Naya Diganta
খনন নেই, তাই বড়াল মৃতপ্রায়

সব নদীর ড্রেজিং চাই

খনন নেই, তাই বড়াল মৃতপ্রায়

একটি জাতীয় দৈনিকের চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, একদা খরস্রোতা বড়াল নদ বর্তমানে অনেকটা পানিবিহীন হয়ে যেন মৃত্যুর সম্মুখীন। এ নদ পুনরুদ্ধার, স্রোতস্বিনী, দখল-দূষণমুক্ত করার জন্য বড়াল পারের লোকজন মানববন্ধন করেন ২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। তারা গত ১৩ বছরে এ জন্য সহস্রাধিক সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, মিছিল, আলোচনা সভা, মতবিনিময়, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন প্রভৃতি করেছেন। তবুও ঐতিহ্যবাহী বড়ালের অবস্থা হয়নি স্বাভাবিক। পদ্মায় এর উৎপত্তিস্থলেই পানিশূন্য। ফলে চারঘাটে (রাজশাহী) পদ্মা থেকে কোনো পানি আসছে না বড়ালে। এ দিকে চর জেগে পানির প্রবাহ বন্ধ। অনেক স্থানে নদের বুকে দখলবাজরা ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। এমনকি অনেক লোক এর বক্ষে ধান-গম, মসুর ও খেসারি, আখ, সরিষার আবাদও করছেন। বড়ালের কিছু অংশে বছরের পর বছর পানিই ঢুকছে না। কোথাওবা শুধু বর্ষায় পানি দেখা যায়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ব্যাহত হয় দু’তীরে সেচ কার্যক্রম। এতে বিঘœ ঘটে ফসল উৎপাদনে। এ অবস্থায় নদতীরবর্তী এলাকাবাসী অনেক সুবিধাই পান না।
বড়াল একদা ছিল বিখ্যাত নদ। বিরাট পদ্মার এই শাখা নদ রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা, এরপর নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর ও সাঁথিয়া এবং সবশেষে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে সিরাজগঞ্জে দেশের তিন প্রধান নদীর অন্যতম, যমুনায় মিলেছে। ‘বড়াল নদ রক্ষা জাতীয় কমিটি’র এক সদস্য জানান, চারঘাটের পর বড়াল নদ এক স্থানে দু’ভাগ হয়ে গেছে। একাংশ নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈরে আত্রাই নদীতে মিশে ‘গুমানি’ নাম নিয়েছে। তার পর চাটমোহরের সীমানায় দু’ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এর এক ভাগ ফের বড়ালে মিশে সে নামেই প্রবাহিত হয়ে বিখ্যাত বাঘাবাড়ীতে হুরা সাগরসমেত যমুনায় মিশে গেছে। এখন এর মোহনাতেও শুকনা দিনে পানি সামান্য থাকে। অন্য দিকে বর্ষার সময় চারঘাট স্লুইস গেট থেকে আটঘড়ি স্লুইস গেট পর্যন্ত বড়ালে পদ্মার পানি ঢুকলেও বড়ালের উৎসে চর পড়ে গেছে। তাই বছরের অর্ধেক সময়ই পানি আসতে পারে না। আটঘড়ি থেকে বনপাড়া (নাটোর) অবধি নদের ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ দখলবাজরা করায়ত্ত করেছেন। ভরাট করে হাউজিং সোসাইটি এবং আশ্রয়ণ প্রকল্প, সরকারের অফিসও গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে বড়ালের নামনিশানা পর্যন্ত নেই।
বড়ালের স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখা এবং নাব্যতা ফেরানোর জন্য ২০০৮ সালে নাটোরে নারদ ও মুসা খান (আংশিক) নদী এবং রাজশাহী জেলার চারঘাটে রেগুলেটরের ইনটেক চ্যানেল খননের প্রকল্পে ১৩ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা। চারঘাট স্লুইস গেট থেকে পদ্মা পর্যন্ত প্রবেশপথের ১৮শ’ মিটার এবং নদীর ১৯ কিলোমিটার খননের জন্য এই অর্থ ‘ব্যয় হয়েছে’। কিন্তু এর পরও এক যুগে বড়ালের ভাগ্য ফেরেনি। এ বছর শীতের আগে কার্তিকেই এ নদের মুখ শুকিয়ে যায়। বড়াল রক্ষা কমিটি মনে করে, তাদের আন্দোলনেই তিন দশক পরে হলেও চারঘাট স্লুইস গেট খুলে দিতে হলো। বড়ালের উৎস খননে প্রশাসনও বাধ্য হয়েছে। নদের চারটি ক্রস বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে। চাটমোহরে আরেকটি বাঁধের বদলে ব্রিজ নির্মিত হয়েছে কমিটির সংগ্রামের মধ্য দিয়েই। সরকারের নদী সম্পর্কিত টাস্কফোর্স সুপারিশ চায়। তখন এর প্রধান ও মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক নদীর সব বাধা সরিয়ে নেয়া, দখলদারমুক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় খননসহ ৬ দফা পেশ করেছেন। পাউবোর পক্ষে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব পেয়ে এ ৬ দফা সুপারিশের সমর্থনে প্রতিবেদন দেয়।
চারঘাটের স্লুইস গেট ভেঙে ফেলা জরুরি। চারঘাট-বাঘা নৌপথের ৫৬টি ব্রিজ ভেঙে বড় করা উচিত। বড়ালের দু’পাশ চিহ্নিত করে সব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। ড্রেজিংয়ের সব মাটি অন্যত্র ফেলতে হবে। এমন অবস্থা হোক যে, নদীর পানি দিয়ে কৃষক চাষাবাদ করবে; জেলে মাছ ধরার পেশায় ফিরতে পারবে এবং নৌচলাচলে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করা হবে না। বড়ালের যাবতীয় দূষণ রোধ করে একে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার অবিলম্বে এসব পদক্ষেপ নিয়ে বড়ালকে বাঁচাবে। না হলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তখন এর মাসুল দিতে হবে সবাইকে।