Naya Diganta

বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথে শিক্ষার্থীরা, আন্দোলন স্থগিত

বৃষ্টিরজনিত বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের স্মরণে মুখে কালো কাপড় বেঁধে রাজধানীর সড়কে নেমেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রামপুরা ব্রিজের উপর মানববন্ধন করেছেন তারা। এ সময় বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে মৌন প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী খিলগাঁও মডেল কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তবে আবহাওয়া ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আপাতত আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়।
আবহাওয়া ঠিক হওয়ার পর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চাপায় নিহত নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসানের কলেজ থেকে বাসচাপায় নিহত একরামুন্নেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মাঈনুদ্দিনের স্কুল পর্যন্ত সাইকেল র্যালি করে মোমবাতি প্রজ্বলন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়। এ দিকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত গ্রিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাহাদি হাসান লিমনের ঘাতক গাড়িচালকের বিচারের দাবি জানিয়ে মিরপুরে প্রতীকী কফিনসহ ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে মিছিল করেছেন তার সহপাঠীরা।
রামপুরার মানববন্ধনে সোহাগী সামিয়া বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমরা মঙ্গলবার কোনো কর্মসূচি রাখছি না। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি আরো কয়েক দিন এরকম বৈরী আবহাওয়া থাকবে। যতদিন এই আবহাওয়া থাকবে ততদিন আমাদের আন্দোলন স্থগিত থাকবে। তবে বৈরী আবহাওয়া কেটে গেলে আমরা আবার কর্মসূচি চালিয়ে যাবো।
মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধনের বিষয়ে সোহাগী সামিয়া বলেন, এই যে এতগুলো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে; কিন্তু প্রশাসন বরাবরই নীরব ভ‚মিকা পালন করছে। প্রশাসনের এই নীরবতার প্রতিবাদে আমরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে নীরব আন্দোলন পালন করছি। এর প্রথম কারণ হচ্ছে আজ পর্যন্ত সড়কে যারা নিহত হয়েছেন তাদের শোক প্রকাশ করতে আমরা কালো কাপড় বেঁধেছি আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সরকারের নীরব ভ‚মিকার প্রতিবাদে আমরা আন্দোলন করছি। তিনি বলেন, আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন করব।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো: আলী তুষার বলেন, অনিয়মের বলি হয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে এই প্রতিবাদী মানববন্ধন পালন করা হচ্ছে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, সরকার এখনো আমাদের দাবি মানেনি। কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। মালিক সমিতি হাফ ভাড়ার মৌখিক ঘোষণা দিয়েছে; কিন্তু আমরা প্রজ্ঞাপন জারি চাই। যতদিন সেটি না হচ্ছে আন্দোলন চলবে।
এ দিকে গতকাল বেলা ১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচক্করে অবস্থান নেন লিমনের সহপাঠী এবং গ্রীন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। তারা প্রতীকী কফিনসহ ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে সড়কে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা নিরাপদ সড়কেরও দাবি জানান। কর্মসূচি চলাকালে অল্প সময়ের জন্য মিরপুর-১০ নম্বর গোলচক্করেরে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের তৎপরতায় আবার শুরু হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা মিরপুর-১০ নম্বর ফুট ওভারব্রিজের নিচে অবস্থান নিয়ে সড়কে যান চলাচলের সুযোগ করে দেন।
শিক্ষার্থীরা বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে লিমনের মৃত্যুতে জড়িত ঘাতক চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে আমরা সড়কে নেমেছি। আমাদের দাবি আমরা নিরাপদ সড়ক চাই, যেন সড়ক দুর্ঘটনায় আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। কোনো শিক্ষার্থীসহ অন্য কোনো মানুষের যেন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু না হয়। তারা বলেন, আমরা একটি নীরব মিছিল নিয়ে আমাদের ইউনিভার্সিটি থেকে মিরপুর-১০ নম্বর পর্যন্ত এসেছি। আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা করিনি, আমরা শুধু একটি দাবি নিয়ে সড়কে নেমেছি। মাহাদি হাসান লিমনের মৃত্যুতে দায়ী ট্রাকচালকসহ তার সহকারীকে দ্রæত আইনের আওতায় এনে বিচার যেমন আমরা চাই, তেমনি চাই একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা। ইচ্ছা করলে আমরা আন্দোলন করতে পারতাম; কিন্তু জনভোগান্তির কথা মাথায় রেখে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছি।
প্রসঙ্গত, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গত ৭ নভেম্বর থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে বাসের ভাড়া ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ নভেম্বর অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে ২৪ নভেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান নিহত হন। পরে রামপুরায় মাঈনুদ্দিন নামের এক শিক্ষার্থী অনাবিল পরিবহন বাসের চাপায় নিহত হন। তারপর থেকে নিরাপদ সড়ক, অর্ধেক ভাড়াসহ ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।
তাদের টানা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার রাজধানীতে বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয় পরিবহন মালিক সমিতি। এরই মধ্যে গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় লরির চাপায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মাহাদি হাসান লিমন নিহত হন। তিনি গ্রীন ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।