৩১ মার্চ ২০২০

দিল্লিতে ধর্মনিরপেক্ষতার কফিন

-

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার দিন ধরে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতের রাজধানী দিল্লির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ সন্ত্রাসী আক্রমণে ৫০ জন মানুষ নিহত এবং ৩৫০ জনেরও বেশি আহত হয়। এ ঘটনাকে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গা না বলে সন্ত্রাসী আক্রমণ বলার যৌক্তিকতা আছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সাধারণত দুটি সম্প্রদায়ের পরস্পরবিরোধী আক্রমণে ঘটে থাকে। কিন্তু দিল্লিতে ওই ঘটনায় একটি সম্প্রদায় অন্য একটি সম্প্রদায়ের ওপর বিনা উসকানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই সন্ত্রাসী আক্রমণ চলাকালীন সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছিলেন। অবশ্য এটাই হলো আধুনিক বিশ্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চরিত্র। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সশস্ত্রবাহিনী এবং সরকারের মদদপুষ্ট মিলিশিয়া বাহিনী যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিধনযজ্ঞ চালায়, তখন তাই হয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কারণ এসব যুদ্ধে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী বা উগ্রবাদী ও চরমপন্থী ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় এবং যুদ্ধের শিকার হয় নিরীহ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। তবুও তাকে বলা হয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অন্য দিকে, অমুসলিম কোনো সম্প্রদায় বা অমুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো সন্ত্রাসী যদি নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করে তখন সেই সন্ত্রাসী হয় Lone Wolf বা ‘বিচ্ছিন্ন নেকড়ে’ অথবা তা হয় একটি বিচ্ছিন্ন আক্রমণের ঘটনা। মূলত এটাই হলো আজকের বিশ্বের সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী আক্রমণের ব্যাখ্যা।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে দীর্ঘ চারদিন যাবত উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যে সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল তার চরিত্র বা পূর্বাপর পরিস্থিতির দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়, এই আক্রমণ ছিল পূর্বপরিকল্পিত। এই আক্রমণ কোনোভাবেই হঠাৎ ঝলসে ওঠা কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি নয়। আসামে সূত্রপাত ঘটা ‘জাতীয় নাগরিকপঞ্জি’ বা এনআরসির হাত ধরে যে ‘নাগরিকত্ব সংশোধন আইন’ বা সিএএ গত ডিসেম্বরে ভারতীয় পার্লামেন্টে পাস হয় তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সারা ভারতজুড়ে সব ধর্মের গণতন্ত্রপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষমনা নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় উত্তর-পূর্ব দিল্লির মুসলমান নাগরিকরা লাগাতার আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। রাষ্ট্রীয় পুলিশের অনেক দমন-পীড়নের মধ্যেও তারা তাদের দাবিতে অনড় থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। কারণ ভারতীয় মুসলমানরা এই আইনের ফলে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল এবং এই আইন প্রকৃতপক্ষে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চরিত্রের পরিপন্থী হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে। এই আন্দোলন চলমান থাকাবস্থায় উত্তর-পূর্ব দিল্লির জাফরাবাদ, মুস্তফাবাদ, রানিবাগ, পোকুলপুরী, মৌজপুরী, শিবপুরী ইত্যাদি এলাকায় মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করা হয়, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং সহায়-সম্পদ লুটপাট করা হয়। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র এবং দেশী ধারাল অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালানো হয়। এমনকি এসিড নিক্ষেপের মাধ্যমেও অনেককে ঝলসে দেয়া হয়। হামলা বন্ধের পর পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর থেকে এমন কি নর্দমা, নালা ও ডোবা ইত্যাদি থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসলে গুজরাটের নাটক রাজধানী দিল্লিতে মঞ্চস্থ করলেন। তিনি ২০০১ সালে গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মাথায় সেখানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়েছিল। সেখানে প্রায় দুই সহস্রাধিক মুসলমান নির্মম হত্যার শিকার হয়েছিলেন। সেটাও প্রকৃতপক্ষে ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের একতরফা সন্ত্রাসী হামলা। একটি চলন্ত ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে বেশ কিছু যাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজরাটে মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর সে দিন নির্মম আক্রমণ চালানো হয়েছিল। সেই আক্রমণেও নির্বিচারে মুসলমান হত্যাকাণ্ড চলাকালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছিলেন নিশ্চুপ। তিনি নির্বিকার থেকে মুসলমান হত্যাকাণ্ডের যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। এবারের হত্যাকাণ্ডে তিনি দিল্লির মসনদে বসে তিন দিন রাজধানীর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহরগুলোতে ঘটতে থাকা এই গণহত্যার ঘটনা নীরবে দেখছিলেন। এরপর হত্যাকাণ্ডের ৬৯ ঘণ্টা পরে তিনি ‘শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের’ ডাক দিয়ে বিবৃতি দেন। ততক্ষণে হামলাকারীরা উত্তর-পূর্ব দিল্লিকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। ঘর-বাড়িগুলোতে আছে শুধু ধ্বংসাবশেষ, আর বেঁচে থাকা মানুষগুলো হয় হাসপাতাল অথবা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দয়ায় খোলা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত হয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় পুলিশ ছিল, তবে তারা ছিল সুবোধ দর্শক অথবা হামলাকারীদের সহায়তাকারী। পুলিশের এই ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে দিল্লির হাইকোর্টের বিচারক এস মুরলিধর এই আক্রমণের ইন্ধনদাতা হিসেবে কপিল মিশ্রকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে ‘এফআইআর’ করার নির্দেশ দেন। কারণ, কপিল মিশ্র সে দিন বিকেলে বিজেপির এক জনসভায় আন্দোলনকারীদের আন্দোলন বন্ধ না করলে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু বিচারপতি মুরলিধর এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাঞ্জাবে বদলির আদেশ হাতে পান বলে জানা যায়। এ দিকে কপিল মিশ্রর উসকানিমূলক বক্তব্যের পরই উত্তর-পূর্ব দিল্লির রাস্তায় এবং অলিগলিতে স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র ও তলোয়ার সজ্জিত সন্ত্রাসীদের ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় এবং ওই সমাবেশে তার বক্তব্যের পরই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাটি ঘটে। অবশ্য গত কয়েক মাস ধরেই বিজেপি নেতারা সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে মারাত্মক উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি বিজেপির কর্নাটকের এমএলএ সোমা শেকড় রিড্ডি সিএএ-বিরোধী আন্দোলনকারীদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা (হিন্দু সম্প্রদায়) ভারতের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ আর তোমরা (মুসলিম সম্প্রদায়) মাত্র ১৭ ভাগ। চিন্তা করো, কী হবে যদি আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে লেগে যাই? আর এখানে তোমরা মাত্র ৫ শতাংশ। কাজেই তোমরা আরো সমস্যা সৃষ্টি করলে যদি আমরা শতভাগ লোক তোমাদের আক্রমণ করি, তাহলে তোমাদের অবস্থার কথা চিন্তা করেছ কি? এর কিছুদিন আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভারতের মুসলমানদের ‘উইপোকার’ সাথে তুলনা করেছিলেন এবং তাদের একজন একজন করে ধরে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার হুমকি দিয়েছিলেন (দ্য ডেইলি স্টার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃষ্ঠা-৬)।

