৩১ মার্চ ২০২০

সন্তানের অধিকার পেতে মায়ের মামলা

-

অধিকার আদায়ের সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে নারীরা আশ্রয় নেন পারিবারিক আদালতের। কিন্তু আদালতের কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতা, মামলা চালানোর মতো অর্থের অভাব, অপর পক্ষ থেকে মানসিক চাপ সব মিলিয়ে নারী হয়ে পড়েন চরম দুর্দশাগ্রস্ত। একজন নারী যিনি সন্তান ফিরে পেতে মামলা করেন, তাকে যদি বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয় তাহলে ন্যায়বিচারের আশা উবে যাওয়ার সাথে সাথে বিচারপ্রক্রিয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারলেই যেন রেহাই পান আবেদনকারী। সেই সাথে সন্তানকে কাছে পেতে মায়ের অপেক্ষার প্রহর হয় দীর্ঘতর। এ ছাড়াও বাংলাদেশে অভিভাবকত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন-১৮৯০ এর বিধানগুলো অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ও বিধিবদ্ধ উভয় আইনে শুধু বাবাই নাবালকের স্বাভাবিক অভিভাবক। মুসলিম আইনে মা কেবল সন্তানের জিম্মাদার। পুত্রশিশুর বয়স সাত বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এবং কন্যাশিশুর বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মা তাদের নিজ জিম্মায় রাখার অধিকারী। হিন্দু আইনে বাবার অবর্তমানে কেবল মা অভিভাবক হন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে হিন্দু আইন প্রযোজ্য। খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে বিয়ে-বিচ্ছেদ বা জুডিশিয়াল সেপারেশনের সময় মা আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক হতে পারেন।

Ramesh v. Smt Laxmi Bai 1999, Cri LJ 5023 মামলায় ৯ বছরের ছেলে বাবার সাথে বসবাস করাকালীন ওই শিশুর মা আদালতে সার্চ ওয়ারেন্ট মামলা করেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন যে, বাবার কাস্টডি থেকে মায়ের কাস্টডিতে শিশুকে নেয়ার উদ্দেশ্যে সার্চ ওয়ারেন্ট আকৃষ্ট করে না বিধায় ওই মামলা চলতে পারে না। Shri Atanu Chakraborty vs The State Of West Bengal & Anr (C.R.R. No. 3870 of 2009) মামলায় চার বছরের ছেলেকে বাবার কাছ থেকে উদ্ধারে মা কর্তৃক সার্চ ওয়ারেন্টের আবেদনের ভিত্তিতে ভারতের বিধাননগরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু করে পুলিশকে নির্দেশ দেন ওই নাবালককে উদ্ধার করে আদালতে হাজির করতে এবং বাবাকেও হাজির থাকতে। সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু সংক্রান্ত ওই আদেশের বিরুদ্ধে নাবালকের বাবা কলকাতা হাইকোর্টে ক্রিমিনাল রিভিশন দায়ের করেন। ক্রিমিনাল রিভিশন মামলার রায়ে বাবার কাস্টডি থেকে নাবালক ছেলেকে উদ্ধারে দেয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সার্চ ওয়ারেন্ট সংক্রান্ত আদেশ আইনসম্মত নয় বিধায় বাতিল করা হয়। হাইকোর্ট বলেন, বাবার বিরুদ্ধে অন্যায় আটক অভিযোগ আনা হয়েছে, যেখানে Hindu Minority and Guardianship Act, 1956-এর ৬ ধারা মতে- ছেলেসন্তানের ক্ষেত্রে বাবা এবং বাবার পরে মা হলেন স্বাভাবিক অভিভাবক। নাবালক ছেলের বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে মায়ের কাস্টডিতে থাকার কথা। আদালতের আদেশ লঙ্ঘন না করে থাকলে, পাঁচ বছরের কম বয়সী নাবালক ছেলে তার বাবার কাস্টডিতে থাকলে তাকে অন্যায় আটক বলা যাবে না। ওই মামলার ঘটনা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত বলেন, বাবার সাথে নাবালক ছেলের বসবাস থাকায় সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যুর প্রশ্নই আসে না। পর্যবেক্ষণে আদালত আরো বলেন, Guardian & Wards Act, 1890-এর বিধান মতে, নাবালকের কাস্টডির জন্য পক্ষদ্বয় উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে যেতে পারে। দেওয়ানি আদালতের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মা চার বছরের নাবালক ছেলের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকবেন কি না, এই প্রশ্নের বিষয়ে উচ্চ আদালত তার সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করে বলেন, উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে নাবালকের তত্ত্বাবধান বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নাবালক তার বাবার কাস্টডিতেই থাকবে।

