৩১ মার্চ ২০২০

বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য : কুরআনের দাবি

-

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন; নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন এবং এই ঐক্যের বন্ধন হিসেবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (সূরা আলে-ইমরান : ১০৩)। এ আয়াতাংশে আল্লাহ তায়ালা তিনটি নির্দেশ দিয়েছেন- ১. মুসলমানদের আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকতে হবে। বেশির ভাগ তাফসিরকারকের মতে, ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে পবিত্র কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। এই কুরআনই ইসলামের মূল ভিত্তি এবং কুরআনের বাস্তব নিদর্শন মহানবী সা:-এর সুন্নাহ। মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও নবীর সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকা। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে অনুসরণ করা। ২. কুরআনের ভিত্তিতে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অর্থাৎ একমাত্র ইসলামই বিশ্ব মুসলমানের ঐক্যের ভিত্তি ও বন্ধন। ইসলাম ভিন্ন অন্য কিছু- ভাষা, গোত্র, বর্ণ কিংবা আঞ্চলিকতা মুসলমানদের ঐক্যের মূল ভিত্তি হতে পারে না। এগুলো ইসলামের অধীনে ঐক্যের অতিরিক্ত উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। ৩. নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা বা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। মুসলমানরা যদি নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, দল-উপদলে বিভক্ত হয়, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয় এবং একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে তা হবে আল্লাহ তায়ালার এই নির্দেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

মুসলমানরা যেন একতাবদ্ধভাবে থাকে এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত ও ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হয়, সে বিষয়ে কুরআনে আল্লাহ তায়ালার আরো নির্দেশ রয়েছে।

মুসলমানদের পরস্পরের সম্প্রীতি ও ভালোবাসা তথা ঐক্যকে আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি তাঁর ‘নিয়ামত’ বলে উল্লেখ করেছেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর সাহচর্যে এসে তাঁর আনীত দ্বীন গ্রহণ করে মক্কার মুহাজির ও মদিনার আনসার এবং মদিনার চিরবৈরী আউস ও খাজরাজ গোত্র পরস্পরের ভাই ভাই হয়ে গেল- আল্লাহ বলেন : ‘আর তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিগর্তের দ্বারপ্রান্তে ছিলে, তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করেছেন’ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-১০৩)।

আল্লাহ পাক বলেন : ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পরও বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-১০৫)।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : ‘মুমিনরা পরস্পরের ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস মীমাংসা করে দাও। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও’ (সূরা হুজুরাত-১০)। এই আয়াত দুনিয়ার সব মুসলমানকে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। প্রত্যেক মুসলিম অপর মুসলিমকে নিজের ভাইয়ের মতো আপন মনে করবে, এটি আল্লাহর আদেশ। অতএব একজন মুসলমান অপর মুসলমানকে কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ঘৃণা করতে পারে না, তার কোনো অনিষ্ট চিন্তা করবে না, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহ করতে পারে না। যারা এরূপ করবে তারা অবশ্যই কুরআনের এই আদেশ লঙ্ঘনকারী।

রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : ‘এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না, তাকে সহযোগিতা করা পরিত্যাগ করবে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করবে না। কোনো ব্যক্তির জন্য তার কোনো মুসলিম ভাইকে হেয় ও ক্ষুদ্র করার মতো অপকর্ম আর নেই’ (মুসনদে আহমাদ; ১৬/২৯৭, ৭৭৫৬)। তিনি আরো বলেছেন : ‘একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর অত্যাচার করতে পারে না, তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে না’ (বুখারি : ২৪৪২; মুসলিম ২৫৮০)।

পবিত্র কুরআন এবং হাদিসের এসব আদেশ ও নিষেধ বিশ্বের সব মুসলমানের ওপরই প্রযোজ্য। যিনি যে অবস্থায়ই আছেন, তার সে অবস্থাতেই এ সব আদেশ-নিষেধ পালন করা কর্তব্য। কুরআন হাদিসের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করলে মুসলমানের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ থাকা কুরআনের নির্দেশ। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের পক্ষে কাজ করা, কথা বলা কিংবা নিদেনপক্ষে এর আকাক্সক্ষা পোষণ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য, এটি তার ঈমানের দাবি। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মন্দ অবস্থা অবলোকন করে, তখন তার উচিত শক্তি প্রয়োগ করে তা ঠিক করে দেয়া; যদি তা সম্ভব না হয় তবে তার বিপক্ষে কথা বলে তা ঠিক করার চেষ্টা করা, যদি তাও সম্ভব না হয় তা দূর করার জন্য আকাক্সক্ষা প্রকাশ করা উচিত। এটি ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর’ (মুসলিম)।

বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় কুরআনের নির্দেশিত মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বাস্তবায়নের পন্থা কেমন হবে? বর্তমান মুসলিম বিশ্ব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন জাতি, রাষ্ট্রে বিভক্ত। আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্র স্বাধীন ও সার্বভৌম। প্রত্যেকের নিজস্ব আইনকানুন এবং নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা আছে। এ ছাড়া অমুসলিম দেশগুলোতেও অনেক মুসলমান বসবাস করে থাকে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম দেশগুলোকে অমুসলিম দেশগুলোর সাথেও বন্ধুত্ব¡পূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়। এ অবস্থায় মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের স্বরূপ কেমন হবে এরূপ প্রশ্ন কারো মনে জাগতে পারে।

এর জবাবে বলা যেতে পারে, উপরি উক্ত বিষয়াদি মুসলমানদের ঐক্যের পথে কোনো বাধা নয়। ‘মুসলিম উম্মাহর ঐক্য’ মানে পৃথিবীর সব মুসলমানকে একই রাষ্ট্র কাঠামো বা এক খলিফার অধীনে থাকতে হবে, তা জরুরি নয়। বর্তমান পৃথিবীতে সব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা মিলে এক রাষ্ট্র হওয়া বাস্তবসম্মত নয় এবং তার প্রয়োজনও নেই। বিশ্বের মুসলমানরা বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হলেও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বাস্তবায়নে সেটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। মুসলমানদের ঐক্যের জন্য প্রয়োজন, কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্র অপর মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের কল্যাণকামী হবে; সব ভালো ও সৎকাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে এবং প্রয়োজনে একে অপরের পাশে থাকবে।

বর্তমানে মুসলমানরা অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারী। অর্ধশতাব্দী আগে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের কয়েকজন নেতা মুসলিম ঐক্যের একটি বিরাট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছিলেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক মুসলিম বিশ্ব উম্মাহর ঐক্যকে আরো কার্যকরভাবে সুসংহত করতে পারে।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ এবং ইসরাইল কর্তৃক পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদে অগ্নিসংযোগের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৯ সালের ২২-২৬ সেপ্টেম্বরে ২৪টি মুসলিম রাষ্ট্রের নেতারা মরক্কোর রাজধানী রাবাতে মিলিত হন এবং ২৫ সেপ্টেম্বর ‘ওআইসি চার্টার’ গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) গঠন করেন। বর্তমানে এর নাম ‘ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা’। ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র ওআইসির সদস্য। এটি এখন মুসলমানদের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংগঠন। এটিকে বলা যায় ‘মুসলিম জাতিসঙ্ঘ।’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ সরকার ওআইসিতে তাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। তিন বছর পরপর এর শীর্ষ সম্মেলন এবং প্রতি বছর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মহাসচিবের পরিচালনায় সংস্থার স্থায়ী সচিবালয় আছে। ওআইসির কার্যপরিধি বাড়িয়ে এবং একে অধিকতর শক্তিশালী করে মুসলিম বিশ্ব ঐক্যের পথে আরো এগিয়ে যেতে পারে। ওআইসিকে আরো কার্যকর ও শক্তিশালী করতে এর বিভিন্ন কমিটিতে সরকারি ছাড়াও বেসরকারি পর্যায় থেকেও ইসলামী চিন্তাবিদদের আরো ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সদস্য রাষ্ট্রের সরকারগুলোকে এ বিষয়ে আরো আগ্রহী ও মনোযোগী হতে হবে।

ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওআইসির সম্মিলিত ভূমিকা পালনে চেষ্টা করা উচিত। ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পদের সহজ প্রবাহ, অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্য দান এবং ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে চেষ্টা চালানো উচিত। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেয়া ইসলামের নির্দেশ। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে পৃথিবীর দরিদ্র এলাকাগুলোতে দারিদ্র্যপীড়িত জনগণের ক্ষুধা নিবারণসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ওআইসির প্রচেষ্টা চালানো উচিত। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্র বিরোধ কিংবা যেকোনো দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত নিরসনে এবং যেকোনো সদস্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সংরক্ষণে ওআইসির ভূমিকা পালন করাই প্রত্যাশিত।

বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ যেসব দ্বন্দ্ব বিরোধ ও যুদ্ধবিগ্রহ বিদ্যমান তা নিরসনের জন্য বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টা চালানো কর্তব্য; এটি কুরআনের নির্দেশ, ঈমানি দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনের জন্য ওআইসি সচিবালয়ের আওতায় একটি স্থায়ী মধ্যস্থতাকারী সেল গঠন করা যেতে পারে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের সরকারি ও বেসরকারি ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম, উম্মাহর কল্যাণকামী অভিজ্ঞ কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে ওই সেল গঠন করা যেতে পারে। যেকোনো দেশে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত দেখা দিলে এই সেল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে।

মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম হওয়া সত্ত্বেও কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ অনুসরণের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ গঠনে দায়িত্ব পালন করতে পারে। এ দায়িত্ব পালন ঈমানি দায়িত্বের অংশ। ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত-১০)। অতএব, প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্র পরস্পরের ভাই। এক মুসলিম ভাই (রাষ্ট্র) অপর কোনো ভাইয়ের বিরুদ্ধে যাবে না, ক্ষতি করবে না এবং দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে লিপ্ত হবে না। প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্র পরস্পরের বন্ধু হবে এবং একে অপরের কল্যাণকামী হবে। এর মাধ্যমে তাদের ঈমানি দায়িত্ব পালন করা হবে এবং উম্মাহও ঐক্যবদ্ধ থাকবে।

প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের সরকারকে তার নাগরিকদের কল্যাণের জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারকে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত নির্দেশাবলির আলোকে তার জনগণের সাথে মানবিক আচরণ ও দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরস্পর কল্যাণকামিতার মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব জাগ্রত রাখতে হবে এবং কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রতি প্রতিহিংসা বা শত্রুতামূলক আচরণ পরিহার করে চলতে হবে। জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রয়োজন দেশের জনগণের কল্যাণ ও মতামতকে গুরুত্ব দেয়া এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। যে সব দেশ গণতন্ত্রকে সাংবিধানিকভাবে গ্রহণ করেছে সেসব দেশে ক্ষমতার পালাবদলের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অভ্যন্তরীণ অনেক দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।

বিশ্বের যে প্রান্তেই হোক, কোনো মুসলিম ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী নির্যাতিত হলে তাদের নির্যাতন থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করা অপর মুসলমানের দায়িত্ব। রাসূল সা: বলেছেন : মুমিনরা একটি দেহের মতো। দেহের যে অঙ্গেই ব্যথা হোক না কেন তাতে সম্পূর্ণ দেহ ব্যথা অনুভব করে, জ্বর ও অনিদ্রায় ভুগতে থাকে (বুখারি-৬০১১, মুসলিম-২৫৮৬)।

আজকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন শক্তির দিয়ে আক্রান্ত এবং নির্যাতিত। মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়ে ১২ লাখ মুসলমানকে তাদের ঘরবাড়ি ও দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে এবং তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। পাশ্চাত্য শক্তি ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তখন থেকেই ইসরাইল ফিলিস্তিনি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চরম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। গত ৭০ বছর ধরে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি সৈন্যের কামান বোমা কিংবা গুলিতে ফিলিস্তিনিদের রক্ত ঝরছে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নরনারী-শিশু, যুবক-বৃদ্ধ ইসরাইলের হাতে খুন হয়েছে। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয়শিবিরে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছে। যারা দেশে আছে, তারা নিজ ভূমিতে পরাধীন জীবনযাপন এবং প্রতিদিন ট্যাংক-সাঁজোয়া কিংবা কামান গোলার গুলির মধ্যে কেউ না কেউ শাহাদত বরণ করছে।

আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ছাড়া অপর কাহাকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না। তাহারা তোমাদের ক্ষতি করিতে ছাড়িবে না’ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-১১৮)।

এ আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী কোনো মুসলমান রাষ্ট্র অপর কোনো মুসলমান ভাইয়ের (রাষ্ট্রের) বিরুদ্ধে কোনো অবিশ্বাসী শক্তিকে বা রাষ্ট্রকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে পারবে না।

বর্তমান পৃথিবীতে ইসরাইল রাষ্ট্র মুসলমানের ভূমি দখল করে, তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ইসরাইল রাষ্ট্র মুসলমানদের শত্রু। সুতরাং ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করার অর্থ হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ওপর তার নির্যাতন-নিপীড়নকে সমর্থন করা। কোনো মুসলিম ঈমানদার ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে না। যদি কোনো মুসলিম রাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের নায্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আগেই ইসরাইলকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তবে তা হবে ফিলিস্তিনি মুসলিমের প্রতি শত্রুতা এবং কুরআনের আদেশের লঙ্ঘন।

আল্লাহ বলেন : ‘যদি মুসলমানের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করে দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন’ (সূরা আল হুজুরাত, আয়াত-৯)।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব, বাংলাদেশ সরকার


আরো সংবাদ