ভারতের উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলমান একসাথে বসবাস করে আসছে। এমনকি হামলা চলাকালে তাদের মধুর সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটেছে। অনেক হিন্দু তাদের জীবন বিপর্যস্ত করে প্রতিবেশী মুসলমানদের নিরাপত্তা দিয়েছে। কাজেই প্রশ্ন হলো, এই আক্রমণকারীরা তাহলে কারা? এ ব্যাপারে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, আক্রমণকারীরা বহিরাগত। এ জন্য তিনি আগেই সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়ে ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। কেজরিওয়াল এই হত্যাকাণ্ডের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের উসকানিকেও দায়ী করেন। এ দিকে সমালোচকদের অনেকেই মনে করেন, দিল্লির মুসলিম ভোটের কারণেই সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি ঘটেছে। কাজেই এমনিতেই তারা দিল্লির মুসলমানদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের মধ্যেই এই আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। ট্রাম্পের এই সফর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ট্রাম্পের সফরের মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে ভারতের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে ভারত-মার্কিন সামরিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি সুস্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অন্য দিকে, ট্রাম্প সিএএকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে ঘোষণা দেয়ায় ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা উৎসাহিত হয়েছে বলে মনে হয়। সব মিলে ট্রাম্পের এই সফর আক্রমণকারীদের পালে বাতাস দিয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। পুরো বিষয়টাকে চিন্তা করলে কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে :

ক. বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বিজেপি নেতারা বিভিন্ন জনসভায় সরাসরি মুসলমানদের হুমকি দিয়ে আসছিলেন যা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এসেছে। সরকার এসব তথ্য জেনেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এমনকি কপিল মিশ্ররা যখন জনসভায় সরাসরি মুসলমানদের আক্রমণের হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন তার পাশেই পুলিশ অফিসার অবস্থান করছিলেন। কিন্তু কেন সম্ভাব্য আক্রমণ বন্ধের জন্য কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো না?

খ. আক্রমণের সময় নির্ধারণের বিষয়টিও একটি বড় প্রশ্নের সৃষ্টি করে। কেন ট্রাম্পের সফরের প্রাক্কালে এই আক্রমণ করা হলো? এটা কি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস প্রাপ্তির ফসল নাকি এটিকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করার একটি প্রয়াস ছিল?

গ. উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে হিন্দু-মুসলমান দীর্ঘদিন যাবত নিবিড় প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করছে এবং হামলার সময় স্থানীয় হিন্দুরা মুসলমান প্রতিবেশীকে রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছে। তাহলে হামলাকারী আসলে কারা? কারা সশস্ত্র অবস্থায় শহরের রাস্তা ও অলিগলিতে টহল দিয়েছে? এরা নিশ্চয়ই বহিরাগত যা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালও বলেছেন। কাজেই এটা শুধুই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলে কেবল বহিরাগত হিন্দুরা কেন আক্রমণে অংশগ্রহণ করল? আর কেনই বা স্থানীয় হিন্দুরা তাদের মুসলমান প্রতিবেশীকে রক্ষা করেছে? তাহলে কি সম্পূর্ণ বহিরাগতরাই এই আক্রমণ পরিকল্পিতভাবে করেছে?

