Naya Diganta

গণতন্ত্র সম্মেলনের আমন্ত্রণে মানবাধিকার মানতে হয়

মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবাট মিলার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেতে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্নীতি দমন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করতে হবে। কেননা শীর্ষ সম্মেলনে এসব নিয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশ এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ পাবে না। তবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী দেশগুলো এ সম্মেলনের নীতিকে সমর্থন দিতে পারে এবং নিজ দেশের গণতান্ত্রিক নীতিগুলো এগিয়ে নিতে প্রচেষ্টা চালাতে পারে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর গতকাল বৃহস্পতিবার কসমস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ভার্চুয়াল সংলাপে মিলার এ সব কথা বলেন। এতে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) বিশিষ্ট ফেলো রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) এ এন এম মুনিরুজ্জামান, কসমস ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কসমস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এনায়েতুল্লাহ খান। সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে দুই দিনের গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে। ভাচুর্য়াল এই সম্মেলনে বিশ্বের ১১০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এতে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও বাংলাদেশ বাদ পড়েছে। দুই পর্বে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বটি আগামী বছর ডিসেম্বরে সশরীরে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বাইডেনের।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) আওতায় সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের গ্রেফতার ও নির্বিচারে আটকাদেশে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্রদূত মিলার বলেন, এই আইনকে মানবিক, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পর্যালোচনা করার জন্য আমি সরকারকে উৎসাহিত করছি, যাতে এটি নির্বিচার আটক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অযাচিত বিধিনিষেধ আরোপের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। তিনি বলেন, ডিএসএ অবাধ বাকস্বাধীনতা ক্ষুণœ করার জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। আমরা সাইবার নিরাপত্তার সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তা গুলিয়ে ফেলে যাতে বিভ্রান্ত না হই, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে অধিক মাত্রায় মনোযোগ সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা প্রচেষ্টা ব্যাহত হতে পারে। অনলাইনসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে যুক্তরাষ্ট্র মূল্যায়ন করে। এটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সমর্থন করে, যেটিতে বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন থাকবে। আমরা ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বহুদলীয় ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সমর্থন করি, যে নীতিগুলো বাংলাদেশের সংবিধানে খুব সুন্দর করে বিধৃত রয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি সব রাজনৈতিক দল ও সব ভোটারের আস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করে মিলার বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে গণতান্ত্রিক অগ্রগতিও প্রয়োজন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা একে অপরের পরিপূরক। সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে তার প্রতিষ্ঠার ধারণা সমুন্নত রাখতে এবং সব নাগরিকের জন্য মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে অবশ্যই অব্যাহতভাবে কাজ করে যেতে হবে। তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বাস্থ্যকর গণতন্ত্রের জন্য অত্যাবশ্যক। প্রতিশোধের ভীতি ছাড়াই গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিরোধী দলের সদস্য ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের মতপ্রকাশ ও পরিবর্তনের দাবি তোলার অধিকার রয়েছে। ভিন্নমতের কণ্ঠস্বরকে শুনতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রাণবন্ত বিতর্ক থেকেই শক্তিশালী গণতন্ত্র বিকশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেই এসব উদ্বেগের ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে। মানবাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের ইস্যুটি আমি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উত্থাপন করেছি। বাংলাদেশে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার দায়িত্ব।
যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়ার ইস্যুটি নিয়ে ঢাকায় কিছু উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান বলেন, এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে কেন আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, মানুষ তা জানতে চায়। এটা থেকে সম্মেলন আয়োজনের লক্ষ্যগুলোতে বাংলাদেশের আরো উন্নতি করা প্রয়োজনÑ এমন বার্তাই অনেকে পেয়ে থাকতে পারেন। তবে বিশ্বস্ত সূত্রগুলো থেকে জানা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী গণতান্ত্রিক শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ আমন্ত্রিত হবে।
মেজর জেনারেল (অব:) মুনিরুজ্জামান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক টেকসই, যা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। এই সম্পর্ককে আমাদের পরিচর্যা করতে হবে। আর এ জন্য রাষ্ট্রদূত যেমনটা বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উন্নয়ন প্রয়োজন।
সাবেক মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্ব সুশাসন ও মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রাষ্ট্রদূত তারেক করিম বলেন, সব গণতন্ত্রই কার্যকর ও অগ্রসরমান। অন্য দেশের গণতন্ত্র কিভাবে চলা উচিত তা নিয়ে কেউ লেকচার দিতে পারে না। কেননা গণতান্ত্রিক ক্ষেত্রে প্রত্যেক জাতি তার নিজস্ব ধারায় চলে। তিনি বলেন, দুর্বলতা রয়েছে এমন ক্ষেত্রগুলোতে সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন।