১২ আগস্ট ২০২০

সংক্রমণ কি কাউকে ছেড়ে দেয়?

-
24tkt

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ (কোভিড-১৯) মহামারী আকারে দেখা দেয়ার পর থেকে অনেককেই বলতে শোনা যায়, ‘এটা আল্লাহর গজব হিসেবে এসেছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানদের ওপর যারা অত্যাচার করছে তাদের শাস্তি দেয়ার জন্যই এই গজব নাজিল হয়েছে।’ মজলুমের হৃদয়ের সান্ত্বনার জন্য এই কথাগুলো অত্যন্ত ফলদায়ক বৈকি! যারা নানাভাবে দিনের পর দিন জুলুম-অত্যাচারের শিকার হয়েছে, মুখ বুঁজে সহ্য করেছে নির্যাতনের যন্ত্রণা, অসহ্য বেদনা নিয়ে শেষ ভরসাস্থল আল্লাহর সাহায্য চেয়ে হাত তুলেছে আসমানের দিকে, কষ্টে জর্জরিত সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে কামনা করেছে, ‘হে আল্লাহ! এই অত্যাচারীদের তুমি ধ্বংস করে দাও!’ তাদের কাছে এই সান্ত্বনার গুরুত্ব অপরিসীম।

বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষের সর্ব প্রকার বুদ্ধি ও সক্ষমতাকে পরাজিত করে যেসব মানবিক বিপর্যয়পূর্ণ ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে, সেসব বিষয়কে, যেমন- মহামারী, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ইত্যাদিকে ‘আল্লাহর গজব’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এটা স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহর বড়ত্ব যে, তিনি স্বাভাবিকভাবেই অহঙ্কারী ও সীমালঙ্ঘনকারী মানুষগুলোকে গজব দেন অত্যন্ত তুচ্ছ কিছু উপাদান বা জীব দিয়ে! কিন্তু কী কারণে গজব এলো এবং যে বিপর্যয়টা এসেছে তা আসলেই গজব কি না, সেটা একমাত্র আল্লাহ’তালাই ভালো জানেন। অন্য দিকে, আমাদের এগোতে হবে সতর্কতার সাথে।

আধুনিক বিজ্ঞানে প্রাগ্রসর রাষ্ট্রগুলোও ‘কোভিড-১৯’ মহামারীর কাছে পরাজিত এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়ে অনেক প্রাণহানির পর, আরো বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত ও অনেকেই নিহত হওয়ার আশঙ্কা মাথায় নিয়ে, এখন তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ও প্রতিষেধক আবিষ্কারের প্রণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই মহামারীর ক্রমবর্ধমানতার মুখে বাংলাদেশ বা ভারতের মতো জনবহুল, দরিদ্র ও ‘উপায়হীন’ রাষ্ট্রগুলোর পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে আমরা নিশ্চিত নই।

যারা অত্যাচারিত, তারা কি এই মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না? এই ‘গজব’ শুধু চীনে যারা মুসলমানদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে, কাশ্মিরে এবং ভারতের অন্যত্র যারা মুসলমানদের অত্যাচার করেছে ও করছে বা ফিলিস্তিনে যারা মুসলমানদের নিষ্ঠুর ও অমানবিকভাবে নির্যাতন করছে শুধু তাদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, এ ধরনের নিশ্চয়তা কি আছে? না, নেই। মহামারী যখন আসে তা বন্যার মতো সবাইকেই কমবেশি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এটাই সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিয়ম।

হজরত আবু ওবায়দা বিন যাররাহ ছিলেন মহানবী মোহাম্মদ সা:-এর বিশিষ্ট সাহাবা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিনি সিরিয়া বিজয়ের কিছুকাল পর সেখানে মহামারী আকারে দেখা দেয়া, প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে সিরিয়ার জাবিয়া এলাকায় ইন্তেকাল করেছিলেন। সেই মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর রাসূল সা:-এর অনেক সাহাবিসহ হাজার হাজার মুসলমান প্রাণ হারিয়েছিলেন। বাস্তবতা হচ্ছে, আল্লাহর গজব হিসেবে যে মহামারী নেমে এসেছিল, তা থেকে রাসূল সা:-এর সাহাবিরাও রেহাই পাননি!

এসব মহামারী মারাত্মকভাবে সংক্রামক ও ছোঁয়াচে বলেই এ থেকে বেঁচে থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল আল্লাহর রাসূল সা:-এর পক্ষ থেকে। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, যারা এসব রোগাক্রান্ত অঞ্চলে আছে তারা যেন অন্য দিকে পালিয়ে না যায়, বা ওই স্থান ত্যাগ না করে। আবার, যারা ওই এলাকার বাইরে আছে, তারা যেন ওই এলাকায় প্রবেশ না করে। এ কারণেই হজরত ওমর রা: সিরিয়ায় প্রবেশ না করে মদিনায় ফিরে গিয়েছিলেন। এই আদেশের উদ্দেশ্য স্পষ্ট- মহামারীর বিস্তার রোধ অথবা যেটাকে আজকাল বলা হচ্ছে ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং’ সেটা রক্ষা করা, জনসমাগমে যোগ না দেয়া, নিজেকে যতটা সম্ভব একাকী ও আলাদা রাখা।

তাই মহামারী দেখা দিলে সবাইকেই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। বাংলাদেশের কেউ কেউ এটাকে ‘জাতিবিশেষের ওপর গজব’ বলছেন। তারা বলতে চাইছেন, বাংলাদেশের মুসলমানদের এতে কোনো ক্ষতি হবে না।’ কিন্তু এটা সঠিক হতে পারে কি?

এখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। প্রত্যেককেই জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলতে হবে। গণমানুষের একত্র হওয়ার মতো সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত এবং এই সবগুলোকেই পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, এই মহামারীকে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সংক্রমিত হয়ে অন্যের মৃত্যুর কারণ হতে দেয়া যাবে না। বিশেষত, করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একজন লোক নিজে অসুস্থ হয়ে পড়ার অনেক আগে থেকেই, নিজের অজান্তেই, এই ভাইরাস বহন করে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন! তাই যেকোনো ধরনের ধর্মীয় জমায়েত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক মুসলিম রাষ্ট্রে জুমা এবং ওয়াক্তের নামাজের জামাত আপাতত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এবার নোয়াখালীতে একটি বিশাল জমায়েত করে আল্লাহর কাছে গজব-মুক্তির প্রার্থনা করা হয়েছে! অথচ এর মধ্যেই সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, কোনো রকম গণজমায়েত করা যাবে না। কারণ এর মধ্যেই বিদেশফেরত অনেক প্রবাসী বাঙালির কারণে এই রোগ দ্রুত সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ! আবার খবর পাওয়া গেছে, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে এই মহামারী রোগের বিস্তার ঠেকাতে যেকোনো ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ সেখানে প্রবাসী মুসলমানদের তাবলিগ জামাতের একটি দল শহরের বাইরে একটি এলাকায় সবাইকে আহ্বান করেছে একত্র হয়ে জুমার নামাজ আদায় করার জন্য! কয়েক দিন আগে এ ধরনের একটি তাবলিগি সমাবেশ থেকে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে মালয়েশিয়াতে এবং পরে দেখা গেছে, সেই বিশাল জমায়েতের একজন মাত্র রোগীর (ব্রুনাই থেকে আগত) কারণেই পরে শতাধিক লোক এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছেন। হাজার হাজার অংশগ্রহণকারীর মধ্যে আরো কতজন যে করোনার জীবাণুু বহন করে জনগণের মধ্যে ও পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন সে হিসাব কে দেবে!

প্রশ্নটা যখন দেশব্যাপী, বরং বিশ্বব্যাপী, জীবনঘাতী মহামারীর বিস্তার রোধের, তখন কেউ বুঝতে পারছে না বা বুঝতে চাইছে না বলে তাকে মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে বা অন্যের মৃত্যুর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে দেয়া যেতে পারে না। এ কাজে বাধা দিতে হবে কঠোরভাবে। অন্যথায় তা হবে আত্মহত্যা আর অন্যকে হত্যা করার সমান অপরাধ! ইসলামে আত্মহত্যা ও মানুষ-হত্যাকে হারাম করা হয়েছে। নিজের ও অন্যের জন্য মৃত্যুর ঝুঁকি সৃষ্টি করে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়ম ভঙ্গ করে আমরা ভুলভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারি না। নবী সা:-এর শেখানো ইসলামেও এটা গ্রহণযোগ্য নয়। গজব থেকে বাঁচার জন্য পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, দ্বীনকে আঁকড়ে ধরতে হবে সবাই মিলে একসাথে এবং অন্যদের কাছে সঠিকভাবে ইসলামকে তুলে ধরতে হবে। আমাদের এ ব্যাপারে সাবধান হতে হবে, সচেতন হতে হবে। আমাদের ভুলের জন্য, অজ্ঞতার জন্য আমরা যেন গজবের বন্যায় ভেসে না যাই!

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক, কবি ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা


আরো সংবাদ