Naya Diganta

ঝামেলা কিনি

ঝামেলা কিনি

 

করোনার কারণে কয়েক মাস ঘর থেকে বের হয়নি বেগম আকতার জাহান। জরুরি প্রয়োজনে পাশে ছোট ভাইয়ের বাসায় অথবা নিজের মেয়ের বাসায় গেছে মাঝে মধ্যে। আজ সে সিদ্ধান্ত নেয় অতো বছর হলো ঢাকায় থাকছে এই উঁচু সোসাইটির ধানমন্ডির ভাড়া বাসায়, মিশছে নামীদামি লোকদের সাথে, দেখেছে এখানকার চাকচিক্য রকমারি জীবনের দৈনন্দিন ঘরসংসার, তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় আজ রিকশায় ঘুরবে পুরনো ঢাকার অলিতে গলিতে।
সে তিন ঘণ্টার জন্য একটি রিকশা ভাড়া নেবে। তা ভেবেই সে ঘর থেকে বের হলো। গলির মুখেই রিকশাওয়ালাকে বললো- আমি তিন ঘণ্টা ঘুরবো পুরান ঢাকায় ভাড়া কত দেবো।
- আপা গরিব মানুষ দিয়েন আপনার দয়ার হাত দিয়া। তয় অতো সময় কইরা একটানা চালাইতে পারমু না। মাঝে একটু সিগারেট চা খাওয়ার সময় দিয়েন।
- ঠিক আছে সময় পাইবেন। ভাড়া বলেন।
- ভাড়া কওন লাগবো? ইনসাফ কইরা দিয়েন।
আকতার জাহান মেজো মেয়েকে বলে এসেছেন যেনো মায়ের দিকে খেয়াল করে।
পুরনো ঢাকায় ঘুরতে যাচ্ছে বলে মেয়ের মন ভালো না। কারণ এই অসুস্থ বৃদ্ধ নানীকে দেখভাল করতে অনেক কষ্ট। অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। নানী নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারে না। তাই রুমে রুমে ‘বেল’ বাজানো সিস্টেম করে দেয়া হয়েছে। দরকারে নানী বেল বাজিয়ে যা যা প্রয়োজন বলে দেয়। কখনো বলে ওষুধ দাও, কখনো কলা রুটি দাও, কখনো ভাত দাও, কখনো ফল দাও, কখনো দুধ দাও। কখনো কখনো অপ্রয়োজনে ও অসময়ে এটা ওটা নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকে। তার এসব ফরমাইশে সবাই বিরক্ত হয়। তাকে ঝামেলা মনে হয় আজকাল।
আকতার জাহান মূলত মায়ের বৃদ্ধ জীবনের এই ঝামেলা থেকে একটু জিরোবার উদ্দেশ্যে বের হয়। পরশু দিন মা বাথরুম থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙেছে। তাকে নিয়ে বাইরে যাবার অবস্থা নেই। পরিচিত ডাক্তার ঘরে এনে ব্যান্ডেজ করে চিকিৎসা করতে হয়েছে। তাতে বেশি অর্থ খরচ হয়। ওটা শেষ না হতেই গতকাল গরম পানি পায়ে ঢেলে পা পুড়েছে।
অতো যে ঝামেলা পোহাতে হবে তা মাথায় ঢোকেনি আকতার জাহানের। নিজের বয়সও পঞ্চাশ পেরিয়েছে। আর কত সইবে ঝামেলা। তার মধ্যে সারারাত মা ঘুমায় না। মাঝে মাঝে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই ঘুমের ট্যাবলেট দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখে। তাতেও কাজ হয় না। সকাল হতে না হতেই আবার বেল টেপা শুরু। -আমার নাস্তা দাও ট্যাবলেট দাও কলা দাও।
রিকশা আলাউদ্দিন রোড দিয়ে হাজীর বিরিয়ানির সামনে দিয়ে ক্রস করে। আকতার জাহান জানে না এই পুরনো ঢাকার সব অলিগলি। শুধু কাগজে পড়েছে ছাপ্পান্নœ হাজার তেপ্পান্ন গলি। তবে সে আজ বাদামতলী হয়ে সদরঘাট বাংলাবাজার ঘুরে ঘুরে মিটফোর্ড হাসপাতাল দিয়ে যাবে যত দূর যাওয়া যায় এই তিন ঘণ্টায়। প্রয়োজনে আরো ঘুরবে যা সময় লাগে। আজ সে সত্যি একটু প্রাণমন জুরোতে চায় বিশ্রাম চায়। জীবনের অতো সময় গেলো, বাতাসে বাতাসে বয়ে গেছে শীত হেমন্ত চৈত্র, সে কখনো সুখ পেয়ে দেখেনি। অনুভব করেনি প্রকৃত সুখের কোনো মুহূর্ত। এই যে বয়স যাচ্ছে আর কতই বা বাঁচবে সে? নিজের ছেলে নেই, স্বামী নেই। তিনটে মেয়ে, সবারই বিয়ে হয়ে গেলো। মেঝো মেয়েটার সন্তান হচ্ছে না অনেক বছর হলে আজকাল প্রায়ই জায়নামাজে সময় ব্যয় করে। আল্লাহর কাছে কেঁদেকেটে প্রার্থনা করে। তাই এখানেই থাকে। ছোটটার দ্বিতীয় বিয়ে দিতে হলো, কপালের ফের। তারও কী হবে কে জানে। এ দিকে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে অতো ঝামেলা আসলেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
