২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

করোনা সঙ্কট শুধু কি চিকিৎসাব্যবস্থা

করোনা সঙ্কট শুধু কি চিকিৎসাব্যবস্থা - সংগৃহীত

এক অদৃশ্য শক্তি করোনাভাইরাস সংক্রমণে আজ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রকে মহামারীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কত দিনের এই সংগ্রাম, কারো মাঝেই কোনো রকম স্পষ্ট ধারণা নেই। করোনাভাইরাস অর্থাৎ কোভিড-১৯ ইস্যুতে ইতোমধ্যে পরাশক্তির বিতর্ক শুরু হয়েছে। বাক যুদ্ধ চলছে। এর দায় কার? আর কিভাবে হবে সমাধান? বাংলাদেশেও চিকিৎসাব্যবস্থাপনা নিয়ে দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে। অবশ্য এর একটি যৌক্তিক কারণও আছে। স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র ‘মালদ্বীপ’, যে রাষ্ট্রটি জিডিপির ৯.০৩ শতাংশ ব্যয় করে জনস্বাস্থ্য খাতে। ৫.৫৫ শতাংশ ব্যয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে নেপাল। ভারতের চেয়ে শ্রীলঙ্কার ব্যয় বেশি ৩.৮১ শতাংশ। সেখানে ভারতের ব্যয় ৩.৫৩ শতাংশ। সবচেয়ে শোচনীয় বাংলাদেশে জিডিপির ২.২৭ শতাংশ ব্যয় নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাত চলছে। আর ২.৯০ শতাংশ আছে পাকিস্তানের।

আমাদের সরকার বছর বছর লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। মন্ত্রী-এমপিরা গলার আওয়াজ উঁচু করে বলে বেড়ান গত বছর এত লাখ কোটি টাকার বাজেট ছিল। এ বছর আমরা এত লাখ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। এই হলো আমাদের উন্নয়ন। বিগত ১২ বছরে যত উন্নয়নের আওয়াজ তার সামান্য গুণগত পরিবর্তন হয়নি। এর বড় প্রমাণ বর্তমানে বাস্তব চিত্রটা নাগরিকরা উপলব্ধি করেছেন। গেল বছর ডেঙ্গু মশার সংক্রমণে চিকিৎসাব্যবস্থার নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থা দেখেছেন দেশবাসী।

নাগরিকদের যে ক’টি মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের রক্ষা করার দায়দায়িত্ব এর মধ্যে অন্যতম খাদ্য ও চিকিৎসা। খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, অতীতেও ছিল। চিকিৎসার অভাবে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে মহামারী দেখা দেয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা নিয়ে নানাভাবে দোষ দেয়া হচ্ছে ডাক্তারদের, নার্সদের। অথচ মূলত এই দায় রাষ্ট্রের অর্থাৎ সরকারের ব্যবস্থাপনার। ২৭ এপ্রিল বিবিসি বাংলার অনলাইন সংস্করণে প্রধান সংবাদ শিরোনাম ছিল ‘সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশে এত বিভ্রান্তি কেন’। তার পরও এখনো সময় আছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর দমন-পীড়ন বাদ দিয়ে জাতীয় সঙ্কটে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার।
রাষ্ট্রে যেকোনো সঙ্কট আসুক, তা ঘনীভূত হওয়ার আগেই মোকাবেলা করতে সমাধানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিকল্প নেই। একটি সঙ্কট জন্ম নেয়ার পর থেকে সঙ্কট ঘনীভূত হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের নেতৃত্বের অংশটি বেশির ভাগ সময়ই প্রধান দুই দলের মতাদর্শগত সঙ্ঘাত হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। যা এখন অতীব জরুরি। সরকার আর বিরোধী দলের মতাদর্শ সঙ্ঘাতের মধ্যে যৌক্তিক কথাটা তুলে ধরতে পারেন নাগরিক সমাজের নেতারা। নিপীড়নমূলক সমাজের মধ্যেও নাগরিক সমাজের নেতাদের মান-অভিমান ভুলে এই সঙ্কটে এগিয়ে আসতে হবে। গোটা দেশে সামগ্রিক সঙ্কট মুহূর্তের কর্মকাণ্ডের মধ্যে জনগণের কোনো অধিকার এখন পর্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। জনগণের ন্যায্য অধিকারের বিষয়গুলো প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে কতটুকু মনোযোগী? ক্ষমতাসীন দল জাতীয় সঙ্কটের মধ্যেও বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন ও দোষারোপের চক্রে রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশলে ব্যস্ত।

ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মৌখিক দাবি পাশ কাটিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং যে অশুভ কর্মতৎপরতা তা জনগণের নামে চালালেও তাতে নাগরিকদের সত্যিকারের আকাক্সক্ষার বাস্তব প্রতিফলন নেই। দিনে দিনে জনগণের আকাক্সক্ষাকে বাদ দিতে দিতে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হতে চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ‘রাষ্ট্র নেতৃত্বের ক্ষমতার উৎস জনগণ’ এই বাস্তব পরিস্থিতি কোনো সময়ই ভুলে যাওয়া ঠিক নয়। জনগণকে ভুলে যাওয়ার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। যেকোনো সঙ্কটে সাধারণ নাগরিকের দায় কম। নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুটো উদাহরণ যথেষ্ট। করোনা সংক্রমণ প্রকাশ হওয়ার পর লকডাউন ঘোষণা না করে ছুটি ঘোষণা করা হয়।

মানুষ দল বেঁধে ঈদের ছুটির মতো গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেলেন। কয়েক দিন পর গার্মেন্ট শ্রমিকরা খবর পেয়েছেন বেতন দেয়া হবে; গার্মেন্ট চালু হচ্ছে। শ্রমিক ভাইবোনেরা হেঁটে দল বেঁধে ফেরি পার হয়ে রাজধানীতে এলেন। আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গ্রামের বাড়িতে যেতে হলো। এ দায় কার? সাধারণ নাগরিকদের নাকি রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনার? সাধারণ নাগরিকরা উদ্বুদ্ধ হন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির প্রতিযোগিতার মাঝে নাগরিকরা তাদের কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকেন। জনগণের আকাক্সক্ষা যখন হারিয়ে যায়, ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় টিকে থাকার অকৌশলের পথ যখন প্রশস্ত করে; তখন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা। সে সময় প্রয়োজন হয় নাগরিক সমাজের নেতাদের এগিয়ে আসার। তখন যদি তারা এগিয়ে না আসেন, তাহলে রাষ্ট্রের মাঝে যোগাযোগের দায়িত্বটা কে পালন করবে?

আমাদের সমাজে যেসব প্রতিষ্ঠানে নাগরিক সমাজের নেতারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা হয় সরকারের অনুগত, তা না হলে রাজনৈতিক দলের লেজুড়ে পরিণত হয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম ব্যবসায়ী সমাজ। সাংবাদিক সমাজ। শিক্ষক সমাজ। চিকিৎসক সমাজ। আইনজীবীসহ প্রায় সর্বস্তরেই এই পরিস্থিতি। নাগরিক সমাজের নেতারা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসবেন না হয়তো; আসতেও চান না। তারা রাষ্ট্রের অসংলগ্নগুলো সাদা চোখে রাষ্ট্রনীতিকদের কাছে তুলে ধরবেন। দেশের জাতীয় সঙ্কটে বিশেষ করে আজকের সঙ্কটে ক্ষমতাসীন নেতারা ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বস্তুনিষ্ঠভাবে নাগরিকদের সমস্যা তুলে ধরতে উদ্যোগ গ্রহণ করলেই এই সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ অনেকাংশে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। সাধারণ নাগরিকরা আজ আমরা অসহায়। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য আপনারা উদ্যোগ গ্রহণ করুন। তবেই সাধারণ নাগরিকরা হয়তো আশার আলো দেখতে পাবেন। সময় খুব দ্রুততার সাথে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর কোনো বক্তব্য সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে দৃশ্যমান নয়। 

লেখক : সহসভাপতি, জাসাস


আরো সংবাদ

২০২০ সালের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি : পর্বসংখ্যা-৯৫ বাংলা নাটক : অবাক জলপান অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি : বিজ্ঞান ষষ্ঠ অধ্যায় : পরমাণুর গঠন অষ্টম শ্রেণীর প্রস্তুতি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় অধ্যায়-৫ : সামাজিকীকরণ ও উন্নয়ন নবম-দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া : বাংলা দ্বিতীয়পত্র অস্ত্র মামলায় গজারিয়ার আ’লীগ নেতা ও তার ভাই তিন দিনের রিমান্ডে বহিষ্কৃত আ’লীগ নেতা এনু-রুপনের জামিন আবেদন খারিজ ঢাবির উন্নয়ন ফি প্রত্যাহার চেয়ে ভিসিকে ছাত্রলীগের স্মারকলিপি কবি ফররুখ আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত বাংলাদেশ লেবার পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ আলুর দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ভুল সিদ্ধান্ত : জি এম কাদের

সকল