০৩ জুন ২০২০

সমকালীন বিশ্বে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে

-

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বাইরে মানুষের জনপ্রিয়তা বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়, তা হলোÑ দেশের শাসক ও সমাজপতি কোন শ্রেণীর? সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী বিনোদনপ্রিয় সমাজের শাসক ও সমাজপতি আয়েশি লোকদের কাছে এন্টারটেইনাররা জনপ্রিয়। আর সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মীয় সমাজব্যবস্থায় যথাক্রমে পরিশ্রমী এবং ধর্মীয় নেতারা জনপ্রিয়। ইসলাম ধর্ম পরিশ্রমী লোকদের মর্যাদা দিয়ে থাকে। কারণ আল্লাহর নবী-রাসূলরাও নিজেরা পরিশ্রম করে জীবকা নির্বাহ করতেন। সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী সমাজে একটি বিরাট পরগাছা শ্রেণী আছে যারা শ্রমবিমুখ এবং আমোদ-ফুর্তিতে অভ্যস্ত। এই শ্রেণীর লোকেরা বাইজি নাচিয়ে আমোদ-ফুর্তিতে ব্যস্ত থাকে। পুঁজিবাদী শ্রেণীর লোকরাও তাই। এসব আয়েশি লোককে যারা আনন্দ দেয় তাদের কাছে ওরাই মর্যাদাবান এবং জনপ্রিয়। এ সব এন্টারটেনারদের মধ্যে আছে বাইজি, ক্রীড়াবিদ, গায়ক-গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রমুখ। এদের এরা সমাজের আদর্শ বলে বিবেচনা করে থাকে। এমন সমাজে একটা প্রবাদ আছে : ’বেস্ট অব অল বিজিনেস ইজ শো বিজিনেস’। সমাজতান্ত্রিক সমাজে ক্রীড়াবিদ, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকাদের মূল্য আছে; তবে শ্রমিকের মর্যাদা বেশি। দেশ ও সমাজ গঠনে শ্রমিকদের অবদানের কথা তারা পুঁজিবাদী সমাজের তুলনায় কমই ভুলে যায়। ইসলামী ব্যবস্থায় সমাজ গঠনে ধর্মীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং সামন্ত-পুঁজিবাদী-সমাজতান্ত্রিক সমাজের মতো আমোদ-ফুর্তিকে নিরুৎসাহিত করা হয়।

মোগল ও ব্রিটিশ আমলে সামন্তপ্রভু ও রাজা-বাদশাহরা বাইজি নাচাতেন। অনেক ক্ষেত্রেই ঘরের স্ত্রীর তুলনায় এদের কদর বেশি ছিল তাদের কাছে। মোগল বাদশাহ আকবর তার পুত্র সেলিমের প্রেমিকা বাইজি আনারকলির নামে লাহোরে ’আনারকলি’ বাজার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন যা আজো বর্তমান। বাদশাহ শাহজাহান নিজ স্ত্রীর সমাধি তথা সে যুগের সপ্তম আশ্চর্যের একটি তাজমহল নির্মাণ করে গেছেন যা আজো বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে এক দর্শনীয় বিষয়। সেকালে দেশব্যাপী বাইজিদের বেশ নামডাক ছিল। ব্রিটিশ আমলেও তাই। ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশের লাখনৌয়ের বাইজিরা সেকালে বিপুল পরিচিতি অর্জন করেছিল। যাদের শ্রমে এদের আরাম-আয়েশ, তাদের প্রতি এদের ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধও ছিল না। জনশ্র“তি এরূপ যে, তাজমহল যে সব শ্রমিক নির্মাণ করেছিলেন তারা যেন অনুরূপ অনন্য সৌধ পুনরায় নির্মাণ করতে না পারেন সে জন্য তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দেয়া হয়েছিল। অধিকন্তু তাজমহল যেসব স্থপতি নকশা করেছিলেন এবং শ্রমিকরা নির্মাণ করেছিলেন ইতিহাসে সে সব নকশাকার ও শ্রমিকদের কারো উল্লেখ নেই, তবে এর ‘নির্মাতা’ হিসেবে উল্লেখ আছে এর নির্মাণে অর্থ জোগানদার সম্রাট শাহজাহানের নাম। তিনি এর নির্মাণ উপকরণের একটি কণাও ছুঁয়ে দেখেননি। অথচ মধ্যযুগে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে স্থপতি সিনান নির্মিত মসজিদের নাম সিনানের নামেই নামকরণ করা হয়েছে।

