Naya Diganta

গানের বাণীতে শব্দালঙ্কার

গানের বাণীতে শব্দালঙ্কার

বাণী আর সুরের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় গান। গানের বাণী বলতে গীতি কবিতাকে বোঝায়। গীতি কবিতা বলতে বোঝায় কবির একটি মাত্র ভাবের বা অনুভূতির ছন্দময় প্রকাশকে। কবিতায় অনেকগুলো ধারা রয়েছে। সবচেয়ে প্রাচীন, উচ্ছল, বহমান ধারা হচ্ছে গীতি কবিতা।
মানুষের সাদামাটা কথাতে কাব্যিক অলঙ্কার পরিধান করিয়ে তাকে কবিতায় রূপান্তর করা হয়।
অলঙ্কার অর্থ ভূষণ বা গয়না। নারীরা তাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য একধরনের ভূষণ বা অলঙ্কার ব্যবহার করে থাকে। তাকে বলে দেহের অলঙ্কার। কবিরা তেমনই কাব্য দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যে বিশেষ ভূষণ বা অলঙ্কার ব্যবহার করে থাকেন তাকে বলে কাব্য অলঙ্কার। অন্য কথায় যে রচনা কৌশল কাব্যের শব্দ ধ্বনিকে শ্রুতিমধুর এবং অর্থধ্বনিকে রসাপ্লুত ও হৃদয়গ্রাহী করে তাকে কাব্যের অলঙ্কার বলে।
একটি কবিতা অলঙ্কারের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত হয়ে তার শিল্পিত রূপ এবং নান্দিকতাকে ফুটিয়ে তুলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই কাব্য অলঙ্কারের নানা শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে
শব্দালঙ্কার যা কবিতার দেহের বিষয়। অর্থালঙ্কার যা কবিতার ভেতরের বিষয়।
অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, বক্রোক্তি, পুনরুক্তবদাভাস, উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক, সমাসোক্তি, অন্যাসোক্তি।
গানের বাণী বা গীতি কবিতায় শব্দালঙ্কারের প্রাধান্য থাকে আর কবিতায় অর্থালঙ্কারের প্রাধ্যান্য থাকে।
যদিও বিশিষ্ট কবি, প্রারম্ভিক ও গীতিকার জনাব আবিদ আনোয়ার গানের বাণীতে শব্দালঙ্কার যতটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থালঙ্কারও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন, বাস্তবে গানে শব্দালঙ্কারের প্রাধান্যই বেশি দেখা যায়। উপমহাদেশে এবং বিশ্ব সঙ্গীতে যে সব সঙ্গীত জনপ্রিয়তার তুঙ্গে গিয়েছে সেগুলোর প্রায়ই শব্দালঙ্কারে ভরপুর, অর্থালঙ্কারে নয়।
সঙ্গীতে অর্থালঙ্কারের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। তবে যেহেতু গীতিকবিতায় শব্দালঙ্কারের ব্যবহার ব্যাপক তাই এই পর্যায়ে আমরা গানে শব্দালঙ্কারের ব্যবহার বিষয়ে আলোচনা সীমিত রাখবো।
শব্দালঙ্কার : উচ্চারণবান্ধব, সহজ, সরল অর্থসমৃদ্ধ শব্দের যথাযথ ব্যবহারই শব্দালঙ্কার।
অন্য কথায় যে অলঙ্কার ধ্বনি বা শব্দের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে বাক্যকে শ্রুতিমধুর করে তাকে শব্দালঙ্কার বলে।
