০৬ এপ্রিল ২০২০

বাংলাদেশে বাংলাচর্চা

-

১৯৭৩ সালে ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে কিছু দিন সে পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছিলাম। সে সময়ে শাপলাকে ‘জাতীয় ফুল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আমার ওপর ভার পড়ল এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগ থেকে এর বৈজ্ঞানিক নাম (Nymphaea nouchali) ও আনুষঙ্গিক কিছু তথ্য সংগ্রহ করে বাংলা বিভাগে এলাম। উদ্দেশ্য বাংলা কাব্যসাহিত্যে তথা রবিঠাকুরের কবিতায় এ ফুলটির উল্লেখ আছে কি না তা জানা। তখন বাংলা বিভাগের প্রধান ড. নীলিমা ইব্রাহীম। এ প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সাথে আলাপ করুন।’ আমি তার কক্ষে গেলাম। দেখলাম, তিনি নিবিষ্ট মনে কবিতা লিখছেন। আমাকে দেখে তিনি প্রশ্নবোধক দৃষ্টি মেলে তাকালেন। আমার পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম, ‘বাংলা সাহিত্যের কোনো কবি বা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় শাপলা ফুলের উল্লেখ আছে কি না?’ তিনি বললেন, ‘বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে যান। সেখানে ড. মুহম্মদ এনামুল হক আছেন। তার কাছে জানতে পারবেন।’ আবার বাংলার বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে এলাম।

দেখলাম, বিভাগীয় প্রধানের সামনে অল্প দূরে একটি পৃথক টেবিলে সে বিভাগের কিছু শিক্ষক পরিবেষ্টিত হয়ে ড. এনামুল হক বসে আলাপ করছেন। প্রথমবার আমি তা লক্ষ করিনি। তার সামনে এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে তার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলে তিনি আমাকে বসতে বললেন। তিনি বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় অনেক ফুলেরই উল্লেখ আছে। তবে শাপলা ফুলের ব্যাপারে আমার জানা নেই।’ সেখানে উপস্থিত যারা ছিলেন তারাও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলতে পারলেন না। বললাম, ‘আমরা যখন স্কুলে পড়ি, তখন রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে একটি প্রবন্ধ আমাদের পাঠ্য ছিল। তা থেকে আমার ধারণা হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তার কবিতায় কী কী উপকরণ ব্যবহার করেছেন সে বিষয়েও একটি তালিকা থাকতে পারে।’ শুভ্র-পক্ব কেশধারী ড. এনামুল হক বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথের নানা বিষয়েই গবেষণা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে যদি কিছু হয়েও থাকে তা আমার চোখে পড়েনি।’ তাকে সালাম জানিয়ে বিদায় নেয়ার জন্য ড. নীলিমা ইব্রাহীমের সামনে এলাম।

ড. নীলিমা ইব্রাহীম আমাকে বসতে বললেন। তিনি আমাকে তার একটি দুঃখবোধের কথা জানান। তিনি বললেন, ‘দেখুন, আমাদের মেয়েরা যখন কোনো পার্টিতে, অনুষ্ঠানে বা সভায় যান, তখন খুব সচেতনভাবে লক্ষ করে থাকেন চুলের খোঁপাটা সুচারুভাবে রচিত হলো কি না। শাড়ির সাথে গায়ের ব্লাউজটা ম্যাচ করেছে কি না। কপালের টিপটা, ঠোঁটের লিপস্টিকের রঙটা পোশাকের সাথে মানানসই হয়েছে কি না। স্যান্ডেল জোড়া ড্রেসের সাথে ম্যাচ করেছে কি না ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিষয়ে তারা খুব সজাগ দৃষ্টি রাখেন। একটু এদিক-সেদিক হলে লজ্জায় তাদের মাথা কাটা যায়। পুরুষরাও তাই। স্যুটের সাথে টাইটা ম্যাচ করল কি না। টাইয়ের নটটা পরিপাটি হয়েছে কি না। জুতা জোড়া মানানসই হয়েছে কি না ইত্যাকার ব্যাপারে তারা সজাগ। একটু এদিক-সেদিক হলে লজ্জায় তাদেরও মাথা কাটা যায়। কিন্তু বাংলা ভাষা লিখতে গিয়ে তারা যে বিস্তর ভুল বানান লেখেন, সেজন্য তারা লজ্জাবোধ করা দূরের কথা, বরং আভিজাত্যের হাসি হেসে বলেন, বাংলাচর্চাটা খুব একটা হয়ে ওঠে না।’
কথাটা সত্যি। একটি ইংরেজি পত্রিকার রিপোর্টার বলেই এসব কথা আমাকে শোনালেন কি না, বুঝলাম না। তবে এই প্রৌঢ়া বিদুষী মহিলার কথার সাথে ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পর আমি এখনো একমত। আজকাল লেখালেখির ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যাপক চল হয়েছে। তবে বানানের ব্যাপারে ইংরেজিতে একটি সুবিধা হলো যে, ভুল বানান কম্পিউটারে অটোকারেক্ট হয়ে যায়। সে সুবিধাটি বাংলা বানানের ক্ষেত্রে কম্পিউটারে নেই। এ কারণে বাংলা বইয়ে প্রচুর বানান ভুল থেকে যায়। কৌশলটি উদ্ভাবন করে বাংলা বানানের ক্ষেত্রে কম্পিউটারে ব্যবহার করা যায় কি না তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

