Naya Diganta

খাদ্যসঙ্কটে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের বন্যপ্রাণীরা

অতিথিদের দেয়া খাবারেই বণ্যপ্রাণীগুলোর ভরসা করতে হয় বেশি।

বনদস্যু, গাছচোর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে বনভূমি উজাড় হওয়ায় এবং বন বিভাগের অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে নির্ভয়ে বিচরণকারী পশু-পাখিদের খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতি মাসে বানরপ্রতি ৯৭ পয়সা আর হরিণপ্রতি ৩৫৮ টাকার খাবার সরবরাহ করা হয়। অপ্রতুল এই বরাদ্দে টান পড়ায় এসব অবলা প্রাণীর খাবারসঙ্কট তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে।

খাদ্যসঙ্কট থাকায় স্বাভাবিকভাবে প্রাণীগুলোর বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। দিন দিন কমে যাচ্ছে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ। খাবারের অভাবে বনের আশপাশে ও দূরের বিভিন্ন লোকালয়ে চলে যাচ্ছে তারা। এতে অনেক প্রাণী সড়ক দুর্ঘটনায়ও মারা যাচ্ছে। আবার অনেক প্রাণী শিকার হয়ে যাচ্ছে দুষ্ট লোকদের হাতে। ফলে এই জাতীয় উদ্যান থেকে দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণী।

বন বিভাগ বলছে, বন্যপ্রাণী রক্ষায় গাছের চারা লাগানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে টাঙ্গাইল বন বিভাগ। তারই ধারাবাহিকতায় টেকসই বন ও জীবিকা সুফল প্রকল্প এগিয়ে চলছে। এতে বনের ভেতরে বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বন্যপ্রাণীর খাদ্যসঙ্কট নিরসন হবে।

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বনাঞ্চলের দোখলা, জাতীয় সদর উদ্যান, চাড়ালজানী ও রসুলপুর রেঞ্জের আওতায় বানর-হনুমানের খাদ্য উপযোগী শাল-গজারী, কাইকা, সাইদা, আজুলী, জয়না, ভুতুম, কুম্বি, জিগা, সোনালুসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাকৃতিক ফলজ গাছ উজাড় হওয়ায় বন্যপ্রাণীর খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে তীব্রভাবে। এর জন্য প্রভাবশালী মহল ও খোদ বন বিভাগের অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নকে দায়ী করছেন অনেকে।

হরিণ প্রজনন কেন্দ্রের প্রবেশদ্বারে দেখা যায়, দেয়ালের ওপর বানরগুলো পথপানে চেয়ে আছে। ব্যারাকের সামনে পৌঁছতেই মুহূর্তেই তিন প্রজন্মের প্রায় অর্ধশত বানর চারদিক দিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে। বিস্কুট বের করামাত্রই যেন তারা প্রাণ ফিরে পায়। কে কার আগে বিস্কুট নিতে পারে, শুরু হয় প্রতিযোগিতা। যে যার মতো পারছে বিস্কুট নিয়ে গালে জমিয়ে রাখছে।

এটি গেল হরিণ প্রজনন কেন্দ্রের চিত্র, অন্যদিকে সন্তোষপুর রাবার বাগানের পাশের গজারি বনে গেলে চোখে পড়বে এর চাইতেও করুণ দৃশ্য। কোনো লোক গিয়ে দাঁড়ালেই একসাথে ছুটে আসবে ১৫-২০টি বানর। খাদ্য জাতীয় কিছু হাতে দেখলেই দৌড়ে এসে লাফিয়ে কাঁধে উঠে বসে। খাবার না দেয়া পর্যন্ত তারা নামবে না। এমনও দেখা গেছে- কলা, আনারসসহ ফল বোঝাই চলন্ত ট্রাকে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে বানর ও হনুমান। গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছার আগেই আবার একইভাবে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে কিংবা গাড়ির চাপায় মারা যাচ্ছে।

আর হরিণ প্রজনন কেন্দ্রে থাকা হরিণদের খাবার হিসেবে সকাল-বিকেল ভুষি দেয়া হয়। কখনো দিনে একবার। এক বস্তা ভুষি তিন দিনের জন্য বরাদ্দ। অনেক সময় জাতীয় উদ্যান রেঞ্জ থেকে লোক এসে খাবার দিয়ে যায়।

লহরিয়া বিটের কর্মরতার সাথে কথা হলে তিনি জানান, বড় কর্তারা এলে বানর, হনুমানকে বাদাম, কলা দেয়া হয়। তাছাড়া অতিথিদের দেয়া খাবারই ওদের ভরসা।

এ জন্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার বরাদ্দ না থাকায় খাদ্যসঙ্কটে তারা লোকালয়ে গিয়ে মারা যাচ্ছে কিংবা শিকারিদের হাতে ধরা পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় এ বন থেকে প্রাণীগুলো বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় বনে বাঘ-ভাল্লুক থাকলেও এখন বনে মানুষের বসবাস বাড়ছে। তাই বন সংকুচিত হয়ে প্রাকৃতিকভাবে খাবার সঙ্কট দেখা দিচ্ছে।

মধুপুরের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো: জামাল উদ্দিন জানান, বর্তমানে মধুপুর জাতীয় উদ্যানে প্রায় ১০ হাজার বানর-হনুমান রয়েছে। এদের কলা, বাদাম ও বিস্কুট দেয়া হয়। একটি প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় বাজেট আগের চেয়ে কমে গেছে। এ বনের বানর-হনুমানের খাবার সরবরাহের জন্য প্রতি মাসে মাত্র ৯ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং লহুরিয়া হরিণ প্রজনন কেন্দ্রের জন্য ৩২ হাজার ৯৪০ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এটা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সরকারের ঊর্ধ্বমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যেন বনের প্রাণীদের খাদ্যের বরাদ্দ বাড়ানো হয়।

জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের রেঞ্জার মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানান, বন্যপ্রাণীর খাবারের জন্য প্রতি মাসে রাজস্ব ও প্রকল্প খাতে বরাদ্দ ছিল। কিন্তু প্রকল্প খাত বন্ধ থাকায় বর্তমানে শুধু রাজস্ব খাতের বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। এই দিয়েই চালাতে হচ্ছে।