১০ এপ্রিল ২০২০

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি

-

প্রত্যেকের ‘নিরাপদ পথ’ নিশ্চিত করে ওই পথেই চলা উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমারের পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আর্থিক ও কৌশলগত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। চীন বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে আগ্রহী। কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় প্রাথমিকভাবে ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৫৬ হাজার কোটি টাকার অর্থায়নে গভীর সমুদ্রবন্দর করতে প্রস্তাব দিয়েছিল বেইজিং। বাংলাদেশ এতে রাজি ছিল। কিন্তু প্রতিবেশী একটি প্রভাবশালী দেশের পরামর্শে বলা হলো, যৌথভাবে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হবে। আবার বলা হয়, অন্য এলাকায় তা নির্মাণ করা হবে। এভাবে সময়ক্ষেপণ করে চীনকে আসলে বুঝিয়ে দেয়া হলো, বাংলাদেশ তোমাদের এ প্রস্তাবে সম্মত নয়। চীনও বিনিয়োগ নিয়ে বসে থাকেনি। আমাদের সরকারের দেয়া সেই প্রস্তাবই এখন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন স্টেটে বাস্তবায়ন করার চুক্তি করা হয়েছে। তা হলো- বিনিয়োগ, গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। যাদের ‘বুদ্ধি’তে আমাদের জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হলো, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা আমাদের পাশে নেই কখনো। বাংলাদেশে চীন যে বিশাল বিনিয়োগে আগ্রহী ছিল, তা এদেশে করা গেলে বিনিয়োগ রক্ষার স্বার্থে হলেও এখন হয়তো চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারসাম্যমূলক একটি অবস্থান নিত।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মিয়ানমার ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ার মুহূর্তে মিয়ানমারের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের অঙ্গীকার ছাড়াও একগুচ্ছ চুক্তি করে দেশে ফিরেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এর মধ্যে বঙ্গোপসাগর এলাকায় ‘কাইয়ুকপাইউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’-বিষয়ক চুক্তিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সফরকালে মিয়ানমারের মূল নেতা অং সান সু চির সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি ৩৩টি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন তিনি। এসব চুক্তির মধ্যে তথ্যবিনিময় থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি, নিরাপত্তা এবং চীন সীমান্তে অবস্থিত মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশের গৃহহীনদের পুনর্বাসনের মতো বিষয়ও রয়েছে।

রাখাইনে গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও দেশত্যাগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তর অভিযোগ ও অন্যায়কে না দেখার ভান করে, চীন আন্তর্জাতিক আঙিনায় ‘মিয়ানমারের ঢাল’ হওয়ার বিনিময়ে যা চেয়েছে, তা-ই পেয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট এবার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্পের তহবিল নিয়ে মিয়ানমারে হাজির হয়েছিলেন। অবশ্য এসব প্রকল্পে মিয়ানমার যতটা লাভবান হবে, তার চেয়ে বেশি লাভ হবে চীনের। এর মধ্যে, অশান্ত রাখাইন প্রদেশে কাইউকপাইউতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে বলা হচ্ছে ‘চীনা মুকুটের রত্ন’। একই সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সত্ত্বেও চীন ‘মিয়ানমারের পাশে’ থাকবে বলে অঙ্গীকার করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রবেশ সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কট বলে স্বীকৃত। মিয়ানমারের ২০১৭ সালের ওই নৃশংসতাকে খোদ জাতিসঙ্ঘ ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছে। যা হোক, ব্যবসা, সম্পদ আর ক্ষমতার কাছে আজ মানবতা মূল্যহীন! রাজনীতি আর কূটনীতির কোনো সরল হিসাব-নিকাশ নেই। মূল কথাটি স্বার্থ। মানবতা অর্থহীন বলেই চীন নরঘাতক মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে।

উগ্রবাদের বিপদ মাথায় রেখে ভারত ও চীন যদি মিয়ানমারের পক্ষ নিয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের সরকারকেও বলতে হবে, মিয়ানমারের আরাকান বা রোহিঙ্গা নীতি এ অঞ্চলে বিপদ আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। তখন এ বিপদ থেকে কেউই বাঁচতে পারবে না। এত বড় একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে; যে যুবক নিজের মাকে, বোনকে, স্ত্রীর ধর্ষণ দৃশ্য দেখেছে; যে মা-বাবা-সন্তানকে পুড়িয়ে মারতে দেখেছে; তারা এখন জীবন দিয়ে হলেও প্রতিশোধ নিতে চাইবে না, তা কে নিশ্চিত করে বলতে পারবেন? বিশ্বকে রোহিঙ্গাবিতাড়নের পরের সমস্যাগুলো কিভাবে আঘাত হানবে, তা বাংলাদেশকে বোঝাতে হবে। চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক লাভের হিসাব-নিকাশ তখন আর মিলবে না।
সমগ্র বিশ্ব যেখানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার, সেখানে চীন নিজের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে গ্রহণ না করে বাংলাদেশের কোনো পথই ছিল না। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের যে নীতি ও পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে, তাতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যে সহজ হবে না, তা-ও টের পাওয়া যাচ্ছে।

চীন অনেক বছর ধরেই মিয়ানমারকে ব্যবহারের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে অবাধে বাণিজ্য সুযোগ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় সচেষ্ট। বিভিন্ন ইস্যুতে মিয়ানমারের প্রতি চীনের যে সমর্থন, এটিই তার মূল কারণ।

মিয়ানমার যখনই বিশ্বসম্প্রদায়ের কোনো চাপের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই মিয়ানমারের প্রতি সহায়তা ও সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। তার ওপর চীনের প্রভাব অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু চীন কখনো মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে না বলেই মনে হয়। চীন অবশ্যই মিয়ানমারকে হাতে রাখতে চাইবে। কারণ, সেখানে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্ব মিয়ানমারকে যতই চেপে ধরেছে, চীন মিয়ানমারকে ততই কাছে টেনেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার সাথেও যোগাযোগ স্থাপন করেছে। গত বছরের এপ্রিলে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লাইং চীনের পাশাপাশি, রাশিয়াও সফর করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য বাড়ানোর লক্ষ্যেই মিয়ানমারের সাথে চীন সুসম্পর্ক ধরে রেখেছে। ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার সাথে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ স্থাপন করাও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে করিডোর বানাতে পারলে খুব সহজেই ভারত মহাসাগরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে চীন। ভারত মহাসাগরে পৌঁছতে পারলে পারস্য উপসাগর দিয়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানি করা তাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। তখন মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনকে আর নির্ভর করতে হবে না।

আমাদের দুর্ভাগ্য, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও ভারতকে পাশে পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এটি অনেকের কাছেই সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীনের দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিনিয়োগ ও ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে হওয়ায়, বাংলাদেশ দুই দেশের কাউকেই স্বপক্ষে পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে স্বার্থ অবশ্যই একটি বড় বিষয়। সবাই নিজের স্বার্থ দেখবে এটিই স্বাভাবিক। সে হিসেবে বলা যায়, আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা আছে। তবুও থেমে থাকলে চলবে না। সমস্যা যখন হয়েছে, সমাধানও বের করতে হবে। ধৈর্য ধরে মোকাবেলা করলে উত্তম সমাধান অবশ্যই হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুর যাতে জোরালো আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটে, সেদিকে নজর দিতে হবে। শুধু মানবিক বিপর্যয়ের নয়, উগ্রপন্থা কোথায় যেতে পারে, তার একটা সম্ভাব্য চিত্রও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

[email protected]


আরো সংবাদ