আমরা ঘটা করে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করে থাকি। আমার মনে পড়ে, ১৯৭০-এর দশকে প্রথম যেবার বাংলা একাডেমিতে বিশাল প্যান্ডেল করে একুশে উদযাপিত হলো, তখন ড. আশরাফ সিদ্দিকী তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে বলেছিলাম, আপনি পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে একুশে উদযাপন করছেন, তাতে বাংলা সাহিত্যের পাঁচ পয়সারও উপকার হবে না। আপনি বরং এ টাকাটা বাংলা ভাষার উন্নয়নে ব্যয় করুন। তাতে বাংলা ভাষার উপকার হবে।’

বাংলা একাডেমির একুশে উদযাপন অনুষ্ঠানের জৌলুশ বাড়ার সাথে সাথে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ বোধ করি কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবু বাংলা ভাষাটা এখনো আমাদের তেমন রপ্ত হয়নি। প্রতি বছরই বইমেলা হয়। চিত্তরঞ্জন সাহার চটের ছালা বিছানো বইয়ের প্রদর্শনী আজ বহুমাত্রায় বিকশিত এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে খুবই চিত্তাকর্ষক অবয়ব নিয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষার মান কি উন্নত হয়েছে? প্রায় প্রতি বছরই অভিযোগ ওঠে, ভুলে ভরা নিম্নমানের বইয়ে মেলার স্টলগুলো সয়লাব। হয়তো এ দৈন্য ঢাকার জন্য উঁচুগলায় বলা হয়, বইমেলা ‘প্রাণের মেলা’, ‘মিলনমেলা’। কিন্তু এতে করে সাহিত্য-সংস্কৃতির কী উপকার হলো? পয়সাওয়ালা যে লোকেরা শখ করে বছরে একবার মেলা থেকে বই কেনেন, তারা সারা বছর ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এসব বই তারা কমই পড়েন। আসলে আলমারিতে সাজিয়ে রাখেন। তবু বলব, অন্তত এটুকু চর্চা অন্তত চলুক। তাহলে লেখকরা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবেন।

আজকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিম্নপর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া হচ্ছে। শিক্ষকরা বাংলায় পড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা বাংলা পাঠ্যবই পড়েন। তবুও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ডিগ্রি অর্জনের পরও সঠিক বাংলা ভাষায় একটি দরখাস্তও লিখতে পারেন না। আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে ঘরে বসেই আমাদের ছেলেমেয়েরা ভারতীয় হিন্দি সিরিয়াল এবং কার্টুন দেখে দেখে মাতৃভাষা বাংলা ভুলতে বসেছে। তাদের অনেকে হিন্দিতে কথা বলে। এ ছাড়াও অনেকে ইংরেজিতে কথা বলে। কয়েক বছর আগে ভারতীয় জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদার ঢাকায় এসে এ বিষয়টি লক্ষ করে ঢাকার একটি জাতীয় বাংলা দৈনিকে কলাম লিখে গেছেন। এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পরও আমাদের বহুলাংশেই ভারতীয় বইয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। আমাদের দেশের বইয়ের চাহিদা নিজেদের দেশেই তেমন নেই। ভারতে তো দূরের কথা। আমাদের বইয়ের দোকানগুলো ভারতীয় লেখকদের বইয়ে সয়লাব। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের বইয়ের বিরাট বাজার। কিন্তু ভারতীয়রা আমাদের লেখকদের বই তেমন একটা পড়েন না। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের বইয়ের তুলনায় গড়পড়তা ভারতীয় বইয়ের মান ভালো। এটা স্বীকার করতেই হবে।

আমার প্রায় ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একটি বিষয় লক্ষ করেছি, যে বিষয়ই পড়ান না কেন, বাংলায় পড়ালেও শিক্ষকদের বেশির ভাগেরই বাংলা উচ্চারণ প্রমিত নয়। তারা ক্লাসে আঞ্চলিক ও ভুল বাংলায় পড়ান। বিশেষত মফস্বল অঞ্চলে এ সমস্যা প্রকট। অবশ্য বহুলাংশে ঢাকায়ও এর বিশেষ ব্যতিক্রম দেখিনি। কথাটা শুনতে যতই খরাপ লাগুক না কেন, তা সত্য। আমরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে ইনফরমালি যখন কথা বলি, তখন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা দোষের কিছু মনে করি না। কিন্তু ক্লাসের ফরমাল লেকচারে সেটা গ্রহণীয় হতে পারে না। বিষয় যা-ই হোক না কেন, ক্লাস লেকচারের ভাষা হতে হবে প্রমিত বাংলায় বিশুদ্ধ ও মার্জিত। এ বিষয়কে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। এ কারণে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ধাপটি পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রয়োজনে অনেকেই শুদ্ধ বাংলা বলতে বা লিখতে পারেন না। এটি নীলিমা ইব্রাহীমের ভাষায় বলতে গেলে- ‘লজ্জা’র কথা। আমাদের সোনার সন্তানরা মায়ের ভাষা, যা অঞ্চলভেদে বিভিন্ন, তা রক্ষা করার জন্য রক্ত দিলেও একটি সর্বজনবোধ্য প্রমিত বাংলা ভাষা গড়ে তুলে সেই শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের কর্তব্য। দেশের বিভিন্ন স্তরের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরাই সেটা করতে পারেন এবং করা কর্তব্য বলে মনে করি। কেবল ভাষাশহীদ বেদিতে বছরে একবার ঘটা করে ফুল দিয়ে সে দায় আমরা এড়াতে পারি না।

ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষে মানুষে মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলা যায়। অতুল প্রসাদ সেন যথার্থই লিখেছেন- ‘কী জাদু বাংলা গানে/গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে’। দাঁড় টানা একটি কঠিন কাজ। সব দেশের সব ভাষার মধ্যেই এমন জাদু আছে। আমাদের ভাষাও তাই। এ জাদু কঠোর পরিশ্রম করতেও প্রণোদনা জোগায়। তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানলে অসাধ্য সাধন করা যায়। দেশে দেশে এর বহু ঐতিহাসিক নজির আছে। বিজ্ঞানের বাইরে এসব কীর্তিকলাপ সুশিক্ষিত সাহিত্যিক ও রাজনীতিকদেরই অবদান। কিন্তু এর বিকৃতি ও অপব্যবহারে তা যেকোনো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। ভাষার অপব্যবহার সাধারণত সঙ্কীর্ণচেতা লেখক ও রাজনীতিকরা করে থাকেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে লক্ষ করেছি, যেসব ছাত্র রাজনীতি করেন তারা ক্লাস করেন কদাচিৎ। শিক্ষকের কাছ থেকে তারা পাঠ নেন না। তাই শিক্ষকের ভাষায় তারা কথা বলেন না। বস্তুত এ জগতে প্রতিটি পেশার মানুষের একই ভাষার আলাদা আলাদা রূপ আছে। কামারের, কুমারের, নাপিতের, মেথরের, চোরের, ডাকাতের, পকেটমারের, বাটপারের- এমন সবারই একই ভাষার আলাদা আলাদা রূপ। হোক তা তামিল, তেলেগু, বাংলা, ইংরেজি, রাশিয়ান কিংবা অন্য কোনো ভাষা। রাজনীতিকদের ভাষারও রূপ আলাদা। সে ভাষা আজকাল আমাদের দেশের শিক্ষানবিশ রাজনীতিকরা সঙ্কীর্ণচেতা ব্যক্তিদের কাছ থেকেই শেখেন। তাই তারা নিজেদের সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি দাবি করলেও সাধারণ মানুষ তাদের ভাষা বহুলাংশেই বোঝেন না বলে হাল ছেড়ে দিয়ে রবিঠাকুরের ভাষায় বলতে বাধ্য হন- ‘তোমার ভাষা বোঝার আশা/ দিয়েছি জলাঞ্জলি।’

দেশে শিক্ষা বিস্তারের সাথে সাথে শিক্ষার্থীরা যতই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষের দিকে আকৃষ্ট হবেন এবং শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে একটি প্রমিত ও সর্বজনবোধ্য বাংলা ভাষা চালু করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন, আমরা ততই অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাবো। একই ভাষা ‘বিশেষরূপে’ ব্যবহার করে তখন আর কেউ আমাদের প্রতারিত করতে পারবেন না। এভাবে সমাজে একটি সমতার ভিত রচিত হবে। তখন আমাদের শিক্ষার্থীরা এবং আমরা জনগণ বাংলা ভাষা ভুল লেখা ও বলার লজ্জা থেকে রেহাই পাবো। সেটা যেদিন পারব, সেদিনই বোঝা যাবে ভাষাশহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশাল প্যান্ডেল বানিয়ে হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দিয়ে এবং বইমেলায় কত টাকার বই বিক্রি হলো, কত লোকসমাগম হলো সে হিসাব কষে ভাষাশহীদদের আমরা যথোচিত সম্মান দেখানো সম্ভব হবে না। রাজপথে খালি পায়ে প্রভাতফেরি করেও না। মাতৃভাষাটা শুদ্ধভাবে রপ্ত করেই আমরা শহীদদের সে সম্মান দেখাতে পারি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপাল, সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা


আরো সংবাদ