Naya Diganta

ইউক্রেন : মিডিয়া ও দু’নেতা

ভ্লাদিমির পুতিন ও ভলোদিমির জেলেনস্কি।

এখনকার পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সঙ্কট ইউক্রেন ইস্যু। অন্তত মিডিয়ার প্রচারণায় তাই মনে হচ্ছে। ইউক্রেনে দ্বন্দ্ব মূলত দু’টি বৃহৎশক্তির। ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। তেমনি আমাদের বাংলাদেশের মতো আয়তনে ছোট রাষ্ট্রও অন্তত এ কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির শিকার হবে বলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবুও এ দেশের মিডিয়ারও আগ্রহ ও উৎসাহের অবধি নেই ইউক্রেন সমস্যা তুলে ধরার বিষয়ে। অবশ্য মিডিয়ার আনুকূল্য প্রধানত পাশ্চাত্যের সাথে এবং রাশিয়ার বিপক্ষে। তবুও একগুঁয়ে রুশ রাষ্ট্রপতি (তিনি সে দেশে কার্যত প্রায় সব কিছুর ‘পতি’) ভøাদিমির পুতিনের ‘কুছ পরোয়া নেহি’।

এই সাবেক গোয়েন্দা কোনো কিছুর কোনো তোয়াক্কা না করেই তার পরিকল্পনা যে নিছক কল্পনা নয়, বাস্তব- তার প্রমাণ রাখছেন। পুতিনের পোয়াবারো বলেই প্রতীয়মান। সংবাদপত্রের সংবাদ অনুসারে, পুতিনের রাশিয়া ইউক্রেনের বেশ ক’টি শহর দখল করেছে। কিন্তু এতটুকু করেই রাশিয়া বিরত হবে বলে মনে হয় না। ইউক্রেন দেশটা যাতে ন্যাটো কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা ইইউতে যোগ দিতে কিছুতেই না পারে, তার গ্যারান্টি পুতিন চান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকার সিদ্ধান্ত যদি হয়, তার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ, তখন কি ইউক্রেনের পশ্চিমাপন্থী জেলেনস্কি সরকার এতে যোগ না দিয়ে পারবে? তাই পুতিন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে সে দেশের অনুগত নতুন সরকার না বসালে পারবেন না ইউক্রেনকে বিরত রাখতে মার্কিন বা পাশ্চাত্যের কোনো জোটে যোগ দেয়া থেকে। এ জন্যই হয়তো রাশিয়া শিগগিরই কিয়েভ দখল করে নিতে চায়। এ কারণেই সম্ভবত বেলারুশ শান্তি সংলাপের সময়েও পুতিন আগের মতোই সঙ্ঘাতের মুখোমুখি করছেন ইউক্রেন বাহিনী ও সরকারকে। তিনি শুধু ইউক্রেনকে নয়, চান রাশিয়ার আশপাশের কোনো দেশ যাতে ন্যাটোতে না যায় এবং মার্কিন সেনা যেন রাশিয়ার আশপাশে না আসতে পারে। তিনি ইতঃপূর্বে জর্জিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তানে রুশ সেনা পাঠিয়েছেন এসব উদ্দেশ্যে। এখন বেলারুশ রাশিয়ার তাঁবেদার। আর কাজাখস্তান অনুগত তার। আগেই বোঝা গেছে, পুতিন সহজে ক্ষান্ত হবেন না। তিনি ‘গভীর পানির মাছ’। রাশিয়া তার নেতৃত্বে যা বলে তা না করে হঠাৎ অন্য কিছু করে ফেলতে পারে। এ জন্যই ইউক্রেনযুদ্ধ কেন্দ্র করে শুধু বিশ্বযুদ্ধ নয়; পরমাণু লড়াইও শুরু হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা। পুতিনের মতিগতি বোঝা ভার। ইউক্রেনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে তিনি মানেন না- এটা স্বীকার করতে হবে। তা ২০১৪ সালেই প্রমাণিত উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখলের মধ্য দিয়ে।

মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা উঠছে। মিডিয়া এখন পাশ্চাত্যের বন্ধু; তাই ইউক্রেনের সুহৃদ। কিন্তু লিবিয়া, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি মুসলিম দেশের ক্ষেত্রে মিডিয়া ‘অন্যরকম’ কেন? এ প্রশ্ন অনেকের। আরেক প্রশ্ন, ইউক্রেন নিয়ে অভিনেতা (জেলেনস্কি) জিতবেন, না কি সাবেক গোয়েন্দা (পুতিন)? দেখা যাক কী হয়।

পত্রিকার শিরোনাম : ‘দ্বৈতনীতি নিয়ে সমালোচনার মুখে পশ্চিমা গণমাধ্যম’। আল-জাজিরা জানায়, ইউক্রেনের প্রতি বিশ্বব্যাপী সমর্থন অব্যাহত- বিশেষত ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়াতে। সেখানে ইউক্রেনে রুশ হামলা ‘আগ্রাসন’রূপে অভিহিত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের পত্র-পত্রিকাও বেশ গুরুত্ব দিয়ে ইউক্রেনের সপক্ষে, বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানান খবর দিচ্ছে। এখন তাদের চোখে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টসহ সে দেশীয় নাগরিকরা ‘বীর’। কিন্তু প্রশ্ন জেগেছে, অন্যান্য যুদ্ধ বা আগ্রাসনের (যেমন ইরাক-সিরিয়া-লিবিয়া) বেলায় একই সংবাদমাধ্যমকে অন্যরকম করতে দেখা যায়। এটা কি দ্বৈতনীতি বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নয়? সোশ্যাল মিডিয়াতে এ নিয়ে সমালোচনা প্রচুর।

