১০ এপ্রিল ২০২০

ফেলে আসা দিনগুলো পিছু ডাকে

ফেলে আসা দিনগুলো পিছু ডাকে - ছবি : সংগ্রহ

মানুষের জীবনে চলার পথে এমন কিছু বিষয় বা ঘটনার জন্ম দেয়, যা কোনো দিন হৃদয় বা মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। আমার জীবনেও চলার পথে (৫০ থেকে ৬০ বছরের) মধ্যে এর সূত্রপাত ঘটেছে। এখনো অবসর মুহূর্তে এসব স্মৃতি রোমন্থন করে খুবই আনন্দ অনুভব করি।
১৯৫৮-৫৯ সাল। আমি তখন যশোর মুসলিম একাডেমির অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে একটি পিকনিকের আয়োজন করা হয়। তখন দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র ভালো পিকনিক স্পট ছিল যশোর শহরতলির রামনগর। যশোর-খুলনা সড়কের পাশে ‘ক্ষণিকা’ পিকনিক কর্নার। সড়ক ও জনপথ বিভাগ পরিচালিত এই পিকনিক কেন্দ্রে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে আসত পিকনিক করতে। বড় বড় দুই ডেকচিতে পোলাওয়ের জন্য খাঁটি গাওয়া ঘি গরম করছিলেন বাবুর্চিরা। হঠাৎ দুটো বড় টিকটিকি মারামারির একপর্যায়ে সোজা গিয়ে পড়ে সেই গরম ডেকচির মাঝে। রান্না বন্ধ করে শহর থেকে ঘি আনার পর শুরু করতে হয় রান্না।

মুসলিম একাডেমির পূর্ব পাশের রাস্তা ছিল তখন ইট-খোয়া বিছানো নির্জন পথ। মোমিন গার্লস স্কুলের এবং আমাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রী ছাড়াও মাঝে মধ্যে দু-চারজন পথচারী চলাচল করত এ পথ দিয়ে। স্কুলের দোতলা থেকে আমাদের সহপাঠী আবুল কাসেম (কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সাহেবের ছেলে) ছাত্রীদের ইভটিজিং করে ইশারায়। এ দৃশ্যটি দেখে ফেলেন পার্শ্ববর্তী কালেক্টরেট ভবনের এক কর্মচারী। তিনি তখনই বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানালেন। জেলা প্রশাসক বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানান। এরপর প্রধান শিক্ষক বেত হাতে নিয়ে ক্লাসে এসে আমাদের কাছে জানতে চান, তোমাদের মধ্যে কে এই কাণ্ডটি করেছে? তার নাম বলো; আমরা জেনেও সবাই নিশ্চুপ। এরপর শুরু হলো পাইকারি বেত্রাঘাত। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্র কেউ বাদ যায়নি এই বেত্রাঘাতের তাণ্ডব থেকে। একটি বেত ভেঙে যাওয়ার পর অফিস থেকে আরেকটি বেত আনা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জানতে পারি, কাসেম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহীদ হয়েছেন। আশির দশকে আমি যশোর থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে মানিকগঞ্জ শহরে নেমে পড়ি। খুঁজে বের করি শহীদ কাসেমের বাসভবন। তার মা তখনো বেঁচে আছেন। পরিবারের সদস্যরা আমার পরিচয় জেনে আনন্দে আত্মহারা। সেখানে সৃষ্টি হয় এক বেদনাবিধুর পরিবেশ। কাসেমের বীরত্বের কাহিনী শুনি তাদের মুখে। মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব পড়েছিল তার ওপর। বিস্ফোরণকালে দুর্ভাগ্যবশত সেখানে তিনি আহত হন। বিস্ফোরণের শব্দ দূর হতে হানাদার বহিনী শুনতে পায়। তারা সেখানে আহত অবস্থায় খুঁজে পায় তাকে। পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে তাকে। মানিকগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থলে স্মৃতিস্তম্ভে শহীদের তালিকায় সর্বপ্রথম তারই নাম স্থান পেয়েছে। এটি চিরভাস্বর হয়ে থাকবে সবার মাঝে।

শৈশবের একটি মজার ঘটনা। সেবার দেশে প্রচণ্ড খরা চলছে। বৃষ্টি হচ্ছে না। ব্যাঙের বিয়ে দিয়ে আমরা কাদামাটি খেলি। পরে গ্রামের প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে চাল, গুড়, নারিকেল সংগ্রহ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে ‘শিন্নির’ আয়োজন। রান্না শেষে তা রাখা হয় দু’টি বড় গামলায়। ওই সময়ে হঠাৎ সেখানে দু’টি কুকুর মারামারির একপর্যায়ে শিন্নি রাখা সেই পাত্রের মাঝে এসে পড়ে। আমাদের সে দিন আর শিন্নি খাওয়া হয়নি।

