৩১ মার্চ ২০২০

বিরোধী দলের অপেক্ষায়

রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে জনগণের কল্যাণে। নিজ রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের থাকা উচিত আইনানুগ আনুগত্য। রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে এ সম্পর্ক বজায় থাকবে গণতান্ত্রিক সরকারের পরিচালনায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমন ধারণা মাথায় রেখেই বেশির ভাগ দেশে সরকার পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে। তবে আমাদের দেশে রাষ্ট্র কি জনগণের সব কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারছে? কিংবা জনগণ কি রাষ্ট্রের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য প্রকাশ করছে?

করোনাভাইরাসের কারণে চীনে আটকে থাকা বাংলাদেশী নাগরিকদের দেশে ফেরত আনার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম এ মোমেন যা বললেন, তা এমন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মন্ত্রী বললেন, চীনে আটকে থাকা বাংলাদেশীদের ফেরত আনার জন্য কয়েক কোটি টাকা বিমান ভাড়া দেশের ফান্ডে নেই! এ বক্তব্য সরকারের সক্ষমতার ব্যাপারে হতাশার জন্ম দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোধহয় ভুলে গিয়েছিলেন, প্রবাসীদের বিপদের সময় তিনি এসব বললেন; অথচ তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হাজার হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য পরম আশীর্বাদস্বরূপ। মন্ত্রীর ওই কথার অসারতা স্পষ্ট করে বক্তব্য দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু সাধারণ মানুষের ‘স্লিপ অব টাং’ আর মন্ত্রীপর্যায়ের মানুষদের বেফাঁস বক্তব্যের ব্যবধান বিস্তর। উঁচু স্তরের মানুষদের ঝোঁকের মাথায় ভুল বলে ফেলার খেসারত দিতে হয় কড়ায়গণ্ডায়।

মাননীয় মন্ত্রী এমন সময় ওই বক্তব্য দিলেন, যখন মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নষ্ট হয়ে গেছে রিক্রুট এজেন্সিগুলোর দুর্নীতির কারণে। বনজঙ্গলে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে হাজার হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক। আমাদের সরকার দফায় দফায় চেষ্টা করেও এ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। ফলে মালয়েশিয়ায় অনেক দিন ধরে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যেও অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মীরা। গৃহস্বামীদের আচরণে টিকতে না পেরে অনেকে দেশে ফিরে আসছেন মৃত বা মুমূর্ষু অবস্থায়। বিদেশে দিন দিন সঙ্কুুচিত হয়ে আসছে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এর সমাধান করা যাচ্ছে না কেন?

এ দিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়েও হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীন একযোগে সমর্থন করেছে মিয়ানমারকেই। এটা ওদের কূটনৈতিক সাফল্য বটে। দুঃখের বিষয় হলোÑ সাফল্যের এমন নজির বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দফতরের তেমন নেই। গাম্বিয়া যদি রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সম্মুখীন না করত, তাহলে আরো নাজুক অবস্থায় পড়তে হতো আমাদের দেশকে। ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে আসছে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিষয়। চীন ও ভারতের সম্পর্কে কূটনৈতিক সমীকরণ বাংলাদেশের অনুকূলে আসছে না। মিয়ানমার যা পারছে; বাংলাদেশ তা পারছে না।

বাংলাদেশ স্বীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশীদের নির্বিচারে গুলি করে মারছে। বাংলাদেশে ঢুকে লোকজন ধরে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছে তারা। পত্রপত্রিকায় এসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আমাদের দেশের বিজিবি অনেক ক্ষেত্রে এসব ঠেকাতে পারছে না। বিএসএফের সাথে ‘পতাকা বৈঠক’ করে বিজিবি কেবল লাশগুলো ফেরত এনেই দায়মুক্ত হতে পারে না। সোজা কথায়, সীমান্তের অধিবাসীদের পুরোপুরি নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশী নাগরিকদের যারা গুলি করে মারছে, সেই বিএসএফকে দোষ দিয়ে ‘লাভ নেই।’ তার এমন বক্তব্য বিশেষ করে সীমান্তের মানুষদের আরো সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে- সীমান্ত যদি অরক্ষিত থাকে, সীমান্তে যদি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা না থাকে; তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্থকতা কোথায়? অরক্ষিত স্বাধীনতা পরাধীনতার নামান্তর নয় কি?

‘মাঝরাতের নির্বাচনে’র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেল এবার ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটাররা নির্বাচন কমিশনকে ‘উচিত জবাব’ দিয়েছেন। মসজিদে মাইকিং করে টেনেটুনে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়েছে। কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে আর কী কী হয়েছে তা সবাই জানেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলতে বাধ্য হয়েছেন, এমন নির্বাচন আমরা চাইনি। মনে হয়, তিনি ওই বক্তব্যে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়েছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় নির্বাচনের নামে যা হয়েছে; এটা কোন ভাষায় বলা যেতে পারে সেটি আমাদের জানা নেই। প্রশ্ন উঠছে, জনগণকে এভাবে নির্বাচনবিমুখ করার পরিণাম যে ভয়াবহ হতে বাধ্য সংশ্লিষ্টমহল তা বুঝেও না বোঝার ভান করছে কি না। ‘রাজচালাকি’র নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আর সুশাসন কায়েম হয় না। ঢাকাবাসী তাই এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতঃর্স্ফূতভাবে যোগ দেয়নি। ৭৫ শতাংশের মতো ভোটার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না হয়ে। ইভিএমে পাওয়া ভোটের সংখ্যা দিয়ে নির্বাচনের ফল বিচার করা সঠিক হবে বলে মনে হয় না। ভোটের আসল ফল তো নির্ধারণ করে দিয়েছে ৭৫ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রে হাজির না হয়ে। এ অনুপস্থিতি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষ এত উন্নয়নের জোয়ারের মধ্যেও আসলে ভালো নেই। তারা ধন-মান ও জান রক্ষায় পেরেশান। অনেক মানুষ এখন বিকল্প তথা প্রকৃত বিরোধী দলের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।


আরো সংবাদ