Naya Diganta

কোভিড ভ্যাকসিন আবিষ্কারে ইঁদুর দৌড়

প্রথম কিস্তি

বিশ্বব্যাপী চলছে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মহোৎসব। পৃথিবীর ইতিহাসে এবারই প্রথম এত সংখ্যক দেশ ও প্রতিষ্ঠান একটি মাত্র ভ্যাকসিন নিয়ে এত টাকা খরচ আর গবেষণা। মাত্র এক বছরের মাথায় করোনার হাত থেকে দ্রæত মুক্তির লক্ষ্যে করোনা ভ্যাকসিনের এত ভ্যারাইটিজ আবিষ্কার এরই আগে বিশ্ববাসী আর কখনো দেখেনি। তাই মানুষের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুর পাক খাচ্ছে, কিভাবে ও কারা এ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ইঁদুর দৌড়ে অংশগ্রহণ করল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে মার্কেট পর্যন্ত নিয়ে আসা একটি জটিল, কঠিন ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কোম্পানি যাদের অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক সব ধরনের অবকাঠামো পুরোপুরি বিদ্যমান আছে।

প্রকৃতপক্ষে, একটি ভ্যাকসিন বাজারে আসতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৫ বছর সময় লাগে। তবে এবারই প্রথম স্টান্ডার্ড ফুল স্কেল ট্রায়াল শেষ করার
আগেই ভ্যাকসিন জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পেল।

ভ্যাকসিন কিভাবে বাজারে আসে
একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর একটি নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বাজারে আসে। যখন কোনো একটি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান একটি ভ্যাকসিন বাজারে আনতে চায় তাদের সক্ষমতার ছাড়পত্র প্রথমেই সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কাছ থেকে নিতে হয়। সবার প্রথম যে ধাপটি অতিক্রম করতে হয় তা হলো, সংশ্লিষ্ট ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি প্রদান। দ্বিতীয় ধাপে ভ্যাকসিনের আবিষ্কার। তৃতীয় ধাপে হয় প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডি। প্রিক্লিনিক্যাল স্টাডি হতে হয় প্রাণীর শরীরে।

প্রতিটি কোম্পানি যারাই ভ্যাকসিন বের করতে চায় তাদেরকে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সরকারের অনুমতিপত্র নিতে হয়। এই স্টেজে ডোজ এবং কোনো ফর্মে ভ্যাকসিন বাজারে আনা হবে, তা নির্ধারিত হয়। এটিকে ইনভেস্টিগেশনাল নিউ ড্রাগ অ্যাপ্লিকেশন বলে। মানুষের শরীরে ক্লিনিক্যাল স্টাডি শুরু করার অনুমতি পেলে শুরু হয় চতুর্থ ধাপের কাজ বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এ পর্যায়ে মানুষের ওপর তিনটি ফেজে ট্রায়াল হয়। প্রথম ফেজ পরিচালিত হয় ৫-৫০ জনের ওপর খুবই অল্প সময়ের জন্য অর্থাৎ কয়েক মাসব্যাপী এই ট্রায়াল চলে। এখানে দেখা হয় ভ্যাকসিন নিরাপদ কি না এবং কোনো রিঅ্যাকশন হয় কি না। কত ডোজে এবং কোন পথে (ওরাল নাকি ইঞ্জেক্টেবল) ভ্যাকসিন প্রয়োগ ইফেক্টিভ ও নিরাপদ ইত্যাদি।

দ্বিতীয় ফেজ : এটি চলে ২৫-১০০০ লোকের ওপর। চলে কয়েক মাস থেকে দুই বছর। এখানে দেখা হয় নিরাপত্তা এবং ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা। এখানকার পরীক্ষার ধরন হলো ডাবল বস্নাইন্ডেড এবং একটি প্লাসেবো কন্ট্রোল গ্রুপ। এর মানে যাকে ভ্যাকসিন বা অন্য কিছু দেয়া হচ্ছে তিনিও জানেন না তাকে কি ভ্যাকসিন না অন্য কিছু দেয়া হচ্ছে আবার ইনভেস্টিগেটরও জানেন না কাকে কী দেয়া হচ্ছে। সব কিছুই কম্পিউটার কোড নিয়ন্ত্রিত। এটি করা হয় ফলাফলে যেন কোনো ধরনের বায়াসনেস না হয়। তবে ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ইনফেক্টেড হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

