখার চেষ্টা করি। তবে তার সাথে বাজেটের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের জন্য বর্তমান অবস্থায় ৫.৬৮ লাখ কোটি টাকা বাজেট অনেক বড় হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে মাত্র ৯ শতাংশ বেশি। তবে, বাজেটে ঘাটতি সাধারণত জিডিপি ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু এ বছর ঘাটতি রাখা হয়েছে জিডিপির ৬ শতাংশ; টাকার অঙ্কে যা ১.৯০ লাখ কোটি। অধিকন্তু, এই ঘাটতির ৮৪ হাজার কোটি দেশীয়ও ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এপ্রিল মাসে টাকা এক লাখ কোটি প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে যার পুরোটাই অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ থেকে সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। এটি ব্যাংক সেক্টরের ওপর একটি চাপ, অধিকন্তু, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমে দেশের উৎপাদনের ওপর চাপ পড়বে। বাজেটে ৮.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে, যেখানে চলতি অর্থবছরে একই প্রবৃদ্ধি টার্গেট ধরা হলেও করোনার কারণে তা সংশোধন করে ৫.৩ শতাংশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক তার জুন মাসের রিপোর্টে বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে ১.৬ শতাংশ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র ১.০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে রিপোর্ট করেছে।

প্রফেসর ড. আবুল হাসান সাদেক আলোচনায় বিশ্বে একটি মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার চেয়ে দেশের জাকাত উত্তোলন করে সামাজিক নিরাপত্তাসহ বাজেটের জাকাতযোগ্য খাতে সাপোর্ট দেয়া যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, দেশে ট্যাক্স-ক্রেডিট পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিটি হলো, জাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া এবং ব্যক্তি যে পরিমাণ জাকাত দেবে, সেই পরিমাণ টাকা ট্যাক্স থেকে কম নেয়া। এতে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা কমবে। কারণ মানুষ জাকাত দেয়ার পর আবার পূর্ণ ট্যাক্স দিতে চায় না। এ ছাড়াও কৃষকদের প্রণোদনা এবং ভোক্তাদের জাকাতের আওতায় আনা যেতে পারে।

প্রধান আলোচক প্রফেসর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মহামারীকালীন বাজেটে ব্যয় বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়নই সঠিক তবে সে ক্ষেত্রে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। জিডিপির ৬ শতাংশ ঘাটতি বাজেট স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও এ বছরের জন্য বেশি নয়। তবে, রাজস্ব আদায় ঠিকমতো না হলে এই ঘাটতি আরো বেড়ে ঋণ/জিডিপি অনুপাত আরো বেড়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, ব্যাংকের ওপর এত ঋণের চাপ দিয়ে আবার ডিপোজিটরের ওপর আবগারি শুল্ক চাপানোয়র ফলে ডিপোজিট কমে যাবে। ফলে ব্যাংক দ্বিমুখী চাপে পড়বে। তিনি বলেন, করোনার মাত্র তিন মাসে বাজারজাতকরণের সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকা শস্য খাতে এবং প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা মৎস্য, পোলট্রি এবং পশুসম্পদ ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কৃষির পণ্যের উৎপাদনে যতটা সমস্যা, বিপণনে সমস্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।

বিশেষ অতিথি নাসির উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্য খাতে ২৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বেশি হলেও বর্তমান মহামারীর তুলনায় বেশি নয়। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় গতবারের ৪.৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে মাত্র ৫.৩ শতাংশ করা হয়েছে যা খুবই কম, এমনিকি মুদ্রাস্ফীতি হিসেবে আনলে প্রকৃত অর্থে বরাদ্দ বাড়েনি। তিনি বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে করোনা চিকিৎসা মোকাবেলায় বাংলাদেশের চিকিৎসা সেক্টরের প্রকাশিত দুর্বলতা, দুর্দশা এবং দুর্নীতির কথা তুলে ধরে এর প্রতিকারের উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দেন।

