৩১ মার্চ ২০২০

মানবাধিকার ও এর বিস্তৃতি

-

মানবাধিকার হলো মানুষের সার্বজনীন, সহজাত, অহস্তান্তরযোগ্য এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকার, যা প্রতিটি মানুষের জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য। মানুষ এ অধিকার ভোগ করবে এবং চর্চা করবে। তবে এ চর্চা কোনোভাবেই অন্যের ক্ষতি ও শান্তি বিনষ্টের কারণ হতে পারবে না। মানবাধিকার সব জায়গায় এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এ অধিকার আইনগতও। স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম দায়িত্ব হলো, এ অধিকার সংরক্ষণ করা। যদিও মানবাধিকার নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের বিষয়টি এখন আরো প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে, যখন মানুষের অধিকারগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধ, সঙ্ঘাত, হানাহানির কারণে বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রথমত একটি পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার অধীনস্থদের অধিকার রক্ষা করবেন। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্র এবং তৃতীয়ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালন করে থাকে।

জন্মগতভাবে সব মানুষ স্বাধীন এবং সমান সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার শব্দটি বহুল আলোচিত ও বহুল প্রচলিত। মানবাধিকারের বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ ও অলঙ্ঘনীয় হলেও এর সংজ্ঞা ও সীমারেখা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। অন্য দিকে ক্ষমতাধর শাসকরা দেশে দেশে জনগণের স্বীকৃত অধিকারগুলো অবলীলায় হরণ ও দমন করছেন এর নজির ভূরি ভূরি। আর দুর্বল জাতিগুলোর সাথে সবল জাতিগুলোর আচরণ আজকাল মানবাধিকারকে একটি উপহাসের বস্তুতে পরিণত করেছে।

ইংল্যান্ডের রাজা জন ও ধনী বিত্তশালী ব্যারনদের মধ্যে ১২১৫ সালে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এতে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাউন্সিলের পূর্ব অনুমতি ছাড়া খামখেয়ালিভাবে জনগণের ওপর কর আরোপ করা যাবে না। রাজ কর্মকর্তারা যথেচ্ছভাবে জনগণের ভূ-সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারবেন না। ব্যবসায়ীরা রাজ্যে ইচ্ছেমতো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাফেরা করতে পারবেন। কোনো স্বাধীন মানুষকে বিচারিক রায় বা দেশীয় আইন ছাড়া গ্রেফতার, কারারুদ্ধ করা, সম্পত্তিচ্যুত, দ্বীপান্তরিত বা নির্বাসিত কিংবা হয়রানি করা যাবে না। এই ম্যাগনাকার্টা চুক্তির মধ্য দিয়েই সংসদীয় গণতন্ত্রের পাশাপাশি আইনের শাসনের ধারণারও যাত্রা শুরু হয়। ওই ঐতিহাসিক সনদেই সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসে সর্বপ্রথম ঘোষণা করা হয় কোনো দেশের রাজাসহ সে দেশের সবাই রাষ্ট্রীয় আইনের অধীন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রজাদের অধিকার ও রাজার ক্ষমতা হ্রাসের যৌক্তিক এ দলিল পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে মানবাধিকার ও জনগণের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।

১৬০০ শতকে ব্রিটিশ জনগণের আন্দোলনের ফলে প্রথম যে তাৎপর্যপূর্ণ দলিলের সৃষ্টি হয় তা পিটিশন অব রাইটস নামে অভিহিত। ১৬২৮ সালে পিটিশন অব রাইটস সংসদ কর্তৃক আইনের আকারে গৃহীত হয়েছিল। পার্লামেন্টের সম্মতি ছাড়া করারোপ, বিনা অপরাধে কারারুদ্ধকরণ, ব্যক্তিগত বাসস্থানে স্বেচ্ছাচারী অনুপ্রবেশ এবং সামরিক আইনের প্রয়োগ থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিয়েছিল মানবাধিকারের এ গুরুত্বপূর্ণ দলিলটি। ১৬৮৯ সালে বিল অব রাইটস ব্রিটিশ পার্লমেন্টে গৃহীত হয় ও বিধিবদ্ধ আইনে রূপান্তরিত হয়। মানুষের মৌলিক মানবাধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ফরাসি দার্শনিক ভল্টেয়ারের মতে, বিল অব রাইটস প্রত্যেক মানুষকে সেসব প্রাকৃতিক অধিকার পুনরুদ্ধার করে দিয়েছে যেগুলো থেকে তারা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন শাসকের দ্বারা বঞ্চিত ছিল। যেমন- জীবন ও সম্পত্তির পূর্ণ স্বাধীনতা, লেখনীর মাধ্যমে জাতির কাছে বক্তব্য উপস্থাপনের অধিকার, স্বাধীন লোকদের দ্বারা গঠিত জুরি ছাড়া আর কারো দ্বারা ফৌজদারি অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন না হওয়ার স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে যেকোনো ধর্ম পালনের স্বাধীনতা। শুধু তাই নয়, বিল অব রাইটস ঘোষণা করে, পার্লামেন্টের পূর্বানুমতি ছাড়া রাজা যদি কোনো আইন স্থগিত বা ভঙ্গ করেন অথবা রাজা তার খরচের জন্য ইচ্ছেমতো করারোপ করেন বা রাজ-কমিশন বা রাজ-আদালত গঠন করেন; তাহলে এগুলো হবে বেআইনি ও ধ্বংসাত্মক।

১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলতে থাকে, যেখানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ নিহত হয়। এরপর ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ব সংঘটিত হয়, যেখানে প্রায় ছয় কোটি লোক নিহত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মিত্রশক্তি মানবাধিকারের কথা চিন্তাভাবনা শুরু করে। ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্ট আটলান্টিক চার্টার ও ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে জাতিসঙ্ঘের গৃহীত ঘোষণায় এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। ১৯৪৫ সালে সান-ফ্রান্সিসকোতে জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে মানবাধিকারের ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা ছিল না; যদিও একটি মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ পরিষদের প্রথম অধিবেশনে আন্তর্জাতিক অধিকারগুলোর বিল প্রণয়ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর কাজ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের ৩৮টি দেশের সম্মতিতে সর্বপ্রথম মানবাধিকার সনদ প্রণয়ন করা হয়। এ ঘোষণায় ১৯টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার এবং ছয়টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা স্বীকৃত। অনেক দেশে ঔপনিবেশিক শাসনামলের অবসান হলে ১৯৬৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর সে দেশগুলোর সম্মতিক্রমে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা দেয়া হয়। এর ফলে ১৯৭৬ সালে জাতিসঙ্ঘের ৩৫ সদস্যের অনুমোদন নিতে বাধ্য করা হয়। পরে ১৯৮৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর ৫৯টি দেশের সম্মতিতে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, মৃত্যুদণ্ডাদেশসহ বেশ কয়েকটি সনদ যুক্ত করা হয়।

মানুষের অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে মানবাধিকারের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবিক অর্থে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। মানবাধিকার সনদ দেয়ার পর তার প্রতি অনেকের আশা-আকাক্সক্ষা ছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও বর্তমানে পৃথিবীর অনেক ভূ-খণ্ডে মানবিধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।

[email protected]


আরো সংবাদ