০৭ জুলাই ২০২০

আল কুদস দিবস : মুসলমানদের জাগরণের দিন

আল কুদস দিবস : মুসলমানদের জাগরণের দিন - সংগৃহীত

কুদস অর্থ পবিত্র। আর ‘আল কুদস’ বলতে বোঝায় ফিলিস্তিনের পবিত্র নগরী বায়তুল মোকাদ্দাসকে। এই নগরী জেরুসালেম নামেও পরিচিত। অগণিত নবী-রাসূলের স্মৃতিধন্য পূণ্যভূমি এটি। এই শহরেই রয়েছে মুসলমানদের প্রথম কিবলা মসজিদুল আকসা। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র মেরাজ বেহেশতি বাহন বোরাকে চড়ে শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। পবিত্র আল-কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত- যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’ (সূরা আল ইসরা : ১)

এখানে মসজিদে আকসার চারদিক বলতে জেরুসালেম শহরকেই বোঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল কুদসের (জেরুসালেম) এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে একজন নবী সালাত আদায় করেননি বা কোনো ফেরেশতা দাঁড়াননি।’ (তিরমিজি) মুসলমানদের কাছে জেরুসালেম শহরটি আল-কুদস নামেও পরিচিত। যে তিনটি মসজিদের উদ্দেশে ইবাদতের নিয়তে সফরের অনুমতি আছে, তার মধ্যে একটি হলো আল-আকসা মসজিদ। বাকি দুটি হলো- মসজিদে হারাম (মক্কা) ও মসজিদে নববী (মদিনা), (বুখারি ১১৮৯; মুসলিম : ১৩৯৭)।

এর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ঘরে নামাজ পড়লে এক গুণ, মসজিদে ২৫ গুণ, মসজিদে নববী ও আকসায় ৫০ হাজার গুণ, মসজিদে হারামে এক লাখ গুণ সওয়াব।’ (ইবনে মাজাহ)।

মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর প্রায় ১৬ মাস মসজিদুল আকসার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। তাই বায়তুল মুকাদ্দাস দুনিয়ার অন্য অনেক ভূখণ্ডের মতো কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়। বায়তুল মুকাদ্দাস ও তার আশপাশের এলাকা তথা সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখণ্ড বহু নবী-রাসূলের (আ.) স্মৃতিবিজড়িত হওয়ায় কোরআন মজিদে এ পুরো ভূখণ্ডকে ‘আরদে মুকাদ্দাস’ বা ‘পবিত্র ভূমি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং মসজিদুল আকসা, বায়তুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন- এ পবিত্র নামগুলো মুসলমানদের ঈমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই মসজিদুল আকসা, বায়তুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিনের প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত।

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইয়াকুব (আ.) ফিলিস্তিনের জেরুসালেম নামক স্থানে ‘আল আকসা’ মসজিদটি নির্মাণ করেন। পরে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর বংশধর হজরত সুলায়মান (আ.) তা পুনর্নির্মাণ করেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই পবিত্র মসজিদ আজ মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপের ক্রুসেডার খ্রিস্টানরা সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে নেয়ার পর বায়তুল মুকাদ্দাসের বিভিন্ন ইসলামি স্থাপনায় পরিবর্তন আনে। এরপর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে সালাহ উদ্দীন আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে আবারো মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন।

তবে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানকার মুসলমানদের ওপর বিপদ নামতে শুরু করে। ইহুদিবাদীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো শুরু করে। তাদের অত্যাচারে জর্জরিত আরবরা জীবন বাঁচাতে দলে দলে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। এ সত্ত্বেও তখনও বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের দখলে ছিল। কিন্তু আরবদের দুর্বলতার মুখে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তা মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ দীর্ঘদিন ধরে তাদের আবাসভূমি ও আল-কুদস (বায়তুল মুকাদ্দাস) উদ্ধারের জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের সংগ্রামে দিশেহারা হয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে ভাঙন ধরানোর জন্য ফিলিস্তিনের একটি ক্ষুদ্র অংশে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে কিছুসংখ্যক নেতাকে আপসকামী ভূমিকায় নিয়ে আসে।

তথাকথিত শান্তি আলোচনার সুযোগে তারা একে একে ফিলিস্তিনের প্রকৃত সংগ্রামী নেতাদের হত্যা করে চলেছে এবং ফিলিস্তিনের নতুন নতুন এলাকা দখল করে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। গত ৬ মে ২০২০ অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে আরো ৭ হাজার অবৈধ ইহুদি বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইলের সরকার। আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ সত্ত্বেও ইসরাইল এই বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন করে। পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে নতুন এই বসতি নির্মাণ করা হবে।

তবে এই বসতি নির্মাণের মধ্যেই থেমে নেই ইসরাইলের এই অবৈধ দখলদারিত্ব। তারা এখন ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরকেই ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। অধিকাংশ মুসলিম দেশ এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। গত ৭ মে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, ১৯৬৭ সালে দখল করা জর্দান উপত্যকাসহ ফিলিস্তিনের যেকোনো অংশ ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেয়ার পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনি জাতির বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচনা করা হবে। ইসরাইলের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করতে এবং আন্তর্জাতিক প্রস্তাবনা মেনে চলতে আমেরিকার প্রতিও আহ্বান জানান আরব লিগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।

ফিলিস্তিন সমস্যার শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও তাদের সহযোগীরা কখনো সরাসরি, কখনো জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ‘শান্তি শান্তি’ খেলা খেলেছে। আর চক্রান্তকারী ইহুদিরা নতুন নতুন নীল নকশা নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাই আজ সময় এসেছে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বিশ্বের সকল মানবতাবাদী মানুষকে এ সংগ্রামে সর্বাত্মক সমর্থন জানাতে হবে। কারণ ফিলিস্তিনের ইস্যু কেবল মুসলমানদের ইস্যু নয়, এটি একটি মানবতাবাদী ইস্যু।

ফিলিস্তিন সমস্যা ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের সমস্যা নয়। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পূর্বে ফিলিস্তিনে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টানরা একত্রে শান্তিতে বসবাস করছিল। যখন ইসরাইল ফিলিস্তিন দখল করে তখনই ফিলিস্তিন সমস্যা তৈরি হয়। ইসরাইল ফিলিস্তিন ইস্যুকে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। এ কারণেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেইনি (র.) এটিকে সারা বিশ্বের মুসলমানদের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে মসজিদুল আকসাসহ সমগ্র ফিলিস্তিনের মুক্তির লক্ষ্যে রমজান মাসের শেষ শুক্রবার ‘বিশ্ব কুদস দিবস’ ঘোষণা করেন। তিনি ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বিষাক্ত টিউমার বা ক্যান্সার বলে অভিহিত করে ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অধিকারের প্রতি সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার জন্য রমযানের শেষ শুক্রবারে নানা কর্মসূচি, অনুষ্ঠান ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন ঘোষণার আহ্বান জানান।

বিশ্ববাসী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব তার এই আহ্বানে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং এই দিনকে কুদস দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। এই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনিদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত রাখা এবং ইসরাইলের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। তাই মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ইহুদি শাসন, শোষণ, নিপীড়ন ও তাদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের অবসান ঘটানো এবং বায়তুল মোকাদ্দাসকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনি জাতির নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ মজলুমের ওপর আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর আগ্রাসন মোকাবেলায় বিশ্বের সকল মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এ দিবস।

 


আরো সংবাদ