Naya Diganta
প্রবাসীর প্রতি দুর্ব্যবহার

তাদের মর্যাদা দিতে হবে

প্রবাসীর প্রতি দুর্ব্যবহার

পৃথিবীর বুকে সম্ভবত বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যে দেশের প্রবাসী নাগরিকরা নিজ দেশের সরকারের কাছে অবমূল্যায়িত হন। বিশেষ করে যারা বিদেশে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করেন তাদের প্রতি তাচ্ছিল্য যেন একটু বেশি করা হয়। এমনকি সরকারের মন্ত্রীরা পর্যন্ত তাদের লাঞ্ছনাকর মন্তব্য করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। আমাদের দেশে রয়েছে এক বিপুল শ্রমিকশ্রেণী। তারা বিদেশে গিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। তারা শিক্ষা-দীক্ষা সেভাবে অর্জন করতে পারেননি ঠিক; কিন্তু দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ শ্রম দেন। আমরা তাদের দেশে-বিদেশে যেখানে পাই শোষণ করি, অবমাননা করি। সুযোগ পেলেই তাদের ওপর অনিয়ম-দুর্নীতির খড়গ বসিয়ে দিই। বিশেষ করে বিদেশে দূতাবাসে ও নিজ দেশের বিমানবন্দরে তাদের সাথে এমন আচরণ করা হয়। তারা এমন মন্দ আচরণের শিকার হন যা তারা ভুলতে পারেন না। আমরা যদি আমাদের এ আচরণ পরিবর্তন না করি তাহলে প্রকৃতপক্ষে এ দেশ কখনো উন্নত ও সভ্য হয়ে উঠতে পারবে না।
সহযোগী একটি দৈনিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশগামী যাত্রীদের হয়রানি ও ভোগান্তির খবর তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে ইমিগ্রেশন পুলিশের বাজে আচরণের ফিরিস্তি দেয়া হয়েছে। কেউ সাহায্য চাইলে কিংবা কোনো প্রয়োজনীয় বিষয় জানতে চাইলে তাদের প্রতি ইমিগ্রেশন পুলিশ বাজে ব্যবহার করছে। এই আচরণ গালিগালাজ এমনকি ‘তুই তোকারিতে’ পর্যন্ত গড়াচ্ছে। তাদের অবহেলার কারণে যাত্রীদের ফ্লাইট মিস হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। পত্রিকাটি কয়েকজন যাত্রীর সাক্ষাৎকার তুলে ধরেছে। বরিশাল থেকে আসা একজন জানান, তিনি টিকিট চেকের জন্য উপস্থিত হলে, দু’দিক থেকে দু’জন পুলিশ তাকে ডাক দেয়। একজনের ডাকে সাড়া দিলে অন্যজন তাকে বিশ্রী গালি দেয়। ময়মনসিংহ থেকে সিঙ্গাপুরগামী অন্য একজন যাত্রী জানান, ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। পুলিশ তকে ‘তুই’ সম্বোধন করে। সামান্য একটি ত্রুটির জন্য অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় তাকে গালি দেয়া হয়। ওই যাত্রীরা জানান, বাইরের বিমানবন্দরগুলোতে তাদের অত্যন্ত সম্মানের সাথে কর্মকর্তারা সম্বোধন করে থাকেন।
ঘটনার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তারা একেবারে শ্রমিকশ্রেণী নন। তারপরও নিজ দেশের কর্মকর্তারা তাদের সাথে ‘কাজের মানুষের’ মতো ব্যবহার করছেন যদিও কাজের মানুষের সাথে সম্মানিত মানুষের মতোই সবার আচরণ করা উচিত। প্রবাসে আমাদের দেশের এক কোটির বেশি মানুষ কর্মে নিয়োজিত। তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি শ্রমিক। তাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও দক্ষতা নেই। তারা যখন আমাদের বিমানবন্দরগুলোতে বাইরের দেশ থেকে নামেন তাদের সাথে রীতিমতো নির্মম আচরণ করা হয়। শুধু পুলিশ কিংবা বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা নন, নিম্ন শ্রেণীর কর্মকার্তারাও তাদের প্রতি চরম দুর্ব্যবহার করেন। আবার এই শ্রমিকরা বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোতে তাদের প্রয়োজনীয় কাজে গেলে যথাযথ সাহায্য পান না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের অবমাননা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়। প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করার জন্য সরকারের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। কিছু দিন আগে সরকারের এক কর্তাব্যক্তি মন্তব্য করে বসেছিলেন, ‘বিদেশে থাকা প্রবাসীরা দেশে এলে দেশে চুরিচামারি বেড়ে যাবে।’ অথচ এই শ্রমিকশ্রেণী রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দিলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিলাসী জীবনে ভাটার টান দেখা দেবে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে শ্রমিকরা বিপুল অর্থ পাঠিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছেন। কিছু দিন আগে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে বিমানভাড়া তিন গুণ বাড়িয়ে দেয়া হলো। অন্য দিকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এই শ্রমিকশ্রেণীকে বিদেশে পাঠানোর সময় অন্যায়ভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়। একই ধরনের শ্রমিক যখন আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রবাসে যান তারা তার থেকে বহু কম অর্থ ব্যয় করে দেশগুলোতে যেতে পারেন। অর্থাৎ আমরা আমাদের প্রবাসীদের সবদিক থেকে শোষণ-বঞ্চনা করছি।
এভাবে আমরা মূলত আমাদের নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছি। আমাদের মিত্র বা বন্ধুকে অবজ্ঞা করছি। প্রবাসীদের প্রতি এই মনোভাবের পরিবর্তন করতে হবে। তাদের ওপর চেপে বসা শোষণ করার নীতি, তাচ্ছিল্য করার নীতি পরিবর্তন করতে হবে। না হলে রাষ্ট্র্র কখনো মানবিক হয়ে উঠতে পারবে না।