এবার দু’টি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার গল্প শোনাব। যশোরের অভয়নগর উপজেলার বারান্দী গ্রামে ভগ্নিপতি আবুল হোসেন মহলদারের ছোট ভাই মহসীন মহলদারের বিয়ের বরযাত্রী হলাম। সন্ধ্যার পর আমরা ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি বরযাত্রী দল ভাড়া বাসে রওনা হলাম কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। তালতলা রেল ক্রসিংয়ের সামনে বরযাত্রী ভর্তি সেই বাসটি আসামাত্র আপনাআপনি স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। মাত্র ৮-১০ সেকেন্ডের ওই মুহূর্তে খুলনাগামী ‘ঝটিকা এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি রেলগেট অতিক্রম করে। সেদিন আল্লাহ তায়ালার রহমতে সব যাত্রীর প্রাণ রক্ষা পায়। বাসে কোনো শিশু যাত্রীর মায়ের নেক দোয়ার বরকতে এটি সম্ভব হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।

আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয়। সেটি যশোর সেনানিবাসের পাশে আরবপুর রেলক্রসিংয়ে। বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ একটি অনুষ্ঠানে আমাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। আয়োজকরা দাওয়াত দিয়ে সাংবাদিকদের প্রতি নজর দেননি। এ বিষয়টি আমাদের আত্মসম্মানে আঘাত করে। ওই মুহূর্তে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার। আমাদের বহনকারী মাইক্রো বাসটি রেলক্রসিং পার হওয়া মাত্র খুলনাগামী ‘সুন্দরবন এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি এসে পড়ে। তখন ক্রসিং গেট খোলা ছিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সে যাত্রা আমরা প্রাণে বেঁচে যাই ৮-৯ জন সাংবাদিক। তাদের মধ্যে ছিলেন তৌহিদুর রহমান, আবদুল হাসিব, আফজাল সিদ্দিকী, আবুল হোসেন মীর, খান হাফিজুর রহমান, একরামউদদ্দৌলা, দেবব্রত সিংহ এবং আমি নিজে। আমরা যশোর কোতোয়ালি থানায় বিষয়টি জানাই। ওই রাতেই টুন ভাই মধুর ক্যান্টিনে আমাদের নৈশভোজের ব্যবস্থা শেষে সব ব্যয়ভার বহন তিনি একাই করেন।

এবার দলবদ্ধভাবে ভ্রমণের কয়েকটি ঘটনা। ১৯৮২ সালে মাসব্যাপী শুভেচ্ছা সফরে গিয়েছিলাম উত্তর কোরিয়ায়। বিশ্বের ৪৫টি দেশ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় কোরিয়ার নেতা প্রেসিডেন্ট কিম-ইল-সুংয়ের নেতৃত্বে সম্পন্ন হওয়া সে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখার জন্য। বাংলাদেশ থেকে চারজন ওই সফরে আমন্ত্রণ পাই উত্তর কোরিয়া দূতাবাসের মাধ্যমে।

সফরসঙ্গী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্বাস আলী খান, বরিশাল হাতেম আলী কলেজের রুহুল আমীন, চট্টগ্রামের জহুরুল ইসলাম ছুট্টু ভাই ও যশোরের আমি। কোরিয়া দূতাবাস থেকে আমার নামের পদবি ভাইস প্রিন্সিপালের স্থলে ‘ভাইস চ্যান্সেলর’ হয়ে মেসেজটি সে দেশে পৌঁছে। ফলে উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং বিমানবন্দরে আমাদের অভ্যর্থনার জন্য উপস্থিত ছিলেন সে দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ফলে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনার বহর কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মরহুম মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের সাথে দু’টি ঘটনার কথা কোনো দিন ভোলার নয়। তিনি তখন ঢাকা সেনানিবাসে সিজিএস অর্থাৎ চিফ অব জেনারেল স্টাফস। সেনানিবাসের স্টাফ বেডি এলাকায় তার বাসভবন। আমাদের কলেজের অধ্যক্ষ ইব্রাহিম হোসেন ও আমি তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য যাই। সাক্ষাৎশেষে আপ্যায়নের পর তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে আমাদের রাজধানীতে গন্তব্যস্থলে নামিয়ে দিয়ে যান। এত উঁচুপর্যায়ের একজন সেনাকর্মকর্তা হয়েও আমাদের প্রতি সেদিন যে সম্মান তিনি দেখিয়েছিলেন তা কি সহজে ভুলতে পারি?

