Naya Diganta
বিআইডিএসের গবেষণা

যানজটেই ২.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারিয়ে যাচ্ছে

বিআইডিএসের গবেষণা

রাজধানীর যানজটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের ক্ষতি হচ্ছে। বছরে জিডিপির সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মাথাপিছু আয়ের ক্ষতি হচ্ছে মাইনাস ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। সেই সাথে রাজধানীর অতি প্রবৃদ্ধির (ওভার গ্রোথ) কারণে ক্ষতি হয় জিডিপির ৬ শতাংশ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সম্মেলনে আরো জানানো হয়, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি বাদ দিয়ে বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে রাজধানীর যানজটে। এ ক্ষতি দেশের জাতীয় বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। অন্য গবেষণায় বলা হয়েছে, দারিদ্র্য নিরসনের গতিতে দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো। ভোগের পরিমাণেও জাতীয় গড় পরিমাণের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর মানুষ। অন্য দিকে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মানুষ জাতীয় গড় ভোগের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ঢাকাস ওভার গ্রোথ অ্যান্ড ইস কস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) পরিচালক আহমেদ আহসান। রাজধানীর লেকশোর হোটেলে এ সম্মেলন হচ্ছে। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে দ্বিতীয় দিনে ১৫টির মতো গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। উপস্থাপনায় আহমেদ আহসান বলেন, এক দিকে উন্নয়নের কাজ চলছে, অন্য দিকে রাস্তায় চলছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন। এই দু’য়ে মিলে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। দেশের মানুষ যারা শহরে বাস করে তাদের বেশির ভাগের বাস রাজধানীতে। দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। প্রধান শহরগুলোতে বাস করে ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে আবার রাজধানীতে বাস করে ১১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস করে সাড়ে ৩ শতাংশ শহরে। ১০ লাখের মতো মানুষ বাস করে এমন শহর মাত্র পাঁচটি। তিনি বলেন, চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৩৮ কোটি। এরমধ্যে শহরে বাস করে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। সবচেয়ে বড় শহরে বাস করে ১ দশমিক ৮ শতাংশ, ১০ লাখের মতো মানুষ বাস করে এমন শহর রয়েছে ১০২টি। ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৩৩ কোটি। এরমধ্যে শহরে বাস করে ৬ শতাংশ। সবচেয়ে বড় শহরে বাস করে ২ শতাংশ মানুষ। ১০ লাখের বেশি মানুষের শহর রয়েছে ৫৪টি।
পিআরআই পরিচালক বলেন, দেশের উন্নয়নের বেশির ভাগ রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় অন্যান্য শহরে উন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহারেও অন্যান্য শহর পিছিয়ে আছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অনেক। কিন্তু উৎপাদন হয় কম। দারিদ্র্য নিরসনের হার শহরে কম, গ্রামে বেশি। এই হার জাতীয় হারের চেয়ে গ্রামে বেশি। এ ছাড়া শ্রমিকদের মজুরি হারের প্রবৃদ্ধি শহরে কমছে। আগে যেখানে প্রবৃদ্ধির এই হার ১২ শতাংশ ছিল। এখন সেটি কমে ৮ শতাংশ হয়েছে।
আরেক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, দেশে জাতীয় পর্যায়ে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৬ সালে সেটি কমে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশে। অন্য দিকে জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু ভোগ ২০১০ সালে ছিল এক হাজার ৪৭১ টাকা ৫৪ পয়সা। ২০১৬ সালে সেটি বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৫০৮ টাকা ৬৪ পয়সা। এ দিকে অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর দারিদ্র্য পরিস্থিতি নাজুক। ২০১০ সালে এসব জেলায় দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৪৫ শতাংশে। এই হার জাতীয় দারিদ্র্য হারের তুলনায় বেশি। ২০১০ সালে জাতীয় গড়ের চেয়ে দারিদ্র্যের হার ২ শতাংশ বেশি থাকলেও ২০১৬ সালে এসে এই অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ছিল ৬ শতাংশের বেশি।
বিআইডিএসের গবেষণার হিসাব বলছে, ছয় বছরে এই অঞ্চলের মানুষের ভোগের পরিমাণ বাড়েনি বললেই চলে। ফলে এই সময়ে এসে জাতীয় গড়ের সাথে এই অঞ্চলের মানুষের ভোগের পরিমাণের ব্যবধানও বেড়েছে। ২০১০ সালে এই ব্যবধান ছিল ৯৬ টাকা ৯৪ টাকা ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১২৯ টাকা ৬৯ পয়সা।
এ দিকে পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশে। পূর্বাঞ্চলের এসব জেলার দারিদ্র্য পরিস্থিতি জাতীয় গড়ের তুলনায় ভালো। ছয় বছরের ব্যবধানে এই এলাকায় দারিদ্র্যের হার কমেছেও বেশি গতিতে। জাতীয় গড় মানের তুলনায় পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর নাগরিকরা ভোগেও এগিয়ে রয়েছেন। ২০১০ সালে এই অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু ভোগ ছিল এক হাজার ৬১৩ টাকা ২২ পয়সা, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে ১৪১ টাকা ৬৮ পয়সা বেশি। ২০১৬ সালে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৯৮ টাকা ১৯ পয়সায়। এই পরিমাণও ১৮৯ টাকা ৫৫ পয়সা বেশি। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে এসে এই ভোগের হারের ব্যবধানও বেড়েছে গড় মানের তুলনায়।