বিশেষ অতিথি ড. আবদুল মজিদ বলেন, বাজেটের ২৬৬ স্থানে কোভিড-১৯ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ বাজেটে এ জন্য বরাদ্দ দেখে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। বাজেট প্রণয়ন করার পর সংশোধন করতে হয় পরবর্তী বাজেট প্রণয়নের সময়। অথচ ইন্দোনেশিয়ায় করোনা শুরু হওয়ার পর তিন মাসে চারবার বাজেট সংশোধিত হয়েছে। গত তিন মাসের করোনার প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.২ থেকে কমিয়ে ৫.৩ শতাংশ করা হয়েছে। অথচ করোনার প্রভাব এখনো বাড়ছে। তাহলে আবারো জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ ধরা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এখন উন্নয়ন নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা। সুতরাং অত্যন্ত জরুরি খাতের ব্যয় বাড়িয়ে অন্যান্য কম জরুরি এমনকি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন খাতে ব্যয় কমিয়ে জনগণকে সহযোগিতা করতে হবে এবং বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে। জনপ্রশাসন খাতে ব্যাপক বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটাত লুটপাটের বরাদ্দ, এটা দেশের কোনো উপকারে আসে না। রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে অতীতে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড রয়েছে, সে ক্ষেত্রে মহামারীর মধ্যে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খুবই অবাস্তব। ১০ শতাংশ হারে ট্যাক্স দিয়ে কালো টাকা সাদা করার ঘোষণা টাকা কালো করাকে উৎসাহ দেবে। অধিকন্তু, যারা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দেন, তাদের সাথে প্রহসন করা হবে।

প্রফেসর ড. শাহ-ই-আলম বলেন, কৃষির অনেক সাব-সেক্টরের উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্ব র্যাংকিংয়ে। আরো ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে, কৃষি লাভজনক করে কৃষক বাঁচাতে হবে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং মাঠপর্যায়ে সোলার এনার্জির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এ খাতে সরকার এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন যা প্রশংসনীয়। শস্যবীমা চালুর বিষয়েও তিনি তাগিদ দেন। 

প্রধান অতিথি ড. মো: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এবারের বাজেট মহামারী মোকাবেলার কারণে ঘাটতি বেশি রাখা খুবই স্বাভাবিক; তবে ঘাটতি বাড়িয়ে হলেও মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত খাতে ভর্তুকি দেয়া প্রয়োজন। বাজেট ঘোষণায় স্বাস্থ্য ও কৃষি সেক্টরে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হলেও, প্রতিবারেরই জনপ্রশাসনে বরাদ্দ অনেক বেশি থাকে, এবারে তা মোট বাজেটের ৩২ শতাংশ। এমনকি প্রতিরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলার বরাদ্দ হিসেবে আনলে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ৪২ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দের প্রবৃদ্ধি ২৯ শতাংশ; অথচ জনপ্রশাসন খুবই ছোট সেক্টর। বলেন তিনি, বছর বছর কালো টাকা সাদা করার ধারা অর্থনীতিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলছে। সভাপতি সমাপনী বক্তব্যে সব আলোচকদের ধন্যবাদ দিয়ে তাদের আলোচনায় সহমত প্রকাশ করেন। তিনি বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে ভূমিকা রাখার তাগিদ দিয়েছেন।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

email: [email protected]


আরো সংবাদ

প্রদীপের অপকর্ম জেনে যাওয়ায় জীবন দিতে হয়েছে সিনহাকে? (২৯৬২৮)মেজর সিনহা হত্যা : ওসি প্রদীপ, ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীসহ ৭ পুলিশ বরখাস্ত (৮২৪৭)পাকিস্তানের বোলিং তোপে লন্ডভন্ড ইংল্যান্ড (৬৬৩৩)জাহাজ ভর্তি ভয়াবহ বিস্ফোরক বৈরুতে পৌঁছল যেভাবে (৬২৩৭)আয়া সোফিয়ায় জুমার নমাজ শেষে যা বললেন এরদোগান (৫৯২২)অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে কড়া বিবৃতি পাকিস্তানের, যা বলছে ভারত (৫৬৪৪)নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দিলেন মাহাথির (৫৫৬১)সাগরের ইলিশে সয়লাব খুলনার বাজার (৫০৩২)কানাডায়ও ঘাতক বাহিনী পাঠিয়েছিলেন মোহাম্মাদ বিন সালমান! (৫০২২)এসএসসির স্কোরের ভিত্তিতে কলেজে ভর্তি হবে শিক্ষার্থীরা (৪৯৭৩)