আমাদের কলেজের একটি সমস্যা নিয়ে আরেকবার মঞ্জুরের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম অধ্যক্ষ ইব্রাহিম হোসেন ও আমি। তিনি তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি বা জেনারেল অফিসার কমান্ডিং। সেনানিবাসে তার দফতরে গিয়ে জানলাম, তিনি ‘দরবারে’ আছেন। দরবার শেষে আমাদের কাছে বিস্তারিত শুনে, তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেন। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কক্সবাজার বেড়াতে যাবো।

কক্সবাজার ঝাউবন এলাকায় ‘কিছুক্ষণ’ নামের একটি হোটেলে উঠি। দুুপুরের খাবার শেষে আমরা হোটেলে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি গাছপাকা আম ডালের আঘাতে দরজা দিয়ে সোজা বালিশের পাশে আমার মুখের কাছে চলে আসে। ভাবলাম, আল্লাহ যাকে খাওয়ান তিনি গাছে না উঠলেও বিছানায় তার খাবার মুখে তুলে দিতে পারেন।

আরেকটি কাজ নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলাম ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের কাছে; মেহেরুল্লাহ একাডেমির হেড মাস্টার শামসুর রহমানকে নিয়ে। কাজ শেষে আমরা দু’জন সিদ্ধান্ত নিলাম সেন্টমার্টিনে যাবো। সৈকতে প্রবাল পাথরের মাঝে দেখি, বিশাল আকৃতির একটি কাকলে মাছ। সাগরের ঢেউয়ে উঠে এসে পাথরের মাঝে আটকে পড়ে। হাতে রুমাল বেঁধে মাছটি ধরে রাখি। ফিরে আসার পথে জাহাজে সারেংয়ের পাশে বসা অবস্থায় একটি মাছ ঢেউয়ের তোড়ে আমার কোলে এসে পড়ে। সেটিও ধরে রাখি। টেকনাফে আমার পূর্বপরিচিত নিউ নেশনের সাংবাদিক ও কুংফু কারাতের মার্শাল আর্টের প্রখ্যাত প্রশিক্ষক, কিম-অংজি হাসানকে মাছ দু’টি শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারিনি। তাই সেই মাছ খাওয়া হয়নি। কারণ রাতেই আমাদের ধরতে হবে ফেরার গাড়ি। এর দু-তিন বছর পর তিনি যশোরে এসেছিলেন মার্শাল আর্ট কারাতের প্রশিক্ষক সাংবাদিক প্রদীপ ঘোষের আমন্ত্রণে। যশোরে আসার পর আমার সাথে দেখা করতে ভোলেননি।

নব্বইয়ের দশকে শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম ভারতে। সেখানে দু’টি মজার ঘটনা ঘটেছে। সফরসঙ্গী শিক্ষক তারাপদ দাস ও লরেন্স ডি. রোজারিও তীর্থস্থান। মথুরা বৃন্দাবন ভ্রমণকালে একটি হনুমান আমার দুই পা জড়িয়ে ধরে। কিছুতেই ছাড়ছিল না। তখন পাশের একজন বললেন, কলা আনার ব্যবস্থা করুন। কলা দেয়ার পরই হনুমানের হাত থেকে মুক্তি পাই। সেখানে আরেকটি হনুমান এসে তারাপদ দাসের চোখের চশমা ছিনিয়ে পার্শ্ববর্তী ভাঙা ভবনের উপরে উঠে সেই চশমা চোখে দেয়। দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করার মুহূর্তে হুনুমানটি অদৃশ্য হয়ে যায়।

দেশে ফেরার পথে কলকাতা অবস্থানকালে আলীপুর চিড়িয়াখানায় দেখি, একটি ময়ূরের খাঁচার ধারে দর্শনার্থীদের ভিড়। কিন্তু ময়ূর পাখা তখনো মেলেনি। তখন হাততালি দিয়ে বলে উঠলাম, ময়ূর নাচো। আমার কথা শেষ হওয়া মাত্র দু’টি ময়ূর পাখা মেলে নাচতে শুরু করে দেয়। দৃশ্যটি দেখে এবং আমার কথা শুনে দর্শকদের কৌতূহল বেড়ে যায়। আনন্দে উল্লসিত হয়ে তারা আমার দেশ ও পরিচয় জানতে চাইলেন।

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, উন্নয়ন কর্মী


আরো সংবাদ