ঘ. পুলিশ কেন নীরব থেকে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি করে দিলো? ২৩ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি এই চার দিনে আক্রান্ত মুসলমানরা বাঁচার আকুতি নিয়ে ১৩ হাজার ২০০টি ফোন করেছিল পুলিশ প্রশাসনকে (এনডিটিভির প্রতিবেদন মোতাবেক)। কিন্তু তারপরও পুলিশ কেন সাড়া দেয়নি বা তৎপর হয়নি হামলা বন্ধের জন্য? তাহলে কি পুলিশ একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যার সুযোগ করে দেয়ার জন্যই এ ধরনের নীরবতা পালন করেছে? দিল্লিতে প্রায় ৮০ হাজার পুলিশ সদস্য থাকা সত্ত্বেও কেন মাত্র কয়েকটি এলাকার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলো?

ঙ. পুলিশের বাইরে আধাসামরিক বাহিনীও ছিল দিল্লিতে, যারা এ ধরনের সন্ত্রাসী আক্রমণ ঠেকাতে সম্পূর্ণ সক্ষম। কিন্তু তা করা হয়নি। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল সেনাবাহিনী নামানোর দাবি জানিয়েছিলেন যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাকচ করে দিয়েছে। তাহলে কি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বেচ্ছা-নীরবতা ছিল হামলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য? এমন সব প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে।

আসলে ভারতের সাম্প্রতিককালের ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ভারতের নিরীহ মুসলমানদের রেডিক্যালিজম বা উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। যদিও মনে করা হচ্ছে, রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে সেখানকার মুসলমানদের কোনোভাবে উগ্রবাদে জড়িয়ে ফেলতে পারলে তাদের কোণঠাসা করে হিন্দুত্ববাদের আড়ালে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এতে ভারতই চূড়ান্ত বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোনো ধর্মেরই উগ্রবাদ বা চরমপন্থা অবলম্বন কখনো কারো জন্যই কল্যাণকর হতে পারে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একটির পর একটি ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে ভারতের মুসলমানদের হতাশাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আসামে ‘এনআরসি’র বেড়াজালে আটকে মুসলমানদের নাগরিকত্বহীন করে ফেলা হয়েছে। কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে পুরো কাশ্মিরবাসীকে কারাগারে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। কাশ্মিরের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন করে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য কমানোর পথ খুলে দেয়া হয়েছে। এরপর সিএএ’র মাধ্যমে পুরো ভারতের মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে পরিণত করার পদক্ষেপ পাকাপোক্ত করা হয়েছে। সবশেষে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে বিনা উসকানিতে মুসলমানদের ওপর একতরফা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ভারতের মুসলমানদের ভীতসন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে ভারতের মুসলমানদের ঠেলে ঠেলে দেয়ালে চেপে ধরার প্রক্রিয়ায় তাদের উগ্রবাদের ফাঁদে আটকানোর একটি পাঁয়তারা চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এ ছাড়া এই প্রক্রিয়ায় কোনো মুসলিম উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবে আহ্বান করা হচ্ছে- যেন তারা ভারতে প্রতিশোধমূলক কোনো সন্ত্রাসী আক্রমণ করে এবং ফলে ভারতের নিরীহ মুসলমানদের কপালে রেডিক্যাল বা উগ্রবাদের কলঙ্ক লেপন করে দেয়া সম্ভব হয় এবং এর ফল কট্টর হিন্দুত্ববাদী সরকার পুরোটাই ভোগ করতে পারবে। ইতিহাসে জানান দেয়, ফিলিস্তিনে উগ্রবাদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া এমনটিই ছিল। ইসরাইলিদের হাতে নিগৃহীত হতে হতে সামান্য পাথর ছোড়া বালক-বালিকাদের মধ্য থেকেই উগ্রবাদীদের উদ্ভব হয়েছিল। যেখান থেকে আফগানিস্তান, আলজেরিয়া হয়ে চেচনিয়া পর্যন্ত এই উগ্রবাদের চাষ করা হয়েছিল। নিরীহ মুসলমানদের উগ্রবাদের ফাঁদে আটকে ফেলা হয়েছিল। বর্তমানে এই উগ্রবাদের ছোবলে সারা বিশ্ব দংশিত হচ্ছে। কাজেই ভারতে নতুন করে উগ্রবাদের সৃষ্টি হলে তার অভিশাপও সারা বিশ্বকেই বহন করতে হবে। ভারতের ‘বিজেপি’ সরকারের সঙ্কীর্ণগোষ্ঠীস্বার্থ হাসিলের প্রক্রিয়ায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সভ্য সমাজের আমরা সবাই নিরাপত্তাহীন হয়ে যাবো এটা হতে পারে না। কাজেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ছলা-কলায় ভুল পথে যাওয়া থেকে আমাদের সরে থাকা উচিত।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : [email protected]


আরো সংবাদ