রাশিয়া তার পড়শি ইউক্রেনে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বারবার সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে দেশটার দ্বিতীয় বৃহৎ শহর খারকিভের পতন ঘটেছে। ডোনেস্ক ও লোহানস্ক তো আগে থেকেই রুশপন্থী বিদ্রোহীরা নিয়ে নিয়েছে। ইউক্রেনের খেরসন শহরও রাশিয়ার হাতে। ধারণা হলো, নিজেদের পতনাবধি রুশ হামলা বন্ধ হবে না। রাশিয়ার হাতে কয়েকটি শিশুসহ কয়েক শ’ ইউক্রেনীয় নাগরিক নিহত হয়েছে এবং আহত অনেক মানুষ। জাতিসঙ্ঘ জানায়, কয়েক লাখ লোক আতঙ্কে ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের বেশির ভাগ প্রতিবেশী পোল্যান্ডে গেছে। এদিকে, রুশ নেতা পুতিনের আগ্রাসন অব্যাহত। বিক্ষুব্ধ পাশ্চাত্য তাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে, রুশদের হামলা চলছেই ইউক্রেনে। রুশ ব্যাংক, রিফাইনারি, সামরিক উপকরণ প্রভৃতিই পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের প্রধান টার্গেট। তাদের সবাই রুশ আগ্রাসনের নিন্দায় সরব। বিশ্ব সংস্থার নিরাপত্তা পরিষদও ঘন ঘন বৈঠকে বসছে (কার নিরাপত্তার জন্য?)।

অপরদিকে, সামাজিক মাধ্যম সোচ্চার তীব্র প্রতিক্রিয়ায়। এতে বলা হয়েছে, ইউক্রেন নিয়ে এখন পাশ্চাত্যের যে প্রতিক্রিয়া, অন্যান্য যুদ্ধে তা দেখা যায়নি। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশের লড়াইকে সেভাবে দেখানো হয়নি। এ সবের উল্টোটা হচ্ছে ইউক্রেন নিয়ে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সমালোচনার তীর ছুড়ছে অনেক গণমাধ্যম ব্যক্তির, সাংবাদিক, রাজনীতিকের বিরুদ্ধে। তারা দ্বৈতনীতির অনুসারী বলে অভিযোগ। ইউক্রেনের যুদ্ধকে পাশ্চাত্য শুধু প্রশংসাই করছে না, তদুপরি ইউক্রেনকে ‘সভ্য’ রাষ্ট্র বলে উদ্বেগ জানানো হয়েছে, ‘এমন দেশে কিভাবে রাশিয়ার হামলা হতে পারে?’ কিয়েভ থেকে পাশ্চাত্যের একজন সাংবাদিক বলেন, এটা ইরাক বা আফগান ফ্রন্ট নয় যেখানে দশকের পর দশক লড়াই হয়েছে। ইউক্রেন অপেক্ষাকৃত সভ্য এবং একটি ইউরোপীয় রাষ্ট্র। এখানে যা হচ্ছে, তা অপ্রত্যাশিত।’ এসব শুনে সোশ্যাল মিডিয়া তাকে ‘বর্ণবাদী’ বললে তিনি মাফ চাইতে বাধ্য হন। সামাজিক মাধ্যম বলেছে, এরূপ বক্তব্য অশ্বেতাঙ্গও, তা-ই ইউরোপীয়দের দুর্ভোগের কারণ হবে। সম্প্রতি একটি মার্কিন টিভি চ্যানেল মধ্য ইউক্রেনের এক শহরের ভিডিও প্রচার করেছে। এতে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয় শহরবাসীর মলোটভ ককটলে বোমা বানানোকে। তখন সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গ করে মন্তব্য আসে, রুশ সেনা রোধে ইউক্রেনের ভূমিকাকে পাশ্চাত্যের মূল ধারার মিডিয়া কত সুন্দর কাভার করছে। কিন্তু যদি এলাকাগুলো (যারা বোমা বানাচ্ছে) ইয়েমেন বা ফিলিস্তিনের বাদামি বর্ণের ব্যক্তি হতো তাহলে ‘সন্ত্রাসী’ নামে অভিহিত করে ড্রোন হামলা চলতো ওদের ওপর। ফরাসি এক টিভি চ্যানেল বলেছে, ‘আমরা সিরিয়ার মানুষ নিয়ে কথা বলছি না। নিরাপত্তার স্বার্থে ইউক্রেন থেকে সরে যাওয়া ইউরোপীয়দের সম্পর্কে বলা হচ্ছে।’

অন্যদিকে, ব্রিটিশ সাংবাদিক ড্যানিয়েল তার বক্তব্যের জন্য সমালোচিত হয়েছেন।

এদিকে কথা উঠেছে ইউক্রেনের বর্তমান মার্কিনপন্থী নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি নিয়ে। তিনি নাম করা কৌতুকাভিনেতা বা কমেডিয়ান। ব্যঙ্গ করে রুশপন্থী এক নেতা বলেছেন, ‘ইউক্রেনের ভাগ্য তুলে দেয়া হয়েছে একজন কৌতুকাভিনেতার হাতে।’ তবে রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনও সমগ্র বিশ্বে কম নিন্দার পাত্র নন। তিনি একনায়কত্ব, দুঃশাসন ও স্বৈরাচারের দায়ে সমালোচিত। তার নামে অভিযোগ, ‘গণতন্ত্রকে বিকৃত করেছেন এ সাবেক গুপ্তচর। তিনি কুখ্যাত কেজিবি প্রধান ছিলেন রাশিয়ার। আইনের শাসন ও মানবাধিকারক তিনি হত্যা করেছেন ব্যাপকভাবে। আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকাই তার পরিকল্পনা ও স্বপ্ন।