আধুনিককালেও ভারতবর্ষের তিনটি দেশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এন্টারটেইনারদের কদর বেশি। সম্প্রতি তুলনামূলকভাবে পাকিস্তান বাদে ভারত ও বাংলাদেশে এটা বেশি। পাকিস্তানে সমাজ গঠনে ধর্মীয় নেতাদের কদর ও সম্মান অপেক্ষাকৃত বেশি। অন্যদিকে, ভারত ও বাংলাদেশে এন্টারটেইনারদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রচার কাজে বেশ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ভারত ‘সাফাই’ আন্দোলনে বলিউড সুপার স্টার অমিতাভ বচ্চন খুব সমাদৃত। প্রথম ভারতীয় অভিনেতা হিসেবে লন্ডনের তুসো মিউজিয়ামে ২০০০ সালে অমিতাভ বচ্চনের মোমের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে এবং পরে নিউ ইয়র্ক, হংকং, ব্যাংকক, ওয়াশিংটন ডিসিতে এর শাখায়ও তার মোমের মূর্তি স্থাপন করা হয়। এ ছাড়াও টেলিভিশনের নানা বিজ্ঞাপনে এবং বিনোদনে আরেক বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এমন আরো অনেক উদাহরণ টানা যায়। এসবের কারণ আধুনিককালে এসব এন্টারটেইনারদেরই সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী, অর্থাৎ ভোগবাদী সমাজে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনে করা হয়। আরো আছে ক্রিকেট ও সঙ্গীত জগতের ব্যক্তিত্ব। তাদের কদরও কম নয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকারা, ক্রিকেট স্টার সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বলে এখানে সমাদৃত। ভোগবাদী সমাজে এরাই হিরো এবং হিরোইন। কারণ রাষ্ট্রীয় কর্ণধারা ভোগ-বিলাসে অভ্যস্ত। এটাই তাদের কাছে আধুনিকতা। ধর্মীয় সংস্কৃতি বাদ দিয়ে বিনোদন সংস্কৃতির প্রাধান্য বিস্তার একালে ব্যাপক। বর্তমানের নাগরিকদের প্রধানত এসব এন্টারটেইনারদের অনুসরণ করতেই শেখানো হচ্ছে।

বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানের সাথে বিশ্বখ্যাত ইসলাম ধর্ম বিশেষজ্ঞ ডা: জাকির নায়েকের এক সাক্ষাৎকারে শাহরুখ খান স্বীকার করেছেন, নাচ-অভিনয় হারাম। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, সমাজদেহ থেকে অনাচার-ব্যভিচার নিরসনেও এন্টারটেইনারদের উপদেশ, নির্দেশ ও পারফরম্যান্সের ব্যবহার দেদার। সামাজিক অনাচার নিরোধে যেখানে ধর্মীয় উপদেশ জরুরি, সেখানে এসব এন্টারটেইনারকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এককালের হলিউড তারকা রক্ষণশীল রোনাল্ড রিগ্যান যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম প্রেসিডেন্ট (১৯৮১-৮৯)। পাকিস্তানের ক্রিকেট সুপারস্টার ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তার আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা বুশরা বিবিকে বিয়ে করেছেন।

পাশ্চাত্য সমাজে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের খ্যাতির তুলনায় মূকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের জনপ্রিয়তা বেশি। সাধারণ লোক আইনস্টাইনের নাম জানে না এবং তাকে বুঝে না, কিন্তু চার্লি চ্যাপলিনের ভাঁড়ামিতে তারা আনন্দিত, যে কারণে তার জনপ্রিয়তাও বিপুল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রশাসন মার্কিন কৌতুকাভিনেতা বব হোপ প্রমুখ অভিনেতা ও জনপ্রিয় গায়ক-গায়িকাদের যোদ্ধাদের বিনোদনের জন্য ভিয়েতনাম পাঠাত। তবে পাশ্চাত্য জগতে নির্মাতাদের কদরও উপেক্ষিত নয়, যেমন প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নামকরণ হয়েছে এর নির্মাতা প্রকৌশলী গুস্তাফ আইফেলের নামে। অথচ বাংলাদেশে বড় বড় স্থাপনার নামকরণ হয় সাধারণত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নামে যারা এসব স্থাপনা নির্মাণের নির্দেশ ও রাষ্ট্রীয় অর্থ জোগান দেয়া ছাড়া এসবের সাথে আদৌ জড়িত নন। শুধু তাই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় এসব স্থাপনা নির্মাণে বিদেশী অর্থদাতা দেশের নামেও নামাকরণ করা হয়। উপেক্ষিত হয় এসব স্থাপনার নকশাকার ও প্রকৌশলীদের নাম।

