Naya Diganta

কবি জসীমউদ্দীন- পল্লীর লোকায়ত ধারা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণ : বিশ্লেষণ

‘কবি জসীমউদ্দীন- পল্লীর লোকায়ত ধারা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণ’ বর্ণিত শিরোনামের লেখাটি একটি বিশ্লেষণাত্মক, সমালোচনামূলক, পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষাধর্মী লেখা। এই লেখায় জসীমউদ্দীন কবি যেমন গুণের অধিকারী ছিলেন, তাকে সেভাবেই চিত্রিত করার চেষ্টা হয়েছে। কাব্যিক বিশ্লেষণে সাহিত্যের বিচারে তিনি সম্মানের অধিকারী ছিলেন এবং যে ধারার অভিধায় ব্যাখ্যার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন সেভাবেই তার লেখার বিষয়কে টেনে আনা হয়েছে। মনগড়া, ইচ্ছামাফিক কোনো তত্ত্ব, যুক্তি বা বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই লেখায় হাত দেয়া হয়নি। তবে লেখাটিতে পরিণতির বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার আঙ্গিকে উপস্থাপনার চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিকতার যে বৈশিষ্ট্য বা সুর তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় তার বিভিন্ন লেখার মধ্যে।
বস্তুত জসীমউদ্দীনের পল্লী-জীবন ও সংস্কৃতির উপকরণ আশ্রয় করে কাব্য রচনা করেছেন বলেই অনাধুনিক হয়ে যাননি। আধুনিক নাগরিক জীবনের কথা তিনি তেমন গুরুত্ব দিয়ে বলেননি বা তার গভীরে প্রবিষ্ট হওয়ার গরজ বোধ করেননি বলে তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রবক্তা না হতে পারেন, কিন্তু তিনি যে আধুনিক যুগের তাতে সন্দেহ নেই। কারণ আধুনিক কবির মতোই তার কাব্যচর্চা সযতœ প্রয়াস ও অনুশীলনের ফসল। কী কাব্যের উপকরণ নির্বাচনে, কী প্রকরণের ব্যবহারে তার কবিমানস সতত সক্রিয় ছিল দেখতে পাই।
কাব্যের বিষয় যেমনি হোক তা কাব্যের দাবি মেটাতে কতটা সমর্থ, সে সম্পর্কে জসীমউদ্দীনের অভ্রান্ত শিল্পবোধ ছিল। আধুনিককালের এক সংস্কৃতিপ্রেমিক মানুষের শিল্প জিজ্ঞাসা তার পল্লীবৃত্তাশ্রয়ী কাব্য-সাধনায় উচ্চকিত হয়েছে। তাই জসীমউদ্দীন কোনো অর্থেই যুগবিরোধী নন, বরং এক অর্থে তিনি প্রচণ্ডভাবে যুগপ্রবৃত্তিরই পোষকতা করেছিলেন। আর যেখানে তিনি যুগজীবনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন, সেখানে তার বিরুদ্ধে অনাধুনিকতার অভিযোগ হাস্যকর বলেই অগ্রাহ্য হতে বাধ্য। কথাটা একটু ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে।
জসীমউদ্দীন সম্পর্কে ভাবতে গেলেই মনে হয় আমাদের চিরায়ত গ্রামজীবনের এমন মহৎ রূপকার আর কে আছেন তিনি ছাড়া? পৃথিবীর সব জাতির মতো বাঙালির কাছেও গ্রাম এক আদিম জীবনের প্রতীক- এই গ্রামকে কেন্দ্র করেই বাঙালির সমাজ ও জীবন হাজার বছর ধরে আবর্তিত হয়েছে। ধানের ক্ষেতের পাশে মাটির কুটির, একপাশে লাউয়ের মাচা, কালো গরুটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিষান বধূ- এসব অন্তহীন গ্রামীণ দৃশ্য চিরায়ত বাঙালি জীবনের প্রতীক। যন্ত্রসভ্যতা যে জীবনকে স্পর্শ করেনি সেই আদিম চিরায়ত গ্রামীণ জীবন আমাদের সবাইকে দু’হাত বাড়িয়ে ডাক দেয়। বাস্তবিকই নগরজীবনের কৃত্রিমতায় হাঁপিয়ে উঠে আমরা প্রায়ই গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত সৌন্দর্যের দিকে ছুটে যেতে চাই, আশ্রয় চাই প্রাণপণে। বাঙালির এই চিরায়ত গ্রামকে তিনি তুলে ধরেছেন তার সাহিত্যসাধনায়। বিশেষ করে জসীমউদ্দীনের কবিতায় আমাদের ফেলে আসা গ্রাম যেন কথা বলে ওঠে। অন্যান্য বাঙালি কবির সঙ্গে এখানেই তার বিশেষত্ব।
জসীমউদ্দীনের কথা ভাবতে গিয়ে আরো অনেকের মতো আমি আমার শৈশবকেই আবিষ্কার করি বারবার। সেই শৈশবে ছয়-সাত বছর বয়সে যখন প্রথম ছড়া-কবিতা পড়তে শুরু করেছি, তখন রবীন্দ্র-নজরুলের পাশাপাশি জসীমউদ্দীনের নামটিও অপরিহার্যভাবে হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল। বস্তুত আমার শৈশব ও কৈশোরে তিনি ছিলেন আমার অতি পরিচিত কবিব্যক্তিত্ব আমার স্বপ্নের মানুষদের একজন। এখন আমি সুস্পষ্টভাবে স্মরণ করতে পারছি, শৈশবে রবীন্দ্র-নজরুলের পর সর্বাগ্রে যে কবিটির নাম আমি জেনেছিলাম, তিনি হলেন জসীমউদ্দীন। বই খুলে প্রায়ই আবৃত্তি করতাম।
‘রাখাল ছেলে রাখাল ছেলে বারেক ফিরে চাও
বাঁকা গাঁয়ের পথটি ধরে কোথায় চলে যাও?’
