Naya Diganta
ক্যান্সার প্রকল্প

বিদেশ ট্যুরে জনপ্রতি পৌনে ১০ লাখ টাকা

ক্যান্সার প্রকল্প

পরামর্শক ও বিদেশ ট্যুরে উন্নয়ন প্রকল্পের একটা বিশেষ অংশ ব্যয় হচ্ছে। বিদেশ প্রশিক্ষণের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণটা ভালোই চলছে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে। একনেক সভা থেকে এ ব্যাপারে বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়ার পরও তার প্রতি দৃষ্টি নেই বললেই চলে। প্রকল্পে বিদেশ প্রশিক্ষণে মাথাপিছু ব্যয় ৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা। কাজ দ্বিগুণ বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে সাড়ে চার গুণ। ইলেকট্রিক ডাটা ট্র্যাকিংসহ জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ু-মুখ ও স্তনে ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি প্রকল্পে এই তথ্য পাওয়া গেছে। তিন বছরের এই প্রকল্পটি এখন ছয় বছরে উন্নীত করার প্রস্তাবের পাশাপাশি ব্যয় ৪৯.৫৪ কোটি টাকা থেকে এখন ১৯৯ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় জরায়ু-মুখ এবং স্তন ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন না হওয়ায় টারশিয়ারি হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে এ সব রোগের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। এই সব রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানে সার্জিক্যাল চিকিৎসা ও রেডিওথেরাপির সুবিধাদি রয়েছে, যা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাই বাংলাদেশের নারীদের জরায়ু-মুখ ও স্তনে ক্যান্সার স্ক্রিনিং, ব্যবস্থাপনা এবং ফলো-আপের জন্য কার্যকর রেফারাল পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করে ক্যান্সারজনিত মাতৃমৃত্যুহার কমিয়ে আনতে প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল দেশের ২০০ উপজেলাতে এটি বাস্তবায়ন করা, সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রিক ডাটা ট্র্যাকিংসহ জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ু-মুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচির অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও জেলা হাসপাতালে জরায়ু-মুখ ও স্তন ক্যান্সার পূর্বাবস্থা চিকিৎসা সুবিধাদি শক্তিশালী করা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাড়ে ৩৩ হাজার বর্গফুট অবকাঠামো নির্মাণ।
প্রেক্ষাপট থেকে জানা গেছে, ৪৯ কোটি ৫৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা খরচের এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেন পরিকল্পনামন্ত্রী। ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫৬.৯৩ শতাংশ। পরে খরচ বাড়িয়ে ৫৬ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার টাকায় উন্নীত করে মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রকল্প এলাকা সম্প্রসারণ করে ৪৯২ উপজেলা, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, ভায়া ও সিবিই কেন্দ্র বা রেফারাল কেন্দ্র সংস্কার বা অবকাঠামো উন্নয়ন, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে ব্রেস্ট ক্লিনিক স্থাপনের কারণে ব্যয় ১৯৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আশরাফুন্নেসা তার প্রতিবেদনে জানান, ৬৪ জেলার ৮৯২টি উপজেলাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। ভায়া ও সিবিই কেন্দ্র বা রেফারাল কেন্দ্র সংস্কার বা অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। নতুন করে কাজ বৃদ্ধি ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও স্থাপন করা হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ধারণা নেয়ার জন্য তিন ব্যাচে ২৪ জনকে বিদেশ প্রশিক্ষণে পাঠানো হবে। প্রকল্পের জনবল নিয়োগে বিলম্ব এবং কোভিড-১৯ সঙ্কটের কারণে মাঠপর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, ভায়া ও সিবিই, সমন্বয় সভা সেমিনার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যয় পর্যালোচনা থেকে জানা গেছে, প্রকল্পে ২৪ জনের বিদেশ প্রশিক্ষণের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এখানে জনপ্রতি ব্যয় হবে ৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা। মূল প্রকল্পে এই খাতে খরচ ছিল না। দ্বিতীয় সংশোধনীর সময় এটা যুক্ত করা হয়েছে। আবার পরামর্শক খাতে ৯ জনের জন্য ১ কোটি ৯ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। যেখানে মাথাপিছু ব্যয় ১২ লাখ ১১ হাজার টাকা। জুন ২১ পর্যন্ত পরামর্শক খাতে অগ্রগতি ৪০.৮৩ শতাংশ।
পুরস্কার ৩ লাখ থেকে ২২.৮০ লাখ টাকা, প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ৪০ লাখ থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা, চলচ্চিত্র নির্মাণে ৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা, বইপত্র ও সাময়িকীতে ৬ লাখ থেকে ২৪ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও প্রকাশনায় ২ কোটি সাড়ে ৩৩ লাখ টাকা থেকে ৫ কোটি ২ লাখ টাকা, মিটিং খাতে সাড়ে ৮ লাখ থেকে পৌনে ২৬ লাখ টাকা, পরীক্ষার ফি ২.৩০ লাখ থেকে ৩০ লাখ ১০ হাজার টাকা, সুপারভিশন ও মনিটরিং খাতে ৬২ লাখ থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে ১২ লাখ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা, স্টেশনারিতে প্রায় ৯ লাখ থেকে এখন পৌনে ২৯ লাখ টাকা, রাসায়নিক দ্রব্যাদি কেনাতে ১ কোটি টাকা থেকে প্রায় ১১ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্যয়ের এই অঙ্ককে পরিকল্পনা কমিশন যৌক্তিকভাবে দেখছে না। খরচকে কমিয়ে আনার জন্য তারা বলছে।
প্রকল্পে দুইটি যানবাহনের জন্য ১২ লাখ ২০ হাজার টাকার জ্বালানি ব্যয় থেকে এখন চারটির জন্য ২৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। ফিল্ড ট্যুরে ১০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা থেকে এখন ৩২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান কার্যপত্রে বলছেন, প্রকল্পের আওতায় আউট সোসিংয়ে নতুন করে ৪৫ জনের প্রস্তাব করা হলেও ৩৭ জনের জন্য অর্থ বিভাগের কোনো সুপারিশ নেই। এখানে আটজনের জন্য কমিশন থেকে সুপারিশ করা হয়েছে, প্রকল্পে তিনটি গাড়ির প্রস্তাব করা হলেও আউটসোর্সিং খাতে চারজন ড্রাইভারের সংস্থান রাখা হয়েছে। যার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনটি যানবাহনের জায়গায় মেরামত ও সংস্কারের জন্য চারটির খরচ ধরা হয়েছে। যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি, বই সাময়িকী, ইন্টারনেট, ফ্যাক্স কেনার ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত চুক্তি সম্পাদন হয়নি। এসবের ক্রয় পদ্ধতি ওটিএমের মাধ্যমে করতে হবে। অনেক খাতে যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনতে বলা হয়েছে।