তৃতীয় ফেজ : কয়েক হাজার ভলান্টিয়ার লাগে কয়েক বছরব্যাপী। একেও ডাবল বস্নাইন্ডেড র‌্যান্ডমাইজড প্লাসেবো কন্ট্রোলড ট্রায়াল বলে। এই পর্যায়ে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হয়। অবশ্য যাদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয় তাদের ইনফেক্টেড হওয়ার চান্স থাকে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় ফেজ শেষ হলে তার ফলাফল সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে জমা দেয়।

ভ্যাকসিনের এফিকেসি ও ইফেক্টিভনেস
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভ্যাকসিন অনুমোদনের আগে অনেক কিছুর সাথে অন্তত তিনটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখেই অনুমোদন দেয়। প্রথমত, ভ্যাকসিনের গুণাগুণ অর্থাৎ ভ্যাকসিনের সব উপাদান সঠিক মাত্রায়, সঠিক তাপমাত্রায়, ইফেক্টিভ ডোজ ইত্যাদিতে সব ঠিকঠাক আছে কি না। দ্বিতীয়ত, টিকা গ্রহণের পর টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিরাপত্তার গ্যারান্টি কতটুকু, তৃতীয়ত, ভ্যাকসিনের ‘এফিক্যাসি’ অর্থাৎ তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় ফেজের ফাইনাল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রাপ্ত টিকার সফলতা, কার্যক্ষমতা বা নিশ্চিত ফলদানের ক্ষমতা। সুতরাং লাইসেন্স প্রাপ্তি ও রেজিস্ট্রেশনের আগ পর্যন্ত এই ‘এফিক্যাসি’ই দেখা হয়।

এ পর্যন্ত সফল হলে ম্যানুফেকচারার বায়োলজিক লাইসেন্সের জন্য অ্যাপ্লিকেশন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর। কর্তৃপক্ষ একটি এক্সপার্ট কমিটি দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হলে লাইসেন্স দেয় সাময়িক সময়ের জন্য শর্তসাপেক্ষে। এখানে শর্তে বলে দেয়া হয় যে, টিকা দেয়ার এ লাইসেন্স সাময়িক এবং সমাজের সবাইকে টিকা দেয়ার পর আবার এর কার্যকারিতা দেখা হবে। সুতরাং কোম্পানি শর্তসাপেক্ষের পোস্ট এপ্রোভাল, মনিটরিং ও রিসার্চ চালাতে থাকে।

যেহেতু এই রিসার্চ চলে সব শ্রেণীর মানুষ যাদের টিকার আওতায় আনা হয়েছে তাদের ওপর। এ পর্যায়টাই প্রকৃতপক্ষে ভ্যাকসিন সমাজে কতটুকু কার্যকর তা দেখা হয়। যা তৃতীয় ফেজের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যন্ত দেখা হয়, তা মূলত ‘এফিক্যাসি’।

‘এফিক্যাসি’ ও ইফেক্টিভনেস শব্দ দু’টি শুনতে প্রায় এক রকম শুনালেও আসলে এদের মধ্যে বাস্তবতার ব্যবধান অনেক। পরিংখ্যানবিদ গবেষকরা ‘এফিকেসি’ আর ‘ইফেক্টিভনেস’ এ দু’টি শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। তাদের ভাষায়, এফিকেসি হলো বাজারে আসার এবং বাস্তবে জনসাধারণের টিকা গ্রহণ করার আগে পরীক্ষামূলকভাবে গৃহীত ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’য়ের টিকার যে সক্ষমতা দেখায় তা।