গানের বাণীতে শব্দালঙ্কারের প্রয়োগ কীভাবে হয় সেটিই বোঝার বিষয়। নানান প্রকৃতির শব্দালঙ্কারের মধ্যে সর্বানুপ্রাস,সর্বযমক ও পুনরুক্তবদাভাস ছাড়া অন্য সব শব্দালঙ্কারের বেশি/কম প্রয়োগ গানের বাণীতে লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে গানের বাণীতে শব্দালঙ্কার ব্যবহারের গুরুত্ব ও প্রায়োগিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে মোটামুটি নিন্মোক্তভাবে ক্রম ধারায় সাজানো যায় : ১. অন্তমিল ২. মধ্যমিল ৩. আদ্যমিল ৪. শ্রুত্যনুপ্রাস ৫. বৃত্তানুপ্রাস ৬. ছেকানুপ্রাস ৭. লাটানুপ্রাস ৮. আদ্যযমক ৯. মধ্যযমক ১০. স্বার্থক যমক ১১. নিরর্থক যমক ১২. কাকু বক্রোক্তি।
অবচেতন মনে গীতি কবিগণ বিভিন্ন শব্দালঙ্কার গীতিকবিতায় ব্যবহার করেন সহজাত প্রক্রিয়ায়। তবে কিছুটা সচেতনতার সাথে পরিকল্পনা করে শব্দালঙ্কার ব্যবহার করা গেলে তা হয়ে দারুণ শ্রুতিমধুর, সুখপাঠ্য এবং সাবলীল সুরারোপযোগ্য। এ জন্য গানের বিষয় নির্বাচনের পর আস্থায়ী,অন্তরা,সঞ্চারী,আভোগ অবয়বে সাদামাটা কথা লিখে সেগুলোতে ছন্দ ও কাব্যালঙ্কার পরিধান করানোর জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ শব্দের প্রতিশব্দ, বিপরীত শব্দ আগে জেনে নিতে হবে, এরপর ক্রমান্বয়ে শব্দালঙ্কারের [বিশেষ করে অনুপ্রাস (অন্তমিল, মধ্যমিল, আদ্যমিলশ্রুত্যনুপ্রাস, বৃত্তানুপ্রাস, ছেকানুপ্রাস, লাটানুপ্রাস), যমক (আদ্যযমক, মধ্যযমক অন্তযমক, সার্থক যমক, নিরর্থক যমক), শ্লেষ ও বক্রোক্তি) প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলা গানের অধিকাংশই অন্তমিল ও অন্তনুপ্রাসসমৃদ্ধ। সুতারং যারা এই প্রাচীন কিন্তু বহুল প্রচলিত শব্দালঙ্কারের ব্যবহার করতে চাইবেন তারা প্রতি চরণের শেষে মিল রেখে গীতিকবিতা রচনা করতে পারেন। যেমন- স্রষ্টা ও সৃষ্টি বিষয়ে প্রথমে ভাবটা সাদামাটা কথায় দুটোলাইন এভাবে লেখে ফেললেন : স্রষ্টাই এই পৃথিবীর সৃষ্টিকারী। তার সৃষ্ট সূর্যই আলো দিয়ে যায়। এই ভাবটা কবি অন্তপ্রাসের জন্য আগেই অন্তমিলসমৃদ্ধ শব্দ দুটো নির্বাচন করবেন।এই ক্ষেত্রে ভাবের সাথে মিল রেখে কবি নির্বাচন করলেন “ ছাড়া-ভরা। এই শব্দ চয়নের পর ছন্দ রেখে কবি লিখলেন-
এই দুনিয়া হয়নি সৃষ্টি স্রষ্টা ছাড়া
একই সূর্যের আলোয় সবার দৃষ্টি ভরা।
আবার কেহ সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য চরণের মাঝে যদি অনুপ্রাস বা দুটো ধ্বনির মিল দেখতে চায় তবে তাকে মধ্যানুপ্রাসের প্রয়োগ করতে হবে। এ জন্য পূর্বেই অন্তমিল সমৃদ্ধ শব্দ নির্বাচন করে নিতে হবে। যেমন- চরণের মাঝে রাখ ডাক বা যাক পাক দিয়ে এভাবে দুটো চরণ হতে পারে-
না রেখে রাখ-ডাক সকাশে
সত্যটা যাক পাক প্রকাশে।
আদ্যানুপ্রাস সমৃদ্ধ গীতিকবিতাও দারুণ দোলা দেয়। তবে আদ্যানুপ্রাস ছাড়াও এখানে অন্তমিল সমৃদ্ধ শব্দের প্রয়োজন হয়। তাই এসব প্রয়োগে গীতিকবিতা লিখতে কবি আদ্যানুপ্রাসের জন্য যেমন শব্দ নির্বাচন করতে হয় তেমনি অন্তমিলের জন্যও শব্দ চয়ন করতে হয়। যেমন- মানুষ নতুন করে ঘর তুলছে। আনন্দে কেউ কেউ বেলুন উড়াচ্ছে- এই ভাবটাকে গীতিচরণে রূপান্তরের জন্য প্রথমে ভাবের সাথে মিল রেখে আদ্যানুপ্রাস ও অন্তমিল সমৃদ্ধ শব্দ নির্বাচন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আদ্যানুপ্রাস হতে পারে ‘মানুষ-ফানুষ’(বেলুনের প্রতিশব্দ)আবার অন্তমিল সমৃদ্ধ শব্দ হতে পারে ‘সুরে-জুড়ে’। এই অবস্থায় গীতিচরণ দুটো এভাবে হতে পারে- মানুষ বাঁধছে ঘর নতুন সুরে
