০২ এপ্রিল ২০২০

নোয়াম চমস্কির সাক্ষাৎকার : ভারতে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ

নোয়াম চমস্কির সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন কার্তিক রামনাথন - ছবি : সংগৃহীত

[নোয়াম চমস্কি বিশ্বখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী, প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের প্রফেসর। এর আগে বিখ্যাত এমআইটিতে শিক্ষকতা করেছেন অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল। তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান সমালোচক। চমস্কির এ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী কার্তিক রামনাথন ক্যালিফোর্নিয়াতে হাইটেক চাকুরে। তিনি মানবাধিকার, যুদ্ধের বিরোধিতা, ল্যাটিন আমেরিকার জনগণের সাথে একাত্মতা, ভারতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা প্রভৃতি ইস্যুতে সক্রিয় কর্মী ও লেখক। এ সাক্ষাৎকার ভাষান্তর করেছেন মীযানুল করীম।]

কার্তিক রামনাথন : বিভিন্ন দেশে নব্য ফ্যাসিবাদী শক্তি ও দক্ষিণপন্থীরা যে তৎপরতা চালাচ্ছে, এতে অনেকেই নিজেদের বিশেষ কোনো জাতি বা গোত্রের অংশ হিসেবে দেখছে সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে। এসব বিভাজন অতীতের বিভেদের পরিণাম বলে আপনার কতটা মনে হয়?
নোয়াম চমস্কি : এর অনেক দিক আছে। প্রত্যেক এলাকার নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। ভারত আর হাঙ্গেরি এক নয়; যুক্তরাষ্ট্রের মতোও নয়। বিশ্বের বেশির ভাগ বিষয়ের চেয়ে বড় যে বিষয়টি, তা হলো- বিশেষত রিগ্যান ও থ্যাচারের সময় থেকে আমেরিকা ও ইউরোপে কিছু আর্থসামাজিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- বাজারীকরণ, জনগণের পরিষেবা, রাষ্ট্রের ভূমিকা ক্ষুণ্ন করা, সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি খাতে হস্তান্তর প্রভৃতি। এ সবকিছুর ফলাফল অত্যন্ত স্পষ্ট। জনগণ দেখতে পেয়েছে সম্পদের পুঞ্জীভূতকরণ এবং এক ধরনের অচলাবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রে এখন জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কাছে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ২০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক মানুষই সপ্তাহভিত্তিক আয়রোজগার দিয়ে কোনো মতে চলছে। আর এ দেশে ‘প্রকৃত মজুরি’র অবস্থা হচ্ছে, এর ক্রয়ক্ষমতা বিগত শতাব্দীর ’৭০-এর দশকের পর্যায়ে নেমে গেছে। সম্পদের তীব্র পুঞ্জীভূতকরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্রের কার্যকারিতাকে কমিয়ে দিয়েছে। এর কারণ, ধনিক শ্রেণী রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। আর ইউরোপে এ অবস্থা আরো প্রকট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা ইইউ’র কাঠামোর কারণে। এখন ইউরোপের প্রধান প্রধান ইস্যুতে আর বিভিন্ন রাষ্ট্র নয়, ব্রাসেলসে ইইউ’র অনির্বাচিত আমলারাই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। তদুপরি, তাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি মারছে জার্মানির ব্যাংকগুলো। তারা কৃচ্ছ্রের নীতি মেনে চলছে, যা নব্য উদারতাবাদী নীতিমালাকে আরো মন্দ বানিয়ে ফেলেছে।
এ সবকিছুর যে পরিণতি, তা ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। তা হলো, মধ্যপন্থী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল ক্রোধ ও ক্ষোভ, তিক্ততা ও নিন্দা। যুক্তরাষ্ট্রেও এটা দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু লোক উঠে আসেন। যেমনÑ (আমেরিকার) ট্রাম্প, হাঙ্গেরির (নামটি অস্পষ্ট) কিংবা ব্রাজিলের বোলসোনারো। তারা এই ক্রোধকে প্রকৃত রোগ নির্ণয়ের কারণ বানাতে চান।