‘ইফেক্টিভনেস’ হলো ইমার্জেন্সি ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার পর বাস্তবে জনসাধারণের মধ্যে তাদের টিকা কতটুকু কার্যকারিতা দেখিয়েছে তা দেখা। অন্য কথায় ‘এফিকেসি’ হলো বাজারে আসার আগের টিকার সক্ষমতা আর ‘ইফেক্টিভনেস’ হলো বাজারে আসার পর বাস্তব ময়দানে টিকার সক্ষমতার প্রমাণ।

এফিকেসি ৮৫ শতাংশ মানে এই নয় যে বাকি ১৫ শতাংশই অসুস্থ হয়ে যাবে এবং ভ্যাকসিন শুধু ৮৫ শতাংশ লোকের ওপর কার্যকরী। এর মানে হলো তাদের ফাইনাল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (তৃতীয় ফেজ) পরীক্ষায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে শতভাগ লোককে পেয়েছে যে তারা কোনো উপসর্গ প্রকাশ করেনি। বাকি ১৫ শতাংশের ক্ষেত্রে তারা যে উপসর্গ প্রকাশ করবে না তার শতভাগ নিশ্চয়তা পায়নি। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ উপসর্গ প্রকাশ করলেও তা হবে মৃদু এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা নেই। এখানে মনে রাখতে হবে যে তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কিন্তু বৃদ্ধ, ইমিউনো ক¤েপ্রামাইজড, খুব দুর্বল ও ছোট শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা ছিল না।

সব মিলিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফাইনাল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ৫০ শতাংশ বা তার ওপর ‘এফিকেসি’ দেখালেই ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়। আর যারা টিকার এই এফিকেসি দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাদের অবস্থা হয় ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নাই’ ধরনের। ফলে তারা অনুমোদনের বাইরে থেকে যায়। বাস্তব ময়দানে টিকা নিচ্ছে আবালবৃদ্ধবনিতা। ফলে ইফেক্টিভনেস ভিন্নতর হতে বাধ্য। টিকা পরিবহন, সংরক্ষণ, বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে টিকার ‘ইফেক্টিভনেস’ কমে যাওয়া সম্ভব। টিকাসংক্রান্ত ‘সিডিসি’র দেয়া যেকোনো নির্দেশনা না মানলেই টিকার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

বাস্তবে ও ইমিউনো কম্প্রোমাইজড ও বয়স্ক লোকেরা টিকা নিলেও তাদের পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। ফলে ইফেক্টিভনেস কমে যাওয়ারই কথা। আবার বাস্তবে অন্য বয়সীদের ওপর ভালো ফলাফল দেখালে সর্বোপরি সক্ষমতা বেড়েও যেতে পারে। আরেকটা উদাহরণ টেনে বলা যায়, সেনবাহিনীর সৈনিকদের প্রশিক্ষণকালে যে ট্রেনিং বা মহড়ার আয়োজন করা হয়, এর মাধ্যমে এদের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধের ময়দানে তার চেয়ে কম বা বেশিও হতে দেখা যায়। যেহেতু এখানে দুই পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে হাজির হয়। এসব কারণেই টিকা নেয়ার পরও ভ্যাকসিন ব্রেক থ্রো ইনফেকশন হয় এবং মারাও যায়। যদিও সংখায় তা অতীব নগণ্য।

পঞ্চম ধাপের কাজ হলো সংশ্লিষ্ট কোম্পানি যারা শর্তসাপেক্ষে ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিন প্রয়োগের অনুমতি পেয়েছে তাদেরকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্যাম্পল লট যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হয়। অনেক যাচাই-বাছাই করার পর তারা ফাইনাল অনুমোদন পায়। কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে দেখে তাদের ‘ইফেক্টিভনেস’ ঠিক আছে কি না। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে যে টিকা কার্যক্রম চলছে তা মূলত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় ফেজের ফলাফল তথা ‘এফিকেসি’র ওপর ভিত্তি করেই চলছে। এখনো অনেক কোম্পানির ভ্যাকসিনেরই ‘ইফেক্টিভনেস’ এখনো দেখার সুযোগ না হলেও বিশ্বব্যাপী এই প্রক্রিয়া চলমান।