আবার যেমন-
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
জসীমউদ্দীন ছিলেন বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। কেননা তিনিই একদিন দুঃসাহসিক অঙ্গীকার নিয়ে বলতে পেরেছিলেন- ‘তোমার গেঁয়ো মাঠটি আমার মক্কা হেন স্থান।’ পল্লীদরদি না হলে এমন উচ্চারণ কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। যে কথা বলছিলাম, জসীমউদ্দীন কি পল্লীকবি? বাস্তবে এর উত্তর হচ্ছে ‘না’।
আমরা লক্ষ করেছি, এক শ্রেণীর গেঁয়ো কবি পল্লীর সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ, প্রেম-বিরহ-যাতনা, লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার চিত্র তুলে ধরেন অত্যন্ত অমার্জিত ভাষায় ও ছন্দে। কোনো কাহিনীর উদ্ভট রূপায়ণে কিংবা কোনো বিরহ উপাখ্যান নির্মাণে গেঁয়ো কবিরা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন অতি সহজেই। এতে একদিকে যেমন থাকে শিল্প চেতনার অভাব- তেমনি অন্য দিকে রুচি, মননশীলতা ও রসোপযোগিতার দৈন্য। এ সত্ত্বেও, লোক জীবনে এগুলোর আদর ও কদর অল্প নয়। এগুলো অমার্জিত ও অশ্লীল হলেও এসব ‘কথাকাব্য’ সর্বত্র সমাদর লাভ করে। যেমন মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল কাব্য, কালিকা মঙ্গল কাব্য, পূর্ববঙ্গ গীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকা ইত্যাদি একই জাতের কাব্য পদবাচ্য। অবশ্য পূর্ববঙ্গ গীতিকা ও মৈমনসিংহ গীতিকা ‘কথাকাব্য’ হিসেবে প্রচুর সমাদর লাভ করেছে, সন্দেহ নেই।
মোট কথা, এ ধরনের গীতিকা কিংবা কাব্যের রচয়িতাকে সাধারণত পল্লীকবি বা গেঁয়ো কবি হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাহলে জসীমউদ্দীন কি এই অর্থে পল্লীকবি? জসীমউদ্দীন এ সঙ্কীর্ণ অর্থে পল্লীকবি নন। কেননা জসীমউদ্দীনের নক্শীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, সকিনা কিংবা বেদের মেয়ে ইত্যাদির উপাদান-উপকরণ পল্লীতে পাওয়া গেলেও কোনো গৃহস্থ ঘরে এসব প্রাপ্তি রীতিমতো দুঃসাধ্য। এ ছাড়া শিল্পসম্মত কাহিনী বুনন, কবিতার শব্দচয়ন, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, প্রতীক ও রূপক নির্মাণে এ সত্য প্রমাণ করে না।
রাখালী, কবর কিংবা পল্লীজননী যেকোনো একটি কবিতা নিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে- জসীমউদদ্ীনের কবিতায় কিংবা কাব্যোপন্যাসে আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার বড় একটা দেখা যায় না। যে দু’চারটি প্রয়োগ দৃষ্টিগোচর হয় তাও মার্জিত এবং কুশলী হস্তে ব্যবহৃত। সুতরাং জসীমউদ্দীনে একজন পল্লীকবির চরিত্র ও চারিত্র্য মোটেও ধরা পড়ে না। যদিও বলা হয়ে থাকে, তার মতো এমন ষোলোআনা পল্লী দরদি কবি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এর অর্থ এই নয় যে তিনি পল্লীকবি। বড়জোর ‘লোককবি’ বলা যায়। কারণ গ্রামজীবন ও পরিবেশ তার কাব্যে উপাদান জুগিয়েছে এবং তার কবিতা-কলাকুশলের মধ্যেও গ্রাম্য আবহকে আমরা মূর্ত হতে দেখি। কিন্তু তাই বলে তিনি গ্রাম্য কবি নন। তার চারণ-উপমা-রূপক প্রয়োগে তিনি যথেষ্ট মুন্শীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