কার্তিক : জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা যে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। গত কয়েক বছরে গিটার বাজানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছি। বহু মানুষই আমার চেয়ে ভালো সঙ্গীত প্রতিভার অধিকারী। কিন্তু দেখা যায়, তাদের সংগ্রাম করে চলতে হচ্ছে। তবুও তারা সহৃদয় ও মানবিক। এটা বললাম এ কারণে যে, মধ্যবিত্তরা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে বলে দেখা গেলেও মানবতাকে আঁকড়ে রাখায় প্রয়াসও তাদের মাঝে বিদ্যমান। আমি নিজে ভারতের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক। বাবা একজন শিক্ষক। ভারত খুব গরিব দেশ। তবে ভারতীয় মধ্যবিত্তদের নব উদারতাবাদের সময়কালের ব্যতিক্রম বলতে হয়। কারণ, এই মধ্যবিত্তরা গত ২০ বছরে ক্ষমতা ও সম্পদ করায়ত্ত করেছে। কিন্তু আপনি দেখতে পাচ্ছেন, তারা সমর্থন দিচ্ছে হিন্দু ফ্যাসিবাদী শাসনকে। এর কারণ কী?
নোয়াম চমস্কি : মধ্যবিত্ত শ্রেণী লাভবান হয়েছে বলে মনে করি না। বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে, তারা আসলে স্থবির হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি। কিন্তু গত ৪০ বছরেও এর দ্বারা শ্রমজীবী শ্রেণী ও পাতি বুর্জোয়াদের কোনো লাভ হয়নি। তারা তাই ক্ষুব্ধ। ট্রাম্পের মতো কেউ কেউ এই ক্ষোভের অপব্যবহার করতে পারেন। তারা বলছেন, “এ অবস্থার জন্য আপনারা নন, দরিদ্র জনগোষ্ঠী-কৃষ্ণাঙ্গ-হিস্পানিকরা-মুসলমানরা দায়ী। মোদিও একই কাজ করছেন। চরমপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। (তাদের কথা হলো) ‘তারা’ আমাদের দেশটাকে নিয়ে যাচ্ছে। এই মুসলমানদের কবল থেকে মুক্ত হতে হবে।”

কার্তিক : কী ঘটনা ঘটছে, তা দেখতে পাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রে এসব হচ্ছে। ভারতের পরিস্থিতি আরো জটিল। ভারতে গরিব আরো গরিব হয়েছে। মধ্যবিত্তরা রয়ে গেছে সেই মধ্যবিত্তই।
নোয়াম চমস্কি : এ কথা নির্ভর করছে, আপনি ‘মধ্যবিত্ত’ বলতে কী বুঝাচ্ছেন তার ওপর। আমি ‘মধ্যবিত্ত’ বলতে শিক্ষকদের বুঝাচ্ছি। তাদের অবস্থার উন্নতি হয়নি। যা হোক, উচ্চ প্রযুক্তি খাতের লাভ হয়েছে। যেসব লোক প্রকৌশল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট, লাভ হয়েছে তাদের। কিন্তু ভারতে লাখ লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছে। তাদের অবস্থা ভালো যাচ্ছে না।

কার্তিক : আপনার সাথে আমি পুরো একমত যে, গ্রামীণ খাতের অবস্থা ভালো নয়। তবে প্রকৌশলী আর চাষিদের মাঝে আরেকটি খাত আছে। যেমন, আপনি বললেন শিক্ষকদের কথা। নগরীতে এবং ধনবান রাষ্ট্রে শিক্ষকরাও নব্য উদারনীতির সুফল পেয়েছেন। এটাই সত্য যে, তাদের লাভ হয়েছে। কারণ, রাষ্ট্র ও সরকার আরো সম্পদশালী ও ক্ষমতাশালী হয়েছে। বেতন বেড়েছে স্কুলশিক্ষকদের।
নোয়াম নমস্কি : প্রকৃত মজুরির হিসেবে গত ৩০ বছরে তা কি বেড়েছে?