হলিউড সুপারস্টার ক্লার্ক গেবল, পিটার ও’টুল, ওমর শরীফ প্রমুখ অভিনেতার নাম বাংলাদেশসমেত বিশ্বের যাবতীয় বিনোদনপ্রিয় লোকের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু বিশ্বখ্যাত স্টিফেন্স হকিন্সের মতো বিজ্ঞানীদের নাম খুব কম লোকই জানেন। অভিনেত্রী সোফিয়া লোরেন, মেরিলিন মনরো, এলিজাবেথ টেলর, ব্রিজিটি বার্দোত প্রমুখের নাম জগদ্বিখ্যাত কিন্তু বিজ্ঞানী মাদাম কুরি, মানবসেবিকা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, মাদার তেরেসা প্রমুখের নাম সীমিত সংখ্যক লোকই জানেন। এর কারণ প্রথমে যেমন বলেছি, এন্টারটেনাররাই আয়েশি বিনোদনপ্রিয় পরগাছা শ্রেণীর প্রিয়।

সত্তরের দশকের শেষার্ধে ঢাকার তিতুমীর কলেজে শিক্ষকতাকালে দেখেছি- প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে ব্রিজিত বার্দোতের ফটো শোভা পাচ্ছিল, তবে কোনো প্রাণিবিজ্ঞানীর ফটো সেখানে ছিল না। ষাটের দশকের শেষার্ধে যখন করাচির পিআইডিতে কর্মরত, ছিলাম তখন দেখেছি- কেমব্র্্িরজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত এক ঊর্ধ্বতন অর্থনীতি গবেষণা কর্মকর্তার অফিসকক্ষে তার টেবিলের সামনের দেয়ালে এক ব্রিটিশ ব্যালে শিল্পীর অর্ধোলঙ্গ ফটো শোভা পাচ্ছে, কিন্তু সে কক্ষে কোনো অর্থনীতিবিদের ফটো দেখিনি। তবে ডিরেক্টরের কক্ষে জাতির পিতার ফটো ছিল।

বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে যাত্রাভিনয় হয়। সারা রাত জেগে সাধারণ মানুষ তা উপভোগ করে। এসব যাত্রাপালার অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের মনে যে দাগ কাটে কোনো ধর্মবেত্তার ধর্মাদেশ তেমন দাগ কাটে না। ভারতীয় চিত্রাভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের পাবনার ঘরবাড়ি উদ্ধারের জন্য পাবনার মানুষ যে সংগ্রাম করেছে, বিক্রমপুরের বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর ঘরবাড়ি উদ্ধারের জন্য সেখানকার মানুষ তা করেনি। এমনি অনেক উদাহরণ টানা যায়। রাসূলে করিম সা:-এর অব্যবহিত পূর্ববর্তী কবি ইমরুল কায়েসের নাম অনেক শিক্ষিত লোকই ভোলেননি। ইসলাম ধর্মের প্রতি যাদের আগ্রহ ও অনুরাগ কম তাদের কাছে ইমরুল কায়েস অত্যন্ত সমাদৃত। এমনকি কাফিরদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর কালাম পবিত্র কুরআন শরিফের লেখক হিসেবেও ইমরুল কায়েসের নাম উচ্চারণ করে থাকে। নাস্তিকরা ইসলাম ধর্মের প্রচারক রাসূলে করিম সা:-এর তুলনায় কার্ল মার্কস, শেক্সপিয়র এবং রবিঠাকুরকে অধিক মূল্য দিয়ে থাকে। এ জাতীয় লোকের সংখ্যা পৃথিবীতে রাসূলে করিম সা:-এর অনুসারীদের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। মোট কথা, ইহজাগতিক লোকদের কাছে বিনোদন জগতের চরিত্ররা এতই জনপ্রিয় যে, পরকালের পাথেয় অন্বেষণকারীদের জনপ্রিয়তা তাদের কাছে ম্লান। সেই সাথে ধর্মাচার ও ধর্মবেত্তাদের প্রভাব পৃথিবীতে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিশ্বে যারা ধর্মকর্ম করেন, বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করেই তাদের তা করতে হচ্ছে। 

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
ও ভাইস প্রিন্সিপাল, মহিলা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা


আরো সংবাদ