৩১ মার্চ ২০২০

‘ভেঙে পড়েছে’, না ‘ভেঙে ফেলা হয়েছে’?

-

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি নয়া দিগন্তের একটি বক্স নিউজের শিরোনাম ছিল, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে’। নিজস্ব প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ দেশে নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে অথচ গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের জন্য নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে সোচ্চার করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জাতীয় সম্মেলনে বিশিষ্টজনরা এই আহ্বান জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশিষ্টজনরা নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করলেও আমজনতার মতে, একটানা দীর্ঘদিন যেনতেন উপায়ে ক্ষমতায় থাকার হীনস্বার্থেই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি সুকৌশলে নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে ফেলেছে। নির্বাচনব্যবস্থা তো পুরনো বাড়ি নয় যে, আপনা আপনি ভেঙে পড়বে। যারা এর সুফলভোগী হিসেবে গত ১১ বছর ধরে ক্ষমতাসীন, তাদেরকে নৈতিক সমর্থন জুুগিয়ে যাচ্ছেন দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী। আর প্রথমে লজিস্টিক সাপোর্টে মইন-মাসুদ তাদের বাহিনীকে ২০০৭-০৮ সালে ব্যবহার করেছিলেন এবং ২০১৪ সাল থেকে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসাররা নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার কাজ করে যাচ্ছেন বলে জনগণ মনে করে। জেনারেল মইন-মাসুদের এগিয়ে আসার পেছনে ওই তাদের ‘অবদান’ও কম ছিল না। সর্বশেষ, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের কারণে ওই মেশিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) আঙ্গুলের ছাপ প্রত্যাখ্যান করায় তিনি ভোট দিতে ব্যর্থ হলেও প্রিজাইডিং অফিসার তার ওপর অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাকে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়ায় তিনি ভোটারদের অসুবিধা উপলব্ধি করে মাত্র ১০ শতাংশ ভোটারের পক্ষ হয়ে ভোট দেয়ার ক্ষমতা কি প্রিজাইডিং অফিসারদের ওপর অর্পণ করেছিলেন? বেলা ৩টা পর্যন্ত মাত্র ১৭ শতাংশ ভোটারের আঙ্গুলের ছাপ ইভিএম গ্রহণ করায় প্রিজাইডিং অফিসাররা তাদের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে বাকি এক ঘণ্টায় ১০ শতাংশ ভোট কাস্ট করায় এবং এর শতভাগ ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে চলে যাওয়ায় ভোটার উপস্থিতি ২৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল; অপর দিকে সরকারি দলের সিটি দক্ষিণের প্রার্থী ১৭ শতাংশ ও উত্তরের প্রার্থী ১৪.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হতে পেরেছেন।

সুজনের সম্মেলনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, ‘সব থেকে বেশি ভোটার উপস্থিত হয় স্থানীয় বা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। সেখানে বিভিন্ন কারণে ভোটাররা উপস্থিত হয়ে ভোট দেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনে ৮১ শতাংশ ভোট পড়েছে। অন্য দিকে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩০ শতাংশের কম ভোট পড়ে। আমি মনে করি, ২০ দফা সংস্কার প্রস্তাবের পরিবর্তে এখন এক দফা দাবি তোলা দরকার, সেটি হলো- ‘সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা।’ এক দফা দাবি কাদের কাছে করা হবে এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব কাদের, তা উহ্যই রয়ে গেল। আকবর আলি খানসহ চারজন উপদেষ্টা ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ভেবেছিলেন, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্ধারিত নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন থাকলে, তিনি তার প্রভাব খাটিয়ে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ আজিজ ‘স্থূল কারচুপি’র নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকেই ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবেন। এই ধারণার বশবর্তী হয়েই তিনিসহ চারজন উপদেষ্টা ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে একযোগে পদত্যাগ করেছিলেন। তাদের এই সাহসী পদত্যাগের জন্য ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের কর্তৃক তারা অভিনন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে, ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয় বরণের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য ছিল, ‘স্থূল কারচুপি’র মাধ্যমে তাদের পরাজিত করা হয়েছে। তাই ওই নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে অনুরোধ জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করায় সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তিত্বকে শুধু কটুবাক্যবাণে জর্জরিত করাই হয়নি, আজো তাকে অশ্রদ্ধার চোখে দেখা হচ্ছে। তাই ২০১৪ সালে যখন ড. খান একতরফা নির্বাচনের সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তখন আওয়ামী লীগ তাকে ‘২০০৭ সালে নির্বাচন করতে ব্যর্থ উপদেষ্টা’ বলে ব্যঙ্গ করে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে- ২০০৭ সালে যারা নির্বাচন বন্ধের পক্ষে ছিলেন, ২০১৪ সালে তারাই একতরফা নির্বাচনের ঘোর সমর্থক হয়ে গেলেন কিভাবে? শুধু তাই নয়, ওই নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও ১৪৬ জন ৪০ শতাংশ ‘গায়েবি’ ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাদের অভিনন্দন জানিয়ে নির্বাচন সফল হওয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে, সে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার সম্পূর্ণ দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা হয়েছিল।