কার্তিক : পরিমাণটা বলতে পারছি না। তবে নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- বাবা চেন্নাইতে ছিলেন একজন শিক্ষক। তাদের মাসিক আয় হতে পারে ৯০০ থেকে হাজার ডলার; মানে, ৪০-৫০ বা ৬০ হাজার রুপি। তিন দশক আগে এটা চিন্তা করা যেত না।
নোয়াম চমস্কি : ভারত দেশটা অনেক বেশি ধনী হয়ে গেছে আগের তুলনায়। তবে সে দেশে বৈষম্য বিরাট।
কার্তিক : অবশ্য অবশ্যই। বৈষম্য যে বেড়েছে, সে ব্যাপারে আমি একমত। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
নোয়াম চমস্কি : এর অর্থ, লাখ লাখ মানুষ উপেক্ষিত হয়েছে। ভারতে তিন কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি পর্যন্ত পায় না। এ সংখ্যাটি কিন্তু কম নয়।

কার্তিক : আপনি যে অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বললেন তা সত্য। যা হোক, একটি বিষয় আপনি তুলে ধরেছেন, মানুষ গলাবাজদের এ কথায় প্রভাবিত হচ্ছে যে, “পাকিস্তান, মেক্সিকো বা আর কোনো ‘শত্রু’ আমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিচ্ছে।” এ ক্ষেত্রে আছে অজ্ঞতার ইতিহাস। কারণ, ’৬০ ও ’৭০-এর দশকে কংগ্রেসের আমলেও (তখন কংগ্রেস ছিল তার ক্ষমতার চূড়ায়) পাকিস্তানকে তুলে ধরা হয়েছিল ‘দুশমন দেশ’ হিসেবে। আর সব সময় কাশ্মিরকে দেখানো হয়েছে ‘ভারতের অংশ’ হিসেবে। অতএব, আমি মনে করি, অর্থনীতির বাইরে অন্য কারণেও বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
নোয়াম চমস্কি : প্রায় ১৬ বছর আগে ভারতে বক্তব্য রাখছিলাম। এক বক্তৃতায় বলেছি ১৯৮৭ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচনের পর কাশ্মিরে ভারতের নির্যাতনের কথা। পরদিন অন্য এক জায়গায় বক্তব্য দিচ্ছিলাম। সেখানে বিজেপির বহু লোক বিক্ষোভ করল। তখন ওই সভার উদ্যোক্তারা জোর দিয়ে বললেন যেন আমি পুলিশ প্রটেকশন নিই।

কার্তিক : মনে হয়, আমার উপস্থিতি ছিল, আপনার প্রথম এমন কোনো বক্তৃতানুষ্ঠান সেটা। খুবসম্ভবত ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে বা সে মাসের শেষ দিকে দিয়েছিলেন সে বক্তৃতা। মনে পড়ছে, এরপর আপনার সাথে ই-মেইলে আলাপ হয়েছিল আমার।
নোয়াম চমস্কি : মোদি কাশ্মিরে যা করেছেন, হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিপুল সমর্থন আছে এর প্রতি।

কার্তিক : হ্যাঁ। এর পেছনে অর্থনীতি ছাড়াও কারণ আছে। তা হলো, বিভাজন। অজ্ঞতা ও প্রপাগান্ডা জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করেছে।
নোয়াম চমস্কি : একটি ব্যাপার হলো, সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে ব্যাপকভাবে। তারা মোটেও সমালোচনা করছে না।

কার্তিক : আপনি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে বলেছেন, বিশ্বে যা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে নাৎসিবাদ না হলেও এর সমান্তরাল ঘটনা ঘটছে। ভারতের ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? কারণ, ভারতে মুসলমান নাগরিকদের অবৈধ অভিবাসীরূপে অভিহিত করে কয়েক মিলিয়ন মুসলমানকে রাখার জন্য বন্দিশিবির তৈরি করা হচ্ছে।
নোয়াম চমস্কি : আমরা যা দেখছি, তা হলো- ফ্যাসিবাদী আদর্শ ছাড়াই ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। ‘ফ্যাসিবাদ’ বলতে বুঝাত শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং সব কিছু নাৎসিবাদী অথবা ফ্যাসিবাদী দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা। এ দল এমনকি, ব্যবসা-বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করত। ভারতে তা দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্র সে দেশে বৃহৎ ব্যবসার নিয়ন্ত্রক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও একই। আমাদের এখানে ফ্যাসিবাদের অনেক লক্ষণই দৃশ্যমান। সীমান্তে বন্দিশিবির রয়েছে। বর্ণবাদের কথাও জানেন। অথচ অতীতে জার্মানি রাষ্ট্র এত শক্তিশালী ছিল যে, শুধু শ্রম নয়, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করত ব্যবসাকেও। রাষ্ট্র সব সংগঠনকেই নিয়ন্ত্রণ করত। ট্রাম্প যখন প্রতিটি কোম্পানিকে চীন থেকে বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দেন, তখন ছোঁয়া পাওয়া যায় নাৎসিবাদের।