আকতার জাহান বংশাল অতিক্রম করে চলে যায় কোর্ট স্ট্রিটে। ধুলোর শহর ঢাকা। ফুটপাথ দখলের কর্মযজ্ঞ, পথ খোঁড়ার ইট বালি রড, লোকাল বাস টেম্পো লেগুনার ভিড়, হাজার হাজার রিকশার প্যারা ঠেলে কবি নজরুল কলেজ ঘেঁষে বাংলাবাজার বাদামতলী সদরঘাট। ওখানে গিয়ে সে একটু নামে, জিরোয়। অনেকগুলো লঞ্চ ভিড়ে আছে। নদীর জলে ময়লা ভাসছে, কটু গন্ধ, লোকজনের হইচই। ফুটপাথেই দোকানপাট পসরা। আশ্চর্য হয় আকতার জাহান, অতো অতো পাইকারি জিনিসের আড়ত এখানে আগে জানেনি। পান কাঁচা সুপারি থেকে শুরু করে কিছুরই অভাব নেই। চাল ডাল তেল আমড়া কচু জাম্বুরা কমলা পেঁপে লেবু ফল সব আছে। আছে মসলার পাইকারি দোকান, আছে খেজুরের দোকান। সে দরকষাকষি করে তিন কেজি খেজুর নেয়। নিজে যেমন খেজুর পছন্দ তেমন মাও খেতে চায়।
এই ফাঁকে রিকশা চালক পান সিগারেট খেয়ে নেয়। আকতার জাহান ভাবে রিকশা চালকের কথা। লোকটির ঘরে কী বৃদ্ধ বাবা-মা বা ঝামেলা করার মতো কেউ আছে। লোকটি কী তার মতোই দুঃখী নাকি সুখে আছে। সে ভাবে ঘাটের কুলি মজুরের কথা। ওদের দেখে মনে হয় যেনো সবাই সুখে আছে। আকতার জাহানের ভেতর থেকে দীর্ঘশ^াস বের হয়। নিজের অর্থবিত্ত যাই হোক ঘর সংসারের প্রাচুর্য যাই হোক আসলে স্বামী বা উপযুক্ত ছেলে না হলে সংসারের হাজারটার ঝামেলা সামাল দেয়া সত্যি কষ্টকর।
সে আবার ওঠে রিকশায়। ব্যাগে ঘুমিয়ে আছে দুটো কমলা আর দুটো আপেল। সে একটি কমলা রিকশাচালককে দিয়ে নিজে আপেল খেতে থাকে আর এই পুরনো ঢাকার মানুষ দেখে, মশার ঝাঁকের মতো মানুষ, মাছের ঝাঁকের মতো মানুষ, মৌমাছির চাক ভাঙা মানুষ...।
আজ তার খারাপ লাগে না। যদিও সে এই পরিবেশে বড় হয়নি, অতো মানুষের গিজ গিজ দেখেনি, অতো নোংরা পরিবেশ পায়নি, অতো ডাকচিৎকার শোনেনি তবু তার এখন ভালো লাগছে। অন্যরকম উপভোগ, অন্যরকম অনুভূতি।
সে এন্জয় করে আজকের অপরাহ্নের এই রিকশা ট্যুর। তার খিদে পায় না। চায়ের তেষ্টা পায় না ঘুমাবার জন্য চোখ ঢুলুঢুলু করে না। একটি স্বাধীনতা একটি মুক্তি একটি শিকল ভাঙার আনন্দ তার মগজে বয়ে যায়। চারদিকে তাকায় আকতার জাহান আর জীবনের অন্যরকম স্বাদ নেয় অন্যরকম নিঃশ্বাস নেয়। মিটফোর্ড এলে পারফিউমের গন্ধ, তারপর ওষধের গন্ধ, তার পরও ময়লার গন্ধ, তার পরে বিরিয়ানির গন্ধ, তারও পরে কুকুরের মলত্যাগের গন্ধ, তারপর মানুষের পেশাবের গন্ধ, তারও পরে বমির গন্ধ।
অপ্রিয় ঝামেলার জীবনে সে যে তিন ঘণ্টার জন্য বের হলো তার পরও এই শহর আজ সত্যি প্রিয় হয়ে উঠছে। লালবাগের কাছে এসে সে খেয়াল করে একটি দোকানের নাম “ঝামেলা কিনি” লেখা। দোকানের ভেতর তার চোখ যায়। সে দেখে টিনের কৌটা পলিথিনের ব্যাগ ডানোর পট বেতের চেয়ার প্লাস্টিকের বোল ভাঙা বেসিন সাইকেলের প্যাডেল...
আকতার জাহান ভালো করে আরেকবার দোকানের নাম দেখে আর মনে মনে হাসে। ‘ঝামেলা কিনি’। সত্যি এগুলো সংসারের ঝামেলাই। তার ভেতর থেকে একটি বড় দীর্ঘশ^াস বের হয়। মায়ের মুখটা মনে হয়।