২৮ মার্চ ২০২০

বন্যপ্রাণী কি মানুষের খাদ্য?

-

বন্যপ্রাণী যে মানুষের খাদ্য নয়, তা কি এবার প্রমাণিত হলো না? চীনারা সব খেয়ে থাকেন, প্রায় সব ধরনের পশুপাখি তথা প্রাণীকুলের কেউ বাদ যাচ্ছে না যা চীনারা খান না। শুধু তাই নয়, বরং তারা ওষুধও তৈরি করে থাকেন প্রাণীকুলের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে। এমন কোনো প্রাণী নেই যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চীনা ওষুধ অর্থাৎ Traditional Chinese Medicine (TCM) প্রস্তুত করতে ব্যবহৃত হয় না। সুতরাং চীন এমন এক জাতির দেশ যে জাতির উপদ্রবে মূল্যবান সম্পদ, বন্যপ্রাণীকুলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে; বিলুপ্তির পথে, বিলুপ্ত প্রায় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এ জাতি নিজেই বন্যপ্রাণীর প্রতি হুমকি। এখন তো দেখা যাচ্ছে, তারা প্রকৃতির বিলুপ্তি ঘটিয়ে ছাড়বে। বহু চীনা প্রকারান্তরে বন্যপ্রাণীর চোরাকারবারিদের তথা অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ীদের ইন্ধন জোগাচ্ছে। তাদের TCM এ যত বন্যপ্রাণীর প্রয়োজন তার তুলনায় কত শত গুণ বেশি প্রাণী এরা সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে রাখে তার খবর কি কেউ রাখেন? জানা যায়, তারা নাকি প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক বেশি প্রাণী ভবিষ্যতের ২০, ৩০ বছর, এমনকি অর্ধশত বছরের জন্যও মজুদ রাখছে। সুন্দরবনের বাঘের চোরাকারবারের পেছনে ওদের ইন্ধনই হয়তো এ বনে বাঘ উজাড় করেছে। পরিণামে বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যের। প্রকৃতির ধর্ম এই যে, প্রাকৃতিক পরিবেশ এক স্থানে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কেননা প্রাকৃতিক পরিবেশ একটা অখণ্ড বিষয়। এটা খণ্ডিত বিখণ্ডিত হলে নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখা দায় হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃতি কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা জানে না, মানে না।

আমরা জানি, মানুষের যেসব রোগ হয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে মানুষের ভেতরেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় এবং মানবদেহে রোগের সূত্র সুপ্ত অবস্থায় রয়ে যেতে পারে। গৃহপালিত প্রাণী এবং বন্যপ্রাণীর বেলায়ও এটি স্বাভাবিক। বন্যপ্রাণীতে থাকা সুপ্ত রোগ-জীবাণু যেমন গৃহপালিত প্রাণী, এমনকি মানুষকেও আক্রান্ত করতে পারে, তেমনি গৃহপালিত প্রাণীতে থাকা সুপ্ত রোগ-জীবাণু বন্যপ্রাণীদের আক্রান্ত করতে পারে। যেমন বার্ড ফ্লু; এটা বন্য পাখির রোগ আর মানুষের ফ্লু মানুষের রোগ। মানুষের ফ্লুর প্রতিরোধ মানুষের মধ্যে থাকলেও বার্ড ফ্লুর প্রতিরোধ ক্ষমতা কিন্তু মানুষের নেই। বার্ড ফ্লু আমাদের গৃহপালিত পাখি তথা মুরগির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে চলে আসে এবং এর জীবাণুর রূপান্তর (Mutation) ঘটে নানা রূপ নেয় এটা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে যার প্রতিরোধ ক্ষমতা মানুষের মধ্যে তৈরি হয় না। এ ক্ষেত্রে পোলট্রি খামারের পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের অভাবও সংক্রমণের দ্রুততা বাড়িয়ে দিয়ে থাকে। তখন এসব রোগ মহামারী আকার ধারণ করতে আর বেশি সময় লাগে না।

একইভাবে, গৃহপালিত প্রাণীর রোগের বাহকের জন্য এসব প্রাণীর প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলেও বন্যপ্রাণীর মধ্যে এর প্রতিরোধ ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। গৃহপালিত হাঁস যা আমরা হাওর-বাঁওড়ে চাষ করতে উৎসাহ জোগাচ্ছি, এর বড় আকারে চাষ হচ্ছে। তবে আমরা এটি ভাবছি না যে, বন্যপ্রাণী তথা পরিযায়ী পাখি এদের থেকে সংক্রমিত হচ্ছে এবং ওদের বংশ নাশ ঘটছে!

জানা যায়, বাদুড়, সাপ প্রভৃতি থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাসই চীনে বর্তমান আতঙ্কজনক রোগ এনেছে। চীন এবং এর মতো যেসব দেশের মানুষ বন্যপ্রাণী খায় ও নানা ধরনের ওষুধ তৈরি করে এবং অন্যান্য কাজে তা লাগায় তাদের কারণেই বন্যপ্রাণী ব্যবসায় জমে উঠেছে সারা বিশ্বে। জেনে অবাক হবেন, গত ২০ বছরের মধ্যে চড়ুই পাখির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র ১০ শতাংশ চড়–ই রয়েছে সারা বিশ্বে। আমাদের মতো দেশগুলো থেকে চোরাকারবারিরা বেআইনিভাবে পাচার করছে বহু বন্যপ্রাণী। ব্যাঙ থেকে শুরু করে সুন্দরবনের বাঘ পর্যন্ত সব প্রাণী পাচার হয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের কচ্ছপ, কাছিম, সাপ, তক্ষকসহ দেশের সবই উজাড় হয়ে গেছে। পাখির মধ্যে ছোট পাখি থেকে শুরু করে বিরাট ধনেশ পর্যন্ত কি না পাচার হচ্ছে? তক্ষকের নাম এখন আর শুধু ‘তক্ষক’ নেই। বিশ্বে তার নাম হয়েছে ‘মিলিয়ন ডলার তক্ষক’।

কেননা, এর মূল্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। এত দিনে বাংলাদেশের তক্ষক বিলুপ্ত প্রায়। অথচ এই সেদিনও তক্ষকের ডাক সারা রাত ভরে শোনা যেত। শোনা যেত আমাদের গ্রাম-গঞ্জে, শোনা যেত শহরে নগরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা একসময় ছিল ‘তক্ষকের এলাকা’। ভাইস চ্যান্সেলরের বাড়ি থেকে শুরু করে যেখানে কিছু বন জঙ্গল রয়েছে সেখানে এই তক্ষকের ডাক শোনা যেত। বর্তমানে সারা দেশে হয়তো তক্ষক নেই বলে আমার ধারণা। এ বিষয়ে আমাদের গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে আশঙ্কা, তক্ষক কি হারিয়ে গেল? রাজধানীর এক কাঁটাবনেই প্রায় চল্লিশ প্রজাতির বন্যপাখির ব্যবসায় রেকর্ড করা হয়েছে আমাদের এক গবেষণার কাজে। ছোট মুনিয়া থেকে ধনেশ পাখি পর্যন্ত। শিয়াল, খাটাশ, বনবিড়াল কি না বিক্রি হচ্ছে এসব দোকানে? অজগর সাপের মতো বৃহৎ সরীসৃপ পর্যন্ত এ সব দোকানে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমাদের দেশে হাওর-বাঁওড়ে ব্যাপকভাবে হাঁস চাষ যেমন বন্যপাখির জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তেমনি বন্যপ্রাণী দিয়ে সংক্রমিত রোগে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মহাবিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সুতরাং, প্রকৃতির ধর্ম আমাদের মানতেই হবে যে, বন্যেরা বনেই ভালো থাকুক মানুষের ভালো থাকার জন্য।

যে হারে বন্যপ্রাণী খাওয়ার ব্যবসায় চলছে চীনসহ বহু দেশে তাতে আমাদের দেশ তথা ‘আমাদের ত্রাতা’ সুন্দরবন উজাড় হতে বেশি সময় লাগবে না। মারাত্মক করোনাভাইরাসের মতো অভিশাপ যেন আর না ছড়ায়। অন্তত এর ভয়ে সারা বিশ্বে যেন বন্যপ্রাণী খাওয়া ও ব্যবসায় বন্ধ হয়ে যায়, এ কামনাই করি। প্রাণিবিজ্ঞানী প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন কবির কথা একটু অন্যরকম করে বলতেন, ‘প্রাণী সুন্দর বন জঙ্গলে, শিশু সুন্দর মায়ের কোলে’।

চলুন, আমরা বন ও বন্যপ্রাণী খেকোদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং মাতৃরূপী প্রকৃতির কোলে প্রজন্ম বাঁচাই।

লেখক : বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং প্রফেসর, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