কার্তিক : পি চিদাম্বরম ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কংগ্রেস দলের রাজনীতিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরূপে কাশ্মিরে দখলদারির বিষয় তিনি পরিচালনা করতেন। তখনো নৃশংসতা চালানো হয়েছিল সেখানে। অবশ্য এখন নৃশংসতা হচ্ছে বেশি। আপনি কি এটা লক্ষ করেছেন?
নোয়াম চমস্কি : কাশ্মির ইস্যুতে কংগ্রেসের রেকর্ড পচা। তাদের শাসনামলে কাশ্মিরে ব্যাপক বর্বরতার পরিচয় দেয়া হয়েছে।

কার্তিক : ঠিক বলেছেন। দুনিয়ার অন্যান্য দেশের দৃষ্টান্তও দিতে পারেন। কথা হলো, চিদাম্বরম যখন কাশ্মিরে দখলদারীর দেখভাল করতেন, তখন তার প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি বিজেপির সমালোচনা করলেন একই কারণে। বললেন, কাশ্মিরকে বশংবদ বানানো হচ্ছে, তখনই তাকে জেলে ঢুকানো হয়েছে। তা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও।
নোয়াম চমস্কি : ভারতের পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সেই সাথে হিন্দু জনগণের বিরাট অংশ কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা এবং সেখানে ভারতের বসতি স্থাপনের পথ করে দেয়াকে জোরালোভাবে সমর্থন করছে। মনে হয়, তারা জানে না যে, কাশ্মিরে কী ঘটছে।

কার্তিক : ভারত নামের দেশটিতে একটি ভালো সরকার কায়েম করা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ? কাশ্মিরের জনগণের সংগ্রামের মতো গণসংগ্রামকে সমর্থন জোগাতে এটা দরকার। ভারতে একটি মধ্যপন্থী, মধ্যবামপন্থী কিংবা ফ্যাসিস্ট নয়, এমন সরকার থাকা কতটা গুরুত্ব বহন করে? এমন সরকার থাকা কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ যারা বিদেশের সংগ্রামকে সমর্থন জোগাবেন?
নোয়াম চমস্কি : রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে, অধিকতর উদার সরকারগুলো স্বাধীনতা ও সুবিচারের আন্দোলনকে কোনোভাবেই এবং কোথাও সমর্থন দেয়নি। তারা তাদের শত্রুদেশে স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করলেও তাদের অনুকূল দেশের সংগ্রামকে সমর্থন দেয় না। এ ধরনের সরকার ইচ্ছামতো নির্যাতন ও বর্বরতা চালাতে পারে। দক্ষিণপন্থীরা কোনো কোনো সময়ে আরো মন্দ হতে পারে। ওবামার কথাই ধরা যাক। মধ্য আমেরিকা থেকে পলায়নপর উদ্বাস্তুদের দিকে দেখুন। বেশির ভাগ উদ্বাস্তুই হন্ডুরাসের। কেন? কারণ, ২০০৯ সালে সেখানে হয়েছিল সামরিক অভ্যুত্থান। এর ফলে একজন সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্টের পতন ঘটে। মহাদেশজুড়ে এর নিন্দা করা হলেও ওবামা ও ক্লিনটন নিন্দা জানাতে অস্বীকার করেন। এ দিকে, হন্ডুরাসে এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো যে, মানুষ সে দেশ ছেড়ে পালাতে থাকে।

