Naya Diganta

সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি না করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

সরকারি দফতরে গিয়ে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি না করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ডিসিদের এই নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছে যাওয়ায় দায়িত্ব বেড়ে গেছে। সরকারি সেবা নিতে সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
প্রাণঘাতী ভাইরাস পরিস্থিতিতে দুই বছর পর ডিসি সম্মেলন আয়োজনে সক্ষম হওয়ায় তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে ধন্যবাদ জানান। কোভিড-১৯ এর নতুন প্রকোপের কারণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ১৫ জন মন্ত্রী ও সচিবের উপস্থিতিতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সম্মেলন শুরু হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস বক্তব্য রাখেন।
খুলনার বিভাগীয় কমিশনার ইসমাইল হোসেন বিভাগীয় কমিশনারদের পক্ষে এবং চাঁদপুর ও রংপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ ও আসিফ আহসান জেলা প্রশাসকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের মাধ্যমে সারা দেশে সরকারের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের কল্যাণ ও কাজ নিশ্চিত করার জন্য সেবা সম্পর্কিত একটি ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সেবার মনোভাব নিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসিদের জন্য যে ২৪ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, করোনাভাইরাসজনিত সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে জারিকৃত নির্দেশনাগুলো মাঠপর্যায়ে প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে গৃহীত উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রমগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং এর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি অফিসগুলোতে সাধারণ মানুষ যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বিঘেœ যথাযথ সেবা পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সেবাপ্রত্যাশীদের সন্তুষ্টি অর্জনই যেন হয় সরকারি কর্মচারীদের ব্রত। এসডিজি স্থানীয়করণের আওতায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে তৎপরতা জোরদার করতে হবে। গৃহহীনদের জন্য গৃহনির্মাণ, ভূমিহীনদের কৃষি খাসজমি বন্দোবস্তসহ সব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যেন প্রকৃত অসহায়, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানকার্যক্রমের মানোন্নয়নে উদ্যোগী হতে হবে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থায় অনলাইনে বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে পাঠদানকার্যক্রম যেন অব্যাহত থাকে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। নাগরিকদের সুস্থ জীবনাচারের জন্য জেলা ও উপজেলায় পার্ক, খেলার মাঠ প্রভৃতির সংরক্ষণ এবং নতুন পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। মাদকমুক্ত সমাজগঠনের লক্ষ্যে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত রাখতে হবে। মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করতে হবে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, খাদ্যে ভেজাল, নকল পণ্য তৈরি ইত্যাদি অপরাধ রোধকল্পে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ মসৃণ রাখতে, কৃত্রিম সঙ্কট রোধকল্পে ও পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নতুন নতুন পর্যটন স্পট গড়ে তুলতে হবে। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে, উপজেলা, জেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরমেয়র এবং অন্যান্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যারা রয়েছেন তাদের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে হবে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সমন্বয় করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প যেন যত্রতত্র না হয় সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।
দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা মেয়র, সিটি করপোরেশনÑ সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা করি, প্রকল্প গ্রহণ করি, বাস্তবায়ন করি এবং বাস্তবায়ন যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, সেটা যদি আমরা নজর দিই, আমাদের যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি, সেটাও যদি যথাযথভাবে আমরা বাস্তবায়ন করি, তাহলে অবশ্যই খুব বেশি দিন লাগবে না। আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছি, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে টিকে থেকে আমরা দেশকে উন্নত করতে পারব।’
জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের নামে পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, প্রতিবেশ যেন নষ্ট না হয়, জীববৈচিত্র্য যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, গণহত্যার শিকার হওয়া কোনো পরিবারের সদস্য ভিক্ষা করে খাবে তা স্বাধীন দেশের জন্য লজ্জার বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব থেকে আগে এই কাজটি করতে হবে। আমি আর কখনো দেখতে চাই না কোনো শহীদ পরিবার, জাতির পিতার চিঠি যার হাতে সে ভিক্ষা করে খাবে। এটা যেন না হয়। আমি সবাইকে আহ্বান জানাবÑ এ বিষয়টি আপনারা ভালোভাবে দেখবেন। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ ভিক্ষা করবে, এটা আমাদের জন্য মোটেও সম্মানজনক নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝরে পড়া ঠেকাতে স্কুল ফিডিং ব্যবস্থার ওপরে জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আর এ ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
সন্ধ্যায় সম্মেলনে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। আজ বুধবার জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীরও ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে।
উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এ প্রকল্পের কাঠামো নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ডিসিদের পক্ষে একটা প্রস্তাব ছিল, এটা বহুতল ভবন করা যায় কি-না। বহুতল ভবন হলে সেটা স্থায়ী হবে, আপনারা সবাই বুঝতে পারেন। কিন্তু আমরা কেন করি না, সেটা হচ্ছে একটা বহুতল ভবন করতে গেলে যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হবে, সে ক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের ওইটাকে কাস্টোমাইজ করার জন্য প্রস্তাবটি বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। আর দ্বিতীয় হচ্ছে বহুতল ভবন করা মানে এখানে ৫০ বছর থাকবে। আমাদের ছিন্নমূল পরিবার যেগুলো আছে, তাদের আশ্রয়ণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এইভাবে যে, এখান থেকে পরবর্তী সময়ে তাদের উত্তরণ ঘটবে। সেজন্য আমরা পার্মানেন্ট স্ট্রাকচারে যাইনি।
জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে অভ্যন্তরীণ সম্পদ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ, অর্থ বিভাগ, পরিসংখ্যান বিভাগ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিষয়াদিকে সামনে রেখে নানা ইস্যুতে আলোচনা হয়।
ডিসি সম্মেলন মোট অধিবেশন হবে ২৫টি। এর মধ্যে কার্য অধিবেশন রয়েছে ২১টি। এতে ৫৫টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা অংশ নিচ্ছে।
ডিসি সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি : সর্বত্র স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে
বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ মাঠ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বহুল প্রতীক্ষিত তিন দিনব্যাপী বার্ষিক ডিসি সম্মেলন- ২০২২ অনুষ্ঠানে বঙ্গভবন থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি হামিদ বলেন, ‘দুর্নীতি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। দুর্নীতির কারণে টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই মাঠ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।’
আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব ও ক্ষমতা অর্পণ করা হয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, দায়িত্ব সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ অত্যাবশ্যক, কিন্তু ক্ষমতার যাতে অপপ্রয়োগ না হয় তা নিশ্চিত করা আরো বেশি জরুরি। রাষ্ট্রপ্রধান কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ক্ষমতার পার্থক্য সচেতনভাবে বজায় রাখারও তাগিদ দেন।
জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে আবদুল হামিদ বলেন, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনে বিরাজমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনার জন্য জেলা প্রশাসক সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। আপনারা মাঠ পর্যায়ে সরকারের বিভিন্নমুখী কার্যক্রমের সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানকারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’
রাষ্ট্রপতি জনগণের সেবক হিসেবে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়ার উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘আমরা ও আপনারা জনগণের সেবক। তাই জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন। জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেবেন।’
ভূমি ব্যবস্থাপনার সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা খুব বেশি ও সরাসরি যা গ্রামীণ বিরোধ ও মামলা মোকদ্দমার অধিকাংশ জমিজমা সংক্রান্ত উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ভূমি রেকর্ডের সময় এক শ্রেণীর অসাধু কর্মচারী স্থানীয় প্রভাবশালী দালাল চক্রের সহযোগিতায় অনেক অনিয়ম করছে এবং অবৈধ সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে জনভোগান্তি বেড়েছে। তাই তিনি এসব ব্যাপারে ডিসিদের কঠোর হতে আদেশ দেন এবং যেকোনো অনিয়ম বন্ধ করতে শক্ত পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেন।