০৯ এপ্রিল ২০২০

এরদোগানের আফ্রিকা সফর ও তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি

রজব তাইয়েব এরদোগান - ছবি : সংগৃহীত

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান তার মহাদেশ সফরের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে আফ্রিকার তিনটি দেশ সফর করেছেন। এই সফরের সময় তার আলোচ্যসূচিতে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বড় প্রতিনিধিদল নিয়ে এরদোগান সফর করেন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে তার স্ত্রী ইমানি, গোয়েন্দা প্রধান হাকান ফিদান ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভোসোগ্লু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী হোলুসি আকরসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ছিলেন।

আফ্রিকার দেশগুলোতে এ ধরনের সফর বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির একটি নিয়মিত অংশে পরিণত হয়েছে। আগে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকা তুরস্কের পররাষ্ট্র নীতির দৃষ্টিতে ‘অনাবিষ্কৃত’ ছিল। ১৯৯০ দশকের শেষের দিকের আগ পর্যন্ত তুরস্ক আফ্রিকা মহাদেশের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী ছিল না। ১৯৯৮ সালে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আফ্রিকার ব্যাপারে একটি নীতি প্রণয়ন করে। ওই নীতিতে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে ওই মহাদেশে তুরস্কের পদচিহ্ন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি ‘অ্যাকশন প্লান’ গ্রহণ করা হয়। ওই মহাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা ছিল একটি মাইলফলক। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসমাঈল চেমের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এই নতুন নীতি গৃহীত হয়েছিল। ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে তার দায়িত্ব পালনকালে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয় এবং একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে তুরস্কের সম্পর্কোন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আফ্রিকার প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেল ১৯৯৯ সালে চেমকে সাথে নিয়ে সরকারিভাবে আলজেরিয়া সফর করেছিলেন। জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) ২০০২ সালে তুরস্কের ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আর্থিক সঙ্কট এবং প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণের অভাবে এই নীতিকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করাটা বাধাগ্রস্ত হয়। আগের সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে নতুন নেতৃত্ব মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার ব্যাপারে একটি ভিশন ও নীতি গ্রহণের সুযোগ পায়। অধিকন্তু, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, উভয় অঞ্চলের সাথে একেপির আরো সম্পৃক্ত হওয়ার পথ খুলে যায়। এরদোগান এবং তার ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বে সরকার পরিচালনার পরিপ্রেক্ষিতে, তুরস্কের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে আফ্রিকার দেশগুলোতে আঙ্কারার সুযোগ-সুবিধার পথ খুলে গিয়েছিল। এতে করে তুরস্কের আফ্রিকান অ্যাকশন প্লান সম্প্রসারিত করার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। ২০০৮ সালে আফ্রিকান ইউনিয়ন তুরস্ককে তাদের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ঘোষণা করলে আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে পৃথকভাবে আরো সম্পর্কোন্নয়নের একটি দৃঢ় ভিত্তি পেয়ে যায় আঙ্কারা।

আফ্রিকা ‘রাইজিং ইকোনমিক স্টারে’ পরিণত হয়েছে। তাই কয়েকটি আন্তর্জাতিক শক্তির মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশ নিয়ে বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে আঙ্কারা বহু সময় ও শক্তি ব্যয় করছে। এ ক্ষেত্রে আঙ্কারার দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির সর্বশেষ প্রমাণ প্রেসিডেন্ট এরদোগানের অতি সাম্প্রতিক সফর। প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবার আলজেরিয়া, সেনেগাল ও গাম্বিয়া সফর করেন।

২০১৮ সালের মার্চেও এরদোগান আফ্রিকা সফর করেছিলেন। সে সময় উল্লিখিত দু’টি দেশ ছাড়াও মৌরিতানিয়া এবং মালিও সফর করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবার গাম্বিয়া সফর করেছেন। তিনি হলেন গাম্বিয়া সফরকারী প্রথম তুর্কি প্রেসিডেন্ট।

লিবিয়ার তুরস্কের নীতি যখন প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়া তুরস্ককে নিয়ে হয়ে উঠেছে আগ্রহী। মনে হচ্ছে, আঙ্কারা তার আফ্রিকা নীতি নিয়ে অব্যাহতভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ তিউনিসিয়া, লিবিয়া এবং মিসরে গণ-অভ্যুত্থান বা গণজাগরণের পর আলজেরীয় কর্তৃপক্ষ তাদের দেশেও এর প্রভাবে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে বলে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। সিরিয়ার ব্যাপারে ‘আসতানা শান্তি প্রক্রিয়া’র অংশ হিসেবে তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। অপর দিকে, আলজেরিয়ার সাথে আঙ্কারার সম্পর্কও একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। উত্তর আফ্রিকার একমাত্র দেশ হচ্ছে আলজেরিয়াÑ যার সাথে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আর আলজেরিয়া সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপের বিরোধী। আলজেরিয়া আলোচনার মাধ্যমে সিরিয়ার সঙ্কট সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। তাই এরদোগানের সফরে আলজেরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষভাবে লিবিয়াপরিস্থিতির আলোকে এবং ওই অঞ্চলে দেশটির গুরুত্বের কারণে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৬৫ সালে গাম্বিয়া ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর তুরস্ক ও গাম্বিয়ার মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ৪৫ বছর আগে আফ্রিকান দেশটি আঙ্কারায় একটি কূটনৈতিক মিশন স্থাপন করেছিল। পরে ২০১০ সালে গাম্বিয়া তুরস্কে দূতাবাস খোলে এবং পরের বছর তুরস্ক বানজুলে তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করেছে। মসজিদ ও স্কুল নির্মাণের মাধ্যমে তুরস্ক গাম্বিয়ায় সাংস্কৃতিক উপস্থিতি জোরদার করতে পারে। গত সপ্তাহে সফরের সময় তুরস্কের কর্মকর্তারা গ্রামের একটি মসজিদ ও স্কুল উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে গাম্বিয়ায় তুরস্কের প্রথম মানবিক মিশনের মাধ্যমে চ্যারিটির পথ উন্মুক্ত হয়। সেনেগাল সফরের শেষপর্যায়ে ডাকারে রেড ক্রিসেন্টের একটি অফিস উদ্বোধন করা হয়। সেনেগালে আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ আহমেদ কাবাসকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আগে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শাদে তুরস্কের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেনেগাল তুরস্কে দূতাবাস খোলেনি।

তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ভবিষ্যতে তার দেশ আফ্রিকা মহাদেশের গুরুত্ব অনুধাবন করে এর সাথে সম্পৃক্ততা আরো বাড়াবে। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাণিজ্য হচ্ছে তুরস্কের আফ্রিকান দৃষ্টিভঙ্গির অত্যন্ত সফল একটি উপাদান। এই মহাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তুরস্ক সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাকে চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করবে।

লেখক : তুরস্কের রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ
আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