তবে ‘এফিকেসি’র সক্ষমতা দেখা ছাড়া কোনো ভ্যাকসিন জনসাধারণ্যে প্রয়োগের অনুমোদন পায় না। উদাহরণস্বরূপ, বাজারে আসার আগে জার্মানির ফাইজার-বায়োঅ্যান্টেক ৪৪ হাজার লোকের ওপর ট্রায়াল করে ৯৪ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না ৩০ হাজার লোকের ওপর ট্রায়াল করে ৯৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ৭০ হাজার লোকের ওপর ট্রায়াল করে ৭৬ শতাংশ, নোভাব্যাক্স ৪৫ হাজার ওপর ট্রায়াল করে ৭৯ শতাংশ, চীনের সিনোফার্ম ৫০ হাজার লোকের ওপর ট্রায়াল করে ৭৯ শতাংশ, রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ৪০ হাজার লোকের ওপর ট্রায়াল করে ৯২ শতাংশ, সিনোভ্যাক্স ২৬ হাজার লোকের ওপর ট্রায়াল করে ৫০ শতাংশ এবং বেলজিয়ামের জনসন অ্যান্ড জনসন ৭০ হাজার লোকের ওপর ট্রায়াল করে ৬৬ শতাংশ কার্যকারিতা পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ট্রায়ালে যেকোনো টিকার নিরাপত্তা পুরোপুরি ঠিক রেখে কার্যকারিতা ৫০ শতাংশ বা তার বেশি হলেই অনুমোদন দিচ্ছে।

অতএব, কোন কোম্পানি বা কোন দেশের টিকা ভালো, কোন দেশেরটা খারাপ এ কথা বলার সময় এখনো হয়নি। এ জন্যই যে টিকার সুবিধা সামনে আসবে সেটিই নেয়া ভালো। তবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে যে টিকা যে দেশে ভ্রমণের জন্য অনুমোদিত সেই টিকাই নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে আবেদনসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। বিশেষ ক্ষেত্র ও বৈজ্ঞানিক কারণ বাদে সব কোম্পানির টিকা যারা অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাজারে ভ্যাকসিন নিয়ে এসেছে- সবাই নিতে পারবেন। যত সহজে আমরা ভ্যাকসিন পাই বলে মনে করছি, আসলে ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসা অত সহজ নয় মোটেই। অতএব, সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় বলা যায়, ‘মাছি মারা কেরানি নিয়ে যত ঠাট্টা-বিদ্রপই করি না কেন মাছি ধরা যে কত কষ্ট তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানে’।

বাস্তব কারণেই কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন দৌড়ে অনেক দেশ এবং কোম্পানি অংশ নিতে পারেনি। ১ ডিসেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত মাত্র ২৫টি কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রয়োগের জন্য বিভিন্ন দেশ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ভ্যাকসিন কেবল ইমার্জেন্সি ব্যবহারের এবং ৯টি ফুল ইউজের জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত। ৯৪টি দেশ ভ্যাকসিন প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্বে এখন ১৪০টি প্রতিষ্ঠানের ৫১৮টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। এর মধ্যে ফেজ-১তে ৫২ টি, ফেজ-২তে ৪৬টি ও ফেজ-৩ তে চলছে ৪২টি ভ্যাকসিন ট্রায়াল। ১০টি ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে বাদ পড়েছে। এ ছাড়াই ১৯৪টি প্রতিষ্ঠানের চলছে প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। মাত্র আটটি ভ্যাকসিন জরুরি ব্যবহারের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমতি দিয়েছে। অথচ ৬২টি দেশের ১৬০টি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন দৌড়ে অংশ নিয়েছিল। বেইজিং ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল সাইন্স এডি৫-এনকভ-আইএইচ নামে একটি ইনহেলেসন ভ্যাকসিনের ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেছে। তৃতীয় ফেজের ট্রায়াল ডিসেম্বর, ২০২১ সালের মধ্যে শেষ করবে। এখানে উল্লেখ্য, ফেজ-৪ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয় সাধারণ জনগণের মধ্যে যা সব দেশই বাধ্যতামূলকভাবে করবেই এমন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে যুতসই মনে হলে ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আগেই এনলিস্ট করে ফেলে।