২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে কাঠুরিয়াদের হাতে কুঠার তুলে দিয়ে তাদের কাছে গণতন্ত্রের বৃক্ষ কর্তন না করার মায়াকান্না করে কোনো ফায়দা আছে কি? সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জনতারও, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আন্দোলনের ফলে বিজয় অর্জিত হলেও এর তখনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ১৯৯৪-৯৬ সালের আন্দোলনে ৩০ মার্চ ১৯৯৬ সালে এর সাংবিধানিক বিজয় অর্জিত হয়েছিল। ২০০৬-০৭ সালে দৃশ্যত ওই বিজয়ের শতভাগ বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতেই মইনকে ডেকে এনে আধাসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল নির্বাচনের আগে প্রচণ্ড আন্দোলন করে। সাংবিধানিক সরকার হটিয়ে অন্যরকম সরকার প্রতিষ্ঠা করে ভোট গ্রহণের আগেই জয় নিশ্চিত করা ছাড়া বা নিজেদের সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন না করা পর্যন্ত জয়ের রেকর্ড আওয়ামী লীগের ঝুলিতে ক’টি আছে? তাই আধা সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুবাদে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৬৫টি আসন পেয়ে ভবিষ্যতে পাঁচ বছর পরে যাতে নির্বাচনে পরাজিত হতে না হয়, এর জন্য গত ৩০ জুন, ২০১১ সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন সরকারে ড. আকবর আলি খান, সুলতানা কামাল ও হাফিজউদ্দিন খানের মতো বিশিষ্টজনদের উপদেষ্টা হওয়ার পথ সাংবিধানিকভাবেই চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হলো। এর মাধ্যমে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল শিকড়ে কুঠারাঘাত করে যে ক্ষত সৃষ্টি করা হয়েছে, তা জনগণের পক্ষে নিরাময় করা দুঃসাধ্য। অনেকে বলছেন, এই ক্ষমতা হস্তগত করার জন্যই ২০০৭ সালে নির্বাচন হতে দেয়া হয়নি। নির্বাচন করলে মহাজোটের ১৬০-১৮০টি আসনে জয় শতভাগ নিশ্চিত থাকলেও ২০০ আসনে জয় শতভাগ নিশ্চিত না হলে পাঁচ বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ২০০১ সালের মতো হয়তো পরাজয় বরণ করতে হতো। অপর দিকে, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী বিএনপি এটাকে নিজেদের জনপ্রিয়তার ফসল মনে করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডের আত্মসমালোচনা না করায় জন্য জনগণের নাড়ির স্পন্দন অনুভব করতে পারেনি। ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আশায় তারা পছন্দনীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন যা প্রতিপক্ষ দলের কাম্য ছিল। এর চরম খেসারত শুধু বিএনপি দিচ্ছে না, জনগণকেও দিতে হচ্ছে। নির্বাচন দুই বছর পিছিয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিচারপতি হাসানকে ঠেকাতে বিএনপি সরকারের অন্তিম দিনে ‘লগিবৈঠার আন্দোলন’ করে কয়েকজন বঙ্গসন্তানকে পিটিয়ে হত্যা করে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি কেয়ারটেকার সরকারের দায়িত্ব নিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা হলো। আর এ ক্ষেত্রে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করা থেকে নির্বাচন কমিশনকে বিরত রাখার জন্য হাইকোর্টে রিট করে বিধি অনুযায়ী বিদ্যমান সর্বশেষ ‘ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে, নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করা যাবে না’ মর্মে হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই ভোটার তালিকায় পেশাগত কারণে গ্রামের যারা শহরে বসবাস করেন, তারা শহরে ভোটার হয়েছিলেন এবং গ্রামে কিছু সহায় সম্পত্তি থাকায় গ্রামেও ভোটার হয়েছিলেন। এরূপ ৭০-৮০ লাখ ভোটারের নাম ২০০০ সালের তালিকায় ছিল। তৎকালীন সচিব কারার মাহমুদুল হাসানের লেখা ও ২০০৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে এই সংখ্যার উল্লেখ ছিল। তারা দ্বৈত ভোটার অর্থাৎ একই ব্যক্তি শহরেও ভোটার গ্রামেও ভোটার। ২০০৬ সালের হালনাগাদে আরো ২০-২৫ লাখ নতুন ভোটার এ তালিকায় যুক্ত হওয়ায় তাদের সংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছেছিল। আওয়ামী লীগ জেনে বুঝেই এদের ভুয়া ভোটার আখ্যায়িত করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন চাঙ্গা করে তোলে। সিইসি পদত্যাগ না করলে বঙ্গভবনে ‘অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া’র হুমকিতে বিচলিত হয়ে অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তখনকার রাষ্ট্রপতি তাকে যখন দীর্ঘ ছুটিতে পাঠান, তখনই শুরু হয় ‘আসল খেলা’। ‘এক কোটি ভুয়া ভোটার রেখে নির্বাচন করব না’ বলে ১৪ দলের দাখিলকৃত সব মনোনয়নপত্র একযোগে প্রত্যাহার করে নেয়ায় বেগম জিয়ার সাতটি আসনসহ ৩০টি আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪টি আসনে নির্বাচিত হওয়াকে একতরফা নির্বাচন বলে তা বন্ধ করতেই জেনারেল মইন-মাসুদকে দিয়ে বঙ্গভবনে অভিযান চালানো হয়। তখন রাষ্ট্রপতিকে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের মতো মসনদে বসিয়ে রেখে মইন-ফখরুদ্দীনের যৌথ নেতৃত্বে আধাসামরিক-বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন দুই বছর পিছিয়ে দেয়া হয় এবং ফটোযুক্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়। ফটোযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করায় দুই কোটি জনসংখ্যার ঢাকা শহরের ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪৫ লাখ; বর্তমানে যা ৫৪ লাখ। শামসুল হুদা কমিশন গ্রামের আসন সংখ্যা কমিয়ে ঢাকায় সাতটি, চট্টগ্রামে দুটি ও গাজীপুরে একটি আসন বেশি উপহার দিয়েছেন। এসব স্থানে তিন লাখ ভোটার একটি আসন পেলেও সাভারের এক লাখ ভোটারকে কেরানীগঞ্জের সাথে যুক্ত করে দেয়ার পরও ছয় লাখ ভোটারের জন্য মাত্র একটি আসন। সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে দুই দিন ছুটি থাকায় বিপুলসংখ্যক নন-ভোটার শহরবাসী ঈদের ছুটির মতো ঢাকা শহর ত্যাগ করায় এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মাত্র ২৭ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে দুই মন্ত্রী বলে থাকেন, যা শুনে হাসি পায়। ফটোযুক্ত ভোটার তালিকা ২০০৮ সালের নির্বাচনে ব্যবহার করার পর ২০১৪-১৮ সালের নির্বাচনে ব্যবহারের ‘প্রয়োজন পড়েনি’।

যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৪ সালে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, তারা ’৯৬ সালে ক্ষমতায় গিয়ে তাদের আন্দোলনের সমর্থক আইনজীবীদের মধ্য থেকে যাদের হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করেছিলেন এবং ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় গিয়ে পদোন্নতি দিয়ে তাদের আপিল বিভাগে নিয়োগ দিয়েছেন, তন্মমধ্যে বিচারপতি খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল। সম্ভবত কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি তার কাস্টিং ভোটের চার-তিন সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায়ে ১১ মে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করলে যারা ’৯৪ সালে পদত্যাগ করেছিলেন, তারাই ৩০ জুন ২০১১ সালে সংসদে ভোট দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিলেন। নিজেদের অধীনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ ক্ষমতায় আছে এবং বাতিলের পক্ষে রায় দানকারী বাকি তিন বিচারপতিকেও পর্যায়ক্রমে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল। তাদের সর্বশেষজন ছিলেন পদত্যাগী ও দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া এস কে সিনহা। তাহলে কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হয়েছিল। তার মাজেজা আমজনতা বুঝতে পারে। জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে নিয়োগকর্তাদের স্বার্থকে স্থান দেয়ায় জনগণ ভোটাধিকার হারা হয়েছে। এর পুরস্কারস্বরূপ মাসে মাসে লাখ টাকা সম্মানী ভাতা ও ফ্রি বাড়ি-গাড়ির সুবিধাসহ ৭৭ বছর বয়সে সাত বছর ধরে একটি কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ অলঙ্কৃত করার সুযোগ পাওয়া গেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে আওয়ামী লীগ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করত, তাহলে নির্বাচনে তাদের পরাজয় হয়তো নিশ্চিত ছিল। কারণ রাজনৈতিক নেতাদের মতো জনগণ কখনো ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ক্ষমতা হাতছাড়া করত না।

গত ১১ বছর যাবত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার দম্ভ ও দাপট এবং দলীয় কর্মীদের আস্ফালন দেখতে দেখতে আমজনতার তা সয়ে গেছে। যেমন ৫০ টাকা কেজি পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় উঠার পর ৫০ শতাংশ কমে এখন ১৫০ টাকা নামায় দৃশ্যত সয়ে গেছে। আয়-উপার্জন ও ব্যয়বৃদ্ধির ফারাকে দিশেহারা এক নগরবাসী হতাশ হয়ে ফুটপাথের হস্তরেখাবিশারদের কাছে হাত দেখিয়ে তাকে বলেছিলেন, ‘দেখেন তো আমার এই নাজুক অবস্থা আর কত দিন চলবে?’ হস্তরেখাবিশারদ অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার হাতের রেখা দেখে বলেছিলেন, ‘আপনার এই অবস্থা আরো চার-পাঁচ বছর অব্যাহত থাকবে।’ তারপর কী হবে?- ‘তারপর সয়ে যাবে।’ জনগণের অবস্থাও তদ্রূপ। এই সরকারের কাছে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন বা নিদেনপক্ষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের মতো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশা করা আর মুদি দোকানে ডিকশনারি পাওয়ার আশা করা একই কথা। দৈবের আশায় বসে থাকলে অনাহারে মরতে হয় জেনেও জনগণ সে আশায় দিন গুজরান করছে।


আরো সংবাদ