কার্তিক : কাশ্মির ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো আন্দোলনকে মার্কিন জনগণ সমর্থন করার জন্য কী করা দরকার?
নোয়াম চমস্কি : দরকার জনগণের ব্যাপক আন্দোলন, যা করা কঠিন। ভিয়েতনামে আগ্রাসন চালানো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন জমে উঠতে কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন হচ্ছে বেশ উদার শহর। সেখানেও আমরা জনগণের বিক্ষোভ সংঘটিত করতে পারিনি। কারণ, পাল্টা বিক্ষোভকারীরা এটা ছত্রভঙ্গ করার আশঙ্কা ছিল। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত অবস্থা ছিল এ রকম। ততদিনে ভিয়েতনাম বাস্তবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। বহু বছর ধরে আমাকে কাজ করতে হয়েছে, যেন পূর্ব তিমুরে ইন্দোনেশীয় হামলার কিছুটা বিরোধিতা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটা ছিল সর্বাধিক ভয়াবহ গণহত্যা। পুরো সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র এতে মদদ দিয়েছে। ’৯০-এর দশকে তুরস্ক কুর্দিদের ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যা করছিল। এ জন্য অস্ত্রশস্ত্রের প্রায় পুরোটাই আসছিল ক্লিনটনের কাছ থেকে। এ ব্যাপারে কোনো সংবাদ ছাপা হচ্ছিল না এবং দেখা যাচ্ছিল না কোনো প্রতিবাদ। আজ কেউ জানে না, তখন কী ঘটেছিল। মাত্র দুই ব্যক্তি এর বিরোধিতা করেছেন, যার একজন আমি নিজে। কাজটা সহজ নয়।

কার্তিক : আমি জানি, সম্প্রতি মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের বিরুদ্ধে ছিলেন আপনি। ইউক্রেন নিয়ে নতুন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক মহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট প্রসঙ্গে বিপুল উত্তেজনা ছিল বলে কি মনে করেন? এখন তার ইমপিচমেন্টের উপযুক্ত সময় বলে কি আপনার ধারণা?
নোয়াম চমস্কি : না, মনে করি না। ইমপিচমেন্ট ইস্যুতে যেসব বিষয়ে জোর দেয়া হলো, সে দিকে নজর দিন। কথা হচ্ছে, ইমপিচমেন্ট-বিষয়ক শুনানিতে যেসব অপরাধের ব্যাপারে অভিযোগ আনা হলো, সেগুলো কী কী? বলা হয়েছে, ‘(ট্রাম্প) ডেমোক্র্যাটদের গায়ে কালিমা লেপনের সুযোগ খুঁজছিলেন।’ তিনি দেশের ক্ষমতাব্যবস্থাকে আক্রমণ করছিলেন। একই ঘটনা দেখা গেছে ‘ওয়াটারগেট’ কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে। তখনকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের যা প্রধান অপরাধ, সেদিকে কেউ লক্ষ করেনি। বলা হয়েছিল, ‘তার নিয়োজিত দুর্বৃত্তরা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদর দফতরে অনুপ্রবেশ করেছিল।’ ক্ষমতাবানদের কেউ আক্রমণ করে না। কারণ, তারা পাল্টা হামলা চালাবে। এ দিকে, বড় বড় অপরাধকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

কার্তিক : আপনি দেখছেন, কুর্দিদের ওপর যা চলছে, তা অভিশংসনের কারণ হচ্ছে না।
নোয়াম চমস্কি : না, হচ্ছে না। ট্রাম্প তুর্কিদের করুণার ওপর ছেড়ে দিলেন কুর্দিদের। এজন্য লিন্ডসে গ্রাহাম ও অন্যরা ট্রাম্পের নিন্দা জানান। তারা বললেন, ‘এতে আইএসের বিরুদ্ধে পরিচালিত লড়াই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।’ কিন্তু কুর্দিদের ব্যাপারে তাদের খেয়াল নেই।

কার্তিক : সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম (সিরিয়ায়) কুর্দিদের পরিত্যাগ করাকে তুলনা করেছেন ইরাক ছেড়ে আসার সাথে। এই তুলনা কি বাস্তবসম্মত?
নোয়াম চমস্কি : যখন সাদ্দাম হোসেন কুর্দিদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে হামলা করছিলেন, তখন আমেরিকার রিগ্যান প্রশাসন তাকে সমর্থন জুগিয়েছে। কুর্দিদের ওপর এই হামলার দায় ইরানের ওপর চাপাতে চেয়েছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন কংগ্রেস হামলার সমালোচনা করে প্রস্তাব নিতে গেলে রিগ্যান প্রশাসন এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। অপর দিকে, কুর্দিদের শেষ করে দেয়া হয়েছে এবং তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বারবার। কিসিঞ্জার, রিগ্যানরা যা করেছেন এবং এখন যা করা হচ্ছে, এসব নতুন নয়।


আরো সংবাদ