১৯ নভেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত বিশ্ব এক হাজার ৩৬৭টি ধরনের করোনার ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরি করে ফেলেছে। ২৬ নভেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত মাত্র আটটি কোম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। এগুলো হলো জার্মানির ফাইজার-বায়োঅ্যান্টেক, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না ও জনসন অ্যান্ড জনসন, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ভারতের কোভি শিল্ড এবং ভারত বায়োঅ্যান্টেক বা কোভ্যাকসিন, চীনের সিনোফার্ম এবং সিনোভ্যাক বা করোনাভ্যাক। এ ছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে বাংলাদেশসহ ৭৭টি দেশ ইমার্জেন্সি ইউজ লিস্টে নাম আছে।

বাংলাদেশ এ পর্যন্ত সাতটি ভ্যাকসিনকে এ দেশে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। এগুলো হলো অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, কোভিশিল্ড, ফাইজার-বায়োঅ্যান্টেক, মডার্না, স্পুটনিক-ভি, জনসন অ্যান্ড জনসন এবং সিনোভ্যাক। শিগরিই বাংলাদেশ এক ডোজ মেসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাকসিনের প্রথম গর্বিত আবিষ্কারক! গ্লোব বায়োঅ্যান্টেক লি. হলো গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের একটি সহযোগী স্বদেশী প্রতিষ্ঠান। সেল ও মলিকুলার বায়োলজি, ব্যাকটেরিয়াল সেল কালচার, প্রোটিন পিউরিফিকেশন, ড্রাগফরমুলেশন, অনকোলজি, বায়োটেকনোলজি, মাস্টার সেল ব্যাংক, নতুন ড্রাগ ও নতুন নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশী এই কোম্পানি ২০২০ সালের ৮ মার্চ মেসেঞ্জার আর এনএভিত্তিক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাজ শুরু করেছে বলে ঘোষণা দেন। ২ জুলাই, ২০২০ সালে ঘোষণা করেন যে তারা মেসেঞ্জার আরএনএভিত্তিক কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে। গত ৫ অক্টোবর, ২০২০ তারা ইঁদুরের ওপর প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করে। সে মোতাবেক তারা ডিসেম্বর, ২০২০ থেকে জানুয়ারি, ২০২১ এর মধ্যে সব নথিপত্রসহ বাংলাদেশ সরকারের কাছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি চায়। গ্লোব বায়োঅ্যান্টেকের পুরো রিসার্চ মে, ২০২১ সালে বিখ্যাত ‘ভ্যাকসিন জার্নালে’ প্রকাশ করেছে।

১৬ জুন ২০২১ ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর শর্তসাপেক্ষে হিউম্যান ট্রায়ালের নীতিগত অনুমোদন দেয়। কিন্তু গত ২২ জুন, ২০২১ বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল-বিএমআরসি একটি চিঠি দিয়ে গ্লোব বায়োঅ্যান্টেককে জানায়, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আগে বানর বা শিম্পাঞ্জির শরীরে প্রয়োগ করে এ টিকা পরীক্ষা করতে হবে।

মেসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাকসিন দুই ধরনের। একটি হলো, পিউর মেসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাকসিন এবং অপরটি মডিফাইড মেসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাকসিন। গ্লোব বায়োঅ্যান্টেক যেহেতু পিউর মেসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাকসিন তৈরি করছে সে ক্ষেত্রে বানর বা শিম্পাঞ্জিতে প্রয়োগ না করলেও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অসুবিধা হতো না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।