ফানুস উড়ছে ঐ আকাশ জুড়ে।
এই প্রক্রিয়ায় চরণের ভাবার্থের সাথে/ বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বৃত্তানুপ্রাস, ছেকানুপ্রাস, লাটানুপ্রাসের প্রয়োগ করতে হবে। গীতিকবিতা একমুখী তালের হলে সে ক্ষেত্রে এক বা দুই শ্রেণীর অনুপ্রাসের সমন্বয়ে হলে সুরারোপ সহজ হয়।তবে পঙ্ক্তি ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন অনুপ্রসা থাকতে পারে।
গীতিকবিতায় যমকের ক্ষেত্রেও অন্তযমকের প্রয়োগ বেশি। এ ছাড়া সার্থক ও নিরর্থক যমকের প্রয়োগও লক্ষ্যণীয়। গীতিকার গীতিকবিতা রচনায় ভেবে-চিন্তে প্রয়োজনীয় যমক চয়ন পূর্বক তা গীতি কবিতায় প্রয়োগ করতে পারেন।
এভাবে যমক ব্যবহারের পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশব্দ, বিপরীত শব্দ, জোড়া শব্দগুলো অধ্যয়ন করতে হবে।
গীতিকবিতায় শ্লেষের ব্যবহার কম। বক্রোক্তির মধ্যে গীতি কবিতায় কাকু বক্রোক্তির ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। বক্রোক্তিতে মূলত হ্যাঁ প্রশ্নবোধক বাক্যের মাধ্যমে না বোধক বক্তব্য এবং না প্রশ্নবোধক বাক্যের মাধ্যমে হ্যাঁ বোধক বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। অনেকটা ঊহমষরংয এৎধসসধৎ এর ঞধম. ছঁবংঃরড়হ এর মতো। সুতরাং গীতিকবিতায় কাকু বক্রোক্তি ব্যবহার করতে এ বিষয়ে পরিছন্ন ধারণা থাকা প্রয়োজন। যেমন- নদীর কূল কিনারা নাই- এই সাধারণ বাক্যকে কাকু বক্রোক্তিতে প্রকাশ করলে দাঁড়াবে- নদীর কি আর কূল কিনারা আছে? কিংবা আমি বলী খেলা দেখতে যাবো- এই সাধারণ বাক্যকে কাকু বক্রোক্তিতে লিখলে যেটা হবে-
আমি কি যাবো না দেখতে বলী খেলা?
এমনি করে অধ্যয়ন পূর্বক গুরুত্বপূর্ণ শব্দালঙ্কারসমূহ গীতিকবিতায় যথাযথ প্রয়োগ হতে পারে।
গীতি কবিতা বা গানের বাণী রচনার জন্য শব্দালঙ্কারই গুরত্বপূর্ণ। কিছু কিছু অর্থালঙ্কারও গানের বাণীতে বেশ ব্যবহার হয়। বিশেষ করে উপমা ও রূপক। তবে প্রাথমিক অবস্থায় শব্দালঙ্কারের ব্যবহার জেনে অনুসরণ করতে পারলে ক্রমধারায় স্বাভাবিকভাবেই উপমা ও রূপকের চাহিদা নিজ থেকেই আসবে। তখন নিজের অজান্তে কবি সহজ সরল উপমা নিজ থেকেই অচেতনভাবে ব্যবহার করবেন। পরবর্তীতে তা একাডেমিক ফরমেটে রূপান্তর করতে পারবেন। যেমন করেছেন- লালন শাহ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম। তাদের প্রায় গানেই শব্দালঙ্কার। তবে কিছু কিছু গানে অর্থাঅলঙ্কার স্বপ্রণোদিতভাবে এসেছে। সেগুলোকে পরবর্তীতে অন্য অভিজ্ঞরা একাডেমিক ফরমেটে এনেছেন।
আশা করা যায় একজন গীতিকবি শব্দালঙ্কারের সাগরে সাঁত রাতে জানলে এর ভেতর থেকে কাব্যের মুক্তালঙ্কার সিঞ্চন করতে পারবেন। আর এর প্রয়োগে নান্দিকতাসমৃদ্ধ গানের বাণী বাঁধতে পারবেন।