‘ইমামবন্দী বনাম মুসাদ্দির ২২ ডিএলআর, পৃষ্টা ৬০৮’ মামলায় বলা হয়েছে- ‘মুসলিম আইনে সন্তানের শরীরের ব্যাপারে লিঙ্গভেদে কিছু বয়স পর্যন্ত মা তত্ত্বাবধানের অধিকারিণী। মা স্বাভাবিক অভিভাবক নন। একমাত্র বাবাই বা যদি তিনি মৃত হন তার নির্বাহক আইনগত বা বৈধ অভিভাবক।’ তবে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করলে মা এ অধিকার হারাবেন। (হেদায় ১৩৮, বেইলি ৪৩৫)। সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ বাবার। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য মায়ের দ্বিতীয় স্বামী সন্তানের রক্ত সম্পর্কীয় নিষিদ্ধ স্তরের মধ্যে একজন না হলে মা তার তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা হারাবেন। তবে আবু বকর সিদ্দিকী বনাম এস এম এ বকর ৩৮ ডিএলআরের মামলায় এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যদি আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, সন্তান মায়ের হেফাজতে থাকলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হবে, সন্তানের কল্যাণ হবে এবং স্বার্থ রক্ষা হবে- সে ক্ষেত্রে আদালত মাকে ওই বয়সের পরও সন্তানের জিম্মাদার নিয়োগ করতে পারেন। ব্যক্তিগত আইন এবং কল্যাণ মতবাদ অভিভাবকের ক্ষেত্রে মতবিরোধ সৃষ্টি করলে কল্যাণ মতবাদই প্রাধান্য পাবে। (আয়শা খানম বনাম অন্যান্য বনাম সাব্বির আহমেদ এবং অন্যান্য, ৪৬ ডিএলআর হাইকোর্ট, পৃষ্ঠা ৫৯৯)।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ, ১৬ ডিএলআরে জোহরা বেগম বনাম মাইমুনা খাতুন মামলায় আদালত বলেন, নিষিদ্ধ স্তরের বাইরে মায়ের বিয়ে হলেই মায়ের কাছ থেকে হেফাজতের অধিকার চলে যাবে না। মা যদি তার নতুন সংসারে সন্তানকে হেফাজতে রাখতে পারেন, সে ক্ষেত্রে তাকে সন্তানের জিম্মাদারি দিতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ কোনো অসমর্থিত অভিযোগের ওপর নির্ভর করে আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে যেক্ষেত্রে কোনো স্ত্রীলোককে তার শালীনতার বিষয়ে অসতীত্বের কালিমা লেপন করা হয় (নদীয়া খলিল বনাম রাদেশ করিম ২৮ বিএলডি, হাইকোর্ট, পৃষ্ঠা ৫৯৯)। তবে জিম্মার স্বাভাবিক অবস্থার ব্যত্যয় ঘটলে সংক্ষুব্ধ মা সংবিধানের ১০২ নং অনুচ্ছেদের বিধান মতে তার সন্তানের তাৎক্ষণিক জিম্মার জন্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করতে পারেন। এক্ষেত্রে সন্তানের কল্যাণে আদেশ দেয়া যেতে পারে (আবদুল জলিল এবং অন্যান্য বনাম শ্যারন লাইলী বেগম জলিল ৫০ ডিএলআর, আপিল বিভাগ, পৃষ্ঠা ৫৫)। কারণ সন্তানের তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে মামলার পক্ষদের অধিকার নয় বরং সন্তানের অধিকারই বিবেচ্য বিষয়।

মায়ের হেফাজত থাকাকালে নাবালক ছেলের সাথে বাবার সাক্ষাতের অধিকার অস্বীকার করা যায় না। অভিভাবকত্ব নিয়ে মামলা চলাকালে সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করে বাবা যাতে তার সন্তানকে নিয়মিত দেখতে পান সে জন্য বাবা-মায়ের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার বিষয়টি পারিবারিক আদালত বিবেচনায় নিতে পারেন (আক্তার মাসুদ বনাম মিসেস বিলকিস জাহান ফেরদৌস, ৫০ ডিএলআর, আপিল বিভাগ, পৃষ্ঠা ১৪৫)।

অনেক সময় সন্তানের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা থাকলে, সন্তানের মতামতকেও আদালত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এ জন্য প্রয়োজন হলে সন্তানকে আলাদা করে বিচারক নিজের কাছে নিয়ে তার মতামত জেনে নিতে পারেন। আবার মা-বাবা পর্যায়ক্রমে সন্তানকে কাছে রাখা কিংবা একজনের কাছে থাকলে অন্যজনকে দেখা করার অনুমতিও দিয়ে থাকেন। পারিবারিক আদালতে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সন্তানকে কাছে রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ারও সুযোগ রয়েছে। তবে সবার মনে রাখা দরকার ‘বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে’।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইনগ্রন্থ প্রণেতা
Email: [email protected]


আরো সংবাদ