Naya Diganta

ইউক্রেনকে ন্যাটোর বাইরে রাখার রুশ দাবি প্রত্যাখ্যান

ইউক্রেনকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য না করার যে দাবি রাশিয়া করেছে, তা নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ দিকে প্যারিস বৈঠকে নিজেদের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। তবে সব পক্ষকে সমস্যার উৎসমূল মিনস্ক চুক্তিতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে চীন। বিবিসি, রয়টার্স ও আলজাজিরা।
ইউক্রেনের সীমান্তে রাশিয়ার সৈন্য সমাবেশ নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বুধবার রাশিয়ার দাবির বিষয়ে তার দেশের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেন বলে জানিয়েছে বিবিসি। ব্লিনকেন কোনো নিশ্চয়তা না দিলেও বলেছেন, এর বদলে তিনি রাশিয়াকে ‘কূটনৈতিক পথে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, রাশিয়ার এটিই বেছে নেয়া উচিত।’ রাশিয়ার একজন মন্ত্রী বলেছেন, ন্যাটোর মাধ্যমে যে জবাব যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে, তা নিয়ে তারা আলোচনা করবেন। ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণের আলোচনায় নিজেদের আপত্তি আর দাবির একটি তালিকা লিখিতভাবে দিয়েছিল রাশিয়া। ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগ দেয়ার পথ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করার দাবিও সেখানে ছিল। এমনকি সেখানে ন্যাটোর সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে নাÑ এমন প্রতিশ্রুতিও চেয়েছিল রাশিয়া। গত বছরের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ফোনালাপের আগে-পরে মস্কো এসব দাবি সামনে আনে।
গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেন সীমান্তে এক লাখের বেশি সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে রাশিয়া। পশ্চিমা দেশগুলো বলে আসছে, রাশিয়া যেকোনো সময় ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তারা মনে করছে। তবে রাশিয়া তা অস্বীকার করে আসছে। ব্লিনকেন বলেছেন, তার দেশের মূল নীতিতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র একই সাথে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং ন্যাটোর মতো কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়ার অধিকার রক্ষার পক্ষে। তার ভাষায়, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আন্তরিকতা নিয়ে কারো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র একই সাথে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সমান মনোযোগ দিচ্ছে, যাতে তারা রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবেলা করতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এখন নির্ভর করছে রাশিয়ার ওপর, তারাই ঠিক করবে, তারা কিভাবে সাড়া দেবে। যে সিদ্ধান্তই তারা নিক, আমরা প্রস্তুত আছি।’ চলতি সপ্তাহেই ‘সামরিক সহায়তার’ তিনটি চালান ইউক্রেনে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি আর্মার উইপন এবং কয়েক শ’ টন গোলাবারুদ রয়েছে সেসব চালানে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইউক্রেনের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সে দেশের সরকারে ‘মস্কোপন্থী কাউকে বসানোর ষড়যন্ত্র’ করছেন বলেও এ সপ্তাহে অভিযোগ তোলে ব্রিটেন। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা হুঁশিয়ার করেছেন, ইউক্রেনে হামলা হলে রাশিয়াকে ‘চরম পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
পশ্চিমা মিত্রদের সাথে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য বা বিভক্তির কথা অস্বীকার করেছেন ব্লিনকেন। তার ভাষায়, ন্যাটো নিজস্ব একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবগুলো নিয়েই করা হচ্ছে। ন্যাটো মহাসচিব স্টলটেনবার্গ বলেছেন, তাদের জোটের বক্তব্য লিখিতভাবে মস্কোতে পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার উদ্বেগের বিষয়গুলো তারা শুনতে চান। কিন্তু নিজেদের মতো করে প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার অধিকার সব দেশেরই আছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ অবশ্য ন্যাটো মহাসচিবের বক্তব্যকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ আখ্যায়িত করেছেন। বুধবার রাশিয়ার পার্লামেন্টে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউক্রেনে ন্যাটোর সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়ে স্টলটেনবার্গের বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ল্যাভরভ বলেন, ‘আপনারা জানেন, তার বক্তব্যের বিষয়ে কথা বলা আমি অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছি।’
যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখতে রাজি রাশিয়া-ইউক্রেন : নিজেদের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। দুই প্রতিবেশী দেশের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই বুধবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই চলমান যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সম্মত হয় দুই দেশ। রুশ সংবাদমাধ্যম মস্কো টাইমস জানিয়েছে, উভয়পক্ষ ৮ ঘণ্টা আলোচনার পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি প্রকাশ করেছে। ফ্রান্স ও জার্মানিও আলোচনায় অংশ নেয়। যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ায় এর প্রশংসা করেছেন এক ফরাসি কূটনীতিক। তিনি এটিকে একটি সবুজ সঙ্কেত হিসেবে অভিহিত করেছেন। আলোচনায় অংশ নেয়া রাশিয়ার প্রতিনিধি বলেছেন, ৮ ঘণ্টার ওই আলোচনা বেশ কঠিন ছিল। জার্মানির বার্লিনে আবারো দুই সপ্তাহ পর রাশিয়া ও ইউক্রেন আলোচনায় বসবে বলে জানানো হয়েছে। ইউক্রেন সীমান্তে যখন টান টান উত্তেজনা চলছে এবং যেকোনো সময় যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে আলোচনায় বসে দুই পক্ষ।
সব পক্ষকে সমস্যার উৎসমূলে যাওয়ার আহ্বান চীনের : এ দিকে পাশ্চাত্য দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোকে ঘিরে ইউক্রেন-রাশিয়ার দ্বন্দ্বের ফলে যে বৈশ্বিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে, তা নিরসনে বিবদমান সব পক্ষকে সমস্যার উৎসমূল মিনস্ক চুক্তিতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে চীন।
বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর মধ্যে ইউক্রেন ইস্যুতে টেলিফোনে আলোচনা হয়। সেখানেই ওয়াং ই এই আহ্বান জানিয়েছেন বলে গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এ সম্পর্কিত এক বিবৃতিতে ওয়াং ই বলেন, ‘মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী টেলিফোনে আমাকে বলেছেন, সশস্ত্র যুদ্ধের পথ পরিহার করে কূটনৈতিকভাবে ইউক্রেন ইস্যুটি সমাধান করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। উত্তরে আমি বলেছি, প্রথমে আমাদের সবাইকে শান্ত হতে হবে এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারেÑ এমন যাবতীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। তার পর আমাদের ফিরতে হবে মিনস্ক ২ চুক্তিতে, যেটি এই পরিস্থিতির উৎসমূল। আমরা, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা যদি এ চুক্তিটি পর্যালোচনা করে ও সময়োপযোগী করে তোলার চেষ্টা করি, সে ক্ষেত্রে উপস্থিত সঙ্কট সমাধানের একটি পথ উঠে আসবে বলে চীন বিশ্বাস করে।’ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গরাজ্য ও রাশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইউক্রেন কয়েক বছর আগে ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করার পর থেকেই উত্তেজনা শুরু হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। সম্প্রতি ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্যপদ না দিলেও ‘সহযোগী দেশ’ হিসেবে মনোনীত করায় আরো বেড়েছে এই উত্তেজনা। ১৯৪৯ সালে গঠিত হওয়া নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অ্যালায়েন্সকে (ন্যাটো) রাশিয়া বরাবরই পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে মনে করে এবং ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়া পাশ্চাত্য আধিপত্যবাদের বিরোধী।
এ ছাড়া একসময়ের সোভিয়েত অঙ্গরাষ্ট্র ইউক্রেনের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রুশ বংশোদ্ভূত। দেশটিতে রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীও বেশ সক্রিয়। এই গোষ্ঠীর সশস্ত্র সহায়তায় ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দ্বীপের দখল নেয় রাশিয়া। ওই বছরই বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে ‘মিনস্ক ১’ চুক্তি স্বাক্ষর করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। মূলত এ চুক্তিটি ছিল ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্ঘাতের সমাপ্তি টানার দলিল। পরের বছর ২০১৫ সালে চুক্তির কিছু শর্ত সংশোধন করে চুক্তিটি নবায়ন করা হয় ‘মিনস্ক ২’ নামে। তবে রাশিয়ার অভিযোগ, মিনস্ক ২ চুক্তির বেশির ভাগ ধারাই বাস্তবায়িত হয়নি। পাশপাশি মস্কো আরো জানিয়েছে, চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাশিয়ার নিরাপত্তার স্বার্থেই ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে সেনা মোতায়েন রাখা হয়েছে। গত ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে এক লাখেরও বেশি রুশ সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। ওই মাসের শেষ দিকে বেশির ভাগ সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে মস্কো; তবে এখনো সীমান্তে ১০ হাজারের মতো রুশ সেনা অবস্থান করছে।
বুধবারের টেলিফোন সংলাপে ব্লিনকেনকে ওয়াং ই বলেন, একটি দেশের নিরাপত্তাকে জোর দিতে গিয়ে অন্যান্য দেশ এবং পূর্ব ইউরোপের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি সেনা উপস্থিতি বাড়িয়ে যুদ্ধের উত্তেজনার সৃষ্টির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এ সম্পর্কে ওয়াং ই বলেন, ‘মিনস্ক-২ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত একটি চুক্তি এবং এখন পর্যন্ত এই চুক্তিটি বিবদমান সব পক্ষের আকাক্সক্ষার একটি সফল বাস্তবায়ন। আমরা চাই, এ চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হোক এবং এ ক্ষেত্রে যা যা সহযোগিতা প্রয়োজন; তার সব দিতে বেইজিং প্রস্তুত আছে।’