Naya Diganta

সুন্দর করে কথা বলা

মানুষের একটি বিশেষ গুণ হচ্ছে সুন্দর করে কথা বলা। মিষ্টভাষী হওয়া, যারা সুন্দর করে কথা বলেন তারা সুবচনে-সুহাসী, তাদের কথায় জাদু আছে যা মানুষের মনকে মুগ্ধ করে স্নিগ্ধ মন ও পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মুখের ভাষাই হচ্ছে কথা, কথা বোঝার ও বোঝানোর জন্য অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়। এই শব্দগুলো যত সুন্দর স্পষ্ট হবে কথা তত সুন্দর ও প্রাঞ্জল হবে। কথা দুই রকম হয়- সুন্দর ও অসুন্দর। ভালো অথবা মন্দ কথা। ভালো কথার অর্থ ভালো, সুন্দর ও কল্যাণকর হয়ে থাকে। মন্দ কথার অর্থ খারাপ ও অকল্যাণকর হয়ে থাকে। সুন্দর কথাকে কুরআন মাজিদে একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে ‘একটি ভালো কথা একটি ভালো গাছের মতো, মাটিতে যার বদ্ধমূল শিকড়, আকাশে যার বিস্তৃত শাখা, সবসময় সে দিয়ে যায় ফল আর ফল’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত : ২৪-২৫)।
কি সুন্দর উপমা! একটি ভালো কথা, ভালো গাছের শিকড় যা মাটির গভীরে প্রোথিত, হালকা বাতাস তো দূরের কথা, ঝড় তুফানেও তা টলে না। তার শাখা বিস্তার করে সে মানুষের জন্য নিবিড় ছায়ার বন্দোবস্ত করেছে। আর মানুষকে সুমিষ্ট ফল দিয়েই যায়। তেমনি আপনার সুন্দর কথা মানুষকে দিতে পারে সুমিষ্ট পুষ্টি, শান্তি-কল্যাণের বার্তা ও অফুরন্ত আনন্দ।
সুন্দর কথা আনে মিষ্টি বাক্য, মধুঝরা বাণী, স্বচ্ছ স্পষ্ট কথা, শান্তি মাধুর্য-মধুর ধ্বনি, আর যিনি এ কথা বলেন তিনি হচ্ছেন মিষ্টভাষী, সুবক্তা, প্রিয়ভাষী, সুকথক ও অমৃতভাষী। পৃথিবীতে যত আদর্শ প্রচারিত হয়েছে তা সুন্দর কথা দিয়ে। অসুন্দর কথা দিয়ে কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। মানুষের মন জয় করতে হলে সুন্দর কথার কোনো বিকল্প নেই।
সুন্দর কথার সঞ্জীবনী সুধা মানুষকে মোহাবিষ্ট করে। মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচায়। সুন্দর কথার অনেক কার্যকারিতা রয়েছে যেমন- এতে মানুষের মনঃকষ্ট দূর হয়। মন সচেতন হয় বিবেক জাগ্রত হয়। শত্রুতা কেটে গিয়ে বন্ধুত্ব হয়। রাগ চলে গিয়ে মন তৃপ্ত হয়। সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয় ভালোবাসার বন্ধন গড়ে ওঠে। রাগারাগি-হানাহানি মিটে যায়। সৌহার্দ্যসম্প্রীতি গড়ে ওঠে।
তাই সোজা কথা সহজ ও সুন্দর করে বলুন, বাঁকা বা প্যাঁচানো কথা বলবেন না। সবরকম অসুন্দর ভাষা পরিহার করুন। সুন্দর শব্দচয়ন করুন, তার জন্য বাংলা ভাষাকে ভালোভাবে জানুন। হাসিমুখে কথা বলতে হবে। প্রিয় নবীজী সা: বলেছেন, ‘তোমার ভাইদের সাথে হাসিমুখে কথা বলাও সাদাকা।’ মানুষের প্রশংসা করুন, তার কৃতিত্ব ও অবদানের জন্য প্রশংসা করুন তবে তোয়াজ নয়। সে উপকার করেছে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। রাসূল সা: বলেন, ‘যে মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞ হয় না’ (আবু দাউদ)। প্রয়োজনে পরামর্শ দিন, আত্মীয়স্বজনের জন্য দোয়া করুন। মানুষের পেছনে নিন্দা না করে প্রশংসা করুন। শ্রোতাকে কখনো তিরস্কার বা কটু কথা বলবেন না। উপকারের কথা, কল্যাণের কথা বলতে হবে। বেশি কথা, অনর্গল কথা, মিথ্যা কথা পরিহার করে চলাই ভালো। আল্লাহ এ পৃথিবীকে সুন্দর করে সাজিয়ে মানুষকে সুন্দর করে কথা বলার প্রতি কর্তব্য করে দিলেন তখন সুন্দর করে কথা বলতে হবে। তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন ও অসুন্দরকে ঘৃণা করেন। মন্দ কথা বলে যে মানুষ নিজেকে জয়ী মনে করে, সে ঠিক জায়গায় ঠিক কথাটি বলতে পেরেছে। কিন্তু নবীজী সা: বলেন, ‘মুসলমানদের সুন্দর একটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে অর্থহীন কথা ও মন্দকাজ ত্যাগ করা’ (তিরমিজি)।
মন্দ কথা বা অসুন্দর কথা হচ্ছে কড়া কথা, গালি, অভিশাপ, কটাক্ষ, বিদ্রুপ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অপবাদ, বকাবকি, ধমকানি, চোটপাট ইত্যাদি। মন্দ কথায় কোনো লাভ নেই বরং ক্ষতি আছে। জবানকে নষ্ট করে চরিত্রকে কলঙ্কিত করে। মানুষ মিথ্যুককে ঘৃণা করে, ঘৃণার ফলে শত্রু হয়ে যায়। মন্দ কথা মূর্খতা আর তা বন্ধুত্ব নষ্ট করে। ‘মুসলিম যে, তার ভাষা ও কর্ম থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে ’(বুখারি )।
অসুন্দর কথা অনেক অনিষ্টের মূল। অসুন্দর কথা পরিবার তথা সমাজে ঘৃণা-বিদ্বেষ ও হানাহানির সৃষ্টি করে। ‘মিথ্যা বলা ও সাক্ষী দেয়া কবিরা গুনাহ’ (বুখারি)। ‘কোনো কটুভাষী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’ (আবু দাউদ)। সুতরাং আমাদের কল্যাণের জন্য সুন্দর কথা বলতে হবে। ‘কেউ যখন তোমাকে সৌজন্যমূলক সম্ভাষণ সালাম জানাবে প্রতিউত্তরে তুমি তাকে উত্তম সম্ভাষণ জানাও, কিংবা অন্তত ততটুকুই জানাও’ (সূরা নিসা, আয়াত-৬৩)। আল্লাহ সুন্দর ভালোবাসেন। আমরা তার রক্তে রঞ্জিত হই এবং জীবনকে সুন্দর করি। আমীন।