জসীমউদ্দীন আসলে আধুনিক কবি। কারণ তিনি যেসব উপমা ব্যবহার করেছেন সেগুলোর উপাদান গ্রাম থেকে সংগৃহীত হলেও এর ব্যাখ্যাসূত্র প্রধানত নাগরিক। আবু সয়ীদ আইয়ুব আধুনিক শব্দটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এক হিসাবে যারাই আধুনিককালে কবিরূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রতিভা ও সাধনার, যুগ্ম অধিকারে, তারাই আধুনিক কবি যুগলক্ষণ অধিকৃত না হলেও। সুতরাং এ অর্থেও জসীমউদ্দীন আধুনিক কবি। অন্য পক্ষে ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার ভাব প্রকাশ ও আঙ্গিকে যারা পরিবর্তন এনেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম কবি তিনি। শুধু গ্রামীণ কবি ছিলেন না। কাহিনী কাব্য, ছন্দ ও গীতিময়তায় তিনি বাংলা কাব্যের নয়া দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাকে বাদ দিয়ে আধুনিক কবিতার কথা চিন্তা করা যায় না।
তবে প্রশ্ন ওঠে, তিরিশ কিংবা তিরিশোত্তর কবিরা যে অর্থে আধুনিক ছিলেন, জসীমউদ্দীন কি সে অর্থে আধুনিক? এর উত্তর হচ্ছে ‘না’। কেননা বুদ্ধদেব বসু ও আহসান হাবীব যে অর্থে আধুনিক, বিষ্ণু দে ও শামসুর রাহমান সে অর্থে আধুনিক নন। আবার জীবনানন্দ দাশ ও অমিয় চক্রবর্তী যে অর্থে আধুনিক, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্র কিংবা সমর সেন সে অর্থে আধুনিক নন। বস্তুত আধুনিক শব্দটি জবষধঃরাব বা আপেক্ষিক। আধুনিকতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তি- ‘আধুনিকতা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।’ আবার জীবনানন্দ দাশ মনে করেন, ‘বাংলা কাব্যে কিংবা কোনো দেশের বিশিষ্ট কাব্যে আধুনিকতা শুধু আজকের কবিতায় আছে- অন্যত্র নয়, এ কথা ঠিক নয়।’ আবার কেউ বলেন, ‘কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ-পরবর্তী এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত অন্তত মুক্তিপিয়াসী কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।’ সুতরাং এসব অভিধায়ও জসীমউদ্দীন আধুনিক কবি।
তার প্রকৃত পরিচয়- তিনি পল্লীবোধ ও পল্লী ইমেজের কবি। এর কারণও এই যে, প্রকৃতি উৎসারিত স্বাভাবিক ও মৌলিক লোকজ ধারাটি তার আগে আর কেউ তেমন সহজভাবে আধুনিক কাব্যধারার সাথে এক করতে সক্ষম হননি। এটি জসীমউদ্দীনের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল এ জন্য যে, তিনি ছিলেন গ্রাম ও গ্রামবাংলার এক স্বাভাবিক অংশ। আর সে জন্যই তার কবিতায় পল্লী প্রকৃতি, লোক জীবন ও লোক ঐতিহ্য অপূর্ব রূপলাভ করেছে। জসীমউদ্দীনের কাব্যে পল্লী প্রকৃতি যেভাবে উপমা-উৎপ্রেক্ষা, রূপক ও চিত্রকল্প তথা আধুনিক কবিতার লক্ষণযোগে ধরা দিয়েছে- সমগ্র বাংলাকাব্যে এর দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই। দু-তিনটি নজির এখানে খাড়া করি।
যেমন :
এই গাঁয়ের এক রাখাল ছেলে লম্বা মাথার চুল
কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল!
[নকশীকাঁথার মাঠ]
কিংবা
দূর্বাবনে রাখলে তারে দূর্বাতে যায় মিশে,
মেঘের খাটে শুইয়ে দিলে খুঁজে না পাই দিশে।
[সোজন বাদিয়ার ঘাট]
এবং এভাবেই রূপকল্পকে-চিত্রকল্পে এবং উপমা-উৎপ্রেক্ষায় সমস্ত পল্লী প্রকৃতির ভেতরে ছড়ানো আছে জসীমউদ্দীনের কবিতার সাম্রাজ্য। মূলত সব দিক বিবেচনায় সহজেই বলা যায়, তিনি আধুনিক যুগের কবি।
লেখক : গবেষক ও সাবেক উপ-